গ্রাম কিংবা শহরে, নারীর লড়াই চলবেই

মনীষা বিশ্বাস: আজ থেকে প্রায় ১৮-২০ বছর আগের কথা। তখন দিনাজপুরের রুদ্রপুর গ্রামটি ছিল বিদ্যুতবিহীন। তখনও যমুনা সেতুর কাজ শেষ হয়নি, ঢাকা থেকে ওখানে পৌছাতে প্রায় ১২ ঘন্টা লেগেছিল – ফেরী পারাপার যেন অন্তহীন অপেক্ষার নাম।

গ্রামের সবাই বলাবলি করতো ঐ সেতুটা হয়ে গেলে ঢাকা থেকে ৪-৫ ঘন্টায় যাওয়া আসা করা যাবে। একটা গবেষণার কাজে টানা দুই মাস কাটানো ছিল আমার তখনকার জীবনের সবচেয়ে বিশাল অভিজ্ঞতা। ছোটবেলা থেকে শহরে বেড়ে ওঠা আমার গ্রামের সাথে প্রত্যক্ষ পরিচয়ের সুযোগ ছিল খুবই কম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী হিসাবে আর পরবর্তীতে মাঠ গবেষণার মাধ্যমেই বাংলার গ্রামীণ জীবনযাত্রা ও জনপদের সাথে নিবিড় যোগাযোগ ও সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। তখন আজকের মতো মোবাইল ফোনের চল হয়নি। ঢাকায় নিজের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করার একমাত্র উপায় ছিল চিঠি, অথবা দিনাজপুর শহরে এসে পোস্টঅফিস থেকে কলকার্ড কিনে দুই তিন সপ্তাহে বাড়ীর ফোনে মিনিট গুণে কথা।

monishas-photo_wc
মনীষা বিশ্বাস

গবেষণা সহযোগী হিসাবে আমার কাজ ছিল রুদ্রপুরের গ্রামীণ নারীদের জীবনযাত্রার তথ্যগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জেনে নেয়া। বিশেষত: যারা ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে সরাসরি অর্থনৈতিক কাজের সাথে যুক্ত হয়েছেন আর যারা কেবলমাত্র ঘরে গৃহস্থালী কাজেই যুক্ত আছেন, তাদের জীবনযাত্রার মানের ক্ষেত্রে পার্থক্যটা বোঝার চেষ্টা করা। যেহেতু গ্রামের মধ্যেই থাকতাম, ভোরে বের হয়ে প্রায় সারাদিন গল্প করে, তাদের পায়ে পায়ে ঘুরে দেখা আর বোঝার চেষ্টায় কখন যে সন্ধ্যা নামত টেরই পেতাম না। আমি জেনে খুবই আশ্চর্য হয়েছিলাম, যে নারী ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে সরাসরি অর্থনৈতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন, আর যিনি ঘরে গৃহস্থালী কাজেই যুক্ত ছিলেন, সব নারীর জীবনেই ’অবসর’ যেন এক ’সোনার হরিণ’!

ঘরের মানুষগুলোর সবার খেয়াল রাখা কেবল নয়, গৃহপালিত পশুপ্রাণীদের পরিবারের একজনের মত ভালোবেসে যত্ন নেয়াও ছিল প্রধানত: নারীর দায়িত্ব। প্রাত্যহিক রান্না, জ্বালানীর যোগাড়, ব্যবস্থাপনা, কোটা, বাছা, ধোয়া, বাটায় যে দিনের কতখানি সময় ব্যয় করতেন তারা শুধু রান্নার একটু স্বাদ বাড়াতে আর সময়ের আগে পরিবেশন করে পুরুষের ’রাগ’ এড়াতে – এটা জেনে আমার মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। আর পালাপার্বণের বিশেষ রান্না কিংবা পারিবারিক ঐতিহ্য বজায় রাখার জন্য মৌসুমে মৌসুমে খাবার তৈরির কথা বাদই দিলাম।

আমার মাথা খারাপ হলেও যুগে যুগে বাংলার বেশিরভাগ নারীরা একে ভালোবাসার অধিকার আর ভালোবাসার স্বীকৃতি হিসেবেই ধরে নিয়েছেন। গ্রামে হোক আর শহরে, ভোজনরসিক বাঙ্গালীর ’মায়ের হাতের রান্না’ আমাদের সংস্কৃতির মূল নির্যাস, এটা ছাড়া উৎসবের আনন্দ আজো অনেকের ফিকে হয়ে যায়। অথচ এর জন্য মায়ের (আর সহযোগী নারীদের) কত যে কর্মঘন্টা ব্যয় হয়ে যায় আর নারীর ’অবসর’ নাই হয়ে যায়, কেউ হিসেব করে না!

তাই হয়তো বাইরের কাজে আর অর্থনৈতিক কাজে নারীর যুক্ততা যতো বাড়ছে, ততোই মুক্তবাজার অর্থনীতি হাতে বানানোর বদলে প্যাকেটজাত আর হিমায়িত খাবার নাড়ু, মুড়ি, গজা থেকে শুরু করে পুরি, সিঙ্গারা, চিকেন নাগেটস, চিপস, জুস, কোমল পানীয় জায়গা করে নিচ্ছে। শহরে তো এটা পূর্ণ বাস্তবতা আর গ্রামে হয়তো আংশিক, সময়ের সাথে এক্ষেত্রে শহর আর গ্রামের পার্থক্য কতটা মুছে যাবে তা সময়ই বলে দেবে।

আজ আমার দেখা সেই ২০ বছর আগের গ্রামগুলো আমূল বদলে গিয়েছে। যদিও ঢাকা এখনো দেশের প্রধান অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র, বাঁচার তাগিদে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ ঢাকামুখী হচ্ছে। তারপরও অনেকেই গ্রামে থেকে যাচ্ছে, এমনকি কেউ কেউ গ্রামমুখীও হচ্ছে।

সরাসরি উন্নয়ন কাজের সুবাদে আমরা দেখেছি, অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল বাড়ির পুরুষটি যখন কাজের সন্ধানে গ্রামের বাইরে যাচ্ছেন (সেটা ফসল কাটতে অন্য এলাকায় হোক, ঢাকা শহরে রিক্সা চালানো বা মজুরির কাজ হোক কিংবা দেশের বাইরের শ্রমিকের কাজ হোক), তখন ঘরের নারীটিই সংসার, সন্তান আর সামান্য চাষের জমিটি সামলাচ্ছেন সমানতালে। আমরা দেখেছি, তেঁতুলহুজুরের ফতোয়ায় শহরের নারীরা তেমন সোচ্চার না হলেও এর সরাসরি জবাব দিয়েছেন গ্রামের খেটে খাওয়া নারীরা, গ্রাম থেকে শহরে আসা তৈরি পোষাকশিল্পের সাথে যুক্ত নারীরা এবং শহরে ঘরের কাজে যুক্ত নারীরা।

অনেক সময় আমার মনে হয়, শহরের উচ্চবিত্ত আর মধ্যবিত্ত নারীরা যতই এগিয়ে যাক, নিজেদের দাবী বুঝে নিতে তারা এখনো পিছিয়ে। আমাদের মধ্যে এমন কজন আছেন যারা আইনত: প্রাপ্য জমি বা সম্পত্তির ভাগ নেবার জন্য মুখ খুলেছেন?

আমরা কাজের সূত্রে গ্রামে গিয়ে গ্রামীণ নারীদের বলি প্রতিবাদী হবে, নিজের অধিকার আদায়ে এগিয়ে যেতে। অথচ সেই একই পরিস্থিতির মুখোমুখি যখন নিজের জীবনে হতে হয়, তখন আমরা এড়িয়ে যাই বা একটু বলে চুপ করে যাই। এটা সত্যি, সবার ক্ষেত্রে একথা প্রযোজ্য নয় – আজ  অনেকেই আমরা সোচ্চার হচ্ছি, কথা বলছি নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে – কিন্তু সত্যি কি সংখ্যাটা আগের চেয়ে অনেক বেশি বেড়েছে? নাকি অল্প কয়েকজন অনেক বেশি বলছে আর বেশিরভাগ আগের চেয়ে চুপ হয়ে গিয়েছে?

শত বছর আগে বেগম রোকেয়া অবগুন্ঠনকে হাতিয়ার করেছিলেন তাঁর এলাকার কন্যাশিশু আর নারীদের আলোর পথযাত্রী করতে – আজ উজ্জ্বল আলোয় স্মার্ট ফোনের ‘সেলফি ঝলকানিতে’ আমরা হিজাবী ফ্যাশনের মধ্যে নতুন সৌন্দর্য্যর জন্য উন্মাদনা দেখি। প্রযুক্তি, শিক্ষা আর অর্থনীতির অগ্রযাত্রা কি সত্যি শহুরে নারীর মুক্তির পথ তৈরি করেছে?

বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ নারী শ্রমিকের প্রায় ৭৭ শতাংশই গ্রামীণ নারী এবং তারা মূলত কৃষি, পশুপালন, হাঁস-মুরগী পালন, মাছ চাষসহ নানাধরনের কৃষি সংক্রান্ত কাজে জড়িত। গ্রামীণ নারীরা কিন্তু আগের চেয়ে কয়েকগুণ সোচ্চার তার মজুরির দাবীতে, কৃষিতে প্রাপ্য সুবিধার দাবীতে, এমনকি জমিতে তার নিজের অধিকার বুঝে নিতে।

তাদের অনেকেই বলার ক্ষেত্রে আমাদের চেয়েও সোচ্চার। এইতো গত মাসে কৃষিতে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার সংক্রান্ত এক সেমিনারে অংশ নিতে এসে এক গ্রামীণ নারী কৃষক মালতী রাণী সরাসরি প্রশ্ন করে বসলেন আমাদের তথ্য ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ হোসেন পলককে – কেন ঢাকায় এসে যে গতির ইন্টারনেট পেয়েছেন, তা সাতক্ষীরায় বসে কেবল ’ঘুরতেই থাকে’? মালতী রানী ঠিকই প্রতিশ্রুতি আদায় করে নিয়েছেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, সাতক্ষীরায় মালতী রানীর এলাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উচ্চমাত্রার ইন্টারনেট এবং ফোনের মানসম্মত যোগাযোগ নিশ্চিত করবেন।

২০১৬ সালে আমরা গ্রামে আর শহরে যোগাযোগ ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক সুবিধায় কত্ত এগিয়ে গিয়েছি। নিশ্চিতভাবেই ঘরে, কর্মক্ষেত্রে আর সামাজিক ক্ষেত্রে নারীরাও অনেক এগিয়ে গিয়েছে। কিন্তু তবু মনে হয়, নারীর লড়াই আজো থামেনি বরং জটিলতর হয়েছে। কেবল পুরুষ নয়, আজ সংসারের হাল কাঁধে তুলে নিয়েছে নারীরাও। গ্রামীণ নারীরা এখন অন্যের বাড়িতে কাজ করার চেয়ে ফসলের মাঠে, চাতালে মজুরি দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে – এটা সেই চিরাচরিত গ্রামীণ নারীর ভ’মিকায় অনেক বড় পরিবর্তন। আর তৈরি পোষাকশিল্পের সাথে যুক্ত লাখ লাখ কিশোরী তরুণীরা তো একধরনের নীরব অর্থনৈতিক বিপ্লব করে ফেলেছেন।

আজ গ্রামীণ নারী দিবসে আমার সশ্রদ্ধ অভিবাদন সকল গ্রামীণ নারীকে, যারা ঘরে এবং কর্মক্ষেত্রে আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে ব্যস্ত, যারা নিজের মতো করে এগিয়ে যাচ্ছেন আর পথ তৈরী করছেন, পথ দেখাচ্ছেন।    

১৫ অক্টোবর ২০১৬

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.