তারা বলে ‘সম্মান’, আমি বলি- আত্মসম্মান!

জান্নাতুন নাঈম প্রীতি: গত ২৭ অক্টোবর যখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ওপর করা নির্যাতন নিয়ে আমার লেখাটি ছাপা হলো, তখন খুব অবাক হয়ে দেখলাম- আমার অভিযোগটি যে সত্য নয় সেটি প্রমাণ করতে এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই বর্তমান ও সাবেক বহু পুরুষ ছাত্র এবং সেসব পুরুষছাত্রের পরিচিত নারী বান্ধবী উঠে পড়ে লেগে গেলেন। তারা প্রথমে বলার চেষ্টা করলেন- এই বিশ্ববিদ্যালয়ে র‍্যাগিং নেই।

যখন ব্যাপারটি ধোপে টিকলো না তখন শুরু করলেন- আর যার সাথেই ঘটে থাকুক, জান্নাতুন নাঈম প্রীতির সাথে সেটি ঘটেনি! প্রীতি বানিয়ে বলছে, প্রীতি বিখ্যাত হতে চাইছে, প্রীতি আলোচনায় আসতে চাইছে।

prity
প্রীতি

কাজেই প্রীতির চরিত্র, সতীত্ব, সম্মান, বয়ফ্রেন্ডের সংখ্যা, পুরস্কারের সংখ্যা, লেখক হবার যোগ্যতা ইত্যাদি নিয়ে বহু বহু প্রশ্ন করে ফেললেন! শুধু প্রশ্ন করেই ক্ষান্ত দিলেন না, র‍্যাগিং বা নির্যাতন যে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সত্যিই নেই তা প্রমাণ করতে একটি মানববন্ধনেরও আয়োজন করে ফেললেন! ভাষণও দিয়ে ফেললেন-

“এক দফা এক দাবি, প্রীতি তুই কবে যাবি!”

ছয়মাস পর আমার প্রাণের প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার বিরুদ্ধেই মানববন্ধন হবে তা কি আমিও ভেবেছিলাম? গভীর বেদনা নিয়ে সেই মানববন্ধনের সামনে দিয়ে হেঁটে যে আসতে পেরেছি, কেউ যে আমার গায়ে একটি টোকাও দেয়নি- তাই ভেবেই বারবার ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিয়েছি তখন!

অথচ আমি নিশ্চিত করে জানি- যদি এই র‍্যাগিংয়ের কারণেই আমি আত্মহত্যা করতাম বা র‍্যাগিংয়ের কারণেই মারা যেতাম তাহলে এই বিশ্ববিদ্যালয়েই আমার মৃত্যু উপলক্ষে মিছিল, মিটিং, প্রতিবাদ সভা, মোমবাতি জ্বালানো হতো। যেহেতু আমি বেঁচে আছি, কাজেই- কেন বেঁচে থাকলাম, কেন আগেই প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিলাম না, কেন গত ছয়মাস ধরে চলা অত্যাচারটির কথা ছয়মাস আগেই বললাম না ইত্যাদি সমালোচনা শুরু হয়ে গেলো!

যারা র‍্যাগিং নামক নির্যাতনটি ঘটিয়ে একজনকে অপমান, অপদস্ত ও বাধ্য করে এক নিষিদ্ধ বিকৃত মজা পায়, ক্ষমতার দম্ভ দেখাতে পারে, তার মাথার নিউরনগুলি আমারা দেখতে পাচ্ছিনা বলে স্বাভাবিক মানুষ ভেবে তাকে ভুল করে আসছি সেইই হচ্ছে র‍্যাগার। র‍্যাগিং হচ্ছে এক অন্যায় নিষিদ্ধ অমানবিক আচরণ ও ভিক্টিমের জন্য নির্যাতন। যেটা দেখে একজন মজা পাচ্ছে এবং অপরজন দুঃখ কষ্ট পেয়ে একাকার হচ্ছে।

‘এটিকেট শেখানোর’ নামে একজন ঘৃণা করা শেখাচ্ছে এবং ‘এটিকেট শেখার’ নামে ঘৃণা করছে। এই ঘৃণা শেখানোর স্কুলে আপনি যদি ঘৃণা ব্যাপারটি না শিখে উঠতে পারেন তবে আপনিই হবেন অপরাধী! আপনি কেন এই ঘৃণার ট্রেনিংটি ঠিক মতন রপ্ত করতে পারছেন না-সেটিই হচ্ছে আপনার মূল অপরাধ। এই নিয়ে আপনিও অপরাধবোধে ভুগবেন- কেন আমি পারছি না? কেন সবাই পারছে? কেন বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার রঙিন স্বপ্নগুলো সাদাকালো হয়ে যাচ্ছে?

কেন, কেন এবং কেন?

এই কেন’র রাজ্যে আপনাকে স্বাগতম!

‘সোফিস ভার্ডেন’ বা বাংলায় ‘সোফির জগৎ’ নামের ইয়স্তেন গার্ডারের একটি চমৎকার দর্শন শিক্ষার ভুবনবিখ্যাত বই আছে। বইয়ের শুরুতে বলা হয়েছে- একটি শিশু যদি শৈশবের শুরু থেকেই দেখে তার বাবা প্রতিদিন উড়ে উড়ে অফিস করতে যাচ্ছে তাহলে সেটিই হবে তার কাছে চূড়ান্ত স্বাভাবিক। এরপর কোনোদিন যদি সে দুইপায়ে বাবাকে দাঁড়াতেও দেখে তাহলে সেটিই হবে অস্বাভাবিক।

ঠিক তেমনই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নামের দেশের নামকরা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অসংখ্য রঙিন স্বপ্ন নিয়ে এসে আমি দেখলাম- এখানে এটিই হয়েছে। সবাই মিলে মেনে মেনে একটি প্রাচীন অযৌক্তিক প্রথাকে একটি নিয়ম বানিয়ে ফেলা এবং সেই নিয়মকে শক্ত করতে নিজের অদৃশ্য মেরুদণ্ড ও মনোবলের হাড়হাড্ডি গুড়ো করে ফেলেছে!

যেহেতু জাহাঙ্গীরনগর আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় সেহেতু আমাকে হলে থাকতে হয় এবং হল থেকে ডিপার্টমেন্টে যেতে হয়। ডিপার্টমেন্টে সম্মিলিতভাবে যে বিষয়টি চলে সেটির নাম ‘ব্যাচ কল’ আর হলে যা চলে তাকে বলে ‘সিটিং’। আর ‘ফাঁপর’ তো আছেই! প্রথমদিন প্রবেশিকা অনুষ্ঠানে র‍্যাগিংকে জিরো টলারেন্স বলা ভিসি ম্যাডামের ছায়াটি আমি কোথাও দেখিনা। না ক্লাসে না হলে। তার বদলে বরং দুইখানে দুইরকম নির্যাতন। মনে আছে- একদিন আমাদের ইমিডিয়েট সিনিয়র ব্যাচের এক ভাই সবার সামনে তাদের ব্যাচের প্রত্যেকের নাম বলতে বললেন। যখন তিনজনের নাম বলতে পারলাম না এবং মিনমিন করে বললাম- আমি চিনি, কিন্তু নাম মনে নাই, তখন আমাকে বলা হল- বিষয়টা আমার জন্য লজ্জাজনক না ন্যাক্কারজনক? নিঃসন্দেহে ন্যাক্কারজনক। আমার মনে হল- কি গর্হিত অপরাধই না করেছি আমি! লজ্জায় আর অপমানে মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে হল।

আরেক ছেলেবন্ধুকে বলা হয়েছিল শার্ট না পড়ে টিশার্ট পরেছিস কেন? মুরগী হয়ে দাঁড়িয়ে থাক! হাতে ঘড়ি পরেছি বলে বলা হয়েছিল- হাতে কাদের ঘড়ি আছে? কাদের এতো সিনিয়র সিনিয়র ভাব! ভয়ে আস্তে করে ঘড়ি খুলে ঘড়িটিকে নিষিদ্ধ ইয়াবার মতন ফেলে দিলাম হ্যান্ডব্যাগে। নিজেকে প্রথমবারের মতন ভীষণ অপরাধী মনে হল।

মনে হলো- ক্লাসে বীরপুরুষ ভাব দেখানো ছেলেগুলি একটাও বীরপুরুষ নয়, সবগুলি ক্রীতদাস। এমনকি আমিও। একজন ক্রীতদাসী। অন্যের হুকুম তামিল করা ছাড়া যার ইহজগতে আর কাজ নেই। গণজাগরণ মঞ্চে রাজাকারদের বিচার চাওয়া, মিলি হত্যা ও ধর্ষণ মামলার আন্দোলনে যাওয়া, ফেসবুকে ধর্ষণ, নিপীড়ন, যৌন হয়রানি নিয়ে ঝড় তোলা প্রতিবাদী মেয়েটি আমি নই। আমি হচ্ছি লজ্জিত, শঙ্কিত, ভীত, অসহায় কোনো একটি করুণার প্রাণী। আমি আসলে ‘আমি’ নই! আমি হচ্ছি অপ্রতিবাদী, ভীরু, আত্মবিশ্বাসহীন একটি পুতুল বিশেষ। যে এতো অসহায় যে নির্যাতনগুলির কথা সে বলতেও পারছে না, লিখতেও পারছে না আবার সইতেও পারছে না! পাছে তাকে শুনতে হয়- তুমি মিথ্যে বলছ, তুমি মানিয়ে নিতে পারছ না, এটা তোমার অযোগ্যতা ও একইসঙ্গে ব্যর্থতা!

ছোটবেলায় স্কুলে রচনা লিখতে খুব ভালো লাগতো ‘মাই ফার্স্ট ডে এট স্কুল’, মানে বিদ্যালয়ে আমার প্রথম দিন। আমি মাঝে মাঝে শিউড়ে উঠি, যদি ‘মাই ফার্স্ট ডে এট ইউনিভার্সিটি’ বা ‘মাই ফার্স্ট ডে এট প্রীতিলতা হল’ অথবা ‘মাই ফার্স্ট ডে এট মাই ডিপার্টমেন্ট’ লিখতে দেওয়া হতো তাহলে কী লিখতাম? সিনিয়রদের দেওয়া নিমের ডাল চিবানো, শার্ট-প্যান্ট পরতে নিষেধ করা, বুকে বড় ওড়না দেওয়া, সালাম না দিতে পারলে ধমক দেওয়া, নিজের পরিচয় না দিতে পারলে মামুলি ভেবে বিশ্রী গালি দেওয়া, গান গাইতে ইচ্ছে না হলেও গান গাইতে বাধ্য করা, ইচ্ছে না করলেও মনোরঞ্জনের জন্য পাঁচ রকম হাসি, দশ রকম কান্না কেঁদে দেখানো ইত্যাদি…এগুলি কি নির্যাতন নয়?

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকেই হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়কে ভালোবাসার দোহাই তুলে আমাকে বলবেন- না, এগুলি তো মজার ব্যাপার! এগুলি নির্যাতন নয়! এগুলির জন্য তুমি অভিযোগ করেছ? ছিঃ ছিঃ ছিঃ!

তাকে আমি বলবো- হ্যাঁ ভাই, আপনার কাছে এগুলি মজা করা, মজা নেয়া, মজায় মজিয়ে মজিয়ে উপভোগ করা, কিন্তু আমার কাছে নির্যাতন। আপনার মতন গণ্ডারের চামড়া বা মেরুদণ্ড নামের শিরদাঁড়া ছাড়াও আরেকটি শিরদাঁড়া আমার আছে, ওটির নাম আত্মসম্মান। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সম্মান বাঁচাতে আপনি মরিয়া হয়ে আপনি এতদিন মুখ বুজে চুপ করে নির্যাতনকেই নিয়ম মেনে আত্মসম্মানটি হারিয়েছেন তিলে তিলে এবং সেটিকেই স্বাভাবিক বলে জেনেছেন, আমার কাছে সেটা অস্বাভাবিক।

তবে আশার কথা যখন মিনমিন করে হলেও সিনিয়র আসাদুজ্জামান ভাই স্বীকার করেন তাদের সাথে র‍্যাগিং ঘটেছে, দ্বিতীয় বর্ষের রাতুল ভাই জানান দেন- তিনিও এই নির্যাতনের পক্ষে নেই, প্রথম বর্ষের আনিকা জুলফিকার জানায়- সেও আমার পাশে আছে আর আঠারোজন শিক্ষক যখন আমার নাম গোত্র না জেনেই জানান দেন যে তারা আমার করা প্রতিবাদের পক্ষে আছেন, নির্যাতনের বিপক্ষে আছেন, তখন নির্যাতনের অন্ধকারে বড় আশা জাগে আলোর মতন!

বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছিলেন- যদি একশো কোটি মানুষ একটি ফালতু বিষয় মেনে নেয়, তবুও সেটি ফালতুই থেকে যায়!

আপনারা যারা র‍্যাগ নামক নির্যাতন ও অপরাধটি করে নিষিদ্ধ মজা অথবা তৃপ্তি পেয়ে থাকেন তারা প্রীতি নামের মেয়েটির প্রতিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মজা উপভোগ করছেন তো? মজিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন- প্রীতির সাথে কোনো র‍্যাগিং ঘটেনি, সবই প্রীতির মিথ্যেবাদিতা-তাও করুন। প্রীতি একজন নির্লজ্জ, নির্বান্ধব, দুর্বিনীত, বেয়াড়া একটি মেয়ে?- তাও লিখুন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি অপরাধ নির্বিবাদে চলতে দিলে দোষ নেই, অপরাধের কথা কেউ লিখে বা বলে ফেললেই দোষ?

আসলে তুমি মেয়ে হয়ে কেন প্রতিবাদটি করেছ- এটিই তোমার সবচেয়ে বড় অপরাধ। তোমার অভিযোগ সত্য কিনা, তোমার অভিযোগে তোমার প্রতিবাদটি প্রকাশ পেলো কিনা এটি মূল কথা নয়। তুমি অভিযোগটি কেন করলে?- এটিই মূলকথা!

কাজেই তুমি বেশ্যা কিনা, তোমার চরিত্র জঘন্য কিনা, তোমার লেখাগুলি সাহিত্য হয় কিনা, তুমি আসলেই পুরস্কারের যোগ্য কিনা…ইত্যাদি ইত্যাদি নিয়ে মুখরোচক যত গল্প করা যাবে ততই আনন্দ! আর সেই ফাঁকে যদি প্রশ্ন করা যায়- তুমি আসলেই অন্যায়ের শিকার কিনা? তাহলে তো কথাই নেই! তোমার অভিযোগ সত্য হবে যদি তুমি সতীসাধ্বী, মাথা নিচু করা মেয়ে হও।

তোমার অভিযোগ সত্য হবে যদি তুমি নির্যাতনে মারা যাও! তোমার অভিযোগ কেবল তখনই সত্য হবে যখন তুমি অভিযোগ প্রমাণ করতে মরে গিয়ে বলতে পারবে- তুমি মরো নাই!

বেশ তো! তাই ভালো, এই ভাবনা নিয়েই থাকুন! আমার কাছে সম্মান মানে হচ্ছে নিজের আত্মসম্মানটি বাঁচিয়ে রাখা, আত্মসম্মান বাঁচিয়ে নির্যাতন মেনে না নেওয়া, আত্মসম্মান নিয়ে সম্মানটির মুখ উজ্জ্বল করা। যার আত্মসম্মানই নেই, সে সম্মানের মর্ম বুঝবে কোত্থেকে?   

চারুকলা বিভাগ, ৪৫ তম আবর্তন, প্রীতিলতা হল।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.