আপন আয়নায় যখন সবাই ইমেলদা মার্কোস

মনিজা রহমান, নিউইয়র্ক থেকে: ঢাকায় আমার পড়শী এক বয়স্ক নারী একটা মজার ছড়া বলতেন। ছড়াটা প্রায়ই মনে হয়। আর মনে মনে হাসি। ছড়াটা এইরকম-

‘মাটি হল খাঁটি

সোনা হল আধা

আর কাপড় কেনে গাধা।’

মানে যে টাকা জমিয়ে জমি বা বাড়ী কেনে সে হলো সবচেয়ে বুদ্ধিমান। আর সোনা কিনলে আধাআধি বুদ্ধিমান। আর গাধারাই শুধু কাপড় কিনে টাকা নষ্ট করে। বলা বাহুল্য যে আমি সেই গাধার দলে।

monija-3
মনিজা রহমান

নিউ ইস্কাটনের হাফিজাবাদ কলোনীর এক বাসায় থাকতেন উনি। ওনার ফ্ল্যাটের পাশেই আমার এক জুনিয়র ফ্রেন্ড বাসার মধ্যে  থ্রিপিস, শাড়ি, বেডশিট, জুয়েলারি বিক্রি করতো। পাশেই বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল। ছেলে-মেয়েদের স্কুলে দিয়ে আমরা মাঝে মাঝে দলবেঁধে ওই বাসায় যেতাম। কোনো চাহিদা না থাকলেও কাপড় কিনতাম। না কিনলেও উল্টে-পাল্টে দেখতাম। বাকিতে নেবার সুযোগ ছিল বলে যেকোনো সময় কিনে ফেলা যেত।

তিন পার্টওয়ালা আলমারি, ওয়ার্ডড্রোব সর্বত্র কাপড় উপচে পড়তো। তবু মনে হতো বাইরে পরার মতো ভালো কোন পোষাকই নেই। গাউসিয়া-চাঁদনী চকে যেতাম প্রতি সপ্তাহে। যাওয়া মানেই দুই-তিনটা ড্রেস বা ড্রেসের কাপড় কেনা। আসার সময় সেগুলো টেইলার্সে দিয়ে আসতাম। টেইলার্স থেকে পরের সপ্তাহে ড্রেস আনতে গিয়ে আবার নতুন কাপড় কিনতাম। আবার বানাতে দিতাম। এভাবে চলতেই থাকতো চক্র। থামাথামি নেই।

অফিসে নিত্যনতুন ড্রেস পরে দেখানোর সেকী আকুল বাসনা। যারা চাকরি করে না, তাদের দেখানোর জায়গা সন্তানের স্কুল গেটের আড্ডা, আত্নীয়-বন্ধুদের নানা অনুষ্ঠান ইত্যাদি। আমাদের মতো বাঙ্গালী মেয়েদের স্বামী-সন্তানসহ একটা নিরাপদ-স্বচ্ছল জীবন নিশ্চিত হবার পরে আর তেমন কিছু করার থাকে না। বাঙ্গালী স্বামীদের বেশীরভাগই স্ত্রীকে ত্যাগ করার কথা সাধারণত ভাবে না। তারা প্রথম বিয়ে করা স্ত্রী আর ছেলেমেয়েদের নিয়ে একটা জীবন পার করে দিতে চায়। অনেকে আবার কষ্টার্জিত অর্থে বউয়ের জন্য বাড়ী কেনে, ফ্ল্যাট কেনে। স্বামীর কথামতো চলতে পারলে বাঙ্গালী নারীদের জীবন তাই মোটামুটি নিশ্চিন্ত বলা যায়।

আমেরিকান মেয়েরা এদিক থেকে বেশ অনিশ্চয়তায় ভোগে। তারা স্লিম থাকতে, বয়স ধরে রাখতে পার্কে-ফুটপাতে জগিং করে, ফিটনেস সেন্টারে গিয়ে ঘাম ঝরায়। এই চর্চাটা এখানে বাঙ্গালী মেয়েদের মধ্যেও কম। তারা সকালে সন্তানকে স্কুলে দিয়ে স্থানীয় গ্রোসারি শপে গিয়ে বাজার করে। তারপর রান্না-বান্না চলে সারাদিন। প্রচুর খাওয়া দাওয়া হয়। স্বাস্থ্য নিয়ে অত চিন্তা নেই। সেতো জানেই বিয়ে যখন হয়েছে, স্বামী তো আর ছেড়ে যাবে না।

ছুটির দিনে সবাই বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোর যেমন মেসি, গ্যাপ, ওল্ড নেভি, জেসি পেনিতে ভিড় জমায়। কোন সেল থাকলে তো কথাই নেই। যেদিকে তাকাই, সেদিকে বাঙ্গালী। জ্যাকসন হাইটস-জ্যামাইকার মতো বাংলাদেশী অধ্যুষিত এলাকায় বাঙ্গালী, ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানী দোকানগুলিতেও সবসময় বাঙ্গালী নারীদের ভীড় লেগে থাকে। আমি নিজেও যাই। কোনো প্রয়োজন নেই। তবু কিনি। মনে মনে নিজেকে প্রবোধ দেই, জীবনে তো আর কোন নেশা নেই। এই কাপড় কেনাটাই একমাত্র নেশা। আর নেশার পিছনে তো একটু অপচয় হবেই।

আগে যখন ঢাকায় থাকতাম, কোথাও বেড়াতে যাবার সময় গৃহকর্মীদেরও নিয়ে যেতাম। নয়তো বাচ্চাদের সামলাবে কে? এখন তো কোথাও গেলে এক মিনিটের জন্য ছোট ছেলের হাত ছাড়ার সুযোগ নেই। ওদের ব্যাগ গোছাতে বললে দেখতাম, দশ মিনিটে হয়ে গেছে। আর আমার লাগেজ গোছানো শেষই হয় না। ড্রেসের সঙ্গে ম্যাচিং করে জুতা, জুতার সঙ্গে ম্যাচিং করে পার্স, তার সঙ্গে জুয়েলারি..কত কী! খেলোয়াড়রা বিদেশে খেলতে গিয়ে শপিং করে, এই নিয়ে আর রিপোর্ট কী করবো, নিজেরাই তো বিদেশে খেলা কভার করতে গিয়ে শপিং করতাম দুই হাতে।

আমার গৃহকর্মীর ব্যাগ গোছাতে দেরী হত না, কারণ ওদের বাসায় পরার জন্য দুই বা তিনটা পোষাক থাকতো। আর বাইরে পরার জন্য ভালো পোষাক একটি বা দুটি। আমাদের আগের দিনের মানুষরাও এমন ছিল। যতক্ষণ পরনের শাড়ি না ছিঁড়তো, তারা নতুন শাড়ি কিনতো না। আর আমাদের যুগে পোষাক তো ছেঁড়ার সময়ই পায় না। তার আগেই ফ্যাশনের পরিবর্তন হয়। লম্বা কামিজ খাটো হয়, খাটো কামিজ কয়দিন পরে লম্বা হয়ে যায়! একটা শাড়ি হয়তো তার পুরো জীবনে এক কি দুইবার ব্যবহৃত হওয়ারও সুযোগ পায় না!

তবে শাড়ি না ছিড়লে কিনবো কেন? ওই যে ফ্যাশন পরিবর্তন। আরও আছে একটা শব্দ- ‘ব্র্যান্ড’। পাঁচশ টাকার জিনিসকে পাঁচ হাজার টাকা বানিয়ে দেয়। উনি অমুক ব্র্যান্ড ছাড়া পোশাক পরতে পারেন না, তমুক ব্র্যান্ডের জিনিস না হলে তার রুচিতে বাঁধে।

এভাবে কৃত্রিম চাহিদার সৃষ্টি হয়। আমরা হয়ে গেছি পণ্যের দাস। আপন দর্পণে একজন ইমেলদা মার্কোস। যার তিন হাজার জুতার বিশাল সংগ্রহ ছিল। তাও আবার প্রত্যেকটি রত্নখচিত। আমাদের মধ্যেও এমন অনেকে আছেন, যার বাসার ক্লোজেট, আলমারি, ওয়ার্ডড্রোব উপচে পড়া শাড়ি-জামা বেডরুমের ফ্লোরে স্তূপিকৃত। এত কাপড় যে রাতে শোয়ার জায়গা নেই। নিউইয়র্কের ছোট্ট ভাড়া বাসায় ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই দশা। তবু কাপড় কেনার নেশা ছাড়ে না।

১৮ অক্টোবর, ২০১৬, নিউইয়র্ক

 

(ঝর্ণার জলের কারাগার)

 

শেয়ার করুন:
  • 28
  •  
  •  
  •  
  •  
    28
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.