মেয়েটি কখনও কোনো কৃষককে ভালোবাসেনি

মাসুদা ভাট্টি: দুপুর মাথায় নিয়ে গাড়িটা এসে থামলো জোয়ার-ভাটায়। সিলেট যাওয়ার পথে এর চেয়ে ভালো কোনো খাবার জায়গা আর নেই, ঢাকা থেকে গাড়ি ছাড়ার পর থেকেই চালক কবির অন্ততঃ বার কয়েক একথা বলেছে। প্রতিবারই তাজিনকে সেটা অনুবাদ করে শোনাতে হয়েছে আন্দ্রেয়াকে। তাজিন আর আন্দ্রেয়া যাচ্ছে সুনামগঞ্জ। ওখানে হাওড়ের ভেতর একটা গ্রামে স্থানীয় একটা এনজিওকে ওদের বড় এনজিও অর্থের জোগান দেয় একটা প্রকল্পে, সেটার কাজ দেখতে যাচ্ছে ওরা।

Masuda Bhatti
মাসুদা ভাট্টি

জীবনে কোনোদিন ঢাকার বাইরে যেতে হয়নি তাজিনকে, কেবল সিলেট আর কক্সেসবাজার ছাড়া। জন্ম, লেখাপড়া, বেড়েওঠা, এমনকি চাকরিটা অবধি ওকে এই ঢাকা শহরেই আটকে রেখেছে। সে হিসেবে বাংলাদেশের ভেতর বেড়ানোর জন্য সিলেট, কক্সেসবাজার ছাড়া আর কোথাও যায়নি ও। কিন্তু দেশের বাইরে অনেক দেশেই যাওয়া হয়েছে ওর। কিন্তু ও যখন এই বিদেশি এনজিও’তে কাজ পেলো তখন সকলেই ওকে নিয়ে হাসতো, যেনো দেশের ভেতরে কোথাও না যাওয়াটা এক ধরনের অন্যায়। আর সে কারণেই তাজিন বেশি বেশি করে মাঠ পরিদর্শনের কাজ নিচ্ছে আজকাল। তাছাড়া আন্দ্রেয়া মেয়েটির সঙ্গেও ওর খুউব খাতির হয়ে গেছে।

আন্দ্রেয়া ডাচ, তাজিনেরই বয়সী। ঢাকায় আসার পর যতোদিন আন্দ্রেয়ার জন্য বাড়ি খোঁজা চলছিলো ততোদিন ও তাজিনের সঙ্গেই ওদের বাসায় ছিল। তাতে সম্পর্কটা শুরু থেকেই বন্ধুত্বের মতো হয়ে গিয়েছিল। তারপর এ জায়গা সে জায়গা করে প্রায় বেশ কয়েকটা প্রকল্প ওরা দেখতে গিয়েছে। প্রতিবারই আন্দ্রেয়াকে তাজিন নতুন করে চিনছে।

জোয়ারভাটায় এই দুপুরে মানুষের ভীড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে বেয়ারারা। গাড়ি থেকে নেমে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতেই ওরা টের পেয়েছিল মানুষের চাপ। দরোজা খুলে দেয় যে ছেলেটা তার সঙ্গে ওদের আগেই পরিচয় ছিল, এ পথ দিয়ে ওরা যাওয়া-আসা করেছে কয়েকবার, আর প্রতিবারই কবির এখানে এনে থামিয়েছে। আন্দ্রেয়ারও জোয়ারভাটা খুব পছন্দের জায়গা। তাজিনের ধারণা ছিল বিদেশিরা বাংলাদেশের সাধারণ রেঁস্তোরায় খেলে ওদের পেটে অসুখ করবে, কিন্তু কিসের কী, ওর চেয়েও আন্দ্রেয়ার পেট ভালো। এর আগে নাকি আন্দ্রেয়া নেপালে কাজ করেছে, সেখানে মাসের পর মাস খোলা জায়গায় মলত্যাগ করতে হয়েছে ওকে, দিনের পর দিন স্থানীয় রান্না খেয়ে থেকেছে। তাজিনের সেরকম কোনো অভিজ্ঞতা এখনও হয়নি।

এখনও কোনো প্রকল্প দেখতে যাওয়া হলে স্থানীয় এনজিও’র পক্ষ থেকে যে পরিমাণ সেবাযত্ন করা হয় তাতে নিজেকে ওর রাণী রাণী মনে হয়। সবচেয়ে বড় মাছটা ধরে হোক কিংবা কিনে হোক, অথবা হাঁস-মুরগি যাই-ই হোক, খাবার দেওয়ায় কোনো রকম কার্পণ্য কেউ করেন না।

ওদেরকে দেখেই পরিচিত বেয়ারা এগিয়ে আসে, মুখের সকল দাঁত বের করে বলে, “কেমন আছেন আপারা? ভাত খাবেন আপা? বোয়াল মাছ মাত্র নামাইছে”। আন্দ্রেয়া তাজিনের দিকে তাকায়, তাজিন অনুবাদ করে শোনায়। আন্দ্রেয়ার চোখমুখ ঝিকমিক করে ওঠে, “অবশ্যই, অবশ্যই, এক্ষুণি দিয়ে দিতে বলো”, ইংরেজি ভাষায় বললেও, বেয়ারা, যার নাম হামিদ, সে ঠিকই বুঝতে পারে। তাই হামিদ তাজিনকে জিজ্ঞেস করে, “আপনারেও আপা বোয়াল মাছ দিমু না অন্য কোনো মাছ খাইবেন? বাইল্যা মাছ আছে, তিতাসের, খাইবেন নাকি? তয় কইলাম অনেক কাঁটা মাছে”। তাজিন হেসে ফেলে, বলে, “দেন ভাই, যা আপনার ইচ্ছে সবই দেন, সবই খাই। ব্যাপক ক্ষিদে পেয়েছে বুঝলেন?” আন্দ্রেয়া ততোক্ষণে এগিয়ে গিয়েছে বাথরুমের দিকে, হামিদ তাজিনকে বসার জায়গা দেখিয়ে দেয়। তাজিন গিয়ে বসে টেবিলে, আন্দ্রেয়া এলে ও যাবে বাথরুমে।

তাজিনের মনে পড়ে, ও যখন ছোট ছিল তখনও ঢাকার রাস্তায় বিদেশি মেয়েদের দেখলে লোকজন জড়ো হয়ে যেতো। আজকাল আর তেমন কেউ নজর করে না, আন্দ্রেয়া দেখতে খুব সুন্দরী, স্বর্ণকেশী, নীল চোখ, আর ওর পোশাকও যথেষ্ট খোলামেলা, কিন্তু কেউ ওকে হা করে দেখে না, এটা তাজিনকে স্বস্তি দেয়, কিন্তু তাই বলে যারা তাকায় তাদের সকলের চোখই যে অপাপময় তা নয়, বরং তাদের দৃষ্টি ভয়ঙ্কর। এসব দৃষ্টির সঙ্গে বাংলাদেশের সকল মেয়েরই কমবেশি পরিচয় আছে; বাংলাদেশের কি সব পৃথিবীর দেশেই এরকম পুরুষদের দৃষ্টির সঙ্গে কেবলমাত্র মেয়েদেরই ঘটে থাকে।

আন্দ্রেয়া বেরিয়ে আসছে, ও পরেছে একটা নীল টপস, সঙ্গে জিনস। একটা গামছামতো ওড়না গলায় প্যাচানো, ওকে দেখতে মনে হচ্ছে একটা ভিন্গ্রহের মানুষ, ভুল করে জোয়ারভাটায় এসে পড়েছে। তাজিন তাকিয়ে দেখছে, সঙ্গে আরো অনেক চোখই হয়তো। আন্দ্রেয়া টেবিলে এসে বসার পর তাজিন উঠে গেলো হাতমুখ ধুতে। হামিদ ততোক্ষণে খাবার লাগাতে শুরু করেছে, বললো, “আফা বেশি দেরি কইরেন না, ঠান্ডা হইয়া গ্যালে মজা পাইবেন না”। আন্দ্রেয়া ওর দিকে তাকিয়েছিল, কিন্তু তাজিন হেঁটে চলে গেলো, সব কথার অনুবাদ হয় না, করতেও হয় না, ভাবতে ভাবতে।

ধোয়া ওঠা গরম ভাত, বোয়াল মাছ, বেলে মাছ, একটা লাবড়ামতো তরকারি আর ডাল, ওরা খাচ্ছে তৃপ্তি করে। আন্দ্রেয়া তাজিনের মতোই হাত দিয়ে খেতে পারে, নেপালে থাকার সময় শিখেছে। যদিও একটু ন্যাড়া-ব্যাড়া লাগে, কিন্তু খায়তো। আবার এই আন্দ্রেয়াই যখন পাঁচতারা হোটেলে গাউন পরে ছুরি-কাঁটা দিয়ে খাবার খায়, পাশে থাকে ওয়াইনের গ্লাস, তখন ওকে ভিন্নরকম লাগে তাজিনের কাছে। আর আন্দ্রেয়া যখন স্যালোয়ার কামিজ পরে তখন ওকে ঠিক বাঙালি না হলেও বাঙালির মতো মনে হয়, কেউ হয়তো অনেকÿণ ভাববে, মেয়েটি কি? দেশি? নাকি বিদেশি? আজকাল অবশ্য অনেক বিদেশিই স্যালোয়ার-কামিজ পরে, এমনকি শাড়িও পরে, শ্রী চিন্ময়ের অনুসারি যারা কিংবা যারা ইসকন মন্দিরে গিয়ে হিন্দুত্ব গ্রহণ করেছে, তারাতো বিদেশের মাইনাস তাপমাত্রার শীতেও শাড়ি পরে রাস্তায় হাঁটে।

কবিরও বসেছে ওদের সঙ্গে, ওর পাতেও মাছ, ডাল, সব্জি। চক্চক্ শব্দ হচ্ছে, তাজিনের কানে লাগে এই শব্দ, ওদের বাড়িতে কেউ শব্দ করে খেতে পারে না, ওর মায়ের কড়া নিষেধ আছে। খাবার টেবিলেই নাকি মানুষ চেনা যায়, ওর মায়ের মতে। অবশ্য তাজিনের মা যত্রতত্রই মানুষ চেনার উপায় খুঁজে বেড়ান, বেশিরভাগ মানুষই সে মানদণ্ডে হয় অসভ্য, নয় অশিক্ষিত। খুব কম মানুষই তার মানদণ্ড উৎরাতে পারে। ছোটবেলা থেকেই মায়ের এই কড়ামি’র ভেতর দিয়ে তাজিনকে যেতে হয়েছে। এটা করবে না, এটা করা যাবে না, এটা করলে লোকে কী বলবে, কার সঙ্গে মিশলে জীবনে কী ধরনের পরিণতি হতে পারে ভদ্রমহিলা তাজিনের ভেতর যেনো ভরে দিয়েছেন। ওর দু’বছরের বড় ভাইকে অবশ্য এতোটা পারেননি, তারপরও তাকেও যতটুকু পারেন ততটুকু ‘মানুষ’ বানিয়েছেন, ওদের মা।

কবিরকে কিছু বলবে বলবে করেও বলেনি তাজিন, ভেবেছে পরে কোনো এক সময় বললেই হবে। কিন্তু আগেও এরকম বহু কথা মনে হয়েছে কিন্তু পরে আর বলা হয়নি। ওরা জোয়ারভাটা থেকে বেরিয়ে ঘন্টাখানেক পথ পার হয়েছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ওদের পৌঁছে যাওয়ার কথা গন্তব্যে। ঠিক তখনই রাস্তার পাশে কবির গাড়িটা দাঁড় করালো।

“কী হলো কবির?” তাজিন জানতে চাইলো। আন্দ্রেয়াও প্রশ্ন নিয়ে তাকালো। কবির কিছু না বলেই নেমে গেলো, তারপর একটা গাছের আড়াল নিয়ে দাঁড়ালো, গাড়ি থেকে ওকে পুরোপুরি দ্যাখা না গেলেও বোঝা যাচ্ছিলো যে, ওই গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে ও প্রস্রাব করছিলো। তাজিনের একটু লজ্জা হলো, ইংরেজিতেই বললো, “আহ, ছেলেটার কি লজ্জাশরমও নেই, একবোরে সামনে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করছে?”।

আন্দ্রেয়া হেসে বললো, “কেন? অসুবিধে কিসে? আমার তো দেখতে ভালোই লাগে, একটা পুরুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করছে, এটা দেখতে আমার বেশ লাগে। এক ধরনের পৌরুষ ফুটে ওঠে তখন”।

: কী বলছো তুমি? তাই বলে কবির? ওহ ঈশ্বর!

: কেন? কবির কি পুরুষ নয়? ওকে তো আমার বেশ পৌরুষদীপ্ত মনে হয়।

: এই যে শুরু হলো তোমার।

তাজিন আন্দ্রেয়ার দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। আসলে পুরুষ বা নারী-পুরুষের গোপনতম সম্পর্ক নিয়ে আন্দ্রেয়া আলটপকা মন্তব্য করতে কখনও দ্বিধা করে না। ঢাকায় রিক্সাওয়ালাদের কাউকে দেখেও ওর মনে হয় ‘কী দারুণ দেখতে!’।

এইতো কয়েকদিন আগে রংপুরে গিয়ে কী বিপদেই না পড়েছিল ওরা। ওদের প্রকল্পটা কৃষকদের স্বাস্থ্য নিয়ে, দিনভর মাঠে কাজ করার পর তারা কী ধরনের খাবার খায় এবং সেই খাবারে তাদের শরীর কতটা পুষ্টি পায় সেটা বের করার জন্য ওরা কাজ করছে। এটা একটা পাইলট প্রকল্প, তারপর সারা বাংলাদেশে এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে নিয়ে যাওয়া হবে। বাংলাদেশের চারটে জেলায় এখন এই প্রকল্পটি বাড়ানো হয়েছে। আগে কেবল রংপুরেই ছিল। তখন ধান কাটার মওসুম চলছে। ওরা ক্ষেতের আলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ধান কাটা লক্ষ্য করছিলো, তাজিনের জন্য বিষয়টি সত্যিই নতুন। এর আগে বলতে গেলে ও ধানই দেখেনি, তা আবার ধানকাটা অবস্থায় কৃষক। আন্দ্রেয়া নেপালে দেখেছে, দেখেছে ভিয়েতনামে। ও নোট নিচ্ছে খাতায়, ঘড়ি দেখছে, মিনিটে ক’গোছা ধান কাটছে লোকটা সেটা। তাজিনকে বললো, “ওর সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই, জিজ্ঞেস করোতো বলা যাবে কিনা?” তাজিন অবাক হলো একটু, কারণ, ওদের সরাসরি কারো সঙ্গে কথা বলার কথা নয়। স্থানীয় এনজিও যাদেরকে ঠিক করে দেবে, তাদের সঙ্গেই ওদের কথা বলতে হবে। নিজেরা বাছাই করতে পারবে না। ওরা কেবল ধানকাটা দেখতে চেয়েছিল বলে সকালে বেরিয়ে পড়েছিল এনজিও অফিস থেকে, সঙ্গে সে অফিসের কেউ ছিল না তখন। তাই তাজিন প্রশ্ন নিয়ে তাকিয়েছিল। আন্দ্রেয়া সেটা বুঝতে পেরেছিল হয়তো, তাই বললো, “অসুবিধে হবে না, আমি কোনো জটিল প্রশ্ন করবো না, আসলে ওর সঙ্গে আমার একটু কথা বলতে ইচ্ছে করছে”। তাজিন একটু সঙ্কোচ নিয়েই একেবারে ওদের সামনে যে লোকটা ধান কাটছিলো তাকেই বললো, “আপনার সঙ্গে এই ম্যাডাম একটু কথা বলতে চান, আপনার অসুবিধা নাইতো?” কাঁচি থামিয়ে লোকটা ওদেরকে দেখলো, এতোÿণও নিশ্চয়ই দেখেছে কিন্তু এবার একেবারে সরাসরি। তারপর একটু হাসলো, বললো, “কী কতা? আমরাতো এই ইলাকার না আফা। আমরা আসছি পদ্মার চর থিকা, ধান কাটার সুমায় আসি, ধান কাটা শ্যাষ হইলিপর চলি যাই”।

আন্দ্রেয়া ওর দিকে তাকিয়েছিল, তাজিন অনুবাদ করে দিলো। তারপর আন্দ্রেয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। আন্দ্রেয়া বললো, “ওর চোখদু’টো দ্যাখ, কেমন তীব্র, এরকম তীব্রচোখ আমি দেখিনি কোনোদিন”। এই বাক্য কি অনুবাদ করে ওকে বলতে হবে? তাজিন ভাবছে যখন তখন আন্দ্রেয়া বললো, “এটা আমি তোমাকে বলেছি বোকা, ওকে বলতে হবে না”। জিজ্ঞেস করোতো, “ও বিবাহিত কি না?” তাজিন এবার আরো অবাক হয়ে ওর দিকে তাকায়। আন্দ্রেয়া হাসছে। কাঁচি উঁচিয়ে লোকটা তখনও ওদের দিকে তাকিয়ে আছে দেখে তাজিন জিজ্ঞেস করেই ফেললো, “ম্যাডাম জানতে চান, আপনি বিয়ে করেছেন কিনা?” লোকটা এবার লজ্জায় আরো মিসমিসে হলো, তাজিনও সেটা লক্ষ্য করলো, অথচ এতোদিন ওর জানা ছিল কেবল ফর্সারাই লজ্জা পেলে লাল হয়, কালো রঙের মানুষও যে লজ্জা পেলে সেটা আলাদা করে বোঝা যায়, তা ও তখন আলাদা করে বুঝতে পারলো। তারপর বললো, সরাসরি ওদের দিকে তাকিয়েই, “জি আফা বিয়া করছি। তয় আমার বউডারে সাপে কামড় দিছিলো, মইরা গ্যাছে”। তাজিনের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠলো, ও একটু থমকেও গিয়ে থাকবে কিংবা ওর চোখেমুখে তার ছাপ পড়ে থাকবে, তাই আন্দ্রেয়াও উদ্বেগ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “ও কি রাগ করলো আমাদের কথায়? বলো আমি খুব দুঃখিত, আমি ওকে কোনো ভাবেই আহত করতে চাইনি”।

: না না আন্দ্রেয়া ওর স্ত্রী মারা গেছে, সাপের ছোবলে তার মৃত্যু হয়েছে।

সঙ্গে সঙ্গে আন্দ্রেয়ার চেহারাটাও কেমন যেনো বদলে গেলো। মুহূর্তমধ্যে ওদের তিনজনকে কেন্দ্র করে একটা অদ্ভুত বেদনাতুর দৃশ্যের জন্ম হলো। তাজিনের মনে হলো, আকাশটাও কি হঠাৎ মেঘলা হলো? আন্দ্রেয়া বললো, “ওকে বলো যে আমি ওর সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই। ও কি বিকেলে আমাদের অফিসে একটু আসতে পারবে? অবশ্য যদি ওর সময় থাকে”। তাজিন অনুবাদ করে দিলো। লোকটা কাঁচি নামিয়ে আবার ধানকাটায় মনোযোগ দিতে দিতে বললো, “জি আফা পারবো, আমি আছরের ওক্তে আপনাগো অফিসে যাবানে। আপনাগো অফিস থিকা আমাগো কইছিলো যে আপনারা আমাগো লগে কথা কবার চান”। তাজিন আন্দ্রেয়াকে অনুবাদ করে বললো, আন্দ্রেয়া তখনও কেমন বিষন্ন হয়ে আছে, বললো, “আহ্ এখনও ওর নামটা জিজ্ঞেস করা হয়নি, একবার জিজ্ঞেস করবে দয়া করে?” তাজিন জিজ্ঞেস করলো, “আপনার নাম কি ভাই?”

: আমার নাম ইমারত আফা।

তাজিন আন্দ্রেয়াকে ওর নামটা জানিয়ে দেয়। ওরা দু’জনেই ইমারতের কাছ থেকে বিদায় নেয়। আসতে আসতে আর ওদের ভেতর কোনো কথা হয় না। কেবল তাজিন ভাবতে থাকে, এমন করে কখনও কোনো মানুষের সঙ্গে ওর কথা বলা হয়নি, অন্ততঃ ইমারতের মতো কারো সঙ্গে। এমনকি কখনও কোনো রিক্সাওয়ালার সঙ্গেও কি ও কোথায় যাবে আর কত ভাড়া জিজ্ঞেস করে দরদাম করা ছাড়া আর কোনো বাড়তি কথা বলেছে? মনে করতে পারে না। কিন্তু আজ এটুকু কথা বলেই ওর মনে হলো, প্রতিটি মানুষের ভেতরেই গল্প থাকে, সুখের কিংবা কষ্টের, যে কোনো গল্পই হতে পারে। অথচও তখনও ওদের আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কৃষকের সঙ্গে আলাপ করা হয়ে ওঠেনি, কেবলই আগের রাতে ওরা ঢাকা থেকে এসে পৌছেছিল।

সেদিন দুপুরে খাবার খেয়ে যখন ওরা কামরায় শুয়ে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলো, বাইরে তখন চাঁদিফাঁটা রোদ ঠায় দাঁড়িয়ে আছে, তাজিন আন্দ্রেয়াকে জিজ্ঞেস করেছিল, “আচ্ছা আন্দ্রেয়া তুমি হঠাৎ ওর সঙ্গে কথা বলতে চাইলে কেন?”

আন্দ্রেয়া যেনো গভীর কোনো ভাবনা থেকে বেরিয়ে বলেছিল, “তুমি ওকে লক্ষ্য করোনি, না? কি পেটানো আর একহাড়া একটা শরীর, যখন ধান কাটছিলো তখন ওর পেশীগুলি কি চমৎকার ফুটে উঠেছিল, ওকে মডেল করে ছবি আঁকা যায় জানো? একটুও মেদ নেই কোথাও, গায়ের রঙটাও কেমন তীব্র আবেদনময়”। তাজিন চমকে ওঠে, কী বলে মেয়েটা? ও যে সকালে এতোক্ষণ ধরে ইমারতের সঙ্গে কথা বললো, কই ওরতো তেমন কিছু মনে হয়নি? আন্দ্রেয়া কী ভাবে আলাদা করে ওকে লক্ষ্য করলো? তাজিনের মনে হয়েছিল, আন্দ্রেয়ার ভেতর কি কোনো শ্রেণীচেতনা নেই? সমাজের এই স্তুরের কারো সম্পর্কে এরকম ভাবনা আসে কী করে? আন্দ্রেয়ার সিভি দেখেছিল তাজিন, নেদারল্যান্ডের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষি-উন্নয়ন নিয়ে লেখাপড়া করেছে, কাজ করেছে কত প্রতিষ্ঠানে তার শেষ নেই, কিন্তু ও কেন এভাবে একজন কৃষকের দিকে তাকায়? ও আন্দ্রেয়ার প্রশ্নের উত্তর কী দেবে ভেবে পায় না। কিন্তু আন্দ্রেয়াই কথা বলে আবার, বলে, “আমি বুঝেছি, তুমি কী ভাবছো। তুমি ভাবছো আমি কি করে একজন কৃষক সম্পর্কে এরকম ভাবতে পারি? তাই না?”

ধরাপড়া চেহারা নিয়ে তাজিন ওর দিকে তাকিয়েছিল। আন্দ্রেয়া বললো, “আমি নেপালেও দেখেছি, ওখানেও একটু উঁচু শ্রেণীর শহুরে কেউ গ্রামের কৃষক বা নীচু শ্রেণীর কারোর দিকে ঠিক এভাবে তাকায় না। বিশেষ করে মেয়েরা। পুরুষরা অবশ্য বাছ-বিচার করে না, তারা মেয়েদের দিকে তাকাতে কোনো শ্রেনীভেদ করে না, এদিক দিয়ে পুরুষরা জন্ম কমিউনিস্ট হা হা”। আন্দ্রেয়ার হাসি ব্যাপারটাকে একটু সহজ করে দিয়েছিল, নইলে তাজিন ওর সঙ্গে কথা বলতে পারছিলো না। একটু সাহস নিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “আমি সত্যিই ওকে এভাবে দেখিনি, মানে তাকাইনি”।

: বললাম তো, আমি জানি। এটা এই দক্ষিণ এশিয়াতেই কেবল দেখেছি আমি। তুমি কি জানো টেক্সাসে কোনো কৃষক যুবককে বিয়ে করার জন্য ওখানকার নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরা মুখিয়ে থাকে? কেন জানো? একেতো ওই কৃষকরা হয় বিশাল পয়সাওয়ালা আর সেই সঙ্গে ওদের থাকে পেটানো শরীর, মেয়েরা কৃষক-যুবক ধরার জন্য প্রতি উইকএন্ডে স্থানীয় পাবগুলিতে ভিড় জমায়, বুঝলে? আমাদের দেশেও ফার্ম বয়দের নিয়ে আমাদের মেয়েদের আগ্রহের শেষ নেই। তোমরা সেরকম করে ভাবতে পারো না, কারণ তোমাদেরকে সেটা শেখানো হয়নি, তাই না?

তাজিন ভাবছে তখনও, আসলেতো, ওদেরকেতো কখনও কৃষকদের নিয়ে কিছু শেখানো হয়েছে বলে মনে পড়ে না? বরং সেই স্কুলে থাকাকালে দু’একটা রচনা ছাড়া কৃষকদের সম্পর্কে আর কিছু শেখার কোনো সুযোগ ছিল কি?

টিভি নাটক বা সিনেমাতেও কৃষক বলতেই লুঙ্গি কাছা দেওয়া আর মাথায় গামছা বাঁধা নায়ক কিংবা ধুকতে ধুকতে মরতে চলা নায়কের কৃষক বাবা, যার পরনে তালি দেয়া লুঙ্গি আর গেঞ্জি। এর বাইরে কৃষকদের সম্পর্কে জানাতো দূরের কথা, কথায় কথায় মা’কে ও বলতে শুনেছে যে, ইস একেবারে চাষার মতো লাগছে দেখতে। ছোটবেলায় লেখাপড়ায় খারাপ করলে ওর মা বলতেন, “তোরে চাষার সঙ্গে বিয়ে দেবো, ভালো ছেলে তো আর পাওয়া যাবে না”। এইতো ওর জীবনের সঙ্গে চাষা বা কৃষক শব্দের মেলামেশা, সেই দুপুরবেলা আন্দ্রেয়াকে যখন কোনো উত্তর না দেয়ায় মেয়েটা তন্দ্রায় ডুবেছে তখন তাজিনের চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল ইমরানের শরীরটা।

আন্দ্রেয়া যেভাবে বলছিলো, সেভাবেই ও চোখের সামনে ইমারতকে নিয়ে আসার চেষ্টা করছিলো, আর তখনই দেখতে পেয়েছিল যে, ইমারত যখন কাঁচি উঁচিয়ে ওদের দিকে তাকিয়েছিল তখন ওর গলার শিরার পাশ দিয়ে একটা ঘামের ধারা নেমে যাচ্ছিলো, তাজিনের অজান্তেই ওর চোখ সেই ঘামের ধারাটা অনুসরণ করছিলো, তারপর সে ফোঁটাটা ঘাড় হয়ে বুকের ওপর দিয়ে নামতে শুরু করেছিল, ইমারতের বুকে বেশি লোম ছিল না, ছড়ানো-ছিটানো কিছু লোম, কিন্তু পেটের ওপর যখন ঘামের ফোঁটাটা এসেছিল ঠিক তখনই ও দেখতে পেয়েছিল যে, আসলেই ইমারতের পেটের পেশিগুলি খুব সুগঠিত ও সুবিন্যস্ত, কিন্তু তখন এটা দেখেনি কেন? অথচ, এখন সিনেমার মত সব চোখের সামনে ভাসছে। লুঙ্গির গিটের ওপরে একটা গভীর নাভি, ঘামের ফোঁটাটা সেখানে এসেই থেমে গিয়েছিল। কিন্তু যে কোনো মুহূর্তে সেই ঘামের ফোঁটাটা আরো গভীরে নেমে যেতে পারে, লুঙ্গির গিঁট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে যেতে পারে। তাজিন চোখ বন্ধ করে ফেলে, কারণ পুরুষের শরীরের এর পরের এ্যানাটমি তো ওর অজানা নয়। সে মুহূর্তে তাজিনের বন্ধ করা চোখের সামনে ইমারতের পেটানো পেশীর দু’টো ঊরু, রোমশ, এবং শরীরের তুলনায় একটু ফর্সাও কি?

ভেতরে ভেতরে তাজিন নিজেও একটু ঘেমে উঠছে কি? এমন তো নয় যে, ওর পুরুষ শরীর সম্পর্কে কিছুই জানা নেই, বরং ভালোই জানা আছে। কিন্তু সে পুরুষ আর ইমারত নামের কৃষকটি কি এক হলো? তাজিন ভাবতে থাকে শুয়ে শুয়ে কিন্তু ওর চোখের সামনে বার বার ইমারতের শরীরটা ভাসতে থাকে, ওকি কোনো ঘামগন্ধ টের পায়?

সকালবেলা ওরা যখন ধানক্ষেতের আল ধরে হাঁটছিলো তখন এক ধরনের গন্ধ চারদিকে ভেসে বেড়াচ্ছিলো, গন্ধটা খুব টাট্কা, একটু ঝাঁঝালো, কিন্তু অসহ্য নয়। সেই গন্ধটাই স্মৃতিতে রয়েছে ওর, এই দুপুরে ওর জন্য ছোট্ট চৌকির ওপর পাতা বিছানায় সেই গন্ধ হুটোপুটি খায়, আয়না না দেখেও তাজিন বলতে পারে যে, ওর মুখটা এখন লাল হয়ে উঠেছে। তাজিন পায়ের কাছে ভাঁজ করা কাঁথাটা টেনে নিয়েছিল শরীরের ওপর এবং কিছুক্ষণ পর সেটা দিয়েই মুখ ঢেকে ফেলেছিল, তারপর একেবারে বিকেল করে বিছানা ছেড়েছিল, ততোক্ষণে বাইরে ইমারত আর আন্দ্রেয়ার টুকটাক কথা বলার শব্দ ভেসে আসছিলো। তাজিন আশ্চর্য হয়েছিল এটা ভেবে যে, ওরা কী ভাষায় কথা বলছে? নাকি কেউ ওদের দোভাষী হিসেবে কাজ করছে, ও দ্রুত বাইরে বেরিয়ে দেখে না, আন্দ্রেয়া আর ইমারতের ভেতর কথা চলছে ঠিকই কিন্তু কোনো দোভাষী সেখানে নেই।

পরে এই প্রশ্ন আন্দ্রেয়াকে জিজ্ঞেস করার পর আন্দ্রেয়া হেসেছিল, বলেছিল, “ভালোবাসায় আবার ভাষা লাগে নাকি তাজিন? ভালোবাসলে আকাশ-বাতাস-মাটি-জল সব ভাষা হয়ে যায় বুঝলে?” রংপুর থেকে ফিরে আসার পর থেকেই ইমারতের নাভির কাছে থমকে থাকা ঘামের ফোঁটা ওর মন জুড়ে ছিল বেশ কিছুদিন, তারপর ফিকে হয়েছে খানিকটা।

সুনামগঞ্জ শহরে যাওয়ার অনেক আগেই একটা জায়গায় থেমে ওদেরকে উঠতে হয়েছে ট্রলারে। গাড়ির চালক কবির সুনামগঞ্জ শহরেই থেকে যাবে স্থানীয় এনজিওটির অফিসে। ড্রাইভার কবিরের প্রস্রাব করা সংক্রান্ত আলোচনার পর থেকে রংপুরের ইমারতকে নিয়ে ভাবতে তাজিন এতোটা পথ এসেছে এবং পথের শেষে ওর একথাটাই মনে হয়েছে যে, ও আসলে কোনোদিন কোনো কৃষককে ভালোবাসেনি। ওর জীবনে সত্যিই কোনো কৃষকের জায়গা কখনও হয়নি, এমনকি পরিচয়ও হয়নি।

ও ভাবতে থাকে কেবল ওরই কি কোনো কৃষকের সঙ্গে পরিচয় হয়নি কখনও নাকি ওর মতো অনেকেরই কোনো কৃষকের সঙ্গে কখনও পরিচয় হয়নি, ভালোবাসাতো দূরের কথা। আন্দ্রেয়ার সঙ্গে এরপর যেখানেই গেছে ও সেখানেই ওর এই শ্রেণীবোধ আর সাধারণ মানুষদের নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। কৃষকদের আরো কাছ থেকে দেখেছে তাজিন।

আন্দ্রেয়া যেনো ওর সামনে একটা নতুন প্রশ্ন উন্মোচন করে দিয়েছে, শ্রেণীবোধ থেকে ওকে একটু হলেও সরিয়ে এনেছে মেয়েটি তাজিনকে, এই কয়েক মাসেই। তাজিনের মনে হয়েছে মেয়েদের শ্রেণীবোধ খুব দ্রুত বদলানো যায়, ওর ভাইকে হয়তো এতো দ্রুতকেউ বদলাতে পারতো না।

কিন্তু ভালোবাসায় কি মেয়েরা তাই সব সময় একেবারে চালচুলোহীন কারো সঙ্গে অকাতরে ঘর ছাড়তে পারে, ছেলেরা পারে না, এমন কোনো নিয়ম আছে নাকি? তাজিন এরপর এই প্রশ্ন নিয়ে অনেক ভেবেছে, ওর আশেপাশের অনেককেই জিজ্ঞেস করেছে। এখনও ঠিক সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি উত্তরটা নিয়ে।

তাজিন, ট্রলারে উঠতে উঠতে লক্ষ্য করে যে ছেলেটি ট্রলারের ইঞ্জিন স্ট্রার্ট দেওয়ার তোড়জোড় শুরু করেছে, সে কাজ করতে করতে একবার আন্দ্রেয়াকে, আরেকবার তাজিনকে দেখছে। ছেলেটার রোদে পোড়া চেহারা, কিন্তু খুব মিষ্টি দু’টো চোখ খুব জাগ্রত।

হঠাৎই ভট্ ভট্ শব্দে ট্রলারের ইঞ্জিন চালু হলো, সামনে ছড়ানো পানি আর পানি, যতোদূর চোখ যায়। এই পানি ঠেলেই ওদেরকে যেতে হবে। মাঝে মাঝে দু’একটা হিজল গাছ পাতাসমেত ডালগুলো জাগিয়ে ডুবে আছে, কখনও কখনও দু’একটা দুধ-সাদা বক তার ওপর বসে। ছেলেটা ততোক্ষণে ইঞ্জিন রেখে হাল ধরে দাঁড়িয়েছে। আন্দ্রেয়া ঝোলা থেকে ক্যামেরা বের করে ছবি তোলার চেষ্টা করছে।

আর তাজিন ভাবছে, কোনোদিন ওরও কি কোনো কৃষকের সঙ্গে পরিচয় হবে? হলে ভালোই হয়, একজন কৃষক, কিন্তু কৃষকের কথা ভাবলেই ওর সামনে শুধু ইমারতের চেহারাটা ভেসে ওঠে। ইমারতের সঙ্গে আন্দ্রেয়ার এখনও যোগাযোগ আছে, ওদের দ্যাখাও হয়েছে। তাজিনের খুব জানতে ইচ্ছে করে আন্দ্রেয়ার কি ইমারতের সঙ্গে বিশেষ কিছু হয়েছে? হলে সেটা কেমন করে হলো? ইমারত ব্যাপারটা কীভাবে নিয়েছে?

কিন্তু এতো ব্যক্তিগত কথা কী করে জিজ্ঞেস করবে ও, সেটাই এখনও ভেবে ঠিক করতে পারেনি তাজিন। তবে একদিন ঠিক জিজ্ঞেস করে ফেলবে, বিস্তীর্ণ জলরাশির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ও ভাবলো। জলের ওপর তখন টুকরো টুকরো মেঘ, কখনও সাদা, কখনও ছাই রঙা, জলকে আরো গভীর করে দিয়ে আকাশটাই যেনো জলের ওপর শুয়ে আছে নির্ভার হয়ে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.