র‌্যাগ নিয়ে খটকায়? আসুন চটকাই – ২

শাশ্বতী বিপ্লব: জাবিয়ান অনেকের ধারণা জনগণের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে অনেক মাথাব্যথা। এদের একদল ভাবেন, মানুষ এখানে ভর্তি হতে না পেরে ব্যাপক হতাশাগ্রস্ত ও হিংসায় আক্রান্ত। তারা দিনরাত জাবির দোষ খুঁজে বেড়ায়। সেই যে শেয়ালের “আঙ্গুরফল টক” গল্পের মতো। আরেক দলের ধারণা, জনগণ জাহাঙ্গীরনগরকে আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে দেখার জন্য নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। তাদেরকে সবসময় আপডেট না জানালেই নয়। তাই একজনের বিপরীতে আরেকজন লিখেই চলেছি পাবলিক পোর্টালে। কয়েকজন আবার যারা লিখছেন তাদের সাথে না পেরে উইমেন চ্যাপ্টারের উপর রাগ করেছেন।

ju-8সত্যি সেলুকাস!

একটা ওপেন পোর্টালে পাল্টাপাল্টি লিখে কী অর্জন করলেন  উনারা, কে জানে? উনারা কি জাবির বাইরে জনমত তৈরি করতে চেয়েছিলেন? জাবির ভেতরেই যখন স্বতঃস্ফূর্ত জনমত তৈরি হয়নি, তখন বাইরের কোন প্রেসার গ্রুপ কিভাবে এবং কেনই বা তৈরি হবে!!

এই যে চারদিকে এতো ইস্যুর ছড়াছড়ি, শিশু ধর্ষণ থেকে শুরু করে সংখ্যালঘু নির্যাতন, ক্রিকেট থেকে শুরু করে মার্কিন নির্বাচন, প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন – এমনি কত শত উত্তেজনাকর খবর চারদিকে দাউ দাউ করছে। সেসব ছেড়ে সবাই জাবি নিয়ে উদ্বিগ্ন, সেটা কেন মনে হলো সবার!

খেয়াল করে দেখবেন, এই যে র‌্যাগ নিয়ে পাল্টাপাল্টি লেখা, সেটার মূল পাঠক কারা? কারা লাইক দিচ্ছেন বা শেয়ার করছেন? প্রায় শতভাগই জাবির বর্তমান ও প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী। এই যে আমিও লিখছি, হলফ করে বলতে পারি বর্তমান ও প্রাক্তন জাবিয়ানদের বাইরে এই লেখাটা তেমন কেউই পড়বে না। জাবিয়ানদের মধ্যে ভার্চুয়াল বিতর্কই যদি উদ্দেশ্য হয় তবে জাবির এতোগুলো ভার্চুয়াল গ্রুপ থাকতে সেখানে বা নিজেদের টাইমলাইনে আলোচনা করলেই তো হয়।

একপক্ষ একটা সমস্যা চিহ্নিত করেছেন, আরেকপক্ষ সেই সমস্যাটায় সমস্যা দেখছেন। ভালো কথা। দু’পক্ষই প্রতিকার চান, আরো ভালো কথা। কিন্তু তার জন্য প্রতিবাদ বা আন্দোলন  কীভাবে করলে আসলেই সমস্যাটার সমাধান হবে, সেটা নিয়ে কি উনারা যথেষ্ট ভেবেছেন?

আমি পক্ষ বিপক্ষ দু’দলকেই বলছি। তাদের লেখালেখিতে ধোয়াশা আরো বেড়েছে বই কমেনি। বরং পুরো বিষয়টা নিয়ে একটা সন্দেহ, অবিশ্বাসের আবহ তৈরি হয়েছে।

ju-6জাহাঙ্গীরনগরে কোনো অন্যায় হয়েছে আর সেটা নিয়ে দলে দলে ছাত্রছাত্রী (বিশেষ করে, ছাত্রীরা) রাস্তায় নামে নাই, এটা মোটামুটি একটা অসম্ভব ব্যাপার। তা সে যতো ক্ষমতাশালী অন্যায়কারীই হোক।

অভিযোগকারী পক্ষ বলছেন, তাদের পিছনে সমর্থন আছে, কিন্তু কেউ ভয়ে মুখ খুলছে না। তাই নাকি? জাবিয়ানরা কবে থেকে এতো ভীতু হলো? ইতিহাস তো তা বলে না।  জাহাঙ্গীরনগরের বাতাসে (সংস্কৃতিতে) প্রতিবাদের দুঃসাহস ঘুরে বেড়ায় সবসময়। যে মেয়েটা বা ছেলেটা নিতান্ত মুখচোরা, সেও মিছিলে, প্রতিবাদে সামিল হতে একটুও পিছপা হয় না। এইটাও সেই 69 বেসিকের আরেকটা। কোনো প্রতিক্রিয়া জানানোর আগে পক্ষ-বিপক্ষ দু’দলেরই সেই কেমিস্ট্রিটাও বোঝা দরকার।

যেমন ধরেন, শিবিরের রাজনীতি। জাহাঙ্গীরনগরে ভালোভাবেই আছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত তারা প্রকাশ্যে মাথাচাড়া দিতে পারে নাই। শিবির ভাবাপন্নরা ইনিয়ে-বিনিয়ে বিভিন্ন ছদ্মবেশে অনেক কিছুই করার বা বলার চেষ্টা করে, কিন্তু ক্যাম্পাসে বসে প্রকাশ্যে গলাবাজি করার সাহস কোনোদিন দেখাতে পারে নাই।

আবার ধরেন, “ধর্ষণ”। জাবির মতো প্রতিবাদ কম বিশ্ববিদ্যালয়েই হয়েছে। ধর্ষক ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতি করে বা ভিসি প্রক্টরের কাছের মানুষ – এইসবকে থোরাই কেয়ার করে/করেছে সাধারণ ছাত্রছাত্রী। তাহলে এখন তারা চুপ কেন? সমস্যাটা কোথায়? একজন ছাত্রীর প্রতি অমানবিক আচরণ করা হলো, কিন্তু তার বিপক্ষে বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রী দাঁড়িয়ে গেলো, কেমন খটকা লাগে তাই না।

জাহাঙ্গীরনগরের ছেলেমেয়েরা নেশা করুক বা না করুক, প্রেম করুক বা না করুক, লেখাপড়া করুক কী গোল্লায় যাক, কেউ চরম অন্যায় কিছু করলে সহজে পার পেয়েছে এরকম হওয়া প্রায় অসম্ভব। যেই প্রশাসনের বিরুদ্ধে পান থেকে চুন খসলেই প্রতিবাদের ঝড় ওঠে, সেই প্রশাসনের উপরই কেন সবাই আস্থা রাখতে চাইছে? সবাই তো গাড়ল নয়, তবে? বিবেচনা করে দেখবেন আশা করি।

ju-7সমস্যাটা ব্যক্তিগত না সমষ্টিগত সেটাই তো পরিস্কার হচ্ছে না এখন পর্যন্ত। ব্যক্তিগত হলে সেটা ব্যক্তিগতভাবেই সমাধান করা উচিত। আর সমষ্টিগত হলে, সেটার পক্ষে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের সমর্থন থাকা উচিত। সাকুল্যে ছয়জন শিক্ষক-শিক্ষিকা প্রতিবাদলিপি লিখেছেন। অবাক হইনি।

জাহাঙ্গীরনগরে (এবং অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও) শিক্ষকদের প্রতিবাদের আবার আরেকটা রাজনীতি আছে। সেটাও একটু আমলে নেয়া ভালো। কিন্তু শিক্ষার্থীরা সম্মিলিত আওয়াজ তুলছে না কেন? ক্যাম্পাসে কি শুধু ফার্স্ট ইয়ার ক্লাস করে এখন!!

তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগ প্রমাণিত বা অপ্রমাণিত কোনটাই হবে না। সেই পর্যন্ত অপেক্ষা না করে পক্ষে-বিপক্ষে জনমত তৈরির চেষ্টা কেন? এটা কি কোনো ইলেকশন, যে প্রার্থীর পক্ষে-বিপক্ষে প্রচারণা চালাতে হবে?

আপনারা লিখে লিখেই যদি রায় দিয়ে দিবেন, তবে প্রশাসনিক বিচারের দরকার কী? একইসাথে দুইটা বিচার পদ্ধতি তো চলতে পারে না, তাই না? একজন ভেবেছেন দেশের মিডিয়ার কাছে লিখে তিনি তার প্রতি হওয়া অন্যায়ের শোধ নেবেন! শুধু প্রশাসনকে জানানো যথেষ্ট নয়। বেশ। এখন যারা পাশে দাঁড়িয়েছেন, তারাও কি শুধু এই একটি ঘটনার বিচার চান? নাকি “গবেষণা” থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই অন্যায় যদি সত্যি মহামারী আকার ধারণ করে থাকে, সেটারও সুষ্ঠু সুরাহা চান?

Shaswati 5
শাশ্বতী বিপ্লব

দেখুন, এই গবেষণায় পাওয়া ফল কোন ব্যক্তিবিশেষের অভিযোগকে যেমন প্রমাণ করে না, তেমনি, কোন ব্যক্তিবিশেষের অভিযোগ প্রমানিত না হলেও তাতে গবেষণাটা খারিজ হয়ে যায় না। দুটো মেলাতে গেলেই মুশকিল।

মনে রাখা ভালো, এখানে অভিযোগকারীর মতো অভিযুক্তেরও সামিজিক জীবন আছে। এবং নিশ্চিত না হয়ে কোন পক্ষ নেয়াটাই শোভন নয়।

আমি বলি কী, মাঝে মাঝে একটু “আবেগ-অনুভূতির” লাগাম টানা ভালো। তাতে পুরো ছবিটা দেখতে সুবিধা হয়। নইলে “কুমির আর শেয়ালের” গল্পের মতো পা মনে করে লাঠি ধরে বোকা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

বিঃ দ্রঃ এতো কথা বলে তবে আমিই বা এখানে লিখছি কেন? আমি প্রথমে নিজের টাইমলাইনেই লিখেছিলাম। উইমেন চ্যাপ্টারের সম্পাদক মনে করেছেন উইমেন চ্যাপ্টারেই যেহেতু চটকানোটা হয়েছে বিষয়টা, তাই এখানেই এটা শেষ হোক। আমিও ভেবে দেখলাম, তবে তাই সই।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.