সাঁওতাল মানুষগুলোর পাশে আমরা

সুপ্রীতি ধর: ফেসবুক-কেন্দ্রিক আমাদের তৎপরতার অভাব নেই। নানান ধরনের অ্যাকটিভিজমের পাশাপাশি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগও আমাদের নতুন না। এবারও তাই দেশজুড়ে একের পর এক সংখ্যালঘু নির্যাতন-উচ্ছেদের ঘটনায় আমরা হতবিহ্বল হয়ে পড়ি। তার পরপরই গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের বাড়িঘরে আগুন দেয়ার ঘটনায় তাদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান নিয়ে বন্ধু আতিকা রোমা একটা উদ্যোগ নিলে আমরা কয়েকজন তাতে যোগ হই। কাজটা একসাথে করার একটা তাড়না থেকেই আমি ব্যক্তিগতভাবে সেখানে কয়েকজন সমমনাকে সংযুক্ত করি। যেখানে ছিল শারমিন শামস, তানিয়া মোর্শেদ, মারজিয়া প্রভা।

santals-6এর মাঝেই দেখি আমাদের বন্ধু, বড়বোন কানিজ আকলিমা সুলতানা ঘটনাস্থলে যাওয়ার কথা ভাবছেন। সুতরাং প্রথমে আমাদের সেখানে যাওয়ার পরিকল্পনা না থাকলেও কানিজ আপার সাথে একাত্ম হয়ে আমরা তিনজন যাওয়ার মনস্থ করি। নতুন শক্তি পাই। আর কানিজ আপাকেও আমাদের এই উদ্যোগের সাথে (গ্রুপে) সংযুক্ত করে নিই। উনিই আমাদের যাতায়াতের সব দায়িত্ব নিয়ে নিলে আমরা একদিক থেকে নিশ্চিন্ত হই।

তার পরের ঘটনা মোটামুটি একটা ইতিহাস বলা চলে। মাত্র তিনদিনের উদ্যোগে, বন্ধুদের ব্যাপক সাহায্য-সহযোগিতায় মোটামুটি ভদ্রস্থ একটা সহায়তা (ত্রাণ) জোগাড় করে ফেলি। রোমা তার প্রতিদিনের চাকরির কাজের ফাঁকে ফাঁকে স্কুটি নিয়ে দৌড়াই এবাড়ি-ওবাড়ি, জোগাড় করে আনে ‘ভালবাসা’। আমি নিজেও এর কাছ থেকে টাকা নিয়ে আসি, ওবাড়ি থেকে কাপড়। কোথায় কাকে ফোন করলে টাকা মিলবে, মাথায় সারাক্ষণ ঘুরতে থাকে। কার বিকাশ নম্বর দেয়া যায়, কোন নম্বর লিমিট ক্রস করছে, সেইসব চিন্তা-দু:শ্চিন্তা মাথায় নিয়েই টাকা জোগাড় করি। এখানে বিকাশ নম্বর দিয়ে সহযোগিতা করেন বন্ধু তৃষ্ণা সরকার আর প্রিয় বড় ভাই আনিস মাহমুদ (যিনি নিজেও ক্যান্সার আক্রান্ত)।

একটু পর পর খোঁজ নেয়া তাদের কাছে, কত টাকা এলো। তাদের কাছে টাকা প্রাপ্তির খবর পেয়ে একটু একটু করে আত্মবিশ্বাস প্রবল হয়, না, আমরা পারবো। এরই মাঝে বরাবরের মতো প্রধান ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভুত হয় যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বন্ধু তানিয়া মোর্শেদ। স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান অংকুর ইন্টারন্যাশনাল থেকে সে এক লাখ ৮৬ হাজার ১০০ টাকা আমাদের পাঠায়। আমাদের মধ্যে একটা প্রবল আত্মবিশ্বাস এসে যায় এই টাকাটা পাওয়ার পর এই ভেবে যে, না, আমরা একটা কিছু করতে পারবো ওই অসহায় মানুষগুলোর জন্য।

santals-7তিন লাখের প্রায় কাছাকাছি নগদ টাকা, নতুন ৫০টি কম্বল, নতুন ও পুরনো কাপড়চোপড় নিয়ে আমরা যোগ দেই কানিজ আপার সাথে, উনি আমাদের যাতায়াত এবং খাবারের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেন। যোগ দেন ড. মকবুল হোসেন (কানিজ আপার পার্টনার) এবং দৈনিক জাগরণের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক এফএম শাহীন, ও রবিউল ইসলাম রুপম, তাপস কুমার পাল, তানভির আহম্মেদ, ফয়জুর রশীদ শুভ্র, দীপ্ত, সুজন কুমার প্রমুখ।

দৈনিক জাগরণের পক্ষ থেকে নগদ ৩৫ হাজার টাকা যোগ হয় আমাদের সহায়তার সাথে, এবং বেশকিছু কাপড়চোপড়।

এ নিয়েই আমরা বৃহস্পতিবার রাতে রওনা হয়ে গত শুক্রবার (১৮ নভেম্বর) দুপুরে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার জয়পুরপাড়া গ্রামে পৌঁছাই এবং স্থানীয় একটি এনজিও ও কিছু স্বেচ্ছাসেবীর সহায়তায় মোট তিনশ মানুষকে তিন লাখ টাকা নগদ, কম্বল, টি-শার্ট-পেটিকোট, শাড়ি ও অন্যান্য কাপড়চোপড় দিয়ে আসি আমরা। যেগুলো শেষপর্যন্ত দেয়া হয়নি, সেগুলো রেখে আসি স্থানীয় একটি এনজিও কর্তৃপক্ষের কাছে, তারা তা বিতরণ করে দেবে বলে আশ্বস্ত করেছেন।

santals-8
ছবিটা আতিকা রোমার তোলা

ঘটনাস্থলে গিয়ে এতো এতো মানুষের ভিড় দেখে একটা বিষয় উপলব্ধি হয় যে, বিশাল এক রাজনীতির খেলা চলছে এখানে। আমরা দূর থেকে এসে সেই বিশালতার ছিটেফোঁটাও উদ্ধার করতে পারি না, শুধু অনুভব করি। স্থানীয়ভাবে আগে থেকেই কাজ করতে থাকা আহসান কবির ডালিম ভাইদের সহযোগিতা পাওয়ায় কাজটা আমাদের অনেক সহজ হয়ে যায়।

নিজের চোখে ওই মানুষগুলোকে না দেখলে জানাই হতো না প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর কত ধরনের নির্যাতন চলে, কীভাবে ওরা বলির পাঁঠা হয়, কিভাবে তাদের নিয়ে বছরের পর বছর ধরে রাজনীতি চলে। তাদেরকে সামনে রেখে দুবৃত্তায়ন অব্যাহত থাকে। আর ওরা যে প্রান্তিক, সেই প্রান্তিকই থেকে যায়। তারপরও ওরা সাঁওতাল সম্প্রদায়ের বলে শিরা টান টান করে চলেন, তাদের দৃঢ়-ঋজু ভাব আমাদের মাথা নত করে দেয় প্রতিনিয়ত। আমরা শিখে আসি, এখনও সব মানুষের মেরুদণ্ড ভেঙে যায়নি। পেটে লাথি খেয়েও কীভাবে তারা সোজা হয়ে দাঁড়াতে জানেন।

ফেরার পথে দেখা হলো আরেকটা গ্রুপের সাথে সিলেট এবং ঢাকা থেকে যাওয়া। ওরা পিক আপে করে খাবার নিয়ে গেছে সাঁওতাল পরিবারগুলোর জন্য। খুব ভালো লাগলো দেখে।

মজার বিষয় হলো, ক্ষতিগ্রস্ত এই পরিবারগুলোর মধ্যে এতোকিছুর পরও খাই খাই ভাব নেই, কেউ হুমড়ি খেয়ে পড়ছে না। বলা চলে, ওরা বেশ নির্বিকার। ত্রাণ দেয়ার পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে, যেখানে মানুষজন চোখের সামনে ত্রাণ নিয়ে দিব্যি অস্বীকার করে ফেলে, আর এই মানুষগুলোর আমাদের প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.