অনিরাপদ ভুবনে আমাদের মেয়েশিশুরা

লীনা দিলরুবা: বেঁচে থাকা কখনো কখনো এমনই দুঃসহ হয়ে পড়ে যখন কাউকেই বিশ্বাস করা যায় না। মেয়েশিশু নিয়ে আমাদের জীবনে তৈরি হয়েছে এই ক্রাইসিস যখন কাউকেই আর বিশ্বাস করা যাচ্ছে না। সাম্প্রতিককালে যে ঘটনাটি ঘটেছে এরপর ঠিক কত বছর বয়স পার হলে মেয়েশিশু নিয়ে বাবা-মায়েরা দুশ্চিন্তা করবে তার আর নিশ্চয়তা থাকলো না। পূজা নামের পাঁচ বছরের একটি ছোট্ট শিশুটি যে মাত্রার ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হলো, এরপর কন্যা সন্তানদের মায়েদের দিশেহারা হয়ে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকলো না।

leena-dilruba-2
লীনা দিলরুবা

আমরা কাকে বিশ্বাস করবো? কার কাছে সন্তানদের নিরাপদ মনে করবো? একটা ছোট্ট কন্যাশিশু তারও লালসার শিকার হতে হলো এবং এমন করুণভাবে, এমন ভয়াবহভাবে, এরপর আসলে আর কোনো প্রতিবাদের ভাষাও কলমে জোটে না, তখন সব কিছু স্তব্ধ হয়ে যায়।

আমাদের কন্যশিশুরা আসলে কখনোই নিরাপদ ছিল না। পূজার মতো হাজারো মেয়েশিশুর বিকৃত পুরুষদের লালসার শিকার হবার কথা আমরা বারে বারে পত্রিকায় দেখেছি। কিন্তু এর কোনো প্রতিকার আমরা সমাজে দেখিনি। বরং দিন দিন এটি আরো বেড়েছে। একটির পর একটি ঘটনা ঘটছে, আমাদের রাষ্ট্র এর জন্য জরুরী সভা তলব করেনি, আমাদের নাগরিকরা রাস্তায় নেমে আসেনি, কিছুদিন আমরা সবাই সবার ড্রয়িংরুমে নিরাপদ দূরত্বে বসে এ নিয়ে ব্লগ, ফেসবুক আর পত্রিকায় লম্বা লম্বা বাণীই প্রসব করেছি। পূজার ঘটনাও এর ব্যতিক্রম হবে না।

আসলে রাষ্ট্রকে আমরা করের সুবিধাই দেই, সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র আমাদের দেবার চাইতে কেড়ে নেয় বেশি। আমাদের সন্তানদের একটি সুখী আর নিরাপদ বাসযোগ্য ভুবন আমাদের রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে পারেনি। এই দায়িত্ব সর্বাংশে আমাদের নিজেদেরই যার যার মতো করে পালন করতে হচ্ছে। আমার সন্তানটি যে রাস্তায় বের হলে ইভটিজিং এর শিকার হবে, আমরা পারি নি রাস্তায় মেয়েদের নিরাপদ চলাফেরার বিষয়টি নিশ্চিত করতে।

পাবলিক বাসে, যে-কোনো পাবলিক যানবাহনে মেয়েদের কোনো নিরাপত্তা নেই। রাতের রাস্তায়, ভীড়ের জায়গায় মেয়েরা কোনোভাবেই নিরাপদ নয়। শপিং সেন্টারে, মেলা, সিনেমা হলেও মেয়েরা হরদম ছেলেদের লালসার শিকার হচ্ছে। পহেলা বৈশাখের ভীড়ে মেয়েদের ভয়াবহ নির্যাতনের ঘটনার কোনো বিচার আমরা দেখিনি। বরং এর প্রতিকার হিসেবে পরের বছরের মেলার উপরই খড়গ নেমে আসতে দেখেছি আমরা। এ যেন মাথা ব্যথার জন্য মাথাটাই কেটে ফেলতে হবে গোছের সমাধান।

মেয়েশিশুদের এই অনিরাপদ বেড়ে ওঠা আমাদের সবার জন্য দুর্ভাবনার এজন্য যে, একটি শিশু যদি ছোট বয়সেই মানুষের বিকৃতির শিকার হয় তাহলে এই ট্রমা তার জীবনে ক্ষতস্থান হয়ে গেড়ে বসতে পারে। এই বাচ্চাটির বেড়ে উঠা হতে পারে আর দশটা বাচ্চা থেকে ভিন্ন। ফুল পাখি, কার্টুন, খেলনার ভুবনের বাইরে একটি দগদগে ঘা তার বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে উঠতে পারে। এই অস্বাভাবিক ঘা যতটা না শরীরের, তা বড়ো বেশি মনের বলে এর কোনো দাওয়াই নেই। বেশিরভাগ সময় এইসব ঘটনা মেয়েশিশুরা প্রিয়জনদের কাছে লুকিয়ে রাখে। আর আমাদের অসংবেদনশীল সমাজ যদি এসব জেনেও যায় তখন পরবর্তী কার্যক্রমে মেয়েটির জীবন আরো দুর্বিষহ করে দিতেই আমরা দেখেছি। তাই এসব ঘটনা মেয়েরা প্রকাশও করতে চায় না। তাই হয় না এর কোনো প্রতিকার। রচিত হয় না কোনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির উদাহরণ।

আমাদের মেয়েশিশুদের জন্য আমাদের নিজেদেরই আসলে তৈরি হতে হবে। আমাদের যার যার অবস্থান থেকে সতর্কভাবে বাচ্চাদের জন্য নিরাপদ ভুবন কীভাবে নিশ্চিত করা যায় তা নির্ণয় করে দিতে হবে। আমরা দেখেছি পুরুষ শিক্ষকের কাছে মেয়েশিশুরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।  এক্ষেত্রে পুরুষ শিক্ষক রাখা বাদ দিয়ে নয় বরং পুরুষ শিক্ষককে তার অবস্থান সম্পর্কে সতর্ক করে এবং বাচ্চাদের পরিপূর্ণভাবে সে কীভাবে নিজেকে সবকিছু থেকে নিজেই রক্ষা করতে পারে সেটির উপযুক্ত শিক্ষা দিতে হবে।

পরিষ্কারভাবে যদি কয়েকটি বিষয় তুলে আনি, আমরা শুনেছি পুরুষ শিক্ষক ক্লাসে মেয়েদের মাথায় হাত রেখে কথা বলে, পিঠে হাত রেখে কথা বলে। একটি মেয়েকে কেন শিক্ষকের পিঠে হাত রাখতে হবে? আমি  মনে করি এই বিষয়ে বিদ্যালয়ে কঠোর নিয়ম মানা উচিত। পুরুষ শিক্ষক কোনোভাবে মেয়েদের স্পর্শ করতে পারবে না।

মেয়েশিশুরা বাড়িতেই নির্যাতনের শিকার হতে পারে। এজন্য ছোটবেলা থেকে মেয়েশিশুকে পরিবারের সদস্যদের বিশেষ করে মায়ের এবং বাবার উচিত বলে দেয়া, তাকে কেউ কিছু ইঙ্গিত করলে তার কী মানে দাঁড়ায়। সে যেন তাকে যে নির্যাতন করা হচ্ছে এই বিষয়টি অনুবাদ করতে পারে। কোনটি কি সেটি একজন মা খুব ভালো করেই মেয়েকে বুঝিয়ে বড়ো করে তুলতে পারে। কোন বিষয়টি বাচ্চা গ্রহন করবে কোনটি বর্জন করবে এগুলো যদি ছোটবেলা থেকে তাকে গল্পচ্ছলে, বন্ধুর মতো করে বলে দেয়া হয় তাহলে যার যার প্রতিরোধ ব্যবস্থা সে নিজেও নিতে পারবে।

কোন স্পর্শ স্নেহের, কোন স্পর্শ লালসার সেটিও স্পষ্ট করে মায়েদেরই উচিত বাচ্চাদের বুঝিয়ে দেয়া। তাহলে পুরুষ শিক্ষকের কোন হাতটি আশির্বাদের কোন হাতটি বিকৃতির সেটি একটি বাচ্চা সহজেই বুঝতে পারবে। সে যদি সঙ্গে সঙ্গে সেটি নোটিশ করে তাহলে ভবিষ্যতে সে শিক্ষক আবার এ কাজ করতে উৎসাহিত হবে না।

আত্মীয়স্বজনের ক্ষেত্রেও এই বিষয়টি প্রযোজ্য। নিকটাত্মীয় দ্বারা নির্য়াতিত অসংখ্য মেয়েদের কথা আমরা জানি। আমাদের মেয়েদের জন্য তাই আমাদের সরব হতে হবে। আমাদের নীরবতা আমাদের ধ্বংস ডেকে আনবে। তাই নীরব থেকে নয়, সরবে আমাদের সবাইকে ভয়াবহ এই সমস্যা থেকে মুক্ত হবার পথ খুঁজে নিতে হবে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.