প্রতিবাদ-প্রতিরোধে শামিল হোন আপনারাও

তৃষ্ণা হোমরায়: বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের ঘটনা অনেকটা ডাল-ভাতের মতো হয়ে গেছে। এমন দিন খুঁজে পাওয়া সত্যিই মুশকিল হবে যেদিন আমাদের গণমাধ্যমে কোন নারী নির্যাতনের খবর প্রকাশিত হয়নি।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, শুধু অক্টোবর মাসেই ৪৪৬ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে  ১১৫টিএর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৩ জনআর  ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৪ জনকে১৮ অক্টোবর মাত্র ৫ বছর বয়সে ধর্ষণের শিকার হয় দিনাজপুরে পার্বতীপুরের পূজা। এই বয়সেই বিভৎসতার শিকার হয়ে শিশুটি সারা শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছে নৃসংশতার চিহ্ন। ১৮ ঘন্টা আটকে রেখে শুধু ধর্ষণই নয়, নরপশুরা  ক্ষত-বিক্ষত করেছে শিশুটির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। কতটা বিকৃত মানসিকতা হলে পুরুষ নামের চল্লিশোর্দ্ধ দুই হায়েনা এমনটা করতে পারে!!

14457316_1298186943524806_4761375906013575645_n
তৃষ্ণা হোমরায়

এরপর ভাটারায় ধর্ষিত হয় ১১ বছরের এক শিশু, সাভারে ১০ বছরের শিশু, নাটোরে ৫ বছরের শিশু, সবশেষ এ তালিকায় যোগ হয়েছে ঢাকার হাজারিবাগের আড়াই বছরের শিশু। বছরের শুরুতেই ঘটে তনু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা একে একে যোগ হয়, আফসানা, রিশা, খাদিজা, কণিকা কিংবা নিতুর নাম। বছর এগুবার সাথে সাথে লম্বা হচ্ছে তালিকা।

একটার পর একটা ঘটনা ঘটছে, অনেকটা সংক্রামক ব্যাধির মতো। জানি, এ হিসেবটা অপরাধের তুলনায় একটা খণ্ডচিত্র মাত্র। সারা দেশে যে হারে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে এর মধ্যে যেগুলো গণমাধ্যম বা মানবাধিকার কর্মীদের নজরে আসছে সেগুলোই শুধু প্রকাশিত হচ্ছে।

ঘরে, বাসে-ট্রেনে, কর্মক্ষেত্রে,  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমনকি ফেসবুক বা অনলাইনেও নিস্তার নেই নারীর। অবস্থা এতটাই খারাপ যে, চোখের সামনে কোন নারীকে উত্যক্ত হতে দেখলে আজকাল আর কেউ এগিয়ে আসে না। কেউ বা আবার মজা নেয়, দূরে দাঁড়িয়ে ভিডিও করে। বিষয়টি হয়ে উঠে ফেসবুকে লাইক পাওয়ার অস্ত্র। আর কোন মেয়ে যদি প্রতিবাদ করে তাহলে তো কথাই নেই। দেখবেন চারপাশে দাঁড়িয়ে গেছেন অনেকেই উপদেশ দেয়ার জন্য। শুনতে হয় কি দরকার আপা এত ঝামেলা করার, বাদ দেনকেউবা আবার এককাঠি উপরে উঠে বলে কি করেছে, কোথায় হাত দিয়েছে? ও এইখানে, তো গায়ে একটু লাগলে কি হয়? লোকাল বাসে উঠলে এরকম একটু লাগবেই…ইত্যাদি ইত্যাদি।  

এদের মধ্যে কিছু পুরুষ আবার মনে করে নারীরা সহজলভ্য। চাইলেই তাদের সঙ্গ পাওয়া যায়। তাই তাদের প্রেম,  বিয়ে বা অনৈতিক প্রস্তাবে সাড়া না দিলেই জেগে উঠে পুরুষত্ব। এজন্য ঔদ্ধত্য মেয়েদের শাস্তি দিতে এরা এসিডে ঝলসে দেওয়া, চাপাতি দিয়ে কোপানো, ছুরিকাঘাত করতে দ্বিধা করে না। প্রশ্ন হচ্ছে আর কতদিন এগুলো সহ্য করবো আমরা? আমাদের কি কিছুই করার নেই?…

ধর্ষণ, মেয়েদের উত্যক্ত করা বা বখাটেপনার জন্য শাস্তি হওয়ার নজির খুবই কম। বিচারহীনতার সংস্কৃতি ঘাড়ে চেপে বসেছে আমাদের। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা আইনের ফাঁক গলে পার পেয়ে যায়। আবার অনেক সময় অভিযুক্তরা প্রভাবশালী হওয়ায় চাপে পড়ে, ভয়ে মামলা তুলে নিতেও বাধ্য হয় মেয়েরা।

এর ওপর রয়েছে পুলিশ-আইনজীবী বাণিজ্য। এতো কিছুর পর বিচারের জন্য এ দ্বার, ও দ্বার ঘুরে একসময় ক্লান্ত হয়ে দুর্ঘটনার শিকার মেয়েটির পরিবারও হাল ছেড়ে দেয়। এতে আরো সাহস বেড়ে যায় দুবৃত্তদের। তাই এ ক্ষেত্রে আইনের ব্যবস্থাটি পাকাপাকি হওয়া দরকার। বিচার নিষ্পত্তিতে উচ্চ আদালতে আলাদা বেঞ্চ করা যেতে পারে। না হলে শাজনীন হত্যার বিচারের মতো অপেক্ষা করতে হবে দীর্ঘ ১৮ বছর!

মোট কথা এমন কিছু করা প্রয়োজন যাতে অপরাধীরা কোন ভাবেই পার পেতে না পারে। শাস্তি হতে হবে মুত্যুদণ্ডের মতো দৃষ্টান্তমূলক। যেন কোন ধর্ষক-উত্যক্তকারী আর সাহস না পায়। এতো গেল আইনের কথা, দায়বদ্ধতা রয়েছে আমাদেরও। বদলাতে হবে মানসিকতা। বখে যাওয়া ছেলেটিকে শাসন করতে হবে পরিবার থেকে।বুঝাতে হবে, প্রয়োজনে কাউন্সিলিংও করা যেতে পারে।

সর্বোপরি গড়ে তুলতে হবে সামাজিক আন্দোলন। তাই আসুন আজ, এখনি রুখে দাঁড়াই ধর্ষণ আর নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে। গড়ে তুলি সম্মিলিত প্রতিরোধ। আমরা আমাদের নিরাপত্তা চাই, আমাদের মেয়েদের নিরাপত্তা চাই,  আমরা বাঁচতে চাই। এই শ্লোগান নিয়ে ৪ নভেম্বর বিকাল সাড়ে ৩ টা থেকে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত আমরা দাঁড়াচ্ছি ধানমন্ডি ৮ নম্বরে রবীন্দ্র সরোবরে, আপনারাও আসুন। (জরুরি কারণে স্থান পরিবর্তন করতে হলো)

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.