রাজনীতি কেড়ে নিচ্ছে আমাদের বৈচিত্র্য

0

কাকলী তালুকদার: প্রিয় বাংলাদেশ, তোমাকে কতটুকু ভালোবাসি সেই পরীক্ষায় আমি কোনদিন নামবো না। মেয়েকে বাংলা পড়তে-লিখতে শেখাই। শাপলা ফুল, ইলিশ মাছ, বাঘ, হাডুডু, মেয়ে এখন জানে। মেয়ের বয়স ছয় বছর, যখনই জানতে চায়, কী ছবি আঁকবো মা, আমি বলি বাংলাদেশের একটা দৃশ্য আঁকো।

মেয়ে বলে, মা তুমি প্রতিদিন একই ছবি আঁকতে বলো কেনো? মেয়েকে ইউটিউবে বাংলাদেশের দৃশ্য বের করে দেই, সে দেখে দেখে ছোট্ট হাতে মায়ের প্রিয় দৃশ্য আঁকে।

khasiaসে পাকিস্তানের নাম জানে, মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনেছে আমার কাছে। টিভিতে যখনই অস্ত্র হাতে কাউকে দেখে, সে জানতে চায়, তার বাড়ি কি পাকিস্তানে? ছোট মনের প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়ার চেষ্টা করি বেশীরভাগ সময়। আমরা চাই, উন্নত জীবনের সুযোগের মধ্য দিয়েও আমাদের সন্তান যেন শেকড়ের টানে তাঁর মাতৃভূমির কথা বারবার স্মরণে রাখে।
অথচ খুব বেশী ক্ষতি আমাদের হবে না যদি সন্তানদের দেশকে না চেনাই। এখানে তারা উন্নত জীবনের সকল অধিকারের মধ্য দিয়েই বেড়ে উঠবে।

গত কয়েকদিন ধরে মনে মনে ভাবছি, কী প্রয়োজন মেয়ের মাঝে বাংলাদেশকে জাগিয়ে রাখার? যখন সে বড় হবে, বাংলাদেশকে নিজের চোখ দিয়ে দেখবে, বিবেক দিয়ে বিচার করবে, তখন সে কি তার ছোট্টবেলার মায়ের প্রিয় ছবির সাথে কিছু মেলাতে পারবে? এর চেয়ে এখনই তো উত্তম সময় শেকড় ছিঁড়ে যাক।

ক্লাশ টেনে পড়ার সময় হ্যান্ডবল খেলার মাঠে একজন গোলকিপার আমাকে মালাউন বলে গালি দিয়েছিল! আমি রাগে দুঃখে অভিমানে সেদিন মাঠে না খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমার শিক্ষক এবং অন্য সহপাঠীদের আন্তরিকতায় আবার মাঠে নেমেছিলাম। কিন্তু সরকারী স্কুলের নামকরা গোলকিপার, যে কিনা আমার কাছেও পছন্দের খেলোয়াড় ছিল সে একটি শব্দের মধ্য দিয়েই তার পুরো মানসিকতা আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিলো। তাকে আমি আজ পর্যন্ত ভুলতে পারিনি।

attack-12কিন্তু পাশাপাশি এমন কিছু পরিবারও ছিল চারপাশে যারা নিয়মিত নামাজ পড়েও আমাদের আদরের ভাগে কোনদিন কম ফেলেনি শুধু ধর্ম বিবেচনা করে! এখনও আছে সেই সকল পরিবার, যাদেরকে আমার নিজের পরিবারের অংশ মনে করি। ধর্ম আমাদের দুই রকম হলেও সম্পর্কের ঘাটতি এখনও হয়নি। তবুও আজকাল শুধু জন্মগতভাবে পাওয়া ধর্মের কারণে নিজেকে পরাজিত সৈনিক মনে হয়।

সেই যে আমার প্রিয় গ্রাম, মাটি, সবুজ ঘাস, পাকা ধানের গন্ধ, ঘুটের গন্ধ, পাট পঁচা গন্ধ, সব কিছুই নাকে লেগে আছে, চোখে লেগে আছে, মনে লেগে আছে। দেশের জন্য, কিছু করতে না পারার ব্যর্থতা ভিতরে যন্ত্রণার দহন চলে। শুধু অপেক্ষা করি, ছেলে-মেয়েরা বড় হলে আমি দেশে ফিরে যাবো। এই ছোট্ট আশাটুকু বাঁচিয়ে রাখি নিজেকে ভাল রাখার জন্য।
কিন্তু আজকাল দেশের পরস্থিতি দেখে ভাবি, আমার জন্মগতভাবে অর্জিত ধর্ম কি আমাকে আমার প্রিয় দেশে সম্মানের সাথে বাঁচতে দিবে? প্রিয় স্বদেশের ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল জোরে এক টুকরো স্বাধীন জমি কি মিলবে যেখানে  ধর্মের জোরে নয় শুধু মানবিকতার জন্য কিছু মানুষ বাঁচতে পারবে!

atack_on_hindusআমি নিরপেক্ষ হতে পারবো না কোনদিন। আমি দুর্বলের পক্ষে সবসময়, এই পক্ষপাতিত্বের কারণে আমাকে চিরদিন ‘সংখ্যালঘু’ হয়েই বাঁচতে হবে তা নিয়ে আমার কোন দুঃখ নেই। জীবনের সংগ্রামের একটা স্বাদ আছে সেটা সংখ্যাগুরুদের দলে থেকে পাওয়া সম্ভব নয়। তবে সেই সংগ্রামটা কখনও ধর্মকে কেন্দ্র করে হবে, সেটা কোনদিন আশা করি না।
কারণ মানবিকতাকে আত্মা ছাড়া উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। ‘ধর্ম’ বিষয়টি আমার কাছে ভাইবোনের মতো। একই মা বাবার চারটি সন্তান যেমন এক রকম হয় না, দেখতে এবং আচরণগতভাবে কিছুটা মিল থাকলেও বৈচিত্র্য অবশ্যই থাকবে। সেই বৈচিত্র্যটুকুই আমাদের প্রত্যেকের আলাদা নিজস্ব সত্ত্বা। এই বৈচিত্র্যের কারণেই পৃথিবীতে নতুন নতুন সৃষ্টি সম্ভব।
কিন্তু আমরা যেন এই বৈচিত্র্যটুকুকেই সহ্য করতে পারছি না!

kakoli

এই দায় আমাদের রাজনীতিবিদদের উপর সবার আগে বর্তায়। একজন রাজনীতিবিদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমাদের পথিকৃৎ হয়ে যাচ্ছেন। একটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি দেশের দায়িত্ব লাভ করে থাকে। সেই রাজনৈতিক দল, দেশের সকল সেক্টরের পোস্টমর্টেমের মধ্য দিয়ে দেশকে এগিয়ে বা পিছিয়ে নিয়ে যায়। তাই আমাদের রাজনৈতিক বিমুখ জীবনগুলো থেকে শুরু করে জীব-অণুজীবের জীবনগুলোও এই রাজনৈতিক আবর্তে বেষ্টিত।
আজকের যে বাংলাদেশ আমরা দেখেছি, প্রতিদিন ধর্ষণ, খুন, আদিবাসী উচ্ছেদ, হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলা, বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি তা আমাদের রাজনৈতিক পোস্ট মর্টেম।

কিছুদিন আগেও ব্লগার, পুরোহিতের লাশ পড়েছে যখন তখন। হায় হায় রবের পরেও সেই হত্যা থেমে থাকেনি। শেষে চূড়ান্ত মূল্য গুলশানের ঘটনার মধ্য দিয়ে দেয়ার পর প্রশাসন একটু লাগাম টানার চেষ্টা করেছে। সেই লাগাম প্রশাসন কিছু দিন ধরে রাখলেও অদৃশ্য রাজনীতি এসে লাগাম ছেড়ে দিচ্ছে নতুন পথে। যদিও পথ নতুন, কিন্তু লক্ষ্য একটাই,মানুষ এবং ধর্ম। মানুষ মানুষকে আক্রমণ করছে, একজন আরেকজনের মূল্যবোধে আক্রমণ করছে। এর সূত্রপাত আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোতে। একক ক্ষমতার লোভে বিরোধী দলকে কোমর সোজা করে দাঁড়াতে না দেয়া। প্রতিযোগিতাহীন বিজয়ের মতো, নিজের বিজয় মুকুট নিজেই পরে বসে থাকা। আর কিছু গুণ্ডাবাহিনী পাহারাদার হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের কাজ অন্য কোনো চেহারা যেন মাথা উঁচু করে না দাঁড়ায়।

attack-14আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর যে বৈচিত্র্যহীন সংস্কৃতির চর্চা, তার প্রভাব আমাদের নিত্যদিনে ঢুকে গেছে। যার ফলাফল অন্য ধর্মের মানুষদের, অন্য সংস্কৃতির মানুষদের অসম্মান।
তাই আমাদের এখন জোরালোভাবেই ভাবতে হবে এবং সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যে সুবিচার আমরা চাইছি, যাদের কাছে চাইছি, তাদের চর্চাটা কোন পর্যায়ে আছে! সত্যিই যদি আমরা ইতিবাচক পরিবর্তন চাই রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং দলের  দিকে তীক্ষ্ণ নজর ফেলতে হবে।
রাজনীতিতে সংস্কার না করে আমাদের পক্ষে কোন ইতিবাচক পরিবর্তনই সম্ভব নয়। আজকের নাসিরনগর বা গোবিন্দগঞ্জ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিগত দারিদ্রতার ফলাফল। তাই দেশকে বাঁচাতে হলে রাজনৈতিকভাবেই এগুতে হবে। আজকের ছায়েদুল হক বা সেইদিনের মাঠের সেই গোলকিপার মেয়েটি রাজনৈতিকভাবেই প্রভাবিত জীবনের প্রতিচ্ছবি।

৭ নভেম্বর ১৬
নিউইয়র্ক

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    4
    Shares

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.