গাজীপুর নির্বাচনে স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তির পরাজয়: অতি লোভে তাঁতী নষ্ট?

অদিতি ফাল্গুনী: গোপালগঞ্জের পর আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় বৃহত্তম ঘাঁটি গাজীপুরে বিপুল ভোটের নির্বাচনে পরাজিত হলেন আওয়ামি লীগের ত্যাগী নেতা ও গত বিএনপি আমলে নিহত আহসান উল্লাহ মাস্টারের পুত্র ও বিশিষ্ট নেতা আজমত উল্লাহ। বিএনপি-জামাত-হেফাজত তথা ১৮ দলের যে প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন…হ্যাঁ, ধর্ম রক্ষার আশায় জনতা যাকে ভোট দিয়েছে, তিনি হাজিদের হজের টাকা চুরি করে খাওয়া, কলেজে না গিয়ে ৩৫০ দিনের উপস্থিতি স্বাক্ষর করা থেকে শুরু করে এমন কোন কাজ করেননি যা ধর্মসঙ্গত।

চারটি সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচনে পরাজয়ের পর এই পরাজয়টি দেশের মুক্তবুদ্ধি ও প্রগতিশীল মানুষ, উচ্চ-মধ্য-নিম্নবিত্ত সহ অসংখ্য কর্মজীবী নারী, ধর্মীয়-নৃ-তাত্ত্বিক-ভাষাগত সংখ্যালঘুসহ সকল সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠির জন্য আশু বিপর্যয়ের সঙ্কেতবাহী। ধর্মের কার্ড সত্যিই গোয়েবলসীয় দক্ষতায় খেলেছে ১৮ দল। শিবিরের নারী কর্মীরা গ্রামে গ্রামে ল্যাপটপ নিয়ে গিয়ে গ্রামের নারীদের ফটোশপ করা ছবি দেখিয়েছে। দূর হাইতিতে ভূমিকম্পে নিহত অসংখ্য মানুষের ছবি দেখিয়ে বলেছে এটা পাঁচই মে শাপলা চত্বরে রাতে নিহত হেফাজতি কর্মীদের ছবি, ইসলামবিরোধী আওয়ামী নাস্তিক, হিন্দু ও ভারতঘেঁষা সরকার যাদের হত্যা করেছে। দরিদ্র ও নিরক্ষর কোটি কোটি মানুষের ধর্মভীতিতে সুপার টেকনোলজির সাহায্যে কম্পিউটারে ফটোশপ করে দু/তিন মাস আগেই সাঈদির চাঁদে যাওয়ার ছবি দেখিয়ে কিভাবে তাদের উত্তেজিত করে দাঙ্গা লাগানো হয়েছিল তা’ আমরা এত দ্রুত ভুলে নিশ্চয়ই যাইনি। সেই খেলারই পুনরাবৃত্তি হলো চার সিটি কর্পোরেশন এবং গাজীপুর নির্বাচনে। তবে এত কিছুর ভেতরেও ক্ষমতাসীন দলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাতেই হয় এত স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সাফল্যের সাথে অনুষ্ঠিত করতে পারার জন্য। কিন্তু পাশাপাশি কিছু ‘কিন্তু’ও থেকে যায়! না, আমি পদ্মা সেতু, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড, হলমার্ক ও শেয়ার বাজার কেলেংকারি, বিশ্বজিত হত্যা, লিমনের পঙ্গুত্ব এসব প্রসঙ্গ তুলছি না বা তুলব না। বিএনপির আমলে এর থেকে কয়েকশ’ গুণ অপরাধ-সন্ত্রাস- চুরি-খুন-ডাকাতি হয়েছে। এই সরকারের ব্যর্থতার পাশাপাশি জিডিপির প্রবৃদ্ধি বা বাংলাদেশের দারিদ্র্য হার অর্দ্ধেক হ্রাস পাওয়ার উপাত্ত বিশ্বব্যাংক সূত্রেই সমর্থিত। তবে? আওয়ামী লীগ সরকারের ভরকেন্দ্রের কাছাকাছি থাকা অনেকে যেমন শাহবাগ আন্দোলনের ঘাড়ে দায় চাপাতে চাইছেন, তাই কি? না, আমার বিবেচনায় গোটা ঘটনার দায় জামাতকে ঠেকাতে সরকারের ‘কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা’র পদ্ধতিতে ‘বলা নেই কওয়া নেই’ হেফাজত তাস বের করে খেলা থেকেই এই যাবতীয় ভরাডুবির সূচনা।

মাননীয় সরকার, শাহবাগে যখন লাখ লাখ ছেলে-মেয়ে একাত্তরেরপর এই প্রথম ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানে প্রজন্ম চত্বর মাতোয়ারা করে তিনটি সপ্তাহ অভুক্ত-অস্নাত পড়ে থেকেছে, রাজাকারের ফাঁসি চেয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ সপরিবারে ছুটে এসেছে, আপনারা তাদের সেই আবেগের যথার্থ সম্মান দেননি। আপনারা ভোটের হিসাবে বসে গেলেন। ব্লগার রাজিব হায়দার কি খুন হতেন যদি সেই রাতেই আপনারা তড়িঘড়ি করে ‘গণ জাগরণ মঞ্চ’ গুটিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত না নিতেন? লাখো তরুণের প্রবল স্বপ্ন, শপথ ও সংকল্পের আন্দোলনকে দ্রুত পকেটস্থ করতে চাইলেন। যেন তা’ যাদুকরের পকেটবন্দী রুমাল। ইচ্ছামতো খুলবেন আর ভাঁজ করবেন! তাই কি হয়? হ্যাঁ, রাজিব খুন হবার পর গণ জাগরণ মঞ্চের আয়ু আরো কিছুদিন বাড়লো। তবে চাঁদের হাট হয়ে গেল ভাঙ্গা হাট। ইতোমধ্যে মাহমুদুর রহমানের ‘আমার দেশ’ আস্তিক-নাস্তিক বিতর্ক তুলে, প্রধান বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া সেই সুরে সুর মিলিয়ে, শিবিরের ‘বাঁশের কেল্লা’ পেজ থেকে রাজিবের নামে ইসলামের নবীর বিরুদ্ধে লেখা বিদ্বেষ ও কটুক্তি বচন প্রচার করে পরিবেশ ত’ কলুষিত করেছেই। তবু এই প্রজন্মের আন্দোলনের কারণেই আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ বিচার ট্রাইব্যুনাল সাহস করেছে যুদ্ধাপরাধী দেলোয়ার জাহান সাঈদীর ফাঁসির রায় দিতে। তারপরই অবশ্য শুরু হলো শিবিরের হাতে পুলিশ নিধন, ফটোশপে চাঁদে সাঈদীর ছবি দেখিয়ে দাঙ্গা ও মন্দির ভাঙ্গা…ঠিক আছে! কিন্তু চট্টগ্রামে গণজাগরণ মঞ্চের সভা কেন হতে দিলেন না মাননীয় প্রধানমন্ত্রী? বরং বিস্ময়ের সাথে আমরা দেখলাম, কওমি মাদ্রসার লাখ লাখ ছাত্র-যুবকের প্রতিনিধিত্বে হেফাজতে ইসলাম নামে এক নতুন শক্তির উত্থান। ৬ই এপ্রিল তারা শাপলা চত্বরে বিশাল সমাবেশ করলো। ইটিভির এক নারী সাংবাদিক নাদিয়া শারমিনকে তারা প্রকাশ্যে তাড়া করে পেটালো। তারা শাহবাগ অবধি এসে গণজাগরণ মঞ্চের ছেলে-মেয়েদের হামলা করতে উদ্যত হলো। এত কিছুর পরও আপনার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দিন খান আলমগীর তাদের ধন্যবাদও দিলেন। তা’ সাপের চরিত্র ত’ ইতোমধ্যে বুঝবার কথা। আপনারা মিতালীপর্ব আরো বাড়ালেন। হেফাজতকে ৬ই মে আবার শাপলা চত্বরে সমাবেশের অনুমতি দিলেন। সারাদিন তারা তাণ্ডব চালালো। কিশোর মাদ্রাসা ছাত্রদের মাঝে জিন্স ও শার্ট পরা যারা এসে অত অত গাছ নানা যন্ত্রপাতি দিয়ে কাটলো, বিকেলে থেকে পুরানা পল্টনের ফুটপাথে হকারদের দোকানের বই-পত্রে (ধর্মীয় গ্রন্থ সহ) আগুন জ্বালালো, সিপিবি অফিসে আগুন দিল…এসব বর্বরতা করার বহু আগেই তাদের কি থামিয়ে দেওয়া যেত না? সন্ধ্যা ছয়টার দিকেই তারা যখন টিভিতে ঘোষণা দিচ্ছিল যে ‘নারী উন্নয়ন নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ হবে জারজ সন্তানদের দেশ’ বা ‘নারীর উন্নয়ন মানে ঘরে থাকা, বাইরে গিয়ে বেশ্যা হওয়া না’…একটি গণতান্ত্রিক দেশে যার সংবিধান নারী-পুরুষের সমতা স্বীকার করে…এই উন্মাদ আবর্জনাদের বক্তব্য এভাবে রাষ্ট্রীয় সরকারী-বেসরকারী প্রচার মাধ্যমে প্রচারিত হতে দিতে হবে কেন? জানি ফরহাদ মজহার মার্কা বহু ভণ্ড বাম আছেন যারা হেফাজতিদের সভা করতে না দিলে ‘গণতন্ত্র বিপন্ন’ বলে কাঁদতেন, আমাদের অনেক বাম বন্ধুই ফেসবুকে জ্বালাময়ী সব স্ট্যাটাস লিখত…কিন্তু এসব কিছুই কি হতে পারত যদি হেফাজতের তাস আপনারা খেলতে না যেতেন? ‘অতি চালাকের গলায় দড়ি’ সাধে বলে না! সব জায়গায় ‘শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’ নাম দিয়ে ‘জিয়াউর রহমান আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর’ নাম মুছে ফেলার বুদ্ধি একইভাবে কার্যকরি না-ও হতে পারে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ঠিক কোন্ ধৃষ্টতা আর আহাম্মকি থেকে আপনার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইসলামী ব্যাংকের অতিথি হয়? এতে কি যে লাখ লাখ তরুণ ‘ই-তে ইসলামী ব্যাংক/ তুই রাজাকার/ তুই রাজাকার’ বলে চেঁচিয়েছে, তাদের আবেগকে পদাহত করা হয় না? কেনই বা সালমান এফ রহমান কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী ও অতি ইতর প্রকৃতির সাংসদ সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর স্বাক্ষী হতে যাবেন? এই নির্লজ্জতার কি উত্তর হয়?

প্যান-ইসলামী মতাদর্শ বনাম আধুনিকতা: মিশর ও তুরষ্ক

ইসলাম ব্যতীত পৃথিবীর অন্য প্রধান ধর্মগুলোতেও যুগান্তের কুসংস্কার, মূঢ়তা আর অন্ধত্বের বিপুল অন্ধকার যে ছিল না তা’ নয়। দুইশো বছর আগেও বাংলার হিন্দু তার পাঁচ বছরের শিশু কন্যাকে অশীতিপর বৃদ্ধের সাথে বিয়ে দিয়ে ঘাটের মড়া বুড়োর সাথে চিতায় ঠেলে তুলত হত্যার জন্য। ইউরোপে খ্রিষ্টীয় পাদ্রিরা লক্ষ লক্ষ নারীকে ডাইনী সন্দেহে হত্যা করেছে। কিন্তু আর্থ-সামাজিক-ঐতিহাসিক কোন্ সব বাস্তবতার নিরিখে এই ধর্মগুলোর কিছুটা হলেও যুগের সাথে মিলিয়ে সংস্কার হয়েছে তা’ দীর্ঘ গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের বিষয় যা এই এক নিবন্ধে চটজলদি বলা কঠিন। কিন্তু যে কোন কারণেই হোক মধ্যযুগ পর্যন্ত জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় যথেষ্ট অগ্রসর বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায় একটি সময় ধর্মীয় কঠোর নানা অনুশাসনের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। আজো তার জের কাটেনি। চোদ্দশ বছর আগের একটি গ্রন্থ আজো অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে চাওয়ার চেষ্টা ও বর্তমানের বাস্তবতার সাথে তার সঙ্গত, স্বাভাবিক বিরোধ ও সদা উদ্যত প্রহরীর মত কঠোর একদল মোল্লা সম্প্রদায় কর্তৃক সারাক্ষণই ধর্ম যথেষ্ট পরিমাণে পালন করতে না পারার জন্য শাসানি ও চোখ রাঙানির দরুণ একজন ‘আধুনিক’ মুসলিমের জীবন তাই সবসময়ই বহন করছে দ্বৈততা বা দ্ব্যর্থকতা। যেমন কোরাণে কোন জীবিত প্রাণীর প্রতিকৃতি আঁকা অধর্ম। অথচ আফগানিস্থানে তালিবানরা বামিয়ানের বুদ্ধমূর্তি ভেঙ্গে ফেলে, মিশরে ইসলামী ব্রাদারহুড পিরামিড ভাঙ্গতে চাওয়া বা বাংলাদেশে হেফাজতে ইসলামের তেরো দফা দাবিতে অপরাজেয় বাংলাসহ দেশের সব ভাস্কর্য ভাঙ্গতে চাওয়ার ঘোষণা সত্ত্বেও নিয়তির পরিহাস হচ্ছে মোল্লা ওমর, বিন লাদেন বা জাকির নায়েক থেকে শুরু করে গোলাম আজম, দেলোয়ার হোসেন সাঈদি বা আল্লামা শফিরা নিয়মিত টিভি বা ভিডিও পর্দায় নিজেদের প্রতিকৃতি দেখান। তাদের ভক্তরা তাদের ওয়াজ থেকে শুরু করে বিধর্মী হত্যা বা ধর্ষণের নির্দেশও ইহুদি-খ্রিষ্টানের আবিষ্কৃত অডিও-ভিডিও-ইউটিউব-পেন ড্রাইভে ব্যবহার করছেন। বর্তমান বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থায় নারী-পুরুষ দু’জনকেই অর্থনৈতিক কাজ করতে হয় যা ইসলামে নারীর জন্য নির্ধারিত পর্দা ব্যবস্থার সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ। বহু বিবাহের স্বীকৃতি বা অনুমোদন, সঙ্গীত-চিত্রকলা-ভাস্কর্য নিষিদ্ধ করা সহ শিল্প-সাহিত্যের চর্চায় নিষেধাজ্ঞা সহ নানা মধ্যযুগীয় বিধি-বিধানই আজো রয়ে গেছে এই ধর্মে। মূলত: মরু অঞ্চলের নানা গোত্র-দ্বন্দে বিভক্ত ও পৌত্তলিক উপাসনা নির্ভর একটি ধর্মকে রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক স্বার্থে বেগবান করার উদ্দেশ্যে পূর্বের পৌত্তলিক ধর্মের নানা উপাদানকে গ্রহণ করেই (ত্রিশ দিনের রোজা বা উপবাস যা পৌত্তলিক আরবেরাও চন্দ্রদেবী আল-লাতের জন্য করত, হজ বা তীর্থযাত্রা, ৩৬০ দেব-দেবীর বিগ্রহ সম্পন্ন কাবা গৃহ প্রদক্ষিণ, কোরবানি বা পশু বলি, ইসলামী পতাকায় চন্দ্র দেবী আল-লাতের প্রতীক অর্দ্ধ চন্দ্রের ব্যবহার, ইসলামী উত্তরাধিকার আইনে ছেলে সন্তানদের প্রাপ্য অংশটুকু পুরোটাই প্রাক-ইসলামী যুগের উত্তরাধিকার আইন মেনেই করা) এই ধর্মে কিছুটা ‘মার্শাল রিলিজিয়ন’ বা ‘সামরিক ধর্মে’র চরিত্র ধারণ করা হয়েছে। কাজেই বুদ্ধ বা যিশুর করুণাঘন আর্তির পরিবর্তে এই ধর্ম সব ‘অবিশ্বাসী’র প্রতি অকরুণ ও নিষ্ঠুর। ‘অবিশ্বাসী’ কেবলই হত্যা, বিতাড়ন বা ধর্মান্তরযোগ্য। তার সাথে সহাবস্থান ‘প্রকৃত মুসলিমে’র জন্য দু:স্বপ্ন। আছে ‘শ্রেষ্ঠ ধর্মের অনুসারী হবার’ জজবা। ফলে বিধর্মী প্রতিবেশী ধনে-বিদ্যা-সাফল্যে এগিয়ে গেলে বা এমনকি সমান সমান হবার আশঙ্কা দেখা দিলেই তাকে হত্যা-লুট-ধর্ষণ-ধর্মান্তর হয়ে দাঁড়ায় ‘জিহাদ।’ কাজেই বাস্তবতা এটাই যে পৃথিবীর সব মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রেই ধীরে ধীরে অমুসলিম নাগরিকরা হয় ধর্মান্তরিত বা দেশান্তরিত হয়েছে। আবার এই ধর্ম নিজেকে ‘পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান’ দাবি করে, মধ্য যুগের হাত কাটা-চোখ তোলা-পাথর ছুঁড়ে হত্যার শরিয়া বিধানে সম্মতি দেয় বলে আধুনিক গণতন্ত্র ও আইন ব্যবস্থাও এ ধর্মের সাথে মতাদর্শিক ভাবে সাঙ্ঘর্ষিক। কাজেই বিপুল ধন-সম্পদের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রে আজো গণতন্ত্র নেই। নারী শিক্ষা ও কর্মসংস্থান, জন্ম নিয়ন্ত্রণ বা আধুনিক জীবনযাত্রার নানা মৌলনীতির সাথে সারাক্ষণই চলছে সঙ্ঘাত। সুখের বিষয় মিশর বা তুরষ্কে মাঝখানে ধর্মনিরপেক্ষবাদীতার পতন হলেও মানুষ আবার ফিরিয়ে আনছে ধর্মনিরপেক্ষ শাসন। ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি তাদের আস্থা হারিয়েছিল আর্থ-সামাজিক সুরক্ষার অভাবে যা ধর্মবাদীরাও তাদের দিতে পারে নি। তাই তারা আবার উদারপন্থায় ফিরছে। ফিরতেই হবে।

হেফাজতের উত্থান: বাংলাদেশে মাদ্রাসা শক্তির বাস্তবতা

এখানে আরো কিছু ব্যাপার আমাদের বোধ করি ভেবে দেখার দরকার আছে। বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের গোড়াপত্তনের পর ভারত উপমহাদেশের মুসলিমরা দীর্ঘদিন ইংরেজি তথা পশ্চিমা শিক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে ছিল। সৈয়দ আহমেদ বেরেলভিরা ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত যতদিনে হলেন, ততদিনে প্রতিবেশী হিন্দু সম্প্রদায় অনেকটাই এগিয়ে গেছে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও আধুনিক কর্মসংস্থান তথা জীবন যাপনে। বৃটিশ শাসক শ্রেণী ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে এদেশে ‘বাদামি কেরানিকুল’ যেমন তৈরি করতে চাইলেন, তেমনি দেওবন্দ মাদ্রাসাও প্রতিষ্ঠিত হলো। ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা, ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত ও জীবন যাপনে ভীষণ পশ্চিমা জিন্নাহর নেতৃত্বে পাকিস্তান আন্দোলন, বাংলায় প্রতিবেশীর তুলনায় পিছিয়ে পড়া বাঙালী মুসলিম জনতার সেন্টিমেন্ট ব্যবহার করে প্রাক-দেশভাগ অবিভক্ত বাংলায় মুসলিম লীগ ও সোহরাওয়ার্দী সরকারের উস্কানিতে নোয়াখালির ১৯৪৬ সালের দাঙ্গা বা কলকাতার ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ সহ নানা দাঙ্গা-হত্যা-ধবংসযজ্ঞের মাধ্যমে ও বৃটিশের সহায়তায়, কংগ্রেসের নিষ্ক্রিয়তায় মুসলিম লীগের ‘দেশভাগ’ পরিকল্পনা সফল করা এদেশের ইতিহাসের রূঢ় বাস্তবতা। অবশ্যই মৃত্তিকা বিচ্ছিন্ন বাঙালী বাবু হিন্দু শ্রেণীর তথা সমগ্র ভারতের উচ্চকোটির হিন্দু নেতাদের মুসলিম বা স্বধর্মেরই দলিত মানুষদের প্রতি তাচ্ছিল্য বা উন্নাসিকতাও ‘পাকিস্তান আন্দোলনে’ প্রেরণা হয়ে কাজ করে থাকবে। যোগেন মন্ডলের মত বাংলার দলিত শ্রেণীর শিক্ষিত, তরুণ নেতৃত্ব পাকিস্তানের পক্ষে রায় দিয়েছিলেন। যাহোক, দুই বাংলা বিভক্তি ও ইতিহাসের বৃহত্তম দেশত্যাগের পরপরই সদ্য স্বাধীনপাকিস্তানে পশ্চিমা পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠির সাথে ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয়তার প্রশ্নে বাঙালী মুসলিমের তথা সমগ্র পূর্ব বাংলার মানুষেরই দ্বন্দ ও বিরোধ দেখা দিল। ১৯৪৮ ও ১৯৫২-তে বাঙালীর ভাষার প্রশ্নে যে স্বাধিকার আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন হয়ে, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হয়ে, ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামি লীগের বিপুল বিজয়, পাক শাসক শ্রেণীর সেই নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান, ১৯৭১-এর ৭ই মার্চ রেসকোর্সের ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণা, ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় নিরীহ বেসামরিক মানুষের উপর পাক বাহিনীর চালানো গণহত্যা ও তার প্রেক্ষিতে আমাদের নয় মাসের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম ও ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের ঘটনা ঘটে। বিজয়ের এই একরৈখিক ইতিহাসের আড়ালে কিছু প্রশ্ন কিন্তু আজ খুব খোলাখুলিভাবেই আমাদের সামনে চলে আসছে। প্রশ্নগুলো হলো:

১. সরকারী নথি-পত্র থেকেই জানা যাচ্ছে ১৯৭১ সালের যুদ্ধে পাক বাহিনী ও বিহারীদের সাথে পাকিস্থান রক্ষার যুদ্ধে যোগদানকারী বাঙালী রাজাকারের সংখ্যা ছিল ৩০,০০০। এই ৩০,০০০ রাজাকার যদি ৩০,০০০ পরিবারের প্রতিনিধিত্ব করে তবে সেই সব পরিবারের মাথা পিছু জনসংখ্যা ৫ জন করে ধরলেও সংখ্যাটি হয় ১,৫০,০০০। পাল্টা হয়তো কেউ বলবেন একই পরিবারে এক চাচাতো ভাই রাজাকার ও অন্যজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন। হ্যাঁ, সমস্যাটাও সেখানেই। বাঙালীর জ্ঞাতি-আত্মীয়-কুটুম্ব সম্বন্ধের এই অসম্ভব ও প্রায় প্রাচীন যুগীয় ‘কিনশিপ বণ্ডেজ’ যার সাথে ধর্মান্তরিত হবার পর চাচাতো-মামাতো-ফুপাতো ভাই-বোনের ভেতর আরব প্রথামতে বিয়ের বন্ধন যুদ্ধের পর রক্তবীজ শত্রুকে হত্যা না করে তাদের সাথেই আত্মীয়তা-খাওয়া-ওঠাবসা সব চলেছে আমাদের। ফলাফল আজ স্বাধীনতার ৪২ বছরের মাথাতেও সালমান এফ রহমানের মত কড়া আওয়ামী লীগার ’৭১-এর গণহত্যাকারী চাচাতো ভাইয়ের পক্ষে স্বাক্ষ্য দিতে দাঁড়াবেন। এই জাতির কাছ থেকে আমরা ঠিক কি প্রত্যাশা করি বা করতে পারি?

২.   ভারত মুক্তিযুদ্ধে এক কোটি উদ্বাস্তুর খাওয়া-পরা, মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং, আন্তর্জাতিক পরিসরে আমাদের স্বীকৃতিদানের জন্য কূটনৈতিক লড়াই এবং ’৭১-এর শেষভাগে সরাসরি আমাদের বিভিন্ন রণাঙ্গনে যুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ও তাঁর নিয়মিত ১২,০০০ সৈন্যের শহীদানের মাধ্যমে আমাদের সর্বতোভাবে সাহায্য করেছে। কিন্তুদুর্ভাগ্য এটাই যে তাড়াতাড়ি যুদ্ধ শেষ করার জন্য হোক বা যে কোন কারণেই হোক ৯০,০০০ পাক সৈন্যকে ‘প্রিসনার্স অফ ওয়্যার (পিওডব্লু)’ ট্রিটমেন্ট দিয়ে অতি দ্রুত ফেরত পাঠানো হলো। আমাদের হত্যা-ধর্ষণ-অগ্নিসংযোগকারী বিদেশী সৈন্যদের কেশাগ্র অবধি আমরা স্পর্শ করতে পারলাম না। অন্যের সাহায্যে যুদ্ধে জিতলে যা হয় তাই হয়েছে।

৩.   হ্যাঁ, যদিও আগে আমরা জানতাম যে বঙ্গবন্ধু সব রাজাকারকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন, কিন্তু এখন আমরা জানতে পারছি যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল যা তিনি সপরিবারে নিহত হবার পর স্থগিত হয়। তবু কোথাও একটা ‘কিন্তু’ থেকে যায়। গোলাম আজম, মতিউর রহমান নিজামিসহ সব বাঘা রাঘব-বোয়াল রাজাকাররা সেসময় কি জেলে ছিলেন? আমি নিশ্চিত নই।

৪.    কিন্তু উপরোল্লিখিত তিনটি বিষয়ই আমি অত বেশি গুরুত্ব দিতে চাই না। এবার মূল প্রসঙ্গে আসি। একদিকে বাঙালী জাতিসত্ত্বা ও বাংলা ভাষা বনাম বহিরাগত ধর্ম ইসলামের দ্বন্দে সদা দীর্ণ বাঙালী মুসলিম কিন্তু ভাষা আন্দোলন, রবীন্দ্রনাথ নিষিদ্ধ করার পাকিস্তানীষড়যন্ত্র সহ নানা সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ২৩ বছরের আন্দোলন করে ভাষা-সংগ্রাম ও জাতীয়তার ভিত্তিতে মাত্রই একটি রাষ্ট্র গঠন করেছিল। কি দরকার ছিল বঙ্গবন্ধুর নব্য গঠিত রাষ্ট্রে প্রবল উদ্দীপনার সাথে মাদ্রাসা শিক্ষা চালু করার? কাকে তুষ্ট করতে চেয়েছিলেন তিনি? দেশের ভেতরে থাকা পরাজিত পাকিস্তানী প্রেতাত্মাদের? উচিত কি ছিল না তাঁর সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার উপরই জোর দেওয়া? খুব কষ্ট হয় যখন এই সরকারের একদা বামপন্থী ও ব্যক্তি জীবনে খুবই সদাচারী শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ সংসদে তার সরকার মাদ্রাসা শিক্ষায় কত কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন সেই হিসাব দাখিল করেন! মাদ্রাসায় কারা যায়? আপনার আমার ভাগ্নে-ভাতিজারা যায় না। গরীবের ছেলে-মেয়েরা যায়। রিক্সাঅলার ছেলে বা বাড়ির কাজের বুয়ার মেয়ে যায়। ইংরেজি মাধ্যমে বিত্তবান শ্রেণীর ছেলে-মেয়েরা, বাংলা মাধ্যমে মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে-মেয়ে আর মাদ্রাসায় গরীবের ছেলে-মেয়ের পড়ার এই যে সংস্কৃতি গত ৪২ বছর ধরে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি সব সরকারের আমলেই জল সিঞ্চন করে এসেছে, তার বিষ ফল ফলবে না?

হ্যাঁ, বঙ্গবন্ধু হয়তো ভারত-রাশিয়া বলয়ের উপর নির্ভরতা কমাতেই ১৯৭৪-এ ওআইসি কনফারেন্সে যোগ দিয়েছিলেন, আবেগের সাথে চুম্বন করেছিলেন পাক প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোকে? কিন্তু কেন? কেন এবং কেন? একটিও মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্র তখনো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় নি। সেই মধ্যপ্রাচ্যের করুণা কুড়ানোর জন্য এই দেখানেপনা কেন? হ্যাঁ, হয়তো মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল শ্রমবাজারে বাঙালী শ্রমিককে পাঠানোর কথা ভেবেছিলেন তিনি। ভেবেছিলেন বিদেশী মুদ্রা অর্জন করবে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ। তবু এত দ্রুতই কি মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ রাষ্ট্রগুলোর সাথে মৈত্রী নির্মাণের চেষ্টা না করলেই চলতো না? অবশ্যই ভারত এই পদক্ষেপে তুষ্ট হয় নি। রাশিয়াও হয়তো সুখী হয়নি। এপ্রসঙ্গেই আর একটি প্রশ্ন আবার ঘুরে-ফিরে আসবে: ’৭১-এর যে গল্প আমরা ‘শুনি’ তার অন্য কোন আলো-ছায়া ছিল কিনা? প্রচুর মানুষ পাকিস্তানের পক্ষে কাজই করেছে। অনেক ‘নিরপেক্ষ’ মানুষ পাকিস্তান সরকারের চাকরি করেছে, নয়টি মাস ও বেতন নিয়েছে। হয়তো পাকিস্তানকে তারা ভালই বাসতো। ২৪ বছর আগে প্রতিবেশী হিন্দু সম্প্রদায়কে সংখ্যাধিক্যের জোরে তাড়িয়ে তারা হাজার মাইল দূরের এক ভিন্ন ভাষাভাষী, পোশাক ও খাদ্যাভ্যাসের ভূখন্ডের সাথে ধর্মের বন্ধনেই আবদ্ধ হয়েছিল। রাষ্ট্রভাষা উর্দূর বিরুদ্ধে শুধু ভাষাপ্রেমেই বাঙালী দাঁড়ায়নি। চাকরি পাবে না বা কম পাবে বলেও দাঁড়িয়েছে। ’৭১ পর্যন্ত বহু শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত বাঙালী উর্দূ ভাল বলতে পারতেন যেমনটা আজ ওপার বাংলার বাঙালীরা হিন্দি বলতে পারে। পশ্চিম পাকিস্তানী ছেলেদের সাথে বিয়ে হয়েছে বহু বাঙালী মুসলিম নারীর। ওপারে যেমন পরিবারের নিমরাজি দশা সত্ত্বেও বহু বাঙালী হিন্দু নারী অ-বাঙালী হিন্দু পুরুষ বিয়ে করে। এখানেই আরো একটি প্রশ্ন আছে। নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় নূরজাহান মুরশিদ সম্পাদিত ‘এদেশ একাল’ পত্রিকায় বাঙালী জাতীয়তাবাদ ও সেক্যুলারিজম নিয়ে এক লেখকের আবেগপূর্ণ লেখার জবাবে এক পত্রলেখিকা প্রশ্ন তুলেছিলেন: কোন বাঙালী মুসলিম বা হিন্দু পুরুষই কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন যে বোন বা মেয়ের বিয়ের জন্য তাকে অবাঙালী কিন্তু স্বধর্মী ও বাঙালী কিন্তু বিধর্মী বেছে নিতে বলা হলে যত ‘ধর্মনিরপেক্ষ’-ই তিনি হোন না কেন, ঠিক কোনটা তিনি বেছে নিবেন? মারাত্মক প্রশ্ন! পড়ে ধাক্কা খেয়েছিলাম।

মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। হ্যাঁ, এই যে বঙ্গবন্ধু মাদ্রাসা শিক্ষা পুনরায় সূচনা করলেন এবং ওআইসিতে যোগ দিলেন হয়তো বাংলাদেশের যে একটি বিপুল সংখ্যার মানুষের হৃদয়ের ‘পাকিস্তান ভাঙ্গার’ বেদনা মুছে দিতে, তারা কি ‘পাকিস্তান ভাঙ্গা’র বেদনা কোনদিন ভুলেছে? যে মুসলিম বিশ্বের সাথে সুসম্পর্ক পুন:স্থাপন করতে চাইলেন বঙ্গবন্ধু তারা কি তাই বলে বাংলাদেশকে ১৫ই আগস্টের আগে রাজনৈতিক স্বীকৃতি দিয়েছে? আহা, সেই মধ্যপ্রাচ্য বা মুসলিম বিশ্বই কি তাঁর আত্মস্বীকৃত খুনীদের সম্মান ও নিরাপত্তার সাথে আশ্রয় দেয়নি? তাহলে কিসের জন্য এসব করলেন বঙ্গবন্ধু? ভোটারদের ভেতর ঠিক কাদের আস্থা জোড়া লাগাতে চেয়েছিলেন তিনি? যারা দেশভাগের বেনিফিশিয়ারি, পড়শির ফেলে যাওয়া জায়গা-জমি হাতিয়েছে, কোটি কোটি বাঙালী হিন্দু দেশ ছাড়ায় শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা বহুলাংশে কমার সুফল ভোগ করেছে, যারা উর্দূ শিখত, অবাঙালী বিয়ে করেছে, পাকিস্তানকে মুসলিমের জন্য দরকারি মনে করত এবং এমনকি মুক্তিযুদ্ধ শেষমেশ এমন কারণেও সমর্থন করতে পারে যে একদম ঘাড়ের উপর এসে পড়েছিল গণহত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগ? কিন্তু হয়তো স্বাধীন বাংলাদেশে ভারতীয় হিন্দু-শিখ সৈন্যের মার্চপাস্ট মনের গহীনে তাদের অনেককে পীড়া দিয়েছে কিম্বা ভয় পেয়েছে আবার চারপাশে বিশাল ‘হিন্দু’ রাষ্ট্র ভারতের পদানত না হতে হয়? বিধর্মী যার মনের একটি গভীর ভয়? সদা আতঙ্ক? কারণ সে আজো ১৪০০ বছর আগের মরুচারী এক সামরিক ধর্মের কারণে বিধর্মী মানেই শত্রু এবং কাজেই তাকে হত্যা, বিতাড়ন ও ধর্মান্তরযোগ্য প্রাণী ছাড়া দ্বিতীয় কিছু ভাবতে পারে না? কাজেই ১৯৭২-এর অক্টোবরেই দূর্গা পূজা মণ্ডপে প্রতিমার মাথা ভেঙ্গে কর্তিত গরুর মুন্ডু ঝোলানো হয়! সংবিধানের ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ প্রথম থাপ্পড় খায় জনতার জিহাদি জোশের কাছে। হ্যাঁ, জনতার জিহাদি জোশ। মুক্তিযুদ্ধের যে ন্যারেটিভ আমরা পড়ছি, তা’ বড্ড একরৈখিক। ইদানীং আমার সন্দেহ হয় খোদ একাত্তর সাথে অন্তত: পঞ্চাশ শতাংশের বেশি বাঙালী মুসলিম হয়তো পাকিস্তানেরই সমর্থক ছিলেন। নয়তো শেখ পরিবারের যত দুর্নীতির কথাই বলা হোক না কেন, তার ভেতর সত্য-মিথ্যা যাই থাকুক না কেন এভাবে একটি দেশের প্রধান রূপকার একটি জাতির স্বাধীনতা যুদ্ধের মাত্র তিন বছরের মাথায় সপরিবারে খুন হতে পারেন না। তাঁর মৃত্যুর জন্য সর্ব ডান থেকে সর্ব বাম… খন্দকার মোশতাক বা জেনারেল জিয়াউর রহমান থেকে সিরাজ শিকদার বা কর্ণেল তাহের অবধি একজোট হতে পারেন না। বঙ্গবন্ধু, চার জাতীয় নেতা বা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর সৈনিক খালেদ মোশাররফের মৃত্যুর পর থেকে দেশে নতুন করে সূচিত হওয়া পাকিস্তানীকরণেরধারা জিয়া আমলে ত’ বটেই, এরশাদ আমলেও প্রবল বেগেই চালু ছিল। আমি নিজেই পাঠ্যপুস্তকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে জিয়ার নাম পড়েছি। আমাদের শৈশব কৈশোরে ‘পাক বাহিনী’ কথাটি বলা যেত না।  আমরা পরীক্ষার খাতায় উত্তর লিখতাম ‘হানাদার বাহিনী।’ নব্বইয়ের গণ অভ্যুত্থানের পরই কেবল টিভিতে আমি মুস্তাফা মনোয়ারকে প্রথম একটি শিশুদের অনুষ্ঠানে ‘পাক বাহিনী’ কথাটি বলতে শুনি। একটা সময় এদেশে কেউ ভাবে নি আওয়ামি লীগ আবার ক্ষমতায় আসবে।

এদেশের গরিষ্ঠ সংখ্যক মানুষের এই প্রবল পাকিস্তান প্রীতি ও ‘হিন্দু’ ও ‘ভারত’ অসূয়া সম্পর্কে জানতে পেরেছি একটু বয়স হবার পর থেকেই। শৈশব কৈশোরে প্রায়ই বান্ধবীদের বাসায় বেড়াতে গেলে তাদের বাবারা বা আঙ্কেলরা কথায় কথায় ‘ইন্দিরা গান্ধী কত চালাক যে নেহেরু যেটা পারে নাই সেটা পেরেছে- পাকিস্তানকে দুই টুকরা করেছে’ বা ‘ভারতের স্বার্থ কি? এত কষ্ট করে তারা পাকিস্তান ভাঙ্গলো কেন যদি তাদের স্বার্থ না থাকে?’ বা ‘ফারাক্কা বাঁধ কত খারাপ’ কিম্বা পাকিস্তান ক্রিকেট দলের দেবতাকুলের (ইমরান খান, ওয়াসিম আকরাম ইত্যাদি ইত্যাদি) রূপ-গুণের প্রশংসা আলাপ করতেন। ঐ আঙ্কেলরা যে ব্যক্তি আমার সাথে কোন খারাপ ব্যবহার করতেন, তা’ নয়। আমি পড়াশুনায় ভাল। আমাকে তারা মেয়ের মত স্ন্হেই করতেন। কিন্তু ‘হিন্দুরা ভারত ও আওয়ামি লীগের দালাল,’ ‘হিন্দুরা ভারতে গোপনে সোনা ও টাকা পাচার করে,’ ‘ইসলামই পৃথিবীর একমাত্র সত্য, শান্তির ও শ্রেষ্ঠ ধর্ম’ এগুলো তারা বিশ্বাস করতেন। খুব অবাক লাগে যখন তারুণ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে বা বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করার পর আমি কিছু বামপন্থীর ভেতর পাকিস্তানী ক্রিকেট দলের জন্য অন্ধ প্রেম, দেশের যা কিছু দুর্গতির জন্য ভারতকে দায়ী করা, আওয়ামী লীগ দলটির নাম শোনা মাত্রই গায়ে বিছুটি পাতার জ্বালা ধরা দেখে আমি এদেশের অনেক মানুষের গড়পরতা বিএনপি পন্থী মানসিকতার থেকে তাদের কিছুই আলাদা করতে পারিনি। আমি কিন্তু ‘নিরপেক্ষ’ হবার প্রচুর চেষ্টা করেছি। হতেও ত’ পারে। আমরা হিন্দুরা কি আওয়ামী লীগকে নি:শর্ত দাসখত লিখে দিয়েছি যেমন ওরা আমাদের বোঝায় বা বলতে চায়? সেটাও ত’ ঠিক নয়। আচ্ছা, আওয়ামি লীগকেও তবে সমালোচনা করতে হবে। ভারতকেও সমালোচনা করা উচিত আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে। নব্বইয়ের গণ অভ্যুত্থানে প্রথম দফা বিএনপি শাসনের পর ১৯৭৫-এর পর আর ১৯৯৬-এ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এদেশে কোন কোন সংবাদপত্রের প্রবল নিরপেক্ষ থাকার কৌশল আমাদের একটি প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করলো অত্যন্ত সাফল্যের সাথে। একজন সাংবাদিক টিপু সুলতান আহত হলে তাকে নিয়ে ‘প্রথম আলো-ডেইলি স্টার’ ফান্ড গঠন করে, প্রতিদিন আহত টিপুর ছবি পত্রিকায় ছাপা হয় অথচ বিএনপি আমলে বেশ কিছু সাংবাদিক নিহত বা পঙ্গু হলেও কিছু যায় আসে না। আওয়ামি লীগ আমলে একজন বিশ্বজিত মরলেই খবর। বিএনপি আমলে গোটা হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর অমানবিক খুন-ধর্ষণের মহড়ায় সুশীলরা আমরা চুপ থাকি। এক লিমনকে নিয়ে আমি নিজেই দুই বছর ধরে আন্দোলন করেছি। একটা কথাও কি বলেছি বিএনপি আমলে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ নিয়ে? বামরা বলেছে? সাহস হয় নি! লিমন এই দেশকে নিজের দেশ ভাবে কিনা এমন প্রশ্ন যে নারীবাদী ফেসবুকে করেন, উনি চারশ মন্দির ভাঙ্গা হিন্দুরা এই দেশকে নিজের দেশ ভাবেন কিনা সে প্রশ্ন করেন না (তাই বলে লিমনের উপর করা প্রতিকারহীন অন্যায়ের পক্ষে সাফাই অবশ্যই গাইছে না এই লেখা)। সেই ‘হেফাজতে নারীবাদী’ আপাকে আমার প্রশ্ন: আপামণি, শফি হুজুরের তেঁতুল তত্ত্ব পড়ার পর এটা কাউন্টার-হেজিমনি বা পিপলস ডিসকোর্সের এ্যাঙ্গেল থেকে কিভাবে ব্যখ্যা করবেন? প্লিজ, বলেন না আপামণি! দ্যাখেন, আমি ত’ উনিশ শতকের ভ্যান্দা মারা মধ্যবিত্ত। এখনো রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রতিক্রিয়াশীল ভাবাদর্শের ঘেরাটোপ থেকেই মুক্ত হতে পারি নাই। কিন্তু আপামণি…আল্লামা শফি হুজুর যদি আপনাকে ছবির হাটে-আজিজ সহ নানা জায়গায় সিগারেট খেতে না দেয়? কি হবে আপামণি?

প্রয়াত সাংবাদিক, লেখক ও সংস্কৃতিসাধক ওয়াহিদুল হকের ভাষ্যে দেশ ভাগের পর দু’টো মুসলিম রাষ্ট্র পেয়েও উপমহাদেশের মুসলিম মানসচক্ষে গোটা উপমহাদেশকে একটা দেশ হিসেবেই দেখে যে দেশে সে সংখ্যালঘু। আর তারপর ‘ছোট’র মানসিকতা থেকে বড়কে সে জ্বালায়-পোড়ায়-গায়ে বিছুটি দেয়! নয়তো পাকিস্তান ও বাংলাদেশে নাশকতা কাজ ত’ সংখ্যালঘু হিসেবে হিন্দুদেরই করার কথা ছিল, ভারতে যেমন মুসলিমরা করে? নিজেকে সারাক্ষণ ‘ছোট’ ভাবার এই বোধ সর্ব ডান থেকে সর্ব বামকে ৫ই মে’র রাতে গণহত্যার গল্প নি:সংশয়ে বিশ্বাস করায়, ‘নৌকাডুবি’ হয়!

শেষকথা : উদারপন্থার মেষচর্ম

আমি মার্ক্স-লেনিনের লেখা-পত্র বলতে গেলে কিছুই পড়ি নাই। ছাত্র জীবন থেকে দেশী-বিদেশী নানা উন্নয়ন সংস্থার কামলাগিরি করতে গিয়ে আর যাই হোক সুস্থির ভাবে পড়াশুনা করা যায় না। এই পেশায় থেকেও দু’এক লাইন সাহিত্য অনুশীলনের দু:সাহস যে করি তাই কম বিস্ময়ের নয়। মার্ক্সীয় শাস্ত্রে আকাট মূর্খ আমি তবু তরুণ কার্ল মার্ক্সের সেই উক্তিটি উদ্ধৃত না করে পারছি না : ‘লিবারেল বুর্জোয়াকে আপাত:দৃষ্টে চরম প্রতিক্রিয়াশীল ডানপন্থীর থেকে ভিন্ন মনে হলেও লিবারেল বুর্জোয়ার উদারপন্থী পরিচ্ছদের আলখাল্লা বা মেষচর্মের নিচেই থাকে নেকড়ের ছাল যা চরম প্রতিক্রিয়াশীলের থেকে একটুও আলাদা নয়।’ ঠিক এজন্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বারাক ওবামার সরকার এলেও ফিলিস্তিনে বা ইরাকে-আফগানিস্তানে বোমা হামলা কমে না। ভারতে বিজেপির তুলনায় কংগ্রেসকে ঢের বেশি মুসলিমপ্রেমী মনে হলেও একটা শাহরুখ খান দিয়ে কি ভারতীয় মুসলিমের প্রকৃত অবস্থান বোঝা যাবে, সে বিজেপি বা কংগ্রেস যে-ই ক্ষমতায় আসুক? বঙ্গবন্ধু এদেশে মাদ্রাসা শিক্ষা জোরদার করে গেছেন। মাদ্রাসা শিক্ষা তহবিলে আরো টাকা ঢালছেন বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী। মেষচর্ম পরিহিত আওয়ামি লীগ তাই শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চকে থামিয়ে দেয়, তাকে চট্টগ্রামে সমাবেশ করতে দেয় না। রবীন্দ্রনাথের নামাবলী পরা আওয়ামি লীগ তাই জামাত নামে সাপের বিষ তুলতে অতি চালাক হয়ে ঝাঁপি থেকে বের করে হেফাজত। সেই সাপ তাকে উল্টো কামড়ে দেয়। সেই কামড়ের বিষে নীল হয় বাংলাদেশ। আওয়ামী লীগ হারে চারটি সিটি কর্পোরেশন ও গাজীপুরে। শাহবাগকে দোষ দেবেন? শাহবাগ আপনাদের হাতের মুঠোয় প্রায় নিশ্চিত জয় নিয়ে এসেছিল। তরুণ প্রজন্ম পদ্মা সেতু-হল মার্ক সব কিছু ভুলে শুধুই যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রশ্নে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে তিনটি সপ্তাহ টানা ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দিয়েছে। আপনারা অতি লোভে তাঁতী নষ্ট করেছেন। আপনারা দু’কুলের ভোট রাখতে গিয়ে, জামাতের সাথে দর কষাকষির রাস্তা খোলা রাখতে গিয়ে না কে জানে কি সব হারালেন! এখনো সময় আছে। আবুল হোসেনকে আর ‘দেশপ্রেমিক’ বলে আদর করার দরকার নেই। সুরঞ্জিতকে ঝেড়ে ফেলুন। পঙ্গু কিশোর লিমনের কাছে ক্ষমা চান। চারশো মন্দির ভাঙ্গা হিন্দুদের বলুন শাসক হয়েও তাদের উপাসনাস্থান রক্ষা করতে না পারায় আপনারা লজ্জিত। আর যুদ্ধাপরাধী সাপগুলোকে ফাঁসির দড়িতে ঝোলান। আমরা আবার আকাশ কাঁপিয়ে ‘জয় বাংলা’ বলবো! আবার প্রদীপ জ্বালাবো প্রজন্ম চত্বরে।

হাজার হোক উদারপন্থার ঐ মেষচর্ম বা রাবীন্দ্রিক নামাবলীর লোভেই বিষে নীল হয়েও আজো যে আমরা ‘আওয়ামী দালাল’ ট্যাগ নিয়েও আপনাদের পিছে আছি।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কথা গুলো আমাদের মনের কথাই, তবে এতটা কাট কাট লিখেছেন পাছে কিছু মানুষ এর লাল্লত পরতে পারে !! এই নরক অনেকের পুণ্য ভুমি হবে সাম্নেই, কিন্তু হিন্দুদের ??? যারা ভারতে গিয়ে প্যান কার্ড, আই কার্ড রেশন কার্ড নিতে গিয়ে ফিরে আসবে ফেলানি হয়ে !! নয়তো রেল লাইনের পাড়ে বসে বসে অণ্ডকোষ হাতিয়ে বলতে হবে এক কালে আমাদের সব ছিল !! হয়তো অদিতী রা পাশ্চাত্তে সেচ্ছা নিরবাসন পাবে, যারা হিন্দু ?? তাদের বউ ঝি রা ?????

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.