সংখ্যাগুরুর উৎসবে আমিও নিরো- বাঁশি বাজাই!

শারমিন শামস্: আমি খুব অসামাজিক হলেও, কোন কোন মানুষ, এমনকি অপরিচিতরাও মনেও কষ্ট দুঃখ দুশ্চিন্তা আমার সাথে শেয়ার করেন। আমি তাদের সাথে কথা বলি, আমার সাধ্যে যতটা কুলায় যুক্তি বুদ্ধি দিয়ে পরামর্শ বা সমাধান দেবার চেষ্টা করি।

গত কয়েকদিনে এরকম বেশ কিছু মানুষ, যাদের অনেককেই আমি ভার্চুয়াল জগতের বাইরে চিনি না, তারা আমার সাথে অনলাইনে কথা বলেছেন। সবই বুকভাঙ্গা কষ্টের কথা। তারা সবাই সনাতন ধর্মের মানুষ, কিন্তু ভাগ্যের বিড়ম্বনায় জন্মেছেন এই পোড়ার দেশে এবং তারচেয়ে বড় কষ্টের ব্যাপারটি হল, এই দেশটাকে তারা খুব ভালোবাসেন। আর আমার জন্য ভীষণ যন্ত্রণার বিষয়টি হলো, এই প্রথম আমি কোন মানুষকে কোন ধরনের পরামর্শ, সান্তনা কিংবা স্বস্তির কথা বলে ভোলাতে পারিনি। আমি ইনবক্সে এইসব কথোপকথন শেষ করেছি ক্ষমা চেয়ে, মাথা নত করে, লজ্জিত আর দুঃখিত হয়ে!

attack-12একটি ছেলে লিখেছে, তার মা তাকে প্রতিদিন প্রশ্ন করছে, সত্যি করে বল কোন হিন্দু কি আজ মরেছে? সে অফিসে গেলে তারা বাবা চিন্তায় অস্থির হয়ে থাকেন, বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত বারবার ফোন করে খোঁজ নেন। ছেলেটি আমাকে অনেক কথা বললো। সবই তার মনভাঙ্গা কষ্টের কথা। সে খুব কষ্ট পাচ্ছে। অল্পবয়সী বাচ্চা ছেলে। এই বয়সে নিজের দেশে নিজেকে অনাহুত ভাবতে শুরু করেছে সে।

আরেকজন, একটি মেয়ে, সে লিখেছে, তার মা তাকে গানের ক্লাসে যেতে দিচ্ছে না। তার ছোটবোন সেতার শেখে। সেই সেতার সঙ্গে নিয়ে রিকশায় করে ক্লাসে যেতে হয়। তার মা’র ভয়, এমনিতেই তারা হিন্দু তার ওপরে এইসব গানবাজনা ‘ইসলামবিরোধী কাজ’। কখন মেয়েদের কোন বিপদ হয়, সেই ভয়ে অস্থির থাকেন জননী।

একজন বয়স্ক মানুষ, তিনি দেশের বাইরে থাকেন। সনাতন ধর্মের মানুষ। তিনি লিখেছেন, আমি আর কখনো দেশে ফিরবো না। দেশে থাকতেই এইসব যন্ত্রণা সহ্য করেছি। নানাভাবে হেনস্থা করেছে মানুষ। সেই অবস্থা এখনও বহাল তো বটেই বরং আরো খারাপ হয়েছে পরিস্থিতি। তাহলে কেন ফিরবো?

এইসব কথার কোন উত্তর নাই আমার কাছে। আমি এইসব চিঠি পাই আর স্তব্ধ বসে থাকি। তারা ভুল বলেননি, ভুল বোঝেননি, ভুল ভাবেননি। তারা ঠিক বলছেন। তাদের দুশ্চিন্তা, তাদের যন্ত্রণা, বেদনা, হতাশার জায়গাটি শতভাগ সত্য, সঠিক, নির্ভুল। রাষ্ট্রের নাকের ডগায়, প্রশাসনের পৃষ্ঠপোষকতায়, মন্ত্রির দাম্ভিক শিষ্ঠাচারহীন বক্তব্য, সরকারের নির্বিকার নিশ্চুপ থাকার মধ্যদিয়ে একটি বার্তা আমরা সকলেই পেয়ে গেছি, আর যাই হোক, ‘অসাম্প্রদায়িক দেশ’ বলে সাইনবোর্ড লাগানোর কোন সুযোগ আর নেই এই দেশে। ভণ্ডামির মুখোশটা খুলে পড়ে গিয়েছিল অনেক আগেই। এখন তা গা ঝাড়া দিয়ে জেঁকে বসেছে সাড়ম্বরে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, হিন্দু মুসলিম ভাই ভাই- এইসব গালভরা বুলি এখন পাঠ্যপুস্তক থেকেও ভ্যানিশ হয়ে যাচ্ছে। তো দেশে থেকে হিন্দুরাই তো ভ্যানিশ হয়ে গেছেন প্রায়। মাত্র আট ভাগ হিন্দু জনগোষ্ঠী নিয়ে আর কী করবেন? এদেরও বিদায় করে দিন। তারপর পিতলের কৃষ্ণমূর্তি গলিয়ে যা হয়, ভাগবাটোয়ারায় তা কম হবে না।

আমি কেন এইসব লিখতে বসেছি? আমি তো সংখ্যাগুরু। আমি মুসলিম। আমার মসজিদ ভাঙ্গা হলে, আমার ধর্ম, কোরআন, হাদিস, হজ, যাকাত নিয়ে কেউ টু শব্দটা করলেই হাউমাউ করে ছুটে এসে দেশজুড়ে আগুন ধরিয়ে দেবার লোক ম্যালা আছে। আমরা তো বড় একাট্টা। আমি সেই সংখ্যাগুরুর একজন, তবু আমাকে সেই ছেলেটা লিখেছে- ‘দিদি, অফিসে কেউ কেউ আমাকে জোর করে গরুর মাংস খাইয়ে আনন্দ পায়। বাংলাদেশ-ভারত খেলায় ভারত জিতলে আমাকে বলে, তুমি তো খুশি। দিদি, এই দেশটা কি আমার নয়?’

আমি জবাব দিই নাই কোন। জবাব দেবার কী আছে তাই তো আমি জানি না। ধর্মের নামে অধর্ম কখন জেকে বসেছে, স্বার্থ, ক্ষমতা আর প্রতাপের রাজনীতিতে ধর্ম কখন মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে- সে তো আমরা চোখের সামনেই দেখেছি, এখনও দেখছি। ধর্মের আলোচনায় মুখ বন্ধ করে রাখেন প্রবল সুশীলও। ধর্মের প্রশ্নে নতজানু জননেতাও। ধর্মের নামে বর্বরতা, লুটপাট, হানাহানি- এইসব বড়ই স্পর্শকাতর বিষয় এই দেশে।

attack-2এমনকি সব কিছু নিয়ে লেখা চলে, ধর্ম নিয়ে লেখা যায় না। এ হলো সেই দেশ, যে দেশে ধর্ম সম্পর্কে তিল পরিমাণ জ্ঞান না থাকলেও ধার্মিক হওয়া চলে। এই দেশে নিজের স্বার্থ ও সুবিধা মত ধর্মীয় আচার ও আইন বানিয়ে প্র্যাকটিস করা যায় তো বটেই, অন্যকেও সেই আচার মানতে নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করা যায়, জ্ঞান দেয়া যায়। এদেশে প্রবল প্রতারকটিও প্রবল ধার্মিক বলে নাম কিনতে পারে, নামকরা মিথ্যেবাদীটিও ধর্মের লেবাসে নূরানি রূপ ধারণ করতে পারে এবং সবচেয়ে আতংকজনক বিষয়টি হলো, তাদের সকলেই সমাজ সংসারে পবিত্র ভাবমূর্তির প্রতীক, ধর্মের নামে তাদের যাবতীয় ক্রিয়াকাণ্ড সম্মানের সহিত গৃহিত ও আলোচিত হয়।

তো এই দেশে পূজা, বুদ্ধপূর্ণিমা, বড়দিনে যে লোক দেখানো অসাম্প্রদায়িকতার ভড়ংটা হয়, সেটা আর বেশিদিন করবার দরকার পড়বে না। হিন্দু নাই, বৌদ্ধ নাই- এইসব  উৎসব করবেটা কে? বরং উৎসব তো চলছে এখন- মূর্তিভাঙ্গা উৎসব।

moonmoon-4
শারমিন শামস্

হা রে রে রে গান গেয়ে হাতুড়ি শাবল হাতে তেড়ে এসে অন্যের বিশ্বাস আর ভালোবাসাকে ভেঙ্গেচুড়ে চুরমার করে দেয়ার যে প্রবল নেশা- তার পিছনে কাজ করে লুটপাটের লোভনীয় ডাক, জায়গাজমি, ঘরবাড়ি সম্পদ দখলের হাতছানি, প্রবল প্রতাপে নিজেদের রাজত্ব কায়েম করার আনন্দ! এইসব শেষ হলে ভিটেমাটি জুড়ে পড়ে থাকে যে সর্বস্বপোড়া ছাই, মন্দিরের মেঝেতে লুটিয়ে থাকে যে পূজার দেবির হাত পা মুখমণ্ডল, ললিত সবিতা হারাধনের কপাল বেয়ে চুইয়ে পড়ে যে রক্তের ধারা, ছোট্ট গোপালের আতংকে ঠিকরে বেরিয়ে আসা চোখে যে বোবা কান্না ধিকধিকিয়ে জ্বলে- তার সাথে আমাদের কোন সংযোগ নেই। আমি তো সংযুক্ত সেইসব লোকেদের সাথে যারা শাবল, মশাল হাতে ছুটে এসেছে ধর্মরক্ষায়। তারাই ঘোষণা দিচ্ছে, ভাষা সংস্কৃতি জাতীয়তাবাদ ইতিহাস ঐতিহ্য- সব তুচ্ছ। এই দেশ ধর্ম আর সাম্প্রদায়িকতার।

প্রিয় দাদাভাই, প্রিয় দিদিভাই, আমি তাই চুপ হয়ে গেছি। আমি তাই লজ্জায় কুকড়ে ছোট হয়ে গেছি। আমি তাই মাথা নিচু করে আছি- হেঁট হয়ে বসে আছি- যেন আমি মৃত। মৃতই বটে। একটি মিথ্যে বর্বর লোভসর্বস্ব সমাজের অথর্ব একজন এই আমি- সংখ্যাগুরুর তকমা এঁটে বসে আছি জন্মসূত্রে। আমিও নিরো, ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করি আরেক নিরোকে। আপনারা সয়ে যান। চুপ করে থাকুন। আমাকে আর কেউ কোন চিঠি লিখবেন না!  

শেয়ার করুন:
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.