ভণ্ডামীর অনুভূতি কেবলই আঘাত পায়

শারমীন জান্নাত ভুট্টো: ধর্মীয় অনুভূতিকে ভূমিকম্পের সাথে তুলনা করলে হয়তো ভুল হবে না। এটি হঠাৎ হঠাৎ জাগ্রত (যেহেতু এটি অনুভূতি) হয়, আর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে যায়। আর যাদের কথায় কথায় অনুভূতি নামক রোগটি সুড়সুড়ি দিয়ে জেগে উঠে, তারা আর কিছু করতে পারুক আর না পারুক, ধ্বংসলীলায় মেতে উঠতে তাদের কোন ধরনের আপত্তি থাকে না। মন্দির-মূর্তি গুঁড়িয়ে দেয়া, ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া ধর্ষণ-খুন-রাহাজানি, লুটতরাজ করা হল ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের ফল।

bhutto
শারমীন জান্নাত ভুট্টো

আর যারা অমুসলমান তাদের তো অনুভূতি থাকার প্রশ্নই ওঠে না। ৫ বছরের শিশুকে যখন সাইফুল নামে একজন মুসলমান ধর্ষণ করে, তখন এইসব হুজুররা কোথায় থাকে? কোথায় থাকে তাদের চেহারা আর বড় বড় গলার আওয়াজ, এসব ধর্ষকদের বিরুদ্ধে কথা বলার! তখন কি এসব ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মনে কোন রকমের অনুভূতি জাগ্রত হয় না? একটি শিশুর বেদনা বোঝার মতো কি তাদের হৃদয় নেই? নাকি তাদের অন্তর শুধুই কম্পিত হয় কেউ শুধুমাত্র ধর্ম (ইসলাম) নিয়ে কথা বললে।

বেশি দিন আগের কথা না, বছর তিনেক হবে। ২০১৩ সালে কতিপয় ভণ্ড মুসলমান যারা আবার হেফাজতি নামে একটি দল করেছে, তারা যখন ৫ মে ঢাকায় তাণ্ডবলীলা চালায় আর কোরআন শরীফ পর্যন্ত পুড়িয়ে দিতে কার্পণ্য করেনি, তখন কোথায় ছিলো তাদের ধর্মীয় অনুভূতি? নাকি পবিত্রগ্রন্থ পুড়িয়ে দিলে এক্সট্রা সওয়াব পাওয়া যায়। এসব কিছুই তাদের ভণ্ডামীর অনুভূতি।

বাঙালীর সাম্প্রদায়িক দাম্ভিকতা আরো তীর্যক হচ্ছে শুধুমাত্র এই ধর্মীয় অনুভূতির কম্পনে। আর এ অহংকার দিনকে দিন বাড়ছে অন্য ধর্মাবলম্বীদের হেয়-হেনস্তা করার মধ্য দিয়ে।

শুনতে হাস্যকর শোনালেও এটাই সত্যি যে, নিজ দেশে অন্য ধর্মাবলম্বীদের অত্যাচার যখন করা হয়, তখন আমরা একবাক্যে বোবা-কালা আর আন্ধা হয়ে যাই। চোখের সামনে মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ দেখলেও আমরা না দেখার ভান করি, পুরোহিতকে হত্যা করা হলে আমরা মুখে কুলুপ আঁটি আর কেউ ধর্ষিত হলে তা শুনেই পড়ে থাকি, একটা শব্দ পর্যন্ত খরচ করি না অবহেলিতদের পক্ষে, কিংবা ঐসব ভণ্ডদের বিপক্ষে।

অথচ মিয়ানমারে মুসলমানদের ওপর অত্যাচার দেখলে কিন্তু আমরা ঠিকই সরব হয়ে উঠি। আর বলতে থাকি, বৌদ্ধ রাষ্ট্রটি কিভাবে সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন চালাচ্ছে! জামায়াত থেকে শুরু করে হেফাজতে ইসলাম, সবাই লিখিত বিবৃতি দিয়ে এর প্রতিবাদ জানায়। অথচ নিজ দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠরা যখন সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার আর নির্যাতন চালায়, তখন কোথায় থাকে তারা?

প্রতিবাদ-সমাবেশ-বিক্ষোভ তো দূরের কথা, মুখ দিয়ে একটা শব্দও বের করে না তখন কেউ। কারণ অমুসলমানদের তো কোন ধরনের ধর্মীয় অনুভূতি নেই আর এরা তো মানুষের পর্যায়েই পড়ে না। আর রাষ্ট্রধর্ম যখন ইসলাম, তখন অন্য ধর্মের তো সেখানে পাত্তাই থাকার কথা না।

“ধর্ম যার যার আর উৎসব সবার”, “বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ” এসব কিতাবী কথাবার্তা বইয়ে পড়েই মানুষ বেশী অভ্যস্ত, বিশ্বাসে নয়। কারণ বাঙালীদের বিশ্বাস শুধু ধর্মে আর এ ধর্ম নিয়ে কেউ কথা বললেই নাকি তা নড়বড়ে হয়ে যায়, হাস্যকর। কবিগুরু কী ভেবে এ কথাটি বলেছিলেন জানা নেই, তবে যা বলে গেছেন তা এখনও চিরন্তন

“সাত কোটি সন্তানের হে বঙ্গ জননী, রেখেছো বাঙালী করে মানুষ করোনি”

শেয়ার করুন:
  • 36
  •  
  •  
  •  
  •  
    36
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.