বাংলাদেশের বিশেষ আইনে বিয়ে ও এরদোয়ানের প্রস্তাবিত বিল

শারমিন জান্নাত ভুট্টো: সপ্তাহখানেক আগের ঘটনা। একটি বিতর্কিত বিল তুরস্কের সংসদে উত্থাপন করে তাতে সমর্থন দিয়েছিলো এরদোয়ানের ক্ষমতাসীন দল একে পার্টি। বিলটিতে বলা হয়, দেশটিতে কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে ধর্ষণের পর যদি ধর্ষণকারী তাকে বিয়ে করে, তাহলে ধর্ষণকারীর অপরাধ ক্ষমা করা হবে। এরদোয়ান সরকারের প্রস্তাবিত বিলটি বিশ্লেষণ করলে চারটি বিষয় পরিষ্কার হয়।

early-3১. বিলটির ফলে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ে বৈধতা পায় সহজেই, যদিও বিয়ের বৈধ বয়স ১৮।

২. যেকোনো বয়সের পুরুষ কোনো মেয়েকে হাসিল ও তার সাথে কামবাসনা পূরণ করতে চাইলে ধর্ষণের পথেই হাঁটবে। তার মানে বৈধতা পাবে ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধও।

৩.যেসব মেয়ে শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হবে তারা কখনোই ন্যায় বিচার পাবে না, উপরন্তু ধর্ষকের সাথেই তার সারাটা জীবন পার করতে হবে।

৪. যেসব পুরুষ ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত, এ বিলের কারণে তারা গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরতে পারবে। কারণ বিয়ে করে যদি সাজা মওকুফ করা যায় তবে তো ধর্ষণকারী বিয়েই করবে। সাজা ভোগের চেয়ে বিয়ে করে পরবর্তীতে তালাক দিয়ে দিলেই তো মামলা খালাস। ইসলাম ধর্মে পুরুষদের চারটি বিয়ে করার বৈধতা তো এখানে আরো বোনাস পয়েন্ট হিসেবে কাজ করবে।

তুরস্কে প্রস্তাবিত এ বিলের পক্ষে সরকারি দলের যুক্তি হচ্ছে যেসব পুরুষ না বুঝে অল্পবয়সী মেয়েদের সাথে যৌনকর্মে জড়িয়ে যাবে মূলত তাদেরকে বিয়ে করার সুযোগ দেয়া হবে। তবে এ ধরনের উদ্ভট বিলের খবর প্রকাশ হবার সাথে সাথে এর তীব্র সমালোচনা ও নিন্দা জানায় দেশটির নারী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো। তারা বিক্ষোভ শুরু করলে চাপের মুখে পড়ে এরদোয়ান সরকার বিলটি পার্লামেন্ট থেকে প্রত্যাহার করে নেয়। আর এর ফলে আবারো বিচার পাবার আশায় মুখ তুলে তাকায় নারীরা।

early-marriage-1এ তো গেলে তুরস্কের কথা। এবার ঘুরে তাকানো যাক নিজের দেশের দিকে। এরদোয়ানের প্রত্যাহৃত বিলের খানিকটা ঝলক মিলবে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৬এর একাংশে। কিভাবে সম্ভব তা নিশ্চয় অনেকেই ভাবছেন। মিল ও সম্ভবের জায়গাটা বলছি এখনই।

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৬এর যে খসড়া মন্ত্রিসভা চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে তাতে ছেলে ও মেয়েদের বিয়ের বৈধ বয়স যথাক্রমে ২১ ও ১৮ বছর রাখা হয়েছে। তবে ‘বিশেষ প্রেক্ষাপটে’ কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে বিয়ে দেয়া যাবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আর এ ‘বিশেষ প্রেক্ষাপট’ বা অবস্থার সঙ্গে এরদোয়ান সাহেবের প্রস্তাবিত বিলের ষোল আনাই মিল। অর্থাৎ বাংলাদেশে ১৮ বছরের নিচে কোনো মেয়ে ধর্ষণের শিকার হলে, ধর্ষণকারী সেই মেয়ের অভিভাবকের সম্মতি আর আইনের দয়ায় তাকে বিয়ে করতে পারবে। বাহ কী সুন্দর, মারহাবা……

এবার আমরা যদি আমাদের দেশের এ আইনটি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করি তাহলে তো উপরিল্লিখত চারটি বিষয়ই প্রাধান্য পাবে। যেসব গরীব ও অসহায় মেয়েরা যৌন নির্যাতনের শিকার হবে, তারা তার নির্যাতনকারীর গোলাম হয়ে থাকবে, যদি কিনা বাধ্য হয়ে মেয়েটিকে বিয়ে করতে হয় সেই ধর্ষককেই।

ধর্ষণের শিকার একটি মেয়ের কষ্ট কি বিয়ের মাধ্যমে লাঘব হয়? এইভাবে কারো কষ্ট দূর করা যায় তা আমার জানা ছিলো না। আচ্ছা ধরেই নিলাম যে, অল্প বয়সে যৌনকাজে লিপ্ত হয়ে কেউ গর্ভবতী হয়ে গেলে কিংবা কোন প্রতিবন্ধী মেয়ে ধর্ষণের শিকার হলে, তারা বিশেষ বিবেচনায় অর্থাৎ আইন ও অভিভাবকের অনুমতিতে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে পারবে।

early-marriage-2আমার প্রশ্ন, সরকার কি এ ধরনের আইনের মাধ্যমে মেয়েদের মাথা গোঁজার ঠাই নিশ্চিত করতে চাইছে? নাকি ধর্ষিত মেয়েদের কে বিয়ে করবে সে চিন্তায় অস্থির হয়ে তাদের বিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে?

কারণ আমাদের দেশে তো মেয়েরা ধর্ষিত বা যৌন হেনস্তার শিকার হলে উল্টো মেয়েটিকেই সামাজিকভাবে হেয় ও অপদস্থ করা হয়। যেমনটি হয়েছে পূর্ণিমা শীলের ক্ষেত্রে। মনে আছে সেই মেয়েটির কথা যে কিনা ১৫ বছর আগে গণধর্ষণের শিকার হয়েও নিজের জীবন গড়ানোর সংগ্রামে লিপ্ত তাকে এখন পর্যন্ত আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হেয় করে যাচ্ছি। আমাদের যে রক্ষণশীল সমাজ সেটি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই ধর্ষিতাকে দেখে সবসময়। ধর্ষকদের জন্য সমাজ বা রাষ্ট্র বরাবারই উদার। তারা কিভাবে যেনো আইনের বেড়াজাল থেকে মুক্তি পেয়ে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়, নতুবা চলে যায় ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

একবার ভেবে দেখুন তো, আজ যদি তনু বেঁচে থাকতো আর কোনভাবে অপ্রাপ্তবয়স্কের খাতায় নাম থাকতো, তবে কী ভাগ্যে জুটতো তার? যেভাবে তনুর বাবা-মাকে হেনস্থা,জেরা আর ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছিল তাতে করে তো মেয়েটা বেঁচে থাকলে তাকে অনেকটা জোর করেই বিয়ে দেয়া হতো। তনু ধর্ষিত হয়নি কিংবা তার মৃত্যুর সঙ্গে সেনাবাহিনীর কোনো সম্পর্ক নেই এসব বিষয় ইনিয়ে-বিনিয়ে আসার পর আমরা তো সবাই ধরেই নিয়েছি, তনু হয়তো আত্মহত্যা করেছে, নয়তো তাকে ভূত এসে মেরে গেছে।

আপাতত এই কাহিনী বিশ্বাস করেই তো আমাদের তনু চ্যাপ্টার ভুলতে হয়েছে। যাই হোক এতো কথা বলছিলাম প্রসঙ্গক্রমেই। যে এরদোয়ানের সমর্থিত আইন চাপের মুখে প্রত্যাহারিত হলো তা কিন্তু আমাদের দেশে ঠিকই পাস হয়ে গেছে। এ আইনের মাধ্যমে কিছু ভালো হোক আর না হোক, বাংলাদেশ-তুরস্ক ভাই ভাই হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ সরকারের উচিত এ মুহূর্তে এরদোয়ান সরকার মানে বড় ভাইকে ধন্যবাদ দিয়ে তাদের দোস্তি বাড়ানো আর নিজেদের মধ্যকার সম্পর্ক আরেকটু উন্নত করা। অবশ্য বেশ কিছুদিন যাবত তুরস্ক যেভাবে যুদ্ধাপরাধী ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে কথা বলছিলো তাতে করে তো দুদেশের সম্পর্কে বিশাল বরফ জমেছিলো। এখন বোধহয় তা একটু গলবে। বড় ভাইকে বোঝানো যাবে তাদের দেশের আইন আমাদের দেশে প্রণীত হচ্ছে। ভাই-ভাই জিন্দাবাদ।

bhutto
শারমিন জান্নাত ভুট্টো

শুধু তাই নয়, এ আইনের মাধ্যমে তেঁতুল শফীদেরও একটু খুশী করা যাবে। তাদের যেভাবে লালা নি:সৃত হয় অল্পবয়সী মেয়েদের দেখলে, তাতে করে তাদের মতো অনেকেই এ আইনের ফায়দা লুটতে চাইবে নি:সন্দেহে। ধর্ম, সমাজ, রাষ্ট্র আর আইন সবকিছুতেই অবহেলার শিকার নারীরা। সেটি দেশে-বিদেশে সর্বত্রই। তবে তুরস্ক চাপের মুখে আইনটি সরালেও আমাদের দেশ তা করবে কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়। কোনো আইন অনুমোদন করার আগে সরকারের এটাও ভেবে দেখা উচিত ছিল তা হিতে বিপরীত হবে কিনা!

সবশেষে বলবো, ধর্ষকের শাস্তির চেয়ে ধর্ষিতার বিয়ে কোনভাবেই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। এ আইনকে ফাঁকি দিতে শত শত শকুনের চোখ প্রস্তুত হচ্ছে ছোবল দিতে। মেয়েরা সাবধানে থেকো আর প্রয়োজনে উপড়ে ফেলো সেসব রাক্ষুসে, শকুনে চোখ।

শেয়ার করুন:
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
    2
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.