শিশুদের না বলা কথাগুলো কান পেতে শুনুন

0

জেসমিন চৌধুরী: আরো একটি দুধের শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে নিরলসভাবে লিখে যাচ্ছি আমরা অনেকে, সরবে প্রতিবাদ করে যাচ্ছি, অথচ মনে হচ্ছে আমাদের প্রতিবাদ আর প্রতিরোধ যেন উসকে দিচ্ছে বিকৃত মানসিকতার পুরুষগুলোর কামলিপ্সাকে। নির্যাতিত শিশুর বয়স কমে আসছে প্রতিবার, নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে সেইসাথে।

কী হচ্ছে এসব?

rape-victimঅনেকে বলেন প্রতিবাদ করে-টরে কিছু হবে না, মানুষ পাল্টাবে না, সমাজ যেমন আছে তেমনই থাকবে। দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার চলবেই, শিশু ধর্ষণ, গণ ধর্ষণ ঘটবেই। আমি এতোটা নেতিবাচক হতে চাই না। তবে প্রতিবাদের ধরন বদলাতে হবে বলে আমি মনে করি। রাজপথে শ্লোগান দিয়ে মাতৃভাষা অর্জন করা যায়, ময়দানে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করা যায়, কিন্তু মানববন্ধন আর মিছিল-মিটিং করে কী সমাজ বদলায়, মানসিকতা বদলায়?

তারপরেও দেখে স্বস্তি লাগে যে কচি কচি শিশুদের ধর্ষণের প্রতিবাদে মানুষ পথে নেমে এসেছে, দুষ্কৃতিকারীদের বিচারের দাবিতে ফেটে পড়ছে দেশ। প্রতিবাদের এই তীব্রতা আমাদেরকে আশার আলো দেখায়, কিন্তু একই সাথে মনে প্রশ্ন জাগে, যারা প্রতিবাদ করছেন তারা যৌন নির্যাতনের মূল কারণ বা তা প্রতিহত করার উপায় সম্পর্কে কতটুকু জানেন বা বোঝেন?

যে দেশে যৌনতা একটি নিষিদ্ধ বিষয়, যে দেশে নারীর উপযুক্ত সম্মান নেই, যে দেশে মেয়েদেরকে নিজেদের শরীর ঢেকে রাখতে বলাই একমাত্র যৌন শিক্ষা, যে দেশে বাচ্চাদেরকে শেখানো হয় না কে, কোথায়, কীভাবে যৌন নির্যাতন করতে পারে, যে দেশে নির্মম ধর্ষণ ও হত্যা বা আত্মহত্যার ঘটনা না ঘটলে মানুষ নারী নির্যাতন সম্পর্কে সচেতন হয় না, সেই দেশে শুধুমাত্র ধর্ষককে শাস্তি দিলেই কি এসব সমস্যা কমে আসবে?

stop-rape-2অনেকে মনে করেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিলে অন্যরা ভয় পেয়ে এই কাজ আর করবে না। ভূল ধারণা। যৌন নির্যাতন করা একটা পাশবিক প্রবৃত্তি। সুযোগ পেলে কোন ভয়ই এই প্রবৃত্তি চরিতার্থ করা থেকে একজন পুরুষকে আটকে রাখতে পারবে না। এই সামাজিক ব্যাধি যথাসম্ভব কমিয়ে আনতে একমাত্র উপায় হচ্ছে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিশুদের বেলায় বেশি করে সতর্কতা অবলম্বন।

একটা গল্প বলি।

কয়েকদিন আগে একটা সোশাল সার্ভিসেস কনফারেন্সে গিয়েছিলাম বাংলাদেশী এক পরিবারের জন্য অনুবাদের কাজ করতে। একটি পারিবারিক নির্যাতনের ঘটনার প্রেক্ষিতে সোশাল ওয়ার্কারদের মতে এই  পরিবারের মা বাবা দু’জনেই তাদের চার বাচ্চার সঠিক লালন পালনে অক্ষম, কারণ তারা তাদের বাচ্চাদের আবেগিক চাহিদা বা ক্ষতির বিষয়টা বুঝেন না। একথা শুনে বাচ্চাদের বাবা সিংহের মতো গর্জে উঠলেন, ‘আমার হুরুতাইন্তর লাগি কিতা বালা, তারা আমার তাকি বেশি বুঝেনি?’

তার স্ত্রীও তাকে সমর্থন করে বললেন, পুলিশ আর সোশাল ওয়ার্কাররা মিলে তাদের সুখের সংসার ভেংগে দেবার চেষ্টা করছে। তাদের মতে, তাদের পরিবারে এমন কিছুই ঘটেনি, প্রতিটা সংসারেই মারামারি, ঝগড়াঝাঁটি হয়। শুধু এইবার একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে এই যা। বাবা রাগের চোটে বাচ্চাদের সামনেই মাকে লাথি মেরে বসেছেন। কিন্তু তিনি তো তার বাচ্চাদের গায়ে কখনো আঙ্গুলের টোকাও দেননি, তাহলে সোশাল ওয়ার্কাররা এটা নিয়ে এতো বাড়াবাড়ি করছে কেন?

stop-rapeআমার নিজের জন্ম বাংলাদেশে, বড় হয়েছি বাংলাদেশে। কাজেই এই মা-বাবার চিন্তাভাবনা আমি অনেকটা বুঝি। যে পুরুষ পরিবারের জন্য রোজগার করে, বাচ্চাদেরকে নিয়ে পার্কে বেড়াতে যায়, মাকে ঘরের কাজে কর্মেও সাহায্য করে, সেই পুরুষের মাঝে-মধ্যে মেজাজ খারাপ করার অধিকার থাকবে না কেন? তার হাতে একটা দুইটা চড় থাপ্পড় খেয়েও যদি বাচ্চাদের মা তার সাথে ঘর সংসার করতে চায়, সোশাল সার্ভিসেসের তাতে সমস্যা কোথায়? এমন একজন মা  তো সাক্ষাত দেবী, তার হাতে বাচ্চাদের আবেগিক নির্যাতন কীভাবে সম্ভব?

এই দেশের সোশাল সার্ভিসেসের লোকগুলো খুবই গোয়ার এবং গাধা টাইপের, এরা আমাদের এসব বাঙালী যুক্তি মানতে রাজী নয় কিছুতেই। তাদের কথা হচ্ছে, এই বাবাটি একটা গুরুতর অপরাধ করেছেন বাচ্চাদের সামনে মাকে শারীরিক নির্যাতন করার মাধ্যমে, আর মাও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বাচ্চাদের সামনে এমন একটা ঘটনা ঘটতে দিয়ে, এবং তারপরও একই ছাদের নিচে এই পুরুষের সাথে বসবাসের ইচ্ছা প্রকাশ করে নিজের অপরাধকে আরো গুরুতর করে তুলেছেন তিনি।

এই নির্যাতিত নারীকে সর্বতোভাবে সাহায্য করতে চায় কর্তৃপক্ষ, কিন্তু সেই সহায়তা ঠিকমতো কাজে লাগাতে হলে তাকে আপাতত স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ ঘটাতে হবে, কারণ বাচ্চাদের ভালমন্দের বিষয়টি হচ্ছে সবচেয়ে জরুরি এবং এই বাবার সাথে তারা কিছুতেই নিরাপদ নয়। মা-বাবা দু’জনের কেউই যেহেতু বাচ্চাদের আবেগিক চাহিদার বিষয়টা বুঝতে সক্ষম নন, সেহেতু তারা যথাযথ কাউন্সেলিং কোর্স করে নিজেদেরকে প্রস্তুত করার আগ পর্যন্ত স্বামী-স্ত্রী একসাথে থাকতে চাইলে বাচ্চাদেরকে তাদের কাছ থেকে নিয়ে নেয়া হবে, কারণ এই শিশুরা রাষ্ট্রের সম্পদ এবং এদের শারীরিক, মানসিক, আবেগিক, সকল ধরনের মঙ্গলের জন্য রাষ্ট্র প্রয়োজনীয় সমস্ত পদক্ষেপ নেবে।  

গত বছর আমি শিশু নির্যাতন বিষয়ক একটা ট্রেইনিং প্রোগ্রামে অংশ নিয়েছিলাম যেখানে বলা হয়েছিল বিভিন্ন গবেষণা ও সমীক্ষায় দেখা গেছে, ইউকে তে প্রতিবছর যেসব শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে, তার মধ্যে ৮০% ভাগই ঘটে মা-বাবার হাতে। আমার এসব অভিজ্ঞতার কথা শুনে অনেকে বলেন, ‘এসব ঘটনা বাইরের দেশেই ঘটে থাকে, আমাদের দেশের মা-বাবারা এমন নয়।‘ প্রকৃত সত্য হচ্ছে, আমাদের দেশে এরকম কোন গবেষণা বা সমীক্ষা করাই হয় না, কাজেই আমাদের দেশে শিশুদের সাথে পারিবারিক পরিবেশে কী ঘটছে, তা হলফ করে বলা কঠিন।  

harass-2শিশু নির্যাতন হয়তো ইউকে’তে  বিরল নয়, কিন্তু শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এখানে রাষ্ট্র বিশেষ বিশেষ পদক্ষেপ নিয়ে থাকে, মা-বাবারাও যার আওতার বাইরে নন। শিশুদের নিরাপত্তার প্রশ্নে রাষ্ট্র মা-বাবার উপরেও পরিপূর্ণভাবে আস্থা রাখে না।

শিশু নির্যাতন বন্ধ এবং শিশুর সুষ্ঠু শারীরিক এবং মানসিক বিকাশের জন্য এসব কার্যক্রম দেখে আমি স্বস্তিবোধ করি। শুধুমাত্র শারীরিক এবং যৌন নির্যাতনই নয়, এখানে শিশুর প্রতি অবহেলা নিরোধেও যেসব কাজ করা হয় তা বিশেষ প্রশংসার দাবি রাখে।

কিন্তু একই সাথে নিজের দেশের শিশুদের কথা ভেবে আমার মন হাহাকার করতে থাকে। এদেশে শিশুর আবেগিক নির্যাতনের জন্য এতো কাজ হচ্ছে, অথচ আমার দেশের শিশুরা ঘরে ঘরে কী অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, যার খবর কে রাখে? আমাদের দেশের সরকার এ বিষয়ে কী কাজ করছে? কতোটুকু খোলামেলাভাবে এসব বিষয় আলোচনা করা হয়? এ বিষয়ে কি কোন ধরনের গবেষণা হচ্ছে? কে, কখন কীভাবে শিশুকে কী ধরনের নির্যাতন করতে পারে তা কি অনুসন্ধান করা হচ্ছে? সরকারের কী এ বিষয়ে কোন পরিকল্পনা বা কোন ধরনের বিবৃতি আছে? মানুষের মধ্যে এই বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করার জন্য কি কোন ধরনের কাজ করা হচ্ছে? এমন শত শত অনুত্তরিত প্রশ্ন আমাকে প্রায়ই বিচলিত করে তুলে।

আমি যখন ছোট ছিলাম, আমার এক দূর সম্পর্কের চাচাতো ভাই আমাকে বিভিন্ন সময়ে যৌন নির্যাতন করার চেষ্টা করেছিলেন। বড়দের কাছে এসব কথা বলার চেষ্টা করে মনোযোগ পেতে ব্যর্থ হয়েছিলাম আমি। এই লোকটিকে বিভিন্ন সময়ে শিশু নির্যাতনে হাতে-নাতে ধরা হয়েছে, কিন্তু তাকে পুলিশে রিপোর্ট করা তো দূরের কথা, বরং ছোটবেলা দেখেছি তার কুকীর্তিকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হতো।

বড় হবার পর একবার এক অনুষ্ঠানে গিয়ে আমার আরেক চাচাতো বোনের বাচ্চা মেয়েদের সাথে তাকে বাগানে একা খেলতে দেখে আমি শিউরে উঠেছিলাম, কিন্তু বোনটিকে যখন আমার উদ্বেগের কথা বললাম, তিনি নির্বিকারভাবে উত্তর দিলেন, ‘আমি এসব কথা আলোচনা করে আমার মেয়েদের শৈশবের সারল্য নষ্ট করতে চাই না।‘

jesmin-3

জেসমিন চৌধুরী

আমি সম্ভবত একজন অসংবেদনশীল মা, কারণ আমি খুব ছোটবেলা থেকেই এসব বিষয় আলোচনা করে আমার বাচ্চাদের সারল্য নষ্ট করে দিয়েছি। আমার বাচ্চারা একটু বড় হবার পর আমি তাদেরকে বলেছি, তাদের অনুমতি ছাড়া তাদেরকে কোনভাবে স্পর্শ করার অধিকার আমারও নেই। একবার আমার এক পুরুষ বন্ধু আমার মেয়েকে কোলে নিতে চাইলে সে নির্দ্বিধায় তাকে বলে দিল, ‘আমি আমার মা ছাড়া কারো কোলে উঠি না।‘

আমার বন্ধুটি অবাক হয়ে গিয়েছিল, আর আমি প্রচণ্ড স্বস্তিবোধ করেছিলাম এই ভেবে যে, আমি কাছে থাকি আর না থাকি, আমার মেয়ে নিজেকে ভাই আর চাচাদের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে।

আমি প্রায়ই ভাবি, যারা অনেক সমবেদনা আর ভালবাসা নিয়ে শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন, মানব বন্ধনে হাত ধরাধরি করে দাঁড়ান, তাদের নিজেদের শিশুরা কি তাদের নিজের বাড়িতে নিরাপদ আছে? কারণ আমাদের দেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শিশুর নিরাপত্তার উর্ধ্বে স্থান দেয়া হয় বড়দের সম্মান এবং সুবিধাকে। পরিবারের ভেতরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো টের পেলেও ধামাচাপা দেওয়া হয়। নিজের ঘরেই আপনজনদের হাতে যে নির্যাতন ঘটে যেতে পারে এবং সচরাচর ঘটেও থাকে, এই বিষয়টিকে ধর্তব্যের মধ্যেই আনা হয় না।

আমিও এমন একটি অনিরাপদ শৈশব কাটিয়ে এসেছি যখন আমার নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব ছিল আমারই উপর। আমি জানি শিশুরা বড়দের অহংবোধ আর স্বার্থপরতার কাছে কত অসহায়।  আমার শৈশবের ক্ষত প্রায়ই সতেজ হয়ে উঠে যখন আমি পত্রিকায় শিশু নির্যাতনের কথা পড়ি, আর মানুষের বিফল প্রতিবাদ দেখি। একটা ভয়াবহ শিশু ধর্ষণ, একটা হত্যা অথবা আত্মহনন ছাড়া যখন মানুষকে জেগে উঠতে দেখি না।

আমার মন প্রাণ প্রতিনিয়ত প্রতিবাদে কাঁদে। আমি মা বাবাদের বলতে চাই, ‘অন্য শিশুদের উপর নির্যাতনের প্রতিবাদ করছেন, মানববন্ধন করছেন, করুন। কিন্তু দয়া করে নিজের ঘরের শিশুটির কথাও ভাবুন, তাদের বলা অথবা না বলতে পারা কথাগুলো বুঝুন আর না বুঝুন, মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করুন, বুঝবার চেষ্টা করুন। শিশু নির্যাতন বন্ধ করার জন্য নিজের ঘরের ভেতরে কাজ করুন। প্রতিটি ঘরকে প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ করে তুলুন। শিশু নির্যাতন কমিয়ে আনতে এর কোন বিকল্প নেই।

শেয়ার করুন:
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares

লেখাটি ১,১৭৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.