নায়লা নাইম ও স্তন ক্যান্সারের নির্দয় প্রচারণা

সাবিনা শারমিন: আপনারা কেউ এ সময়ের বহুল আলোচিত মডেল নায়লা নাইমের স্তন ক্যান্সার সংক্রান্ত বিজ্ঞাপনটি দেখেছেন? কী মনে হয়েছে আপনাদের? একে কি সচেতনতামূলক মনে হয়েছে? নাকি নায়লা নাইমের স্বভাবসুলভ শরীর প্রদর্শনেরই আরেকটি প্রকাশ মনে হয়েছে?

স্তন সকল প্রাণীকুলের অন্যান্য অঙ্গের মতোই একটি অঙ্গ। তা সে পুরুষ হোক আর নারীই হোক। তবে স্তন যৌন প্রক্রিয়ার অংশ হলেও আমাদের সমাজ ,সংস্কৃতি নারীর স্তনকে মানব শিশুর খাদ্যের চেয়ে এটিকে যৌনfঙ্গ হিসেবে দেখতেই বেশী আগ্রহ এবং উত্তেজনা বোধ করে। জানি না অন্যান্য প্রাণীকুলের মধ্যে পুরুষ পশুরা নারী পশুদের স্তনকে শুধু যৌন অঙ্গ হিসেবে দেখে, নাকি নিতান্তই একটি অঙ্গ হিসেবেই বিবেচনা করে। যদিও নারীর স্তন যুগলের সৌন্দর্যের বর্ণনায় কাব্য রচিত হয়েছে যুগে যুগে। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, শরীরের অন্যান্য অঙ্গের অসুস্থতার মতোই মানুষের স্তনেও ক্যান্সার বাসা বাঁধে খুব স্বাভাবিকভাবেই।

naila-1কিন্তু ধর্মীয় ,সামাজিক সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি, প্রথাগত কারণে এই বিশেষ অঙ্গটিকে যৌন অঙ্গ হিসেবে দেখতে দেখতে এর রোগকেও একটি নিষিদ্ধ যৌন রোগ বলেই বিবেচিত করে আসছে কিছু অনগ্রসর মানুষ। আর ত্রুটিপূর্ণ মানসিকতা এবং অজ্ঞতার কারণে বেশীরভাগ মানুষই মনে করে এটি শুধুমাত্র নারীর রোগ। বাস্তবতা হচ্ছে ব্রেস্ট ক্যান্সারে পুরুষরাও আক্রান্ত হতে পারে।

নারীর স্তন এর আকার স্ফীত হওয়ার কারণে এ অংশে ক্যান্সার সহজে দানা বাঁধে । তাই যে সকল পুরুষের বক্ষাদেশ নারীর স্তনের আকারের মতো স্ফীত, তাদেরও এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে তার শতকরা হার নারীর তুলনায় নগণ্য। কিন্তু আমাদের দেশে পুরুষের ব্রেস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি এখনো অনেকেরই অজানা। তাই প্রচারণার জন্যে প্রয়োজন পড়ে শুধু একজন নারী।

সেই সূত্রেই নায়লা নাইমের স্তন ক্যান্সার সচেতনতার উপর করা বিজ্ঞাপনটি চোখে পড়ে। চেকমেট নামের একটি ব্রেস্ট ক্যান্সার ক্যাম্পেইনে তিনি ব্রেস্ট ক্যান্সার চেকঅাউট করার কথা বলে পেছন থেকে শার্ট খুলে ফেলার ভঙ্গিমা নিয়ে যেভাবে সম্মুখভাগে ঘুরছিলেন এবং পোশাক খুলে ফেলে স্তন প্রদর্শনের আকস্মিক ক্যারিশমা দেখাচ্ছিলেন, তাতে সেটি ব্রেস্ট ক্যান্সারের মতো একটি প্রাণঘাতী রোগের সচেতনতা বিষয়ক প্রচারণা তা মেনে নেয়া দু:সাধ্য। এটি একটি অরুচিকর, অমানবিক, নোংরা এবং পণ্য বাজারজাতের একটি অসুস্থ প্রচারণা বলেই মনে হচ্ছে। সেই সাথে স্তন ক্যান্সারের সচেতনতা বিষয়ক প্রচারণা চালাতে গিয়ে এখানে নারীর শরীরকে একরকম এবিউজই করা হয়েছে। যা দেখে মনে হচ্ছিলো এটি হিন্দি ছবির আইটেম গানের অংশ বিশেষ। যেখানে নারীর শরীরকে পরোক্ষভাবে প্রদর্শন করে দর্শকদের এক ধরনের যৌন সুড়সুড়ি দেয়ার সূক্ষ্ম কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। যা সুচতুরভাবে নারীকে অবমাননাই করা হয়েছে।

naila-2বিজ্ঞাপনে নারীর সৌন্দর্য ব্যবহার করা হয়, এটি যুগে যুগে চলে আসছে, কিন্তু তাই বলে এখন আর বিজ্ঞাপনে শুধু নারীরাই অংশগ্রহণ করছে না। পুরুষ এবং শিশুরাও অংশগ্রহণ করছে। ব্রেস্ট ক্যান্সার যেহেতু নারী -পুরুষ উভয়েরই হয়ে থাকে, সেহেতু উভয়কেই এখানে প্রদর্শন করা যেতো। সেখানে কারো চেহারা বা শরীর প্রদর্শন খুব জরুরি ছিলো না।

তাছাড়া যে তিনটি স্টেপসের কথা বলা আছে সেখানে ব্রেস্ট ক্যান্সার ডায়াগনোসিস করার পরীক্ষা ম্যামোগ্রাম এর মত স্ক্রিনিং পরীক্ষা সম্পর্কে কিছুই উল্লেখ করা হয়নি, যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি টেস্ট। তাছাড়া ব্রেস্ট ক্যান্সারের সম্ভাবনা পরখ করার জন্যে কোন পদ্ধতিতে নিজে নিজে স্তন পরীক্ষা করা যায় সে সম্পর্কেও কিছু বলা হয়নি।

প্রতিষ্ঠানের পণ্য ব্যবসা সফল করে বিপণনের জন্য যারা এ ধরনের বিজ্ঞাপন প্রচার করলেন, তারা কিসের সচেতনতা বাড়াচ্ছেন? এখানে বিজ্ঞাপনের নৈতিকতা বিষয়ক কোনো নীতিমালা আদৌ আছে কি? তা কি যথার্থভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে?

নারীর শরীর পুঁজিপতির পণ্য হিসেবে অনৈতিক এবং অশ্লীলভাবে ব্যবহৃত হওয়া নতুন কিছু না। কিন্তু বিকৃত এবং নির্মম মানসিকতা নিয়ে ব্রেস্ট ক্যান্সার এওয়ারনেস এর বিজ্ঞাপনের নামে অত্যন্ত অশ্লীল এবং অমানবিকভাবে স্তন প্রদর্শনের জন্যে যে নারীরা প্রফেশনের নামে নারীর অবস্থানকে খাটো করে, তারা সমাজে কী সচেতনতা বয়ে আনবে?

sabina-sharmin-4
সাবিনা শারমিন

অবাক হতে হয় এ ধরনের একটি অসুস্থতা নিয়ে ‘বক্ষ ক্যাটওয়াক’ এর জন্যে প্রয়োজন পরে একজন দায়িত্বহীন নায়লা নাইমের। ফলে এ নিয়ে ফেসবুকে ট্রল করতেও দেখা যাচ্ছে একধরনের বিকৃত রুচির মানুষদের।

সমগ্র পৃথিবীতে ব্রেস্ট ক্যান্সার এখন মহামারী আকার ধারণ করেছে। তাই এই রোগ সম্পর্কে নারীদের পাশাপাশি ঘরের ভাই বন্ধু বাবা-চাচা-খালু সকলের এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। কারণ, ঘরের নারীরা এ রোগে আক্রান্ত হলে তা নিরাময়ের জন্যে নারীর পাশাপাশি পুরুষদেরই এগিয়ে আসতে হয় । আর তাদেরও এটি ভাবা উচিৎ নয় যে তার স্ত্রী এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে এবং পুরুষ হয়ে তিনি বেঁচে গেছেন। কারণ এটি শুধু নারীর রোগ নয়। তবে সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণে এই রোগ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। তাই রোগ হওয়ার আগেই যে ধরনের সচেতনতা গ্রহণ করলে নিরাপদ থাকা সম্ভব তা করতে গিয়ে যদি রোগ নিয়ে অশ্লীলতা প্রদর্শন করা হয়, তবে তা মানসিক বিকৃতিকেই উস্কে দেবে।

একজন ভুক্তভোগীই জানে এই পথ কতো বেদনা নিয়ে অতিক্রম করতে হয়। কেমোথেরাপির সময় একজন নারীর চুল যখন চোখের সামনে বৃষ্টির মতো ঝরতে থাকে, তখন রোগীর সাথে সাথে কাছের মানুষদের এ দৃশ্য মেনে নেয়া বড়ই পীড়াদায়ক হয়ে ওঠে। তাই সচেতনতা বাড়াতে অসচেতন, অমানবিক এবং নির্দয় আচরণ একেবারেই গ্রহণ যোগ্য নয় ।

https://www.facebook.com/checkmatefanz/videos/336989939988871/

শেয়ার করুন:
  • 8
  •  
  •  
  •  
  •  
    8
    Shares

মেধা শূন্যতা এর কারন। যে কোন বিজ্ঞাপন বা প্রচারণার একটা বড় উদ্দেশ্য শ্রোতা/দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ যা বিষয়বস্তু সাপেক্ষে কিছুটা ভিন্ন হওয়াই স্বাভাবিক। অবানিজ্যিক এবং চিকিৎসা বিষয়ে বিশেষত যেখানে মানুষের মৃত্যূর যথেষ্ট আশঙ্কা আছে সেখানে এমন রুচি বিবর্জিত প্রচারণা যে গ্রহণযোগ্য না সেটা একজন দুজনের বুঝতে সমস্যা হলেও হতে পারে, কিন্তু এই বিজ্ঞাপনের সাথে নিঃসন্দেহে জড়িত ছিল অনেক মানুষ আর সমস্যাটা সেখানেই। কারুর মনে কি সংশয় হয়নি এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে? এই বিজ্ঞাপনে বাংলা আর ইংরেজী দুই প্রকারের কথাই ছিল বিকৃত, সেই বিষয়টাও কি কারুর কানে লাগেনি? এমন সিরিয়াস একটা বিষয়ে কাজ এতটা সাবস্ট্যান্ডার্ড টিমের কাছে অর্পণই বা কার সিদ্ধান্তে হয়েছে?

আমার যে কি ভালো লাগে যখন চারপাশে সব স্বতা সাবত্রা পুরুষ দেখি.. আর স্বতী সাবিত্রী নারী দেখলে তো আরও ভালো লাগে.. গত ১৩/১৪ দিন আগে নায়লা নাইমের একটা ভিডিও বের হলো, তখন সবার মুখে মুখে একটাই কথা ছিলো.. খোল নাই ক্যান.. কবে খুলবা ? আসলেই তো ? একটা মানুষের আর কি দেখার বাকি থাকে, ওর আসলেই তো কোটি কোটি ছবি আছে প্রায় সব খোলা.. কই ওই ভিডিওর নিউজে তো কোন স্বতী সাবিত্রি নারীকে দেখলাম না প্রতিবাদ করতে ? আবার কোন স্বতা সাবত্রা পুরুষকেও দেখি নাই কোন ভাবেই প্রটেস্ট করতে.. কই তখন তো কেউ বললেন না, দর্শক তো আরও দেখতে চায় এর বিপক্ষে, একটা মেয়েকে আপনারা সর্বস্ব খুুলে দেখানোর জন্য অফার করবেন, বা খোলার অপেক্ষা করবেন, একবারও বলবেন না যে, এটা অন্যায়। হোক সে নায়লা নাঈম, কিন্তু তবুও তো সে নারী. তখন কারো এটা মাথাব্যাথা ছিলো না.. সেকেন্ড ভিডিও টা তে ওর বুক দেখে কতজন রাতের ঘুম হারাম করেছেন সে না হয় নাই বললাম.. নায়লা নাঈমের শরীর দেখার জন্যই তো সবার ব্যাপক আগ্রহ তাই না.. আর আপনাদের আগ্রহের কারনেই তো আজ সে নায়লা নাঈম.. তাকে তো ফলো করে যান, কামনা করে যান, সেগুলোর খোলা চিত্র আপনাদের দেয়া কমেন্টে প্রমাণ পায়। আমার ফ্রেন্ড লিস্টের কাউকে কাউকেও দেখেছি অপেক্ষা করতে.. বাকিরা মনে মনে . আর শেষ ভিডিও তে যখন আপনাদের আশা পুরন হলো না.. তখন আপনাদের মনে হলো ফালতু.. সেক্সুয়াল কনটেন্ট. একজন কৃষক তো তার কৃষিকাজের জন্যই পরিচিত তাই না ? সে নিশ্চই এসে ইন্জিনিয়ারিং করবে না ? তাই নায়লা নাঈম আপনাদের কাছে একটা ম্যাসেজ পৌছানোর চেষ্টা করেছে, সেটা আপনাদের খুব লেগে গেল ? ব্রেস্ট ক্যান্সার সম্পর্কে আপনি সচেতন ছিলেন এটা নিজের বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন ? আজ একটা মেয়ে যাকে আপনারা ব্রেস্টের জন্যই দেখতে থাকেন, তার মুখে সচেতনতার কথা শুনে আঁতে লেগে উঠলো ? অনেক দিন আগে কোন এক বিজ্ঞাপন দেখেছিলাম , যেখানে ক্যান্সার পেশেন্ট কে ভিডিওটা বানানো হয়েছে। বিল্ড বিউটিফুল. কই শুনি নাই তো আপনাদের অতি সেনসেটিভ আঁতের কথা। নায়লার এখানে তো কোন পেশেন্ট কে দেখানো হয় নাই। যে ওই রকম আঁতে লাগবে। আজকে যদি স্বাধীনতা নিয়ে সে কোন কথা বলত, তখন কি রাজাকারদের আঁতে লাগতো ? যাই হোক, কোন মানুষের ভালো কথা তো নিতে পারবেন না .. যদি দুই একজনও এই ভিডিও থেকে বিষয়টা মনে রেখে তার পার্টনারের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে সেটাই স্বার্থকতা.. নিশ্চই ইন্টারনেট ব্যবহারকারী সবাই এমন ইনসেন্সিবল না…

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.