স্তন ক্যান্সার: সচেতনতা বনাম যৌনতা

মুমিতুল মিম্মা: এখনও পর্যন্ত আমার দেখা স্তন ক্যান্সার বিজ্ঞাপনগুলোর মধ্যে সেরা সচেতনতা দিতে পেরেছে ব্রাজিলের হসপিটাল এরিস্টাইডেস ম্যালটেজ (মূল ওয়েবসাইট http://www.lbcc.org.br/parceiros.php , পেইজ লিঙ্ক-https://www.facebook.com/hamaltez/photos/a.171350686241889.33551.171346336242324/1206906152686332/?type=3&permPage=1&__mref=message_bubble ) আমেরিকার প্রসাধন কোম্পানি এভন এর সঙ্গে জোট বেঁধে তারা পুরো অক্টোবর মাসজুড়ে চালিয়েছে প্রচারণা।

naila-1প্রচারণার জন্যে তারা বেছে নিয়েছিলেন একজন ক্যান্সার আক্রান্ত মেয়েকে যার স্তন অপসারণের পর তিনি দৃপ্ত চাহনিতে অনেকটা এরকম ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছেন, যেন “আমি কী ডরাই সখি ভিখারি রাঘবে!” ছবিটার মেয়েটার দিকে আমি কিছুক্ষণ ভাষাহীনভাবে তাকিয়েছিলাম। ঐ জায়গায় নিজেকে কল্পনা করতে গিয়েও কয়েকবার হোঁচট খেয়েছি। তারপরে যতক্ষণে চিন্তা করতে পারলাম আমার পৃথিবীটা তখন শূন্য।

আমার এক ছাত্রী আছে, ওর মায়ের স্তন ক্যান্সার। খুব কাছ থেকে যতোটা জানা যায়, তা দেখেই বলছি ক্যান্সারের কেমো নেয়ার পরে রোগী যদি ভালোও হয়ে ওঠেন, তখনও শরীরে রয়ে যায় কেমোর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব। আর সামাজিকভাবে হেয় করার বিষয়টা তো আছেই। রোগী যদি ভালো হয়েও ফিরে আসেন, তাহলেও স্তন অপসারণের জন্যে যে অগ্রহণযোগ্যতা নিজের কাছে তৈরি হয়, সেটা সামলাতেই তার হিমশিম খেতে হয়।

সামাজিকভাবে আরও চাপ সামলাবার ক্ষমতা তখন তার থাকে না। তখন এতোটা সামাজিক যন্ত্রণার শিকার হতে হয় সদ্য ফিরে আসা মানুষটাকে! আর যারা এই সামাজিকভাবে চাপের কাছে নতি স্বীকার করে বসেন, তারা স্তন ক্যান্সারের কোনো চিকিৎসা না করিয়েই মারা যান অকাতরে। আমাদের সমাজে চিকিৎসার চেয়েও একজন মেয়ের স্তন থাকাটা অনেক জরুরি। ফলাফল মৃত্যুকে আলিঙ্গন!  

সম্প্রতি নায়লা নাইমকে দিয়ে করানো একটি টিভিসি নিয়ে হইচই পড়ে গিয়েছিল। নায়লা নাইম বিতর্কে আমি যাবো না। নাটকের মত বিজ্ঞাপনেও থাকে চিত্রনাট্য এবং সেখানে থাকে একটি মেসেজ বা তথ্য। সেখানে কাজ করার জন্যে থাকে- ১. চিত্রনাট্যকার ২. পরিচালক ৩. প্রযোজক ৪. অভিনেতা।

mimma
মুমিতুল মিম্মা

ফলে যদি কোন চিত্রনাট্য নিয়ে কাজ করা হয় তবে সেখানে উপরোক্ত চারটা জায়গা ভালভাবে না কাজ না করলে পুরো মেসেজ কেঁচে যাবার আশংকা রয়ে যায়। ফলাফল হয় বিরূপ। ভুল তথ্য পৌঁছাবার অবকাশ থাকেযোগাযোগ মাধ্যম থেকে ঐ বিরূপ মেসেজ নিয়ে সমাজে তৈরি হয় বিরূপ মানসিকতার লোক।

এবার আসি নায়লার অভিনয় নিয়ে। নায়লা নিজে একজন পর্নস্টারকোন মডেলই নিজে থেকে কোন এক্সপ্রেশন দেন না, তাকে যা করতে বলা হয় তিনি তাই-ই করে থাকেন। তাকে নিয়ে যারা কাজ করতে চান, বা তাকে যারা নির্বাচিত করে থাকেন তাদের নিজেদের বোধের জায়গা কতটুকু সেটার ভাবনার বিষয়। যে কেউ ভালো কাজ করতেই পারেন। কিন্তু নায়লা না জানে সঠিক উচ্চারণ, না জানে অভিনয়। ন্যূনতম যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও নায়লাকে দিয়ে যারা কাজ করাবার কথা ভাবেন তাদের মানসিকতাটা সবার আগে বোঝা জরুরি।

বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির সরাসরি অনুদানে চেকমেটস তৈরি করে বিজ্ঞাপনটি। বিজ্ঞাপনটি বাংলাদেশের মানুষের মনে সাড়া ফেলতে পেরেছে ঠিকই। তবে সেটা নায়লা অভিনীত বিজ্ঞাপনের যৌনতার জোরে। আদতে সেখানে “দেখবেন, ধরবেন, চেক করবেন” বলে হালকা চালে ক্যান্সারের মতো একটা ভয়াবহ ব্যাপারে “আপনাদের মধ্যে কে হবেন আমার চেকমেট?” বক্তব্যটা দিয়ে যৌনতার মেসেজ দিয়েছেন পরিচালক।

যৌনতার বিপক্ষে কেউই নই। কিন্তু সচেতনতা প্রসঙ্গে প্রতি বছর তৈরি হওয়া ২০০০০ হাজার স্তন ক্যান্সার রোগীর সংখ্যার ভয়াবহতাকে প্রকাশ করাটাই কী যুক্তিসঙ্গত ছিল না? মশাই, সবকিছু এতো সহজেই “দেখবেন, ধরবেন, চেক করবেন” বললেই “বিট করতে” পারা যায় না।

মাথা একটা দিয়েছেন ঈশ্বর, ওটার ভেতরে নাকি মগজও আছে। সেগুলো একটু নেড়ে চেড়ে দেখুন প্লিজ!

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.