টাচ হ্যাজ এ মেমোরি…

suraiya-3
সুরাইয়া আবেদীন

সুরাইয়া আবেদীন: প্রথম ঘটনার পাত্র আমার এক পরিচিত ভাইয়া। উচ্চশিক্ষিত, আত্মবিশ্বাসী, সফল, জীবনের প্রতি মুহূর্ত উপভোগ করা হাসিখুশি- একজন মানুষ বলতে যা বুঝায় উনি তাই। উনার কোন দুঃখ নাই- আমরা পরিচিতরা এ ভেবে হিংসায় মরে যেতাম।
কিন্তু ঠিক এর বিপরীত এক চেহারা দেখেছিলাম একদিন।  

আলাপ হচ্ছিল child molestation নিয়ে। উপস্থিত আমরা সবাই কিভাবে বাচ্চাদের সচেতন করা যায় তাই নিয়ে কথা বলছিলাম, উনি প্রথমে মৃদুভাবে আলাপের প্রসঙ্গ পাল্টাতে বললেন। আমরা কেউ তার এ  আবেদনে গুরুত্ব দেই নাই, বরং এতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের আলাপ চেইঞ্জ করতে বলায় একটু অবাকই হয়েছিলাম। কিছুক্ষণ পর খেয়াল করলাম, উনি আর রুমে নাই।বেশ কিছুক্ষণ পর আমরা দুই একজন খুঁজতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলাম, তা কখনো ভুলব না।

ছাদের এক কোনায় মাথা নিচু করে বসে আছেন। কাঁদতে কাঁদতে চোখ লাল… চুল এলোমেলো, ফর্সা মানুষ চেহারা পুরা ভয়ঙ্কর হয়ে গেছে…
হতভম্ব আমরা উনার কাছে গেলে চিৎকার করে শুধু বলেছিলেন ‘আমি না করেছিলাম এই আলাপ করতে…’
আমাদের কয়েক মুহূর্ত লেগেছিল বুঝতে যে এতো সুদর্শন, আত্মবিশ্বাসী, সফল, হাসিখুশি একজন মানুষ ভেতরে ভেতরে কী ভঙ্গুর, কী ক্ষয়ে যাওয়া একজন…
ভয়াবহ  child molestation  এর শিকার নিজ সেই সত্ত্বাকে মনে, মস্তিষ্কে বয়ে চলছেন, চলবেন জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত…    

এই ঘটনার পাত্রী এক আহ্লাদী পুতুল!  
এই পুতুল সবার কোলে কোলে থাকে। শুধু দাদার কোলে গেলেই কান্না শুরু করে দেয়, কিংবা দাদা হাত বাড়ালে কিছুতেই তার কোলে যেতে চায় না, এতোটুকু শিশুর চোখ, মুখ আর অভিব্যক্তি বলে দেয় দাদাকে সে খুব ভয় পায়…দাদা কোলে নেবার জন্য হাত বাড়ালে সে যার কোলে আছে তার গলা শক্ত করে ধরে রাখে, কিছুতেই ছাড়ে না…
এই দাদা নামাজ পড়েন, হজ করেছেন। উনার কোরআন তেলোয়াত শুনে ঐ বাসার সবার ঘুম ভাঙে…   

The saddest thing about betrayal is that it never comes from your enemies. It comes from loved ones.- প্রথম ঘটনাতে ঐ ভাইয়া ভিকটিম হয়েছিল তার নানার হাতে। আর দ্বিতীয় ঘটনায় শিকারি দাদা।
যাদের হওয়ার কথা ছিল শিশুর শৈশবের সবচে বড় আনন্দের, হাসির, স্নেহের উৎস, তারাই হয়ে গেল শিশুর শৈশবের সবচে বড় অন্ধকার। নানা,দাদার কথা মনে পড়লে যেখানে হবার কথা নস্টালজিক, সেখানে তাদের স্মরণে, স্পর্শে এসব ভিকটিমরা ক্রোধে ঘৃণায় এতোটুকু হয়ে যায়…  

আমরা যারা খুবই ভাগ্যবান, যারা এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হই নাই কখনই তারা যদি একটু খেয়াল করি তাহলে দেখবো এর সিংহভাগ কৃতিত্ব আমাদের অভিভাবকদের।
আবার একইভাবে যারা শিকার হয় তার জন্যও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দায়ী থাকে এই অভিভাবকই।
অভিভাবকদের সচেতনতাই পারে শিশুকে এই দুর্ঘটনার হাত থেকে বাঁচাতে।     

child molestation  সবসময় হয় নেতিবাচক কিছুতে, ‘ভাবতেও পারি না’ বা ‘কল্পনাও করতে পারি না’ এ দুই ক্যাটাগরিতে আমরা যে আত্মীয়/ব্যাক্তিদের ফেলি তাদের দ্বারা। এমনকি বড় বাচ্চারাও (১৫/১৭ বয়স) ছোট শিশুদের উপর এই নির্যাতন করতে পারে।


আজকে খুব কমন কিছু ভুলের প্রতি আলোকপাত করতে চাই, যাতে অভিভাবকরা একটু হলেও সচেতন হন। বিশেষ করে মায়েরা।   

১- বাচ্চাকে শরীরের সাথে পরিচয় না করানো!   
বাচ্চাকে তার নিজের শরীরের সাথে পরিচিত করেন না মায়েরা। কিন্তু করা খুব দরকার। শিশুকে নিজের শরীরের ব্যাপারে সচেতন করে তুলুন একদম আর্লি এইজ থেকে।
শরীরের কোন কোন অংশ ‘প্রাইভেট’ এ ব্যাপারে বাচ্চাকে  ধারণা দিন।
ঠোঁট, বুক, উরু, নিতম্ব, দুই পায়ের সংযোগস্থল, ইউরেনাল পার্ট- এভাবে স্পেসিফিক্যালি শরীরের  ‘প্রাইভেট’ অংশ সম্পর্কে খেলার ছলে কিংবা গোসল করানোর সময় শিখিয়ে দেয়া দরকার।  
সন্তানকে জানিয়ে দেন এই প্রাইভেট অংশগুলোর বাউন্ডারি আছে।  এগুলো সবার জন্য না, এ প্রাইভেট অংশে কেবল বাবা-মা এলাউড।    
তবে ডাক্তার বা অন্য কেউ যাকে বাবা-মা অনুমতি দিয়েছেন শুধুমাত্র সেক্ষেত্রে সেই ব্যক্তি ‘প্রয়োজনে’ দেখতে, ধরতে পারবে, তাও বাবা-মায়ের ‘উপস্থিতিতে’।  
বাইরের কেউ কোনভাবেই প্রাইভেট অংশের ছবি তুলতে, স্পর্শ করতে বা তা নিয়ে ‘খেলা’ করতে পারবে না।
আবার অন্য কারোর প্রাইভেট অংশও বাচ্চা ধরতে পারবে না, চকলেট বা পুতুল দিলেও না এটাও শিখিয়ে দিতে হবে।  

২- আলোচনার সূত্রপাত না করা।

বাচ্চা যে বয়স থেকে বুঝতে শেখে সে বয়স থেকেই সচেতন ভাবে তাকে তার শরীরের ‘প্রাইভেট’  অংশের ‘নিরাপত্তা’ সম্পর্কে জানানো জরুরী। কিন্তু অনেক শিক্ষিত মা সন্তানকে না জানিয়ে ভয়ঙ্কর ভুল করেন এবং পেডোফাইলরা এ সুযোগটাই নেয়। তবে এ ক্ষেত্রে কথা বলার সময় খুবই সতর্ক ভাবে শব্দচয়ন করতে হয়।

‘স্পর্শ’ সম্পর্কে বাচ্চাকে জানান। ‘ভাল’ স্পর্শ/’খারাপ’ স্পর্শ এভাবে না বলে ‘নিরাপদ’/’অনিরাপদ’ স্পর্শ এভাবে বলুন।    
‘নিরাপদ স্পর্শ’ সম্পর্কে পরিচয় করিয়ে দিন, বলুন মা, বোন বা মায়ের মনোনীত কেউ যখন গোসল বা লোশন দেবার জন্য শরীর স্পর্শ করে ,মা বাবা বা পরিবারের কেউ যখন আদর করে, ডাক্তার যখন বাবা মায়ের উপস্থিতিতে শরীর দেখে এগুলা ‘নিরাপদ’ স্পর্শ। এগুলো স্বাভাবিক।      
‘অনিরাপদ স্পর্শ’ – এ স্পর্শ সব সময় শরীরের ‘প্রাইভেট অংশ’ গুলো ঘিরে হয় তা সন্তানকে জানান। যখন পরিচিত বা অপরিচিত কেউ বাচ্চার শরীরের ‘প্রাইভেট অংশ’ এমন ভাবে ধরে যাতে সে  ব্যাথা পায়, কষ্ট পায়, বা ‘একটু অন্যরকম বোধ করে’ বা ‘ভাল লাগে না’ সেগুলো ‘অনিরাপদ স্পর্শ’। বলুন এই স্পর্শ ‘অস্বাভাবিক’।   
বাচ্চাকে শিখিয়ে দিতে হবে ‘অনিরাপদ স্পর্শ’ যদি কেউ করে তাহলে তা সে অবশ্যই মা বাবাকে বলবে।  
বাচ্চাকে ‘কোড’ শিখিয়ে দিতে হয়, কারণ যদি কখনো সে বাবা মায়ের উপস্থিতিতেই কারোর থেকে ‘অনিরাপদ স্পর্শ’ অনুভব করে, তাহলে যেন সেই ‘সংকেত’ বা ‘কোড’ মা কে তাৎক্ষণিকভাবে বলে। এবং এও বলে দেন এই কোড শুধু বাচ্চা এবং মা বাবা বা মা বাবার মনোনীত কেউ জানবে, অন্য আর কাউকে বলা যাবে না।
‘অনিরাপদ স্পর্শ’ দিয়ে কখনো কেউ খেলা করতে চাইলে বাচ্চাকে বলুন সে যেন ‘না’ বলে, সাথে সাথে ঐ ব্যাক্তির কাছ থেকে চলে আসে এবং উক্ত খেলা সম্পর্কে মা বাবাকে, বা স্কুলে হলে শিক্ষককে জানায়।   

৩- ‘সিক্রেসি’ সম্পর্কে ধারণা না দেয়া !
পেডোফাইলদের কমন কথা ‘এটা তোমার আর আমার গোপন খেলা, বাবা-মাকে বলো না’। / কিংবা ‘বাবা মা কে বললে মেরে ফেলবো’।  
বাচ্চাকে পেডোফাইল এ তত্ত্ব শেখানোর আগেই বাচ্চাকে সতর্ক করে দেন এই বলে যে -মা বাবাকে বলার পরেও ‘সিক্রেট’ সিক্রেটই থাকে। তাই কেউ যদি ‘সিক্রেট’ কিছু বাচ্চার সাথে করে বা বলে তাহলে সে নির্দ্বিধায় তা মা- বাবাকে বলবে, এতে গোপনীয়তা নষ্ট হবে না, বা সেই ব্যক্তি জানবে না, মেরে ফেলতে পারবে না।   

৩- বাচ্চাকে কথা বলার সুযোগ না দেয়া-
বাচ্চাকে সব সময় এমন একটা পরিবেশ দিতে হবে যাতে সে অকপটে সব মা-বাবাকে বলতে পারে। বাচ্চা কিছু বলতে চাইলে অনেক সময় গার্জিয়ান বলেন ‘এখন না পরে শুনব’। এটা  ভুল। বাচ্চা যখন যা বলতে চায় তা সেই মুহূর্তেই গুরুত্ব দিয়ে তা শুনতে হবে। মা -বাবাকে সব বলা যায়- এমন ধারনা শিশুকাল থেকেই বাচ্চার মনস্তত্ত্বে গেঁথে দেন।    

৪-  বাচ্চাকে বিশ্বাস না করা।
অনেক বাবা মা আছেন বাচ্চাকে বিশ্বাস করেন না। এটা যে কত বড় বিপদ আনে!  বাচ্চাকে বিশ্বাস করতে হবে। আগেই বলেছি একবার  child molestation  সব সময় হয় নেতিবাচক কিছুতে  ‘ভাবতেও পারি নাই’ বা ‘কল্পনাও করতে পারি নাই’ এ দুই ক্যাটাগরিতে পরা ব্যক্তিদের দ্বারা। কাজেই বাচ্চা যদি ‘অনিরাপদ স্পর্শ’ সম্পর্কে বলতে যেয়ে নিজের বাবা, ভাই, শ্বশুর বা চাচার কথা বলে তাহলে ক্ষেপে না যেয়ে, বাচ্চাকে চড় না দিয়ে তার কথা বিশ্বাস করুন। পেডোফাইল যে কেউ হতে পারে। এমনকি নারীরাও।


৫- উপরিউক্ত বিষয় গুলো নিয়মিত বাচ্চার কানে না দেয়া-
উপরিউক্ত আলোচনা বারবার বাচ্চার সাথে করতে হবে।এ আলাপ এক সিটিং এ শেষ করার মত না।
কুইজ খেলার ছলে, কিংবা যা যা শিখিয়েছেন তা প্রশ্নের আকারে জিজ্ঞেস করা, যেমন ‘শরীরের প্রাইভেট অংশ কোন গুলো?’, ‘অনিরাপদ স্পর্শ কি?’ ‘নিরাপদ স্পর্শ কেমন?’ ‘কেউ অনিরাপদ স্পর্শ করলে কাকে বলবে? কেন বলবে?’ ‘কেউ যদি সিক্রেট খেলা বলে তাহলে বাবু কি করবে?’- এভাবে নিজের মত করে বাচ্চাকে নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে সচেতন করতে হবে।  

৬- সতর্ক দৃষ্টি না রাখা।
বেশিরভাগ সময়  পেডোফাইল হয় বাচ্চার সংস্পর্শে থাকা ব্যাক্তি। যে খুবই চালাক, কিন্তু ভাব ধরে নিরীহ, বাচ্চা ভালোবাসে। যে বাচ্চার জন্য উপহার আনে কিংবা চকলেট দেয়, কিংবা যে ধার্মিক অথবা চমৎকার প্রফেশনে থাকা কেউ। এমনকি ফেরেশতা টাইপ শিক্ষক পর্যন্ত হতে পারে পেডোফাইল।   
কাজেই অভিভাবক হিসেবে খুব সতর্ক থাকতে হবে। সবসময় ওয়াচ করতে হবে আশেপাশের সবার মুভমেন্ট। আচরণ। আবার খুব সতর্ক হতে যেয়ে কারোর প্রতি যেন অন্যায়, অবিচার করে ফেলা না হয় তাও খেয়াল করতে হবে।
যে যা নয় তাকে তাই বলা- খুব বড় অপরাধ।

জন কিটস বলেছেন,  ‘Touch has a memory’
এ কথার গভীরতা যে কতখানি তা কম বেশি সবাই অনুভব করতে পারি।  
সন্তানের শৈশব কিংবা কৈশোরের ‘স্পর্শের স্মৃতি” কেমন হবে তা নির্ধারণ করবেন মা বাবা।

তাই প্রিয় অভিভাবকগণ, আবার বলি- ‘Touch has a memory’
জন কিটসের এই কথাটা মনে রাখবেন।

শেয়ার করুন:
  • 1.6K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.6K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.