প্রতিবাদের সাবজেক্টিভিটি বনাম অবজেক্টিভিটি

শাশ্বতী বিপ্লব: লিখবো না, লিখবো না করেও লিখতে বসলাম। বলা চলে বাধ্য হলাম। কিছু মানুষের ক্ষোভ, দুঃখ আর হতাশার চাপে আর চোখ বন্ধ করে থাকা গেলো না। এই মানুষগুলো কেন যে বোঝে না প্রতিবাদের “সাবজেক্টিভিটি”ই আসল, আর সব বাজে কথা।

জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ঝুলে থাকা পাঁচ বছরের পূজার জীবন, ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার নাসিরনগরে প্রতিমা ভাংচুর কিংবা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের ছাত্রী দীপা হত্যা কোনটাই ঠিক প্রতিবাদে ফেটে পড়ার মতো খবর নয়। কেনই বা হবে? কে ওরা? নিছক সংখ্যালঘু হিন্দু বৈ তো নয়! যারা এক পা ভারতে দিয়ে রাখে।

Shaswati 5
শাশ্বতী বিপ্লব

খুব বেইমান ওরা, জানেন। প্রতিবাদে ফেটে পড়তে আমাদের যে মাল-মশলা লাগে তার কোনোটাই যে এগুলাতে নেই। আমরা যারা সংখ্যাগুরু হিসেবে সুবিধাজনক অবস্থানে আছি, তারা কেন প্রতিবাদ করবো!!

আপনারা ভেবেছেন, যেকোনো অন্যায় হলেই আমরা অনলাইনজীবীরা, যারা নিজেদের নারীবাদী বা মানবতাবাদী বা সাম্যবাদী বলে বড়াই করি, তারা প্রতিবাদে ফেটে পড়ি? মাঠে না নামি, অন্ততঃ বিচার চাই, বিচার চাই বলে ফেসবুকের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেই, তাই না? সত্যি, খুব সরল আপনারা!!

আরে ভাই, এমনি এমনি আন্দোলন-প্রতিবাদ এগুলো জমে নাকি? মাল মশলা লাগে না? যত বেশি মাল মশলা, তত বড় হুঙ্কার। বুঝলেন না? দাঁড়ান বুঝিয়ে বলি।

প্রধান মশলাই হলো “অনুভূতি”, যার মাধ্যমে আমাদের “সাব্জেকটিভিটি”র সাথে সম্পর্ক তৈরি হয়। জ্বী ভাই, অনুভূতিতে আঘাত লাগা চাই। আপাততঃ ধর্মীয় অনুভূতি এবং যৌনানুভূতি – এই দুইটা আমাদের টপলিস্টে আছে। সত্যি হোক বা মিথ্যা, আমাদের এই দুই অনুভূতিতে যদি ফুলের আঁচড়টিও কাটেন, আপনি যেই হোন, আমরা কিন্তু ছেড়ে কথা বলবো না, বলে দিলাম।

দ্বিতীয় মশলা হলো, “লীগানুভূতি”। এর আবার দুইটা উপধারা আছে। একধারা এর পক্ষে, আরেকধারা এর বিপক্ষে। কিন্তু কোনো না কোনো উপায়ে “লীগ” সম্পৃক্ততা থাকা চাই, বুঝলেন। নইলে ব্যাপারটা ঠিক জমে না, তাইনা।

তৃতীয়খান হলো, “প্রাকৃতিক সম্পদানুভূতি”। এই যেমন ধরেন তেল, গ্যাস, বাঘ, সুন্দরবন, ফ্লোরা, ফোনা, ইত্যাদি। এগুলোর কোনটা যদি আক্রান্ত বা আঘাত প্রাপ্ত না হয়, তবে বয়েই গেছে আমাদের প্রতিবাদ করতে।

চতুর্থটা হলো, “বাক্যানুভূতি”। মানে যা খুশী তাই বলতে পারার অনুভূতি। যে অনুভূতিতে প্রচণ্ড আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী (!), আমাদের উকিল জামাই বার্গম্যানের প্রতি অন্যায়ের প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিলাম, মনে নেই? রাগে অন্ধ হয়ে টপাটপ সাইন করে দিলাম। বেশিদিন আগের কথা তো নয়, এর মাঝেই ভুলে গেলেন!!

আর আপাতত সবশেষ যে অনুভূতি আমাদের কাছে গুরুত্বপূূর্ণ তা হলো, “লাইকানুভূতি”। ইয়ে মানে, ঐযে, ফেসবুকে অনেক লাইক পাওয়া যায় সেইটা আরকি।

তো, আপনাদের ওই হতচ্ছাড়া হিন্দু পরিবারের পূজার ক্ষতবিক্ষত দেহ বা দীপার গলায় জমে থাকা রক্তের দাগ বা ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রতিমাগুলোর ভাঙ্গা অংশ – এর কোনটাতেই কি এই মশলাগুলোর কোনটা আছে? আপনারাই বলুন। তবে কেন প্রতিবাদ আশা করেন, আশ্চর্য!!

এর কোনটাতেই ধর্মীয় সুড়সুড়ি দেয়ার উপাদান নেই (“হিন্দু” আবার ধর্ম নাকি!),  নেই রগরগে ভিডিও ফুটেজ (নিদেনপক্ষে, প্রেম বা পরকীয়া জাতীয় কিছুও যদি থাকতো), নেই ” জয় বাংলা” লিখে কিছু অশ্রাব্য গালিগালাজের সুযোগ।

তবে? কিসের প্রতিবাদ আশা করেন আপনারা? শুধু শুধু মায়াকান্না জুড়েছেন কেন?

ভুলে যাবেন না, আমাদের কাছে সাব্জেকটিভিটি, মানে আমাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট “অনুভূতি” গুরুত্বপূূর্ণ। যেখানে আমাদের স্বার্থবিরোধী কিছু নাই, সেখানে আমরাও নাই। অতো সস্তা না বুঝলেন! আর আপনারা গুটিকয় মানুষ আপনাদের “অবজেক্টিভিটি” নিয়ে থাকুন। আমরা কেন শুধু শুধু মাথা ঘামাতে যাবো। যত্তসব বোকার দল!

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.