মালাউন বলে গালি দেয়া ওই মন্ত্রী কবে বিদায় হচ্ছে?

সুপ্রীতি ধর: দেশের একজন মন্ত্রীর মুখ থেকে যখন ‘মালাউনের বাচ্চারা’ গালি বের হয় এবং সেজন্য তাঁকে যখন কোনো জবাবদিহি করতে হয় না, তখন বিষয়টিকে হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ থাকে না। এই যে তাঁকে কোনো জবাবদিহিতা করতে হচ্ছে না, এটা কিসের ইঙ্গিত দেয়? লতিফ সিদ্দিকী হজ নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, যার জন্য তাঁকে মন্ত্রিত্ব, সংসদ সদস্যপদ, দলীয় সদস্যপদ সবই হারাতে হলো। অথচ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সংসদ সদস্য, এই মন্ত্রী কোন্ শক্তিবলে আজ বেঁচে যাচ্ছেন? তিনি তো শুধু গালিই দেননি, তাঁর ভাষাই বলে দেয়, তিনি নাসিরনগরের হামলার পিছনেও ছিলেন, নইলে তিনি ঘটনার চারদিন পর এলাকায় যাবেন কেন? প্রত্যাহৃত ওসিকেই বা কোন যুক্তিতে তিনি ফিরিয়ে নেন?

attack-4প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চাই, আপনার সেই অগ্নিমূর্তি আজ কোথায়? সংখ্যালঘুদের জন্য আপনার ‘অনুভূতি’ কি আঘাতপ্রাপ্ত হয় না? আপনি ব্লগার-নাস্তিকদের বিরুদ্ধে কথা বলেন, তাদেরকে সংযত হয়ে লিখতে বলেন, অথচ নিজের মন্ত্রীদের জিহ্বা সংবরণ করতে বলেন না, এ কেমন নেতা আপনি? আপনি কি আসলেই সবার নেতা? নাকি গুটিকয়েক অনুভূতিসম্পন্নের?

এদিকে শনিবার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন শেষে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেছেন, রসরাজ দাসের পক্ষে একজন আইনজীবী দাঁড়াতে চেয়েছিলেন, কিন্ত বিচারক তাকে দাঁড়াতে দেননি। রসরাজকে কোনও কথা বলারও সুযোগ দেননি। ফলে ওই বিচারক যা করেছেন তা ন্যায়বিচারের পরিপন্থি বলে তিনি মন্তব্য করেন। ১৬৪ ধারার জবানবন্দি দেওয়ার আগে রসরাজকে যাতে আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দেওয়া হয়, সেকথাও জোর দিয়ে বলেন তিনি।

কেমন যেন সব গোলমেলে হয়ে যাচ্ছে না প্রিয় প্রধানমন্ত্রী! এক বন্ধু লিখেছেন, “ফটোশপ, রসরাজকে ধরে এনে বেধড়ক মারধর, এলাকায় ‘অবমাননা’ রটিয়ে দিয়ে রসরাজকে পুলিশে দেয়া, জনসভার আয়োজন করে এলাকায় দুদিন ধরে মাইকিং ও লিফলেট বিতরণ, জনসভায় যোগদানের জন্য এলাকায় বহিরাগতদের আগমন, মিছিল, দুই সংগঠনের আলাদা আলাদা জনসভায় ইউএনও এবং ওসির সংহতিজ্ঞাপক বক্তৃতা, আর তার পরপরই মালাউনদের বাড়িঘর, উপাসনালয়, লুটপাট, ভাঙচুর, মারধর, নারী নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ। একদিকে মালাউনদের কান্না আর অন্যদিকে এবারের যাত্রাপালায় সার্কাসের ক্লাউনরা গাইছে বিবেকের পার্ট”।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, রামুর ঘটনার আদলে খুবই পরিকল্পিতভাবে নাসিরনগরের ঘটনায় এমনিতেই আমরা মানে সাধারণ মানুষ মর্মাহত। আমাদের শেকড় উৎপাটনের এই প্রচেষ্টা তো নতুন না, তাই আমরা মোটামুটি অভ্যস্ত হলেও প্রতিবারই নতুন করে কষ্ট পাই, নিজেকে ক্ষত-বিক্ষত মনে হয়। তার ওপর আপনার স্বনামধন্য মন্ত্রী ‘মালাউনের বাচ্চা’ বলে গালি দিয়েছেন। ওই নাসিরনগরের ক্ষুদ্র, হতদরিদ্র জেলে পাড়ার জলোদাসদের বলা, আর আমাকে বলা একই কথা। এতে আমার কষ্ট হচ্ছে, দুদিন ধরে ঘুমাতে পারিনি, এমনিতেই পারছি না দেশে একের পর এক ঘটে যাওয়া ঘটনায়। মন্ত্রীর এই মন্তব্য শোনার পর আমার রক্তচাপ বেড়ে গেছে, নিজেকে খুবই তুচ্ছ মনে হচ্ছে। আমি আপনার কাছে বিচার চাইছি। হয় আপনি বিচার করবেন, নয়তো আমরা ধরেই নেবো, আমাদেরকে আসলে আপনার আর প্রয়োজন নেই। আপনি নিজেও ওই মন্ত্রীর মতনই আমাদের মালাউনের বাচ্চাই ভাবেন।

বন্ধু, সুহৃদ ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া যথার্থই লিখেছেন- “চেনা শত্রুকে মোকাবেলা করা সম্ভব, কিন্তু অসাম্প্রদায়িকতার মুখোশ পরে থাকা শত্রুর মোকাবিলা করা দুরূহ। যতক্ষণ না আমরা এই চরিত্র বুঝতে পারছি ততক্ষণ সমস্যার আবর্তের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকবো। আমরা যখন আক্ষেপ করি, মন্ত্রী ছায়েদুল হক কেন সাম্প্রদায়িক বক্তব্য দিলেন, তখন আমরা এটা ধরে নিই – তিনি যে রাজনৈতিক দলের অনুসারী তারা অসাম্প্রদায়িক। কিন্তু আসলেই কি তারা অসাম্প্রদায়িক? তারা কি আসলেই নিপীড়িত জনতার বন্ধু? এসবের উত্তর খোঁজা খুবই জরুরি। নয়তো সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে না। জামাত, বিএনপি যেমন সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল, তেমনি আওয়ামী লীগও”।

PM 1প্রিয় নেত্রী, আপনিই বলুন, জ্যোতির্ময় বড়ুয়া কি ভুল কিছু বলেছেন? আমাদের হৃদয়ের ক্ষরণ কি আপনি অনুভব করতে পারেন? যদি পারেন, যদি মনে করেন, না, জ্যোতির্ময় বড়ুয়া ঠিক কথাই বলেছেন, তবে এখনই সময় আপনার পদক্ষেপ নেয়ার। প্রথমত আপনি ওই মন্ত্রীকে বাদ দেবেন মন্ত্রিসভা থেকে, এমন সাম্প্রদায়িক মন্তব্যের পর তার আর ওই সংসদে বসার কোনো অধিকার নেই। এটা সংবিধানসম্মত নয়। আশা করি, আপনি এটা করবেন। তাকে ডেকে মৃদু ধমক দিলে হবে না। আমরা চূড়ান্ত শাস্তি দাবি করছি। দ্বিতীয়ত, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনায় এখনও আপনার নড়াচড়া দেখতে পাইনি, আপনার সংশ্লিষ্ট লোকজনও গেছেন ঘটনার চারদিন পর। গিয়েই আবার হম্বিতম্বি চালিয়েছেন মিডিয়ার বাড়াবাড়ি বলে। আর তারই জের ধরে পরদিন আবারও সেখানে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। এটা কাদের ইন্ধনে হচ্ছে, আপনার কি বুঝতে খুব অসুবিধা হচ্ছে মাননীয়া? আমার কিন্তু হচ্ছে না।

গত কয়েক বছরে এ দেখে দেখে চোখ এখন ক্লান্ত, মন বেদনাক্রান্ত। এখন আপনার হস্তক্ষেপ ছাড়া তো মনে হয় না এই আগুন আগুন খেলা আর উচ্ছেদ-অত্যাচার উৎসব থামবে। তো আপনি কি একটু সদয় হবেন এই দরিদ্র মানুষগুলোর প্রতি? ততোধিক নিগৃহীত ওই ‘মালাউনের বাচ্চাদের’ প্রতি? ‘মালাউন’ জানেন তো, খুব গায়ে লাগে শব্দটা। জোরে এসে চড় মেরে যায় অস্তিত্বে। শব্দটির আভিধানিক অর্থ ‘অভিশপ্ত’। অভিশপ্তই তো, নইলে এভাবে পড়ে পড়ে মার খায় কেউ? সাংবাদিক বলে গ্রামে-গঞ্জে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আছে, আছে সেখানকার লোকজনের সাথে মেশার। তা থেকেই জানি, কতোটা অরক্ষিত, অনিরাপদ জীবনযাপন করেন এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন। তারা এখন আর কিছুতেই নিজেদের এই দেশের নাগরিক বলে ভাবতে পারেন না। ঘরে সোমত্ত মেয়ে থাকলে তো কথাই নেই। হিন্দু মেয়েদের ওপর আলাদা নজর থাকে কীনা সংখ্যাগরিষ্ঠদের!

সেদিন উইমেন চ্যাপ্টারেই এক সংখ্যালঘু মেয়ে ‘অসাম্প্রদায়িকতার মুখোশ’ নামে একটি লেখা লিখেছিল। সেই লেখাটি আমি রাখতে পারিনি প্রধানমন্ত্রী। নানান দিক থেকে মেয়েটির ওপর চাপ এসেছে। বেশি এসেছে তার আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকেই।

তাদের ভাষ্য, দেশ এখন খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, কাজেই নিজেদের রোষানলে ফেলার কোনো মানে হয় না। তারা ভয় পায়, জানেন তো প্রধানমন্ত্রী! আপনার দেশে মানুষ এখন কথা বলে মেপে মেপে। অনেকে তো লেখাও বাদ দিয়েছে। আপনার কি মনে হয় না, এই মানুষগুলোও সবাই দেশকে ভালবাসে আপনার মতোনই?

supriti-1
সুপ্রীতি ধর

অনেকেই বলে, আপনিই নাকি আমাদের শেষ ভরসাস্থল। হতে পারেন। কিন্তু আপনি কি আসলেই আমাদের এই ‘মালাউনের বাচ্চাদের’ শেষ ভরসা হয়েছেন কখনও? আমি তো আশ্বস্ত হওয়ার মতো পাই না কিছু। আপনি চাইলে এরকম ঘটনাই তো ঘটে না এই দেশে। রামুর ঘটনার বিচার করেছেন? করেননি। আর করেননি বলেই এখন এই অরাজকতা চলছে। দেশজুড়ে এখন মন্দির ভাঙচুর আর সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে আগুন, লুট করার যে ট্রেন্ড চালু হয়েছে, তাতে খুব বেশিদিন সময় লাগবে না হিন্দু নিশ্চিহ্ন হতে।

আপনার মন্ত্রী ছায়েদুল হক দাবি করেছেন, ‘নাসিরনগরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক। সাংবাদিকরাই পরিস্থিতি অস্বাভাবিক করে তুলছেন।’ পাশাপাশি তিনি এ ঘটনায় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের বাড়াবাড়ি না করতে সতর্ক করেছেন। তো, সেখানকার লোকজন যে কী অসাধারণ পরিস্থিতিতে আছে, তা আপনি না দেখলেও বা দেখতে না চাইলেও আমরা সাধারণেরা কিন্তু দেখছি। সেখানকার লোকজনের কান্না, ক্ষুব্ধ চেহারাগুলোও দেখছি। তাদের আজকের দৃষ্টি কিন্তু স্বাভাবিক না, সেখানে নিরাপত্তাহীনতা, ভিটেমাটি হারানোর বেদনা লুকিয়ে আছে। আছে ক্ষোভ, ক্রোধ একইসাথে।

এখন কথা হলো, সরকারের মন্ত্রী যদি হিন্দুদের মালাউন বলতে পারে, কাঠমোল্লাদের মত বাড়াবাড়ি না করার হুমকি দিতে পারে, এবং সেই মন্ত্রী যদি এতো পরও বহাল তবিয়তে থাকে, সেক্ষেত্রে বুঝে নিতে হবে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে মন্ত্রীর এই বক্তব্যর প্রতি সমর্থন আছে। যাইহোক, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমরা আপনার সিদ্ধান্ত দেখার অপেক্ষায় রইলাম।

লোকজন বলছে, হয় সঠিক নাগরিক অধিকার দিন, আর না হয় এই লোক দেখানো নাগরিকত্ব কেড়ে নিন।

আপনি বলে দিন সবাইকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে। নইলে সাধারণ লোকজনই বিকল্প খুঁজে নেবে, জুজুবুড়ির ভয় আর কয়দিন?

শেয়ার করুন:
  • 12
  •  
  •  
  •  
  •  
    12
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.