ধর্ষণ যখন বিনোদন-অপরাধ  

ফারহানা আনন্দময়ী:

সমস্যা আসলে গোড়াতেই, অর্থাৎ সমাজবদ্ধ পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে। এ সমাজের অধিকাংশ পুরুষই ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে না। তাদের দৃষ্টিতে এটা একটা বিনোদন।

ধর্ষণ হলো যৌনতাড়িত ধর্ষকামি পুরুষের বিনোদনের একটি বিকৃত মাধ্যম। আমি নিশ্চিত আমাদের সমাজে অনেক পুরুষ আছেন, যারা খবরের কাগজে কোনো ধর্ষণের খবর, তার বিস্তারিত বর্ণনা একাধিকবার পড়েন শুধু এক বিকৃত আনন্দলাভের জন্যে।

যে সিনেমায় ধর্ষণদৃশ্য আছে, সেটি টিকেট কেটে তারা বারবার দেখতে যান শুধু ওই একটি বিশেষ দৃশ্য দেখার জন্যে। এখন বলুন তো, তারাও কি ধর্ষণ না ক’রেও ধর্ষক নন ? এই চিরউত্থিত পুরুষদেশে কে ধর্ষক নন? নারীইচ্ছের বিরুদ্ধে বা নারীসম্মতি ছাড়া যৌনসম্ভোগকে যদি ধর্ষণের সংজ্ঞায় ফেলি তো এই দেশের শতকরা ৮০ভাগ গৃহস্বামীও তার স্ত্রীর ধর্ষক!

আজ আবার এই বিষয়টি সামনে চলে এলো, কারণ কয়েকদিন আগে পার্বতীপুরে দুই মধ্যবয়সী পুরুষ ৫ বছরের এক শিশুকন্যাকে ঘরের মধ্যে আটকে রেখে ধর্ষণ ক’রে ফসলের মাঠে মধ্যে ফেলে রেখে গেছে। শিশুটি এখন জীবনের জন্যে মৃত্যুর সাথে লড়ছে হাসপাতালে।  এইসব পুরুষদের চোখে ৫ বছর বয়সী শিশুকন্যা থেকে পঞ্চাশোর্ধ্ব নারী…সকলেই কেবল ভোগের বস্তু। নারী তাদের কাছে কোনো  মনুষ্যপ্রাণী নয়, বস্তু কিংবা খাদ্য।

এই পৃথিবীতে বিনোদনের কত মাধ্যম আছে, আনন্দ খুঁজে নেয়ার কত উপকরণ আছে… প্রকৃতি আছে, বই আছে, সঙ্গীত আছে, চিত্রকলা আছে, নাটক-সিনেমা আছে, দেশভ্রমণ আছে, আড্ডা আছে, রেস্তরাঁ আছে… কতকিছু। অথচ এই আধুনিক যুগে পৌঁছেও কিছু মানুষ এখনও সেই আদিমই রয়ে গেছে। তাদের কাছে বিনোদনের একমাত্র উৎস যৌনতা, এবং সেই যৌনতা পুরোটাই অবদমনে ভরা

anandomoyee-2
ফারহানা আনন্দময়ী

না, আমি যৌনতার বিরুদ্ধে কখনোই নই, প্রকৃতিতে যৌনতা খুব স্বাভাবিক একটা অনুষঙ্গকিন্তু সেই যৌনতাকে কিছু সংখ্যক মানুষ জীবনযাপনের একমাত্র বিনোদনের বিষয় ক’রে তোলে। আমার তাদের জন্যে করুণা হয়। সুন্দর এই জীবনটায় সৃষ্টিশীল কিছুই তারা উপভোগ করলো না, ঘরে বসে পর্নোগ্রাফি দ্যাখা, আর পথে বেরিয়ে অনাত্মীয় অপরিচিত নারীকে শারীরিকভাবে উৎপীড়ণেই  তাদের সকল পুলক, সকল বিনোদন এই যৌণনিপীড়ণ যখন প্রকাশ্য হয়ে কোনো গুরুতর ঘটনায় রূপ নেয় তখন যেন হয়ে ওঠে বিনোদন-অপরাধ।

ধর্ষণ যে শাস্তি হিসেবে মৃত্যদণ্ড পাওয়ার মাত্রার একটি অপরাধ তা কিন্তু তাদের আচরণে আপনি-আমি বুঝবো না। এবং এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজও কিছুতেই তা বুঝতে দেয় না। একটি ধর্ষণের ঘটনায় এই পুরুষদেশে সমাজবদ্ধ পুরুষ এবং পুরুষতন্ত্রের ধারক কিছু নারীর আঙুল ধর্ষণের শিকার নারীটির দিকেই কেবল নির্দেশিত থাকে।

ধর্ষণ ক’রে পুরুষটি নয়, যেন অপরাধটি নারীই করে ফেলেছে। কেন নারী ওড়না গলায় ঝুলিয়ে বেরোলো, কেন সন্ধ্যার পরে একা বেরোলো, কেন তার একাধিক পুরুষ বন্ধু ছিল… তাদের চোখে ধর্ষণ ঘটার পক্ষে এগুলো যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত কারণ।

এরপরে শুরু হয় ধর্ষিতাকে মানসিক চাপে ফেলা…সমাজ-পরিবার কেউ বাদ যায় না। ধর্ষিত হওয়া মানেই যেন তার সম্ভ্রমহানি হলো। নারীর সম্ভ্রম যেন শরীরের একটি অংশ। এ সমাজে আর তার মুখ দেখানো যাবে না, মাথা সারাজীবনের জন্যে নীচু হয়ে গেল। ঘটনার শিকার নারীটিকে অপবিত্র-অশুচি ট্যাগ লাগিয়ে হীনমন্যতার চূড়ান্ত পর্যায়ে ডুবিয়ে দেয়া হয়… যা তাকে আত্মহননের দিকে প্ররোচিত করে। আর এই কাজটি সবচেয়ে বেশি সুচারুভাবে সম্পন্ন করে তার কাছের মানুষেরাই। এই প্রসঙ্গে মনে করে পড়লো ঋতুপর্ণা অভিনীত ‘দহন’ কিংবা রেখা অভিনীত ‘ঘর’ সিনেমাটি। একজন ভিক্টিমের প্রাত্যহিক জীবনকে কেমন দুর্বিষহ ক’রে তোলে পরিবারের মানুষেরা!  বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা এর থেকেও কঠিন এবং ভয়ঙ্কর।

এতোসব দেখেশুনে সম্ভ্রমহানির সংজ্ঞা আমি নিজের মতো ক’রে শিখে নিয়েছি। শিখেছি, আসলে শারীরিকভাবে নারীর সম্ভ্রমহানি ব’লে কিছু ঘটেই না। কারণ জেনেছি, নারীর সম্ভ্রম তার যোনীতে জমা থাকে না। সম্ভ্রম ব’লে যা থাকে তা তার আত্মপরিচয়ের একটি অংশ, শরীরের অংশ নয়।

আমি সেই মায়েদের একজন, যারা তার কন্যাসন্তানকে স্পষ্ট করে বলতে পারি, “চিরউত্থিত এই পুরুষদেশে তুমি যে কোনো পরিস্থিতিতেই ধর্ষণ নামক এই উৎপীড়ণের শিকার হতে পারো। যতটুকু সম্ভব প্রাথমিক আত্মরক্ষার কৌশলটা জেনে রেখো। যদি তাতেও নিজেকে রক্ষা করতে না-পারো, মানসিক ধকলটা সামলে ওঠো এবং এরপরের লড়াইটা জারি রেখো। অর্থাৎ ধর্ষকের বিরুদ্ধে আইনগত লড়াই।

কিচ্ছু হয়নি তোমার, মেয়ে। শরীরের অশুচি ব’লে কিছু নেই। তুমি আমার কাছে সেই মেয়েটিই আছো, এই ঘটনা ঘটার আগে যা ছিলে। জীবন এতো ফেলনা নয় যে একটা ধর্ষণের ঘটনায় গোটা জীবন অর্থহীন হয়ে যাবে। বেঁচে ওঠো, শক্তি ধরো, ধর্ষকের শাস্তি নিশ্চিত করার লড়াইটা জারি রাখো … মা আছি তোমার সঙ্গে।”

সমাজের মানুষের কাছে একটাই অনুরোধ, পূজাদেরকে বেঁচে উঠতে দিন। শুধু শারীরিক বেঁচে ওঠা নয়, সামাজিকভাবে পূজাদেরকে বেঁচে উঠতে সাহায্য করুন। ওদেরকে সাহস দিন, সহমর্মী হয়ে  হাতটা ধরে রাখুন শুধু। এই ট্রমা থেকে বের হতে তাকে মানসিক ছায়া দিন। ধর্ষিতার পরবর্তী জীবনযাপনকে স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করুন। আর ধর্ষককে জঘন্যতম অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে, শাস্তি নিশ্চিতের লড়াইয়ে সামিল হোন, অন্য পুরুষেরা জানুক ধর্ষণ কোনো বিনোদন-অপরাধ নয়।  

আমরা এখন থেকে বুঝতে শিখবো, জানবো, একটি ধর্ষণের ঘটনায় ধর্ষিত নারীটির কোনো সম্ভ্রমহানি হয়নি, সম্ভ্রমহানি হয় সমাজব্যবস্থার, সম্ভ্রমহানি হয় এই সমাজে বসবাসকারী ধর্ষক পুরুষজাতির। ওদের সম্ভ্রমহানির গ্লানিতে লজ্জিত হতে শেখো সমাজের বাকি পুরুষ, যারা প্রকাশ্য ধর্ষণ না ক’রেও মনে মনে ধর্ষক… লজ্জায় মাটির সঙ্গে মিশে যাও তোমরাও 

শেয়ার করুন:
  • 172
  •  
  •  
  •  
  •  
    172
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.