বিয়েটা যেন হয় ভালো লাগার, স্বকীয়তা বিকিয়ে নয়  

বিথী হক: আমার দূর সম্পর্কের মামাতো বোন। বিদেশ থাকে, দেখতে-শুনতে সুন্দরী। খুব স্মার্টও বটে! যেমন বাংলা বলে, তেমনি বলে ইংরেজি। যেকোনো ছেলের মাথা ঘুরিয়ে দিতে পারে এমন ব্যক্তিত্ব তার। বেশ কয়েকবার দেশে এসে আমার সঙ্গে ঘুরে বেরিয়েছে। আমরা ফুচকা খেয়েছি, গল্প করেছি, হেঁটে বেরিয়েছি। ধর্ম নিয়ে তার বিশেষ আগ্রহও যে আছে এমনটিও মনে হয়নি তাকে দেখে, বা থাকলেও তার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয় এমন পর্যায়েই ছিল।

তো কয়েকমাস আগে জানালো সে বিয়ে করছে, পাত্র তারই পছন্দের। শুনে খুশি হলাম, পাত্রকে আমি চিনিও একটু আধটু।

bithy-7
বিথী হক

তারপর বিয়ের মাসখানেক পর আমার সঙ্গে কথা বলার জন্য ভিডিও কলে আসলো। আমি তো তাকে দেখে চিনতেই পারছি না, হা করে তাকিয়ে আছি তার দিকে। এ আমি কাকে দেখছি, চিনতেই কষ্ট হচ্ছে। আর চিনবোই বা কী করে, এ যে আমার সে জন নয়।

হাফ-প্যান্ট আর বড় গলার টি-শার্ট পরে যে আমার সঙ্গে দূর দেশ থেকে চোখের সামনে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দিতো, সে আর আজকের মাথাবন্ধ-হিজাব আর তার উপর ওড়না পরা এতো একই মানুষ নয়। এর কথাবার্তার ধরনও বদলে গেছে। আগে আমরা ক্যারিয়ার, স্বপ্ন, সিনেমা, দর্শন নিয়ে কথা বলতাম, আর এখন সে আধা ঘন্টা কথা বললে ২০ মিনিট শুধু কবে বিয়ে করবো, এত দেরি করছি কেন বিয়েতে, এসব প্রসঙ্গেই কেটে যায়। আর বাদবাকি সময় এলাকার কার কী অবস্থা, কী করছে, কোথায় আছে, সেসব বিষয়ে।

এ গেল মাত্র একটা ঘটনা, এরকম পরিচিত মোটামুটি অর্ধশত নারী দেখলাম যারা বিয়ের আগের আর বিয়ের পরের দুটো সত্ত্বার সাথে নিজের অস্তিত্বের সহাবস্থান রক্ষা করতে পারেনি। যদিও আমি জানি না বিয়ের পর তাদের স্বামীরা কি করছে। তবে আর যাই হোক কাওকে অবশ্য শার্ট-প্যান্ট ছেড়ে দাড়ি, টুপি আর জোব্বা পরে ছবি দিতে দেখিনি, এমনকি স্বচক্ষেও এসব কাপড় চোপড় পরতে দেখলাম না কখনো।

নারী অধিকার নিয়ে কথা বলা মানুষগুলোকেও যখন দেখি বিয়ে করা মাত্রই আপাদমস্তক বদলে যায় তখন খানিকটা হতাশা নিয়েই ভাবতে থাকি, এমন সভ্য, শিক্ষিত নারীরাও যদি ব্যক্তিত্ব সংকটে পড়ে মোমের পুতুল হয়ে যায় তো, অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষিত, পিছিয়ে পড়া নারীদের কী অবস্থা হয়? তারা তো হ্যাঁ, না কোনটাই বলতে সাহস পায় না। তাহলে এতোদিন শুধু নারী অধিকার নিয়ে কথা বলে যাদেরকে অধিকার নিয়ে সচেতন করতে চেয়েছি, তারা আসলে আধিকার বলতে কী বুঝেছে? কতোটা বুঝেছে?

তারা কী বুঝেছে অধিকার মানে নিজেরটা নিজেকেই বুঝে নিতে হবে? নিজের দেহ ও মনের উপর মানুষের নিজের যতটা অধিকার রয়েছে, ততোটা অধিকার কারো নেই? বুঝেছে কি নিজের যা ভাল লাগে না সেটা অনুরোধের ঢেঁকি গিলে বদহজম হয়ে মরে পড়ে থাকলেও কারো কিচ্ছু যায় আসে না!

আমি হয়তো খানিকটা জানি, তারা বোঝেনি। কিন্তু সভ্য, শিক্ষিত নারীরা তো বুঝতো; না বুঝলেও অন্তত বুঝে থাকার ভান করতো। তাদের অন্যের কথায় উঠতে, বসতে তো বিস্তর আপত্তি ছিল। তাহলে হঠাৎ এতোখানি বদলে যাওয়ার কারণ কী হতে পারে?

marriage-1-“ভালবাসা?” ভালবাসা এতোই তীব্র হয়ে যায় যে নিজের সমস্ত ভাল লাগা ছেড়ে নিজেকে বেমালুম বদলে ফেলতে হবে? তাও না হয় হতেই পারে মানলাম, কিন্তু এই ভালবাসা কেন শুধু নারীদেরই বাসতে হবে? পুরুষরা কি ভালবেসে নারীদের পছন্দের পুরুষ হতে পারে না? নাকি তাদের কারো ভালবাসা পাওয়ার  প্রয়োজন নাই? তারা যে পুরুষ, ভালবাসার জন্য এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর আর কিছু হতে পারে না।

আমার পরিচিত আরেকজন নারী যার নিজের ব্যবসা আছে, বাপ-মায়ের টাকা দিয়ে সে চলে না। তাকে মনে মনে সমীহ করতাম। হঠাৎ একদিন তার স্ট্যাটাসে, আর মাত্র কয়েকদিন পর আরেকজনের লাস্ট নেম/টাইটেল নেবে এমন বিয়ের একটা ঈঙ্গিত পেলাম। কারো হয়ে যাওয়া মানে দাসখত লিখে তার দাস হয়ে যাওয়াটা ঠিক কতখানি সম্মানজনক হতে পারে, তা ভাবতে থাকলাম!

এটাকে যদি শুধুমাত্র ভালবাসার দোহাই দিয়ে বৈধকরণ করা হয়, আর এমন ভালবাসাই যদি থাকে, তাহলে কোন পুরুষই কি কোন নারীকে এতখানি ভালবাসেনি যে নারীর লাস্ট নেম/টাইটেল নেওয়ার কথা ভাবতে খুব ভাল লাগেনি তাদের? যদি নাই লাগে, মানে পুরুষ যদি মনে করে ভালবাসলেই আরেকজনের লাস্ট নেম নিতেই হবে এমন কথা নেই বা ভালবাসার সাথে অন্যের নাম জড়ানোর কোনো সম্পর্ক নেই, তাহলে নারীরা কেন এমনটা ভাবতে পারে না? ভালবাসাটাকে ভালবাসার পর্যায়ে না রেখে মানসিক দৈন্যতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলে যে কেউই যে এই দৈন্যতার সুযোগ নিয়ে নিজেকে দেবতারূপে প্রতিষ্ঠিত করবে এই সহজ সত্যটা বুঝতে নারীদের আর কত যুগ লাগবে?

দুটো মানুষ একসঙ্গে বসবাস করবার মত একে অপরকে যথেষ্ট পরিমাণ ভালবাসলে বা টান থাকলে বিয়ে করতেই পারে। তবে সেই ভালবাসাটায় শুধু চোখ, মুখ, হাত, পা না দেখে মানসিক অবস্থা জেনে নেওয়াটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যে যেমন তাকে সেভাবেই মেনে নিয়ে ভালবাসতে না পারলে শুধুমাত্র বিয়ে করার উদ্দেশ্যে বিয়ে করে বোরখা-হিজাবসহ যাবতীয় শৃঙ্খলসমূহের যথোপযুক্ত ব্যবহারে মানুষের হীনতা ছাড়া আর কিছু প্রকাশ পায় না এ কথা কে, কাকে, কবে, বোঝাবে?

“বিয়ে দাও সব ঠিক হয়ে যাবে” এমন তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে প্রতিদিন কত শত নর-নারীর বিয়ে হয়ে যায়। সেখানে এমন তত্ত্বের শিকড় সমাজের তলায় যে গেড়ে বসে আছে, সেটা বুঝবার জন্য আইনস্টাইন হতে হয় না।

বাবা-মায়ের সম্বিৎ ফিরে আসুক, সচেতন হোক সকল নারী-পুরুষ। নিজেদের প্রয়োজনে, নিজেদের ভালো রাখার উদ্দেশ্যেই বিয়ে। আরেকজনকে বন্দী করে নিয়ে আসা বা বাঁধা-ধরা জীবনের উদ্দেশ্যে বিয়ে নয়। নারী-পুরুষ একজন আরেকজনের সঙ্গী হোক, কেউ প্রভু আর কেউ ভৃত্য নয়।

শেয়ার করুন:
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
    4
    Shares

Women Chapter এ একেকজন একেক রকম তথ্য দেন। কেউ বিয়ের পক্ষে, কেউ বিয়ের বিপক্ষে কেউ বা বলছে সংসার টিকিয়ে রাখতে যোগ্যতা লাগে ইত্যাদি। যার যার দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটছে। ভালো লাগে নারীরা স্বাধীনভাবে ভাবছে। নারীর মনোজগতের পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। সুনির্দিষ্ট message থাকা দরকার।

Apnar kother Sathe ekmot holam nah. Kuno ek dhormer proti Apnar moner ontornihito clash ei lekhay unmochitoh hoyese(amar mone holo) . Nari adorsho nari shadhinotay bishshasi nari badi kontho je Kuno ek dhormer proti elarji te bughe ta ekhon nitto noimottik bepar. Anpnio tar uddhe non(mone hold) . Asha Kori bobissote begum rokeya shakhawat hossain er moto kauke pabo jini shadhinota shudhu baizzik pokasher upor nirvor kore nah ei beparta bujte ebon bujhate pare.je ghotona bollen er biporit o ghote tar adomshumari je beshi ta bujte ki ainestain hote Hoy kina jana nai. Jara tader onichsay tader baizzik aboron poriborton kore tader belay bhinno. Valo thakben

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.