আল্লামা শফীর দৃষ্টিতে নারী ও কিছু পর্যবেক্ষণ

উইমেন চ্যাপ্টার: হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আহম্মদ শফীর বয়ান নিয়ে সম্প্রতি একটি ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে ছাড়া হয়েছে। বয়ানে তিনি সামাজিক নানা ইস্যু নিয়েই তার মন্তব্য তুলে ধরেছেন। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ‘নারী’। নারীকে তিনি ‘তেঁতুল’ ফলের সাথে তুলনা করে বলেছেন, তেঁতুল দেখলেই যেমন মানুষের জিভে লালা আসে, নারীও তেমনি। আর এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি নারীকে ঘরের চার দেয়ালে আবদ্ধ থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। বয়ানে তিনি পোশাক শিল্পের নারী শ্রমিকদের চরিত্র নিয়েও কটাক্ষ করেছেন। ভিডিও ক্লিপটি প্রচারিত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে তুমুল সমালোচনা চলছে। এখানে তার অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো:

বিশিষ্ট ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন আল্লামা শফির ভিডিও লিংকটি ফেসবুকে শেয়ার করে লিখেছেন ‘আমার ফেসবুক বন্ধুরা বিশেষ করে মেয়েবন্ধুরা অবশ্যই শুনবেন—ইসলামের হেফাজতকারী আল্লামা শফির ওয়াজ। এই লোক মায়ের পেটে জন্মগ্রহণ করেনি। নারী দেখলেই ওর বুকে লালা বের হয়’!

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সুস্মিতা চক্রবর্তী লিখেছেন, ‘আল্লামা শফি ‘ধর্ম’ নিয়া রাজনীতি করেন ঠিক আছে। কিন্তু নারীদের বিষয়ে জ্ঞান/নসিহত দান করার এ হেন অধিকার তাকে কে দিয়েছে? নারীদের নিয়ে যে সমস্ত কথা উনি বলেছেন সেটা কোনো বিবেকবান-ধার্মিক মানুষের কথা হতে পারে না। সকল ধর্মই সময় আর সমাজ-ইতিহাসের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে প্রয়োজনে নানা কিছু শুভচিন্তাকে স্বাগত জনায়। আর উনি দেখছি এই সময়ে বসে নারীদেরকে ঠিক মানুষ নয় স্রেফ বস্তু হিসেবে এর হেফাজতের বিষয়ে চরম প্রতিক্রিয়াশীল আর ‘বিনোদনমূলক’ মন্তব্য করে ফেলেছেন! নারী-পুরুষ ঈশ্বর বা খোদার সৃষ্ট সর্বশ্রেষ্ঠ দুই সত্তা। বিদ্যমান ধর্মগুলোর প্রধান প্রধান পথপ্রদর্শক আর জ্ঞানী-মহাত্মারা নারীকে সেই যুগে যতখানি স্বাধীনভাবে কাজ করার করার বা জ্ঞান সাধনার প্রতি ইতিবাচক কথাবার্তা আর আচরন করে গেছেন তার সাথে এই মওলানার মিল পাওয়া সত্যি ভার। এই সময়ে যখন কিনা ঘরে-বাইরে নারীরা সর্বত্র নানামুখী কর্ম-পেশার সাথে যুক্ত থেকে, লড়াই করে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে টিকে থাকার/এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, সমাজের মঙ্গল সাধনার ধারায় অংশগ্রহণ-অব্যাহত রাখছে সেখানে এই সমস্ত প্রতিক্রয়াশীল কথাবার্তা স্রেফ নারীকে জন্তুর মতো চিড়িয়াখানায়-খাঁচায়-কারাগারে-খোঁয়াড়ে ফিরে যাওয়ার ইঙ্গিতবাহী/নির্দেশবাহী। ফলে, এই সমস্ত প্রতিক্রিয়াশীল আলাপ-আলোচনাকে শক্তভাবে প্রত্যাখান করা ছাড়া কোন বিকল্প নাই। উনি বয়ষ্ক লোক, ধর্ম-রাজনীতি-ক্ষমতা ইত্যাদি প্রভৃতির চর্চা করছেন ভাল কথা। উনার নারীদের নিয়ে এতটা প্রতিক্রিয়াশীল কথাবার্তা না থাকলে আমরা তাকে অন্তত একজন মুরুব্বী হিসেবে বিবেচনা করে খানিকটা নিশ্চুপ থাকতে পারতাম। কিন্তু এভাবে নারীর হেফাজতের বিষয়ে উনার এ হেন চরম দায়-দায়িত্ব বাড়তে থাকলে আশা করি এই দেশের নারীরা এর পাল্টা উত্তর দিতে দ্বিধা করবেন না’।

ব্লগার এন্ড অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক (বোয়ান) এর পেজে লেখা হয়েছে, হেফাজতের নারীদের নিয়ে কি ভাবনা, সমাজে তাদের কি ভূমিকা হওয়া উচিৎ সেইটা নিয়ে বক্তব্য তাদের নেতা শফীর মুখ থেকেই শুনুন, এরপর সিদ্ধান্ত নিন, তাঁর স্বপ্নের ভবিষ্যতে আপনি বসবাস করতে রাজী কিনা’? এই স্ট্যাটাসের প্রতিক্রিয়ায় কবির য়াহমদ কবির নামের একজন লিখেছেন, “মহিলাদের দেখলে আপনার মনের মধ্যে কু-খেয়াল এসে যাবে। মহিলা দেখলে কুভাব না আসলে পুরুষ ধ্বজভঙ্গ”- বলেছেন হেফাজতি আল্লামা শফী। ২৫ মিনিটের বয়ানে তিনি যেভাবে নারী সম্পর্কে কথা বলছিলেন তাতে মনে হচ্ছে নারীরা মানুষই না। এই ওয়াজে লোকটা গার্মেন্টস সেক্টরে মেয়েদের অংশগ্রহণের বিরোধিতা করেছে। সেইসাথে মেয়েদের লেখাপড়া করার প্রতিও বিরোধিতা করেছে।

শাহজাহান সিরাজ নামে অপর একজন লিখেছেন, ‘বিশ্বাসের নামে অন্ধত্ব বন্ধ হোক! ধর্মের নামে অশান্তি ও উন্নয়ন বিমুখতা বন্ধ হোক! মহানবী (স:) আজ যদি জন্ম নিতেন তিনি কি উটের পিঠে চড়ে ধর্ম ও সমাজ সংস্কার করতেন? নাকি বিমানে চড়ে সারাবিশ্বে তার শান্তির বাণী প্রচার করতেন? আমি নিশ্চিত উনি বিমানে চড়তেন! কিন্তু শফি সাহেব হয়ত বলতেন – নাউজুবিল্লাহ, উনি উটের পিঠেই চড়তেন, কারণ এটা অ্যারাবিয়ান বেহেস্তীয় সংস্কৃতি’!

আরেকজন লিখেছেন, নারীদের প্রতি এমন বিদ্বেষ পোষণ করা লোকগুলো কি কোন নারী ছাড়াই পৃথিবীতে এসেছে? বছর বছর যে ছাওয়ালগুলো পয়দা করলো তারা সেগুলো কি কোন নারী ছাড়াই পৃথিবীতে এসেছে? তাদের জন্মদাত্রী মা’কে কি মানুষ মনে করে না?
মীন সাজু নামের একজন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট তার স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘নারী’কে জাতীয় ফল হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হউক…কারণ কতিপয় হুজুরে’রা একজন নারী’কে কলা ফল বানাইতেছে (সাইদি), আরেকজন নারী’কে তেঁতুল ফল বানাইতেছে…আমরাও নারী নামক জাতীয় ফল’কে চব্য, চোষ্য, লেহ্য, পেয় বানিয়ে তৃপ্ত হই…সাইদি’র ওয়াজ অনুযায়ী, কলা যেমন ছিলে দিলে কেউ খেতে চায় না, তেমনি নারী বেআব্রু হলে সেই নারী’র প্রতি কারও আকর্ষণ থাকে না…শফি হুজুরের ওয়াজ অনুযায়ী, তেঁতুল দেখলে যেমন সবার লালা ঝরে, নারী দেখলেও সব পুরুষদের লালা ঝরে, অতএব নারী’দের গৃহভ্যান্তরে থাকা উচিৎ…

হে নারী সকল, তোমরা হইতেছ জাতীয় ফল, কতিপয় হুজুর’রা তোমাদিগকে মহা সন্মানিত করিয়াছেন… অতএব তোমাদিগের একমাত্র কাজ হইতেছে ফল হিসেবে প্লেটে উঠিয়া সেইসব হুজুরদের চাহিদা পূর্ণ করা…’।

সবার সুবিধার্থে আল্লামা শফির নারী সম্পর্কিত বয়ানটি এখানে তুলে ধরা হলো:
“ আপনারা মহিলারা মার্কেট করতে যাবেন না। স্বামী আছে সন্তান আছে তাদের যাইতে বলবেন। আপনি কেন যাবেন? আপনি স্বামীর ঘরের মধ্যে থাইকা উনার আসবাব পত্র এগুলার হেফাজত করবেন। ছেলে সন্তান লালন পালন করবেন। এগুলা আপনার কাজ। আপনি বাইরে কেন যাবেন?

আপনার মেয়েকে কেন দিচ্ছেন গার্মেন্টসে কাজ করার জন্য? চাকরি তো অনেক করতেসেন। আপনি নিজে করতেসেন, আপনার বউ করতেসে,মেয়েরা করতেসে। কিন্তু কুলাইতে তো পারতেসেন না। খালি অভাব আর অভাব। আগের যুগে রোজগার করত একজন, স্বামী। সবাই মিইলা খাইত। এখন বরকত নাই। সবাই মিইলা এতো টাকা কামাইয়াও তো কুলাইতে পারতেসেন না। গার্মেন্টসে কেন দিচ্ছেন আপনার মেয়েকে? সকাল ৭/৮ টায় যায়, রাত ১০/১২ টায়ও আসেনা। কোন পুরুষের সাথে ঘোরাফেরা করে তুমি তো জান না। কতজনের সাথে মত্তলা হচ্ছে আপনার মেয়ে তা তো জানেন না। জেনা কইরা টাকা কামাই করতেসে, বরকত থাকবে কেমনে?

আপনারা মেয়েদের স্কুল, কলেজ, ভার্সিটিতে লেখাপড়া করাইতেসেন। কেন করাইতেসেন? তাদের ক্লাস ফোর ফাইভ পর্যন্ত পড়াইবেন যাতে বিবাহ শাদী দিলে স্বামীর টাকা পয়সার হিসাব রাখতে পারে। বেশি বেশি আপনার মেয়েকে স্কুল কলেজ ভার্সিটিতে পড়াইতেসেন,লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করতেসেন। কিছুদিন পর আপনার মেয়ে, স্বামী একটা নিজে নিজে জোগাড় কইরা লাভ ম্যারেজ কোর্ট ম্যারেজ কইরা চইলা যাবে। আপনার কথা স্মরণ করবে না। মহিলাদের ক্লাসের সামনে বসানো হয়। পুরুষরা কি লেখাপড়া করবে? মেয়ে মানুষ হচ্ছে তেঁতুলের মত। ছোট্ট একটা ছেলে তেতুল খাইতেসে, তা দেখলে আপনার মুখ দিয়া লালা ঝরবে। তেঁতুল গাছের নিচ দিয়া আপনি হাইটা যান তাইলেও আপনার লালা ঝরবে। দোকানে তেঁতুল বিক্রি হইতে দেখলেও আপনার লালা ঝরবে। ঠিক তেমনি মহিলাদের দেখলে দিলের মাঝে লালা ঝরে। বিবাহ করতে মন চায়। লাভ ম্যারেজ, কোর্ট ম্যারেজ করতে মন চায়। দিনরাত মেয়েদের সাথে পড়ালেখা করতেসেন, আপনারা দিল ঠিক রাখতে পারবেন না। রাস্তাঘাটে মেয়েদের সাথে চলাফেরা করতেসেন, আপনার দিল ঠিক রাখতে পারবেন না। যতই বুজুর্গ হন আপনার মনের মাঝে কু খেয়াল আইসা যাবে। এইটা মনের জেনা, দিলের জেনা। এইটা একসময় আসল জেনায় পরিণত হবে। কেউ যদি বলে মেয়ে মানুষ দেখলে আমার দিলের মাঝে লালা ঝরে না, তাহলে বলব তোমার ধ্বজভঙ্গ রোগ আছে। তোমার পুরুষত্ব নষ্ট হয়া গেসে। তাই মহিলাদের দেখলে তোমার কু ভাব আসে না। “

(এর পরের অংশ চাঁটগাইয়া ভাষায়। মূল অংশটি তুলে ধরা হল)

“জন্মনিয়ন্ত্রণ কেন করেন? বার্থ কন্ট্রোল কেন করেন? বার্থ কন্ট্রোল হল পুরুষদের মরদ থাইকা খাসী কইরা ফেলা। মহিলাদের জন্মদানী সেলাই কইরা দেয়া। এরই নাম বার্থ কন্ট্রোল। বার্থ কন্ট্রোল করলেও, ডেথ তো কন্ট্রোল করতে পারবা না। রিজিকের মালিক হচ্ছে আল্লাহ। খাওয়াইবো তো উনি। তুমি কেন বার্থ কন্ট্রোল করবা? বড় গুনাহের কাজ এইটা। পারলে চাইরটা পর্যন্ত বিবাহ করবা। খাওয়াইবো তো আল্লাহ। বার্থ কন্ট্রোল করবা না। এইটা বড় গুনাহের কাজ।”

বয়ানের ইউটিউব লিঙ্ক:

শেয়ার করুন:
  • 27
  •  
  •  
  •  
  •  
    27
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.