ভয়াবহ বর্ণবাদী আমরাও

0

ফারজানা আকসা জহুরা: আপনি কি কখনো কোনো… কালো… সুন্দর পুতুল দেখেছেন? একটা বয়স পর্যন্ত আমি কিন্তু দেখিনি। আমাদের মতন দেশগুলিতে কালো কোনো সুন্দর পুতুল নেই, আছে কালো দৈত্যl কদাকার কুৎসিত যত জিনিস আছে, তা নির্দশন করতে আমরা কালো রং ব্যবহার করি।

আপনি আপনার কালো বাচ্চাটিকে ফর্সা পুতুল কিনে দিয়ে রাজকন্যা আর রাজপুত্রের গল্প শোনান, আবার আপনার সেই গল্পের রাজকন্যা আর রাজপুত্ররা সবাই কিন্তু ফর্সা ও সুন্দর হয় …. আর দৈত্য দানব শয়তানগুলি দেখতে কালোই হয়। মনের অজানতেই আপনি বাচ্চাদের মনে বর্ণবাদের বীজ ঢুকিয়ে দেন। অথচ এই আপনিই ইউরোপ আমেরিকাকে বর্ণবাদী দেশ বলে গালাগালি করেন।

farzana-akhsha

আমাদের সমাজে অনেক মানুষ আছেন খুব ধার্মিক সর্বদা আল্লাহ গুনগান করেন… কিন্তু আল্লাহ সৃষ্টি কালো মানুষকে তারা পছন্দ করেন না। তারা বলেন ও ভাবেন, “যার গায়ের রং কালো, তার মনও কালো”। অনেকেই ছেলের বৌ খুঁজেন ফর্সা, ফর্সা হলো তাদের কাছে আভিজাত্যের প্রতীক এবং এর ব্যতিক্রম তাদের খুবই অপছন্দ। কালো হলো তাদের চোখে নিম্নবর্গীয়। অনেকে খুব আধুনিক, অথচ ফর্সা রংকেই তাদের কাছে স্মার্ট বলে মনে হয়। ফর্সা হবার জন্য তারা সর্বদা ব্যস্ত। কিছু প্রগতিশীল মানুষ আছেন, যারা কেবলি ফর্সা রং দেখেই প্রেমে পড়েন। অনেকেই অফিসের পিএ বা স্টাফও ফর্সা খুঁজেন। কেন জানি বিভাগের প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হওয়া বেশিরভাগ মেয়েগুলোও সব ফর্সাই হয় (এর ব্যতিক্রমও আছে)।

টিভি-সিনেমার নায়িকাগুলি সবই ফর্সা। দুই একটা কদাচিৎ কালো থাকে, কিন্তু তারাও কেমনে জানি ঐ ফর্সা হতে শুরু করে ….. কিংবা অন্যদের মতন ফর্সা হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নামে। নন্দিতা দাস কজনাই বা হোন! যে মেয়েটি এক সময় কালো রং নিয়ে ফটোসুন্দরী হয়, দুইদিন পরে সে তার আপন রংটি হারিয়ে ফর্সা হয়ে আত্মবিশ্বাস খুঁজে।

আবার উপস্থাপিকা হিসাবে খুব নাম করা দামী কালো গায়ের রঙের মডেল হঠাৎ তার খ্যাতি ধরে রাখতে ঐ ফর্সা হওয়ার প্রচেষ্টা শুরু করে… ফর্সা হয়ও বটে। আর ওনারা এই সব কেন করে জানেন? কারণ আমরা যে ফর্সা ছাড়া অন্যদের মূল্যায়ন করি না। তাইতো কালোরা নিজের আপন রং ভুলে অন্যের রং ধরে শরীরে এবং তাতে নাকি তারা আত্মবিশ্বাসী হয়।

টিভিতে জয় বলে “সৌন্দর্য হলো আত্মবিশ্বাস”। আর ফেয়ার এন্ড লাভলি বলে “চাকরি পেতে হলে ফর্সা হও”। এই সবই হলো বর্ণবাদ। যা আমরা প্রতিদিন দেখি, যা আমরা নিয়মিত চর্চা করি। যা আমাদের আচার ব্যবহার ও কাজকর্মে লুকিয়ে আছে, অথচ এই আমরাই ইউরোপ-আমেরিকানদের বর্ণবাদ বলি। আর নিজেদের বর্ণবাদী চরিত্র উপলব্ধিও করি না, স্বীকারও করি না। কী অদ্ভূত আমরা, তাই না?

santals-5আবার দেখুন খুব সচেতনভাবেই আমাদের সকল ধর্মে বর্ণবাদ আছে l এগুলো এতই স্বাভাবিক যে তা আমাদের ধর্মের অংশ। ব্যক্তিগতভাবে আমি ধার্মিক। এরপরও বিষয়গুলো আমায় চিন্তায় ফেলে কখনো কখনো খুব কষ্ট দেয়। আমাদের নবী-রাসুলগণ, যাদের সম্পর্কে আমি জানি তারা সকলেই সুন্দরের প্রতীক ছিলেন। ইউসুফ নবীর কথা তো আমরা জানি। আবার হাবিল-কাবিলের মধ্যে যে খারাপ শয়তান, যে ভাইকে হত্যা করে ছিলো… সেই কাবিল কিন্তু “কালো”। আবার হিন্দুদের দেবী দূর্গা কতোই না সুন্দর, তাকে শান্ত-সৌম্য রূপে দেখানো হয়, আর তার খারাপ রাগী চরিত্রের রূপ ঐ “মা কালী”। তিনি কালো।

একবার আমার এক বান্ধবী বলেছিল, যারা ভালোমানুষ তাদের দেখলেই বোঝা যায়। তাদের চেহারা একটা জ্যোতি থাকে, আবার অনেকে বলে ফজরের নামাজ পড়লে চেহারায় জ্যোতি বাড়ে। অথচ আমি কবে যে নামাজ শুরু করেছি বলতে পারবো না। হলের প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পানি দিয়েই ভোরবেলায় ওজু করতাম। কই আমার চেহারা দিয়ে তো কখনো জ্যোতি বের হয়নি!

সারাটা কৈশোর আর যৌবন মুখভর্তি ব্রন নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি। তখন তো খুব পর্দাও করতাম। নিশ্চয় আপনি বলবেন, আমি পাপী ছিলাম, তাই না? আমার মতোন মানুষদের তো নামাজও পড়তে নাই, পর্দা ও দরকার নাই। আমরা তো এমনেই পাপী, যা আমাদের গায়ের রংই বলে। কারণ আপনাদের ধর্মীয় চিন্তা হচ্ছে, নামাজি পরহেজগারদের চেহারা সুন্দর হয়, তারা দেখতেও সুন্দর। জন্মগত রংই আমাদের চরিত্র নির্ধারণ করে দিয়েছে। তাহলে শুধু শুধু কালো মানুষদের এতো ইবাদত করার দরকারটা কী? তখন আর বোরখা বা পরিপূর্ণ পর্দা করতাম না। সবাই তখন বলতো, পর্দা করা ছাড়লাম কেন? আমি বলতাম আমার জন্য পর্দা ফরজ না।

শুধু কি তাই? পদ্মিনী, ছত্রিনী, শঙ্খিনী, হস্তিনী বলে চার প্রকারের নারী চরিত্রের বিশ্লেষণ প্রচলিত আছে আমাদের সমাজে। শরীরের গঠন আর শরীরের রংই যখন একজনের চরিত্র নির্ধারণ করে, তখন ঐ সমাজে কালো বা খারাপ শারীরিক গঠন নিয়ে জন্ম নেয়া একটা আজন্ম পাপ।

ছোটবেলায় অনেককেই বলতে দেখেছি কালী কাল কাসুন্দি। তোর মনও কালো, গায়ের রংও কালো। আর রাস্তাঘাটে অনেক ছেলেরা আমায় দেখে বলতো ” জয় মা কালী”। হ্যাঁ, ঐ কালী বলেই ইভটিজিং এর সমস্যায় পড়তে হয়নি। কারণ রাস্তাঘাটে, পাড়ায় মহল্লার ছেলেমেয়ে সবাই তো কালোদের টিটকারি মারে, অপমানিত করে.. ঐটা তো আর ইভটিজিং না ! ইভটিজিং শুধু সুন্দরীদের জন্য!

কেন যে উন্নত দেশগুলিতে কালো …শারীরিক গঠন বা জাত- রং এইগুলি নিয়ে কিছু বলা আইনত অপরাধ… বুঝি না। এই গুলি তো আমাদের সংস্কৃতির অংশ, তাই না? যা ছোটো থেকে শুনে শুনে মুখস্ত করেছি। না আপনারা বুঝবেন না, যারা নিজেদের ফর্সা উচ্চবর্গীয় বলে মনে করেন।

আমার দেশের হয়তো শতকরা ৮০ ভাগ মানুষই উপরের বর্ণিত বর্ণবাদী চিন্তা পুষে। বাইরে নিজেদের দেখান, মহান। বলেন, “কালো তো কী হয়েছে, তোমার তো চেহারা সুন্দর”। আমি বলি …সুন্দর তো সুন্দর, তার আবার ফর্সা আর কালো কেনো? আর হ্যাঁ, আমি কালো তাতে কী সমস্যা হয়েছে অন্যদের? বরং আমার রং দেখিয়েই না তারা তাদের রং এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে পারে, তাই নয় কি।

আমি ফ্রান্সে আসার পর আমাদের এক প্রতিবেশী চাচীর মা আমাকে দেখতে চেয়েছিলো skype এ। আমি কেমন দেখতে যে আমার বিদেশে বিয়ে হয়েছে। যাই হোক, আমার এই কালো রূপ তাকে খুবই ব্যথিত করেছে। তিনি বুঝতে পারছিলেন না কেমনে কী।

Cosmopolitan Womenএমন তো অনেকের সাথেই হয়েছে। আমার এক চাচা খুব কালো আর মোটা মেয়ে বিয়ে করেছিলেন। চাচার সৌন্দর্য দেখে চাচীর এলাকার সবাই বলেছিল, ওর মতোন মেয়ে যদি এতো সুন্দর বর পায়, আমরা নিশ্চয় আরও ভালো বর পাবো। একটা বয়সে এসে কারোর সাথে মিশতে ইচ্ছে করতো না, অনেকেই আমাকে বলতো পাত্র খুঁজি ইত্যাদি, কিন্তু নিজেরাই ফর্সা পাত্রী খুঁজতো। যদিও আমি বিয়ে করতে আগ্রহী কিনা বা কি ধরনের ছেলে আমার পচ্ছন্দ, তা তাদের জানার আগ্রহ বা প্রয়োজন ছিলো না। আমার একজন খুব পরিচিত হঠাৎ ভাইয়ের জন্য পাত্রী খোঁজার সময় তীব্র ভাষায় বললো, কালো মেয়ে তো চলবেই না। কেন জানি তখন কথাটা শুনে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম, কথাটা অনেকদিন আমার কানে বেজেছিল। যদিও আমি তার ভাইকে পছন্দ করতাম না, বা তার ভাবী হওয়ার কোনো মনোবাসনা ছিলো না আমার।

জ্ঞান হবার পর থেকেই আমি হিমুর স্বপ্ন দেখতাম, আমার সেই স্বপ্নের হিমু কালো ছিল। আমির খান, সালমান খান কিংবা শাহরুখ কাউকেই কখনও কামনা করিনি, কেন জানি অজয় দেবগনকে খুব ভালো লাগতো। ছোটো থেকেই ফর্সা মানুষ কিছুটা এড়িয়ে চলি, হয়তো ওদের মতোন আমিও বর্ণবাদী।

খুব ছোটবেলাতে একটা ইংরেজী মুভি/টিভি সিরিয়াল দেখেছিলাম, সম্ভবত রুটস এই জাতীয় নাম হবে। আফ্রিকান কালো মানুষদের নিয়ে। মুভি/সিরিয়ালটি দেখে আমি খুব কাঁদতাম। আর ভাবতাম আমি কি নিগ্রো? কারণ আমাকেও তো একইরকম অপমান করা হতো।

ইউরোপ আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গরা আর সেই আগের অবস্থানে নেই। আর এটা সম্ভব হয়েছে দীর্ঘ আন্দোলন, সংগ্রামের ফলে। কৃষ্ণাঙ্গরা শুধু কালোই না, তাদের ধর্ম জাতি দেশ এবং ভাষা, সংস্কৃতিও সম্পূর্ণ আলাদা ছিলো এক সময় পর্যন্ত। যদিও এখন ওরা ইউরোপ-আমেরিকায় মূলধারার জনগণ। হয়তো এই কারণে আর আগের মতন বৈষম্য নেই। তবুও যেটুকু আছে, তাও আমাদের চোখে লাগে।

অথচ আমরা সাঁওতালদের নিয়ে সেই ভাবনাটাই ভাবি যা এক সময় ইউরোপ আমেরিকানরা ‘নিগ্রো’দের নিয়ে করতো। রংয়ের কারণে আমরা নিজের স্বজাতি…. স্বগোত্রের সাথে যা করি …. তা আমাদের চোখেও লাগে না ….. আমরা স্বীকারও করি না। চাকরির সুবাদে নওগাঁর আগ্রাদ্বিগুণে এক বছর যাতায়াত করেছিলাম। ওখানে প্রচুর সাঁওতাল থাকে। সেখানকার একজন সাঁওতাল কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, তাদের তো বাঙ্গালীরা দেখতে পারে না, একমাত্র পেটের আর শরীরের ক্ষুধায় তাদের মনে পড়ে। কারণ সাঁওতাল নারীরা একপ্রকার নাম পারিশ্রমিকে তাদের ক্ষেতে কাজ করে, যা অন্যরা করে না।

যাই হোক, এক সময় আমরা সবাই কালো বা শ্যামবর্ণের ছিলাম, ঐ আর্য আর মুঘলদের আগমন .. এরপর কিছু ব্রিটিশদের স্পর্শে আমাদের অনেকের রং ফর্সা হয়েছিলো। ঐ থেকে ফর্সারা ধরে নিলো, তারা জাতের … অন্যরা অজাত- কুজাতের। তখন তারা তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য স্বজাতিকে বেছে নিলো। কারণ তাদের তো জাতিসত্তা আলাদা, তাই তারা আর্য হতে পারলো না। আর অন্যরাও ঐ ফর্সা রং এর কারণে ফর্সাকে উত্তম আর কালোকে অধম বানালো। এখন সামাজিক অবস্থা এমন যে সবাই নিজেকে ফর্সা বানাতে ব্যস্ত। ফর্সা এখন আত্মবিশ্বাস, আত্মসম্মানের। আপনি এটাকে বর্ণবাদ মনে করেন না। অথচ আগাগোড়া এই রং ভাবনাটাই বর্ণবাদ চিন্তা।

এই দেখুন আমাদের পরিচিত বর্ণবাদী দেশেই (ফ্রান্সে) আমি বাচ্চাদের হাতে কালো সুন্দর পুতুল দেখি। এদের কার্টুনগুলোতে কালো পজেটিভ ক্যারেকটার দেখি। রাস্তাঘাটে কালোদের বীরদর্পে ঘুরে বেড়াতে দেখি। এইদেশের কালোরা দিব্যি ঐ কালো রং নিয়ে আত্মবিশ্বাস ও আত্মসম্মান নিয়ে ঘুরে বেড়াই, কখনো তাদের সাদা ফেস পাউডার দিতে দেখি না। দেখি না ফর্সা হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা করতে। এই দেশে টিভিতে যখন কালো মডেলদের দেখি, তাদের ঐ কালো রং এর মধ্যে অসম্ভব সৌন্দর্য দেখি, যখন কালো উপস্থাপিকা কিংবা সংবাদ পাঠিকাদের রং নিয়ে সগর্বে উপস্থাপন করতে দেখি, ভালোলাগা আর ভালোবাসায় চোখে পানি আসে। আর ভাবি আমার জন্ম যদি এমন দেশে হতো! অথচ এইদেশে থেকেও বাঙ্গালীরা আফ্রিকানদের কথায় কথায় ‘কালিয়া’ বলে সম্বোধন করে। আর ভাবে দেখায় বাঙ্গালীরা জাতি হিসেবে কতো উচ্চবর্গীয়।

আপনারা যারা নিজেদের ফর্সা রং নিয়ে গর্ব করেন আর কালোদের নিম্নবর্গীয় জাতি বলে মনে করেন যারা গায়ের রং এ আত্মবিশ্বাস আত্মসম্মান খুঁজে পান,  তারা নিজেদের একবার প্রশ্ন করেন, আপনি কতোটুকু মানুষ! আত্মবিশ্বাস, আত্মসম্মান তো থাকে মানুষের। অনেক তো হলো গায়ের রং বিচারে মানুষ খোঁজা। মানুষ থাকে মনুষ্যত্বে, এখন না হয় একটু মনুষ্যত্ব খোঁজেন।

লেখাটি ২,২১১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.