সাম্প্রদায়িক দেশে অসাম্প্রদায়িকতার নমুনা

বিথী হক: আজকে যে লোকটা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ নিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছে এবং নিজেকেও অসাম্প্রদায়িক বলে ঢাকঢোল পেটানোর ব্যবস্থা করেছে আমি তাকে চিনি। শুধু ভার্চুয়ালি না, ব্যক্তিগতভাবেই চিনি। শুধু তাকেই না, তার মত অন্তত শ’খানেক লোককে চিনি। বিজয়া দশমীতে তার স্ট্যাটাস দেখেছিলাম, “হিন্দুরা এত ভণ্ডামি করে! কী দরকার এত টাকা দিয়ে পুতুল বানিয়ে তাকে মা ডেকে আবার লাথি মেরে বানের জলে ভাসিয়ে দেওয়ার! মাকে কেউ এমন করে নাকি?”

attack-7এই লোকের আরেকটা স্ট্যাটাস, “হে আল্লাহ্, সকলের কুরবানি তুমি গ্রহণ করো, পাপমুক্ত করো সবাইকে।” আরেক জনকে চিনি যিনি কুরবানির ঈদের দিন “পশুহত্যা করে এ কেমন উৎসব!” এবং কালীপূজার দিন “ছোটবেলার পাঁঠাবলির কথা মনে পড়ে যাচ্ছে।”

চেনেন এদেরকে? শুধু আমার না, সবার লিস্টেই এমন মানুষজন আছে বলে আমার ধারণা। এই যে এভাবে আঁতকে উঠছেন, এমন সাম্প্রদায়িকতা তো এ দেশে কস্মিনকালেও ছিল না। তাহলে আজ কেন ঘরের পর ঘর জ্বালিয়ে মানুষকে উদ্বাস্তু করে দিচ্ছে দেশ, জনগণ? সত্যিই কি তাই? এদেশে সাম্প্রদায়িকতা ছিল না আগে? আচ্ছা বলুন তো, দুর্গা পূজায় কতটাকা বোনাস পান প্রতিবছর? না, না হাসির কথা বলিনি তো। দুই ঈদে বোনাস পেলে পূজায় পাবেন না কেন? এ দেশ তো সাম্প্রদায়িক ছিল না, সম্প্রতি হয়েছে। তাই এখন পূজার বোনাস না পেলেও আগে নিশ্চয়ই পেতেন!

আচ্ছা টাকা-পয়সার হিসাব বাদ দিই, কী হয় টাকা পয়সায়? খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাটাই মৌলিক অধিকার। রোজার সময় অফিসের মেন্যু কি আপনার? আবার হাসেন কেন? আপনার উপোসের সময় তো আপনার জন্য অফিস শুকনো নাড়ু-মুড়ির ব্যবস্থা রাখে না, তাহলে রোজায় রান্না বন্ধ থাকে কেন? এ দেশ তো অসাম্প্রদায়িক।

এ দেশে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলমান সবার তো সমান অধিকার। তাহলে আপনার নাম কারা ভালবেসে ‘সংখ্যালঘু’ দিয়েছে? সমান আর সংখ্যালঘু কি একই কথা নাকি? যদি হয় তাহলে আজকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘর জ্বললে এতো চেঁচামেঁচি কেন? দিনাজপুরের মন্দিরের কালীমূর্তি ভাংলে এত কথা কেন?

attack-4এই ভাঙাভাঙির সংস্কৃতি কি নতুন নাকি? মসজিদ, মন্দিরের হুজুর-পুরোহিতরা যখন বলেন ‘আমার ধর্মই একমাত্র সত্য, বাকিসব ভুয়া’ তখন কি সেটা অসাম্প্রদায়িক হয়? কোন হুজুর-পুরোহিত কেন ছোটবেলা থেকে শেখান না, আমার ধর্ম ঠিক, কিন্তু তার ধর্মও ভুল না? কেন শেখান না? আজকে হিন্দু-মুসলমান ঝগড়াঝাঁটি নতুন মনে হচ্ছে? ভুলে গেছেন নাকি ৪৭ এর ঘটনা? সেবছর দাঙ্গায় কত মানুষ মরেছিল সেকথা কারো মনে আছে? লাল রক্তে ডুবে যাওয়া শরীর যখন স্বজনরা আলাদা করতে পারছিলেন না তখন পর্যন্ত মালাউন-ডান্ডি শব্দসমূহের ব্যবহার বন্ধ হয়নি।

যারা এখন পর্যন্ত মনে করছেন, মুসলমান ঘরে জন্ম হয়েছে বলে আপনার জীবন সার্থক; আর যারা মনে করছেন হিন্দুঘরে জন্ম হয়েছে বলে মনে করছেন আপনি উপরের সারিতে; আপনি মানেন আর না মানেন আপনি মনে-প্রাণে সাম্প্রদায়িক। যারা মানুষের ঘরে আগুন দিয়েছে আপনিও তাদেরই দলে, সুযোগ পাচ্ছেন না বলে আপনি কেরোসিনের ডিব্বা হাতে ছুটতে পারছেন না।

আর যারা হিন্দু ঘর জ্বলছে, মন্দির ভাংছে এবং নিজেকে মালাউন বলে হ্যাশট্যাগ দিচ্ছেন তারাই এসব ঘটনার মাথা। করুণা আর বিশ্বাস আলাদা জিনিস কিন্তু, গুলিয়ে ফেললে চলবে না। গাজায় মানুষ হত্যার ঘটনায় ‘সেভ দ্য মুসলিম’ আর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হত্যায় ‘সেভ দ্য হিন্দু’ মোটা দাগে একই ঘটনা, আপনি ভিন্নমত সেটা আলাদা ব্যাপার।

কেন মুসলমান বলে তাকে বাঁচাতে হবে? কেন হিন্দু বলে তাকে আমার বাঁচাতে হবে? কেন খ্রিস্টান হলে তাকে বাঁচাতে হবে? তার মানে এখানে মানুষের করুণা লাভের জন্য মানুষের সবচেয়ে বড় সেনসিটিভ ইস্যু ধর্মকে টেনে আনতে হবে? তাহলে আপনি অসাম্প্রদায়িক কিভাবে হলেন একটু বুঝাবেন কি?

মালাউন মানে অভিশপ্ত, এর সাথে হিন্দু ধর্মের কী সম্পর্ক? মাথার ভেতর হিন্দু-মুসলমান-খ্রিস্টান এসব রেখে মানুষ বাঁচানোর আন্দোলনকে কি আদৌ আন্দোলন বলা চলে? যুগ যুগ ধরে আপনার আমার পরিবার মাথার ভেতর যে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বুনেছে তার ফলাফল যে কতো ভয়াবহ ও শক্তিশালী সেটা সম্ভবত গত কয়েকদিনে সবাই বুঝে গেছেন।

attack-12মানুষের জন্য কষ্ট তো কষ্টই। এই যে হিন্দু মারছে আমার কিন্তু কষ্ট লাগছে, এই যে মুসলিম মরছে আমার কিন্তু একইরকম কষ্ট হচ্ছে, বৌদ্ধদের হত্যা করা হচ্ছে তাতেও আমার কষ্টের হেরফের হচ্ছে না। হিন্দু মরলো বলে নিজেকে অসাম্প্রদায়িক উল্লেখ করে মুসলমানদের খোঁচা মেরে কথা বলা কি সাম্প্রদায়িকতা নয়? বৌদ্ধরা মুসলিমদের হত্যা করছে বলে নিজেকে অসাম্প্রদায়িক মনে করে বৌদ্ধদের খোঁচা মেরে কয়েকজন বৌদ্ধ মারার চিন্তা যারা করছেন, তারা সকলেই একই গোত্রভুক্ত ধার্মিক। তারা কেউ অসাম্প্রদায়িক নন, তাদেরকে অসাম্প্রদায়িক ভেবে ভুল করলে বন্ধুর হাতের আগুনেই কিন্তু আপনার ঘর পুড়বে।

bithy-5
বিথী হক

হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ যেই ধর্মেরই হোন না কেন বা নিজের ধর্মকে যতই আধুনিক মনে করেন না কেন স্বীকার করতেই হবে ভণ্ডামি এবং ধর্মান্ধতার জন্য কোন ধর্মের মানুষই কারো চেয়ে কম যান না। ধর্ম আভ্যন্তরীন বিষয়। নিজের জীবন-দর্শনের জন্য বা নিজেকে সমৃদ্ধ করতে পারলে আপনি যে ধর্মেরই হোন না কেন আপনাকে মাথা নত করে শ্রদ্ধা জানাই। কিন্তু গোঁড়ামির জন্য, অন্যের জীবনে বাগড়া দিতে আসলে বা অন্যকে নিজের ধর্মের মাহাত্ম্য বোঝাতে আসলে আপনি যেই হন না কেন; আপনাকে আমি ঘৃণা করি।

আপনি সাম্প্রদায়িকতার মাথায় তেল দিয়ে চকচকে করছেন, আপনিই মানুষের ঘরে আগুন দিচ্ছেন। ধার্মিক হওয়ার জন্য কিন্তু কিছু করতে হয় না, জন্মগতভাবেই ধর্ম পাওয়া যায়, কিন্তু মানুষ হওয়াটা চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। মানুষ হতে গেলে অনেককিছু হতে হয়। তাই সাম্প্রদায়িক বা ধার্মিক নয়, মানুষে মানুষে ভরে যাক পৃথিবী। শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়া নয়, পৃথিবীর সকল মানুষ হাসি-আনন্দে বাঁচুক। আগুন জ্বলুক ভালবাসার, ঘর পোড়ানোর নয়!

শেয়ার করুন:
  • 10
  •  
  •  
  •  
  •  
    10
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.