‘মুষ্টিমেয়’ বনাম ‘জেনারাইলেজেশন’ বিতর্ক

সুরাইয়া আবেদীন: সম্প্রতি একটা লেখা পড়লাম। সেখানে বলা হয়েছে, নারীদের লেখাগুলো নাকি ‘জেনারালাইয’ করে ফেলার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে রচিত। আবার এসব লেখাকে ‘সাহসী’ বিশেষণেও অভিহিত করতে দেখলাম।
নারীর প্রতি পুরুষের করা অন্যায় অসভ্য আচরণ, যা কিনা একবিন্দুও মিথ্যে নয়, তা নিয়ে কথা বললে, তা নিয়ে লিখলে, কেন তা ‘সাহসী’ ট্যাগ পাবে, তাই বুঝি না।
নারীদের নিজেদের কথা লিখতে ‘সাহসী’ হতে হয় না, হতে হয় অপমানিত, অসম্মানিত, নিঃস্ব একজন।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে নারী কী পরিমাণ সহিংসতার শিকার ঘরে আর বাইরে তা নিয়ে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক/ ইউনিসেফ এর  নানা আর্টিকেল, রিপোর্ট আছে।  
গুগল করলেই হবে।
যদিও সেসব রিপোর্টে নারীর প্রতি সহিংসতার কারণ হিসেবে পুরুষের ‘অতি আগ্রহ প্রদর্শন /প্রেম’ বা ‘প্রেমের আকুতি’ একদমই খুঁজে পাইনি।
suraiya-2
প্রেম তো হৃদয়ের রক্তক্ষরণের ব্যাপার, শরীরের নয়।
পাশের দেশের নির্ভয়া আর আমার দেশের ইয়াসমিন, বা খাদিজা নিজের শরীরের রক্ত দিয়ে পুরুষের প্রতিহিংসার শিকার হয়েছে।
হৃদয় কোথায় এখানে?
খুঁজে তো পাচ্ছি না…।  

নারী সংক্রান্ত বক্তৃতামুখর দিন বোধ করি বাংলাদেশে একটাই। আর তা হলো নারী দিবস। এই একদিনে নারীকে তার প্রাপ্য সম্মান, অধিকার দেয়া হয় শব্দে, ভাষণে, আর তারপর? বাকি ৩৬৪ দিন চুপ করে থাকা হয়। হিরণ্ময় নীরবতা বিরাজ করে সর্বত্র।

আর একটা ব্যাপারে আমরা খুব বক্তৃতামুখর হয়ে উঠি। যখন মুষ্টিমেয় ‘পুরুষ’রা দেখেন নারীর লেখায় শুধুই ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ’ পুরুষের নেতিবাচকতার কথা লেখা হচ্ছে। তখন এই মুষ্টিমেয় ‘পুরুষ’রা এমন একটা ভাব করেন যেন তারা অস্তিত্ব সংকটে পড়ে গেছেন।
তাদের মতে অর্থাৎ ভদ্র, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে নারীকে দেখা, মানুষ হিসেবে নারীকে ভাবা, অর্থাৎ ‘মুষ্টিমেয়’ পুরুষরা যারা আছেন তাদের কি নারীরা চোখে দেখে না? নাকি তারা অদৃশ্য?
নিজেদের অস্তিত্ব সংকট কাটাতে তারা পুরুষের চরিত্র চিত্রণকে ‘জেনারালাইয’ না করে ফেলতে নারীদের অনুরোধ করেন।  
যা কিছু সমাজ, সংসারে অনুপাতে বেশি তাই নিয়েই সবাই কথা বলে।
ব্যতিক্রম যখন হয় ‘মুষ্টিমেয়’, তখন তা নিয়ে কথা বলা ততোটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, তবে বলছি না তা অস্বীকার করা সমীচীন। সংখ্যায় অল্প, তবে আছে- এভাবে বলাই যায়।     

তবে হ্যাঁ, ‘মুষ্টিমেয়’ পুরুষরা অদৃশ্যই। সংখ্যায় তারা এতোই নগণ্য যে তাদের চোখেই পড়ে না, সমগ্র পুরুষ সমাজ এর প্রতিনিধিত্ব তারা তো করেনই না, বরং করে তাদের বিপরীত মানসিকতার সংখ্যাগরিষ্ঠরা।   

উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত লেখা বা দুনিয়ার যত বিখ্যাত বইয়ের কথাই বলি না কেন যার মূল বিষয় ”পুরুষের নেতিবাচক চরিত্র চিত্রণ” তার প্রত্যেকটার পেছনে আছে একজন নির্দিষ্ট বা একদল ‘নির্দিষ্ট’ পুরুষের অমানবিকতা আর অন্যায়।

এই প্রতিটা লেখাই লেখক লিখেন হয় নিজে ভিক্টিম হয়ে, অথবা আশেপাশের কাউকে ভিক্টিম হতে দেখে…মেয়েরা তো পুরুষের মত কোপানোতে সিদ্ধহস্ত হয় না, তাই কলমের কালিতেই ক্ষোভ ঝাড়ে।

নারীকে অপমান, অসম্মান করার ব্যাপারে পুরুষের ভূমিকা নেতিবাচকভাবে এতোই কমন ও সংখ্যাধিক্য যে, নারীরা যখন এসব অমানবিক জঘণ্য অন্যায়ের প্রতিবাদে কলম ধরে, তখন তা হয়ে যায় ‘জেনারালাইজেশান’!!
সংখ্যালঘু ভাল পুরুষরা ধরেই নেয় এই নারী নিশ্চয়ই ‘পুরুষবিদ্বেষী’, ভাল পুরুষ কি একদমই নেই?’
ভাল পুরুষ, ইতিবাচক পুরুষ, যাই বলি না কেন, অবশ্যই আছেন, তবে ঐ যে বললাম, সংখ্যায় এতোই কম যে চোখেই পড়ে না।

সাম্প্রতিক যে লেখাট নিয়ে এতো আলোচনা, তাতে লেখক বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক পুরুষের প্রধান দুর্বলতা হচ্ছে তারা নারীকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে ফেলে। নারীর সঙ্গে কথা বলার অতি আগ্রহ প্রদর্শন বা প্রেম করার চেষ্টা করা দক্ষিণ এশিয়ার পুরুষ সমাজের আজকের এই সমালোচিত হবার মূল কারণ।’

লম্বা দীর্ঘশ্বাস!!
বাস্তবতা এতো প্রেমময়ই যদি হতো, আমরা এতদিনে আরও কয়েকজন রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলকে পেতাম…  কিন্তু তা কি পেয়েছি?
পেয়েছি বদরুলকে, পেয়েছি অসংখ্য নারীর মৃতদেহ, যাদের হত্যাকারী তাদের স্বামী, প্রেমিক, রাস্তার একদল ধর্ষক, এবং এসব মৃত্যুর কারণ একদমই যে ‘প্রেম’  না তা স্বাভাবিক বুদ্ধিসম্পন্ন যে কেউই বলে দেবে…   

বাস্তবে পুরুষ সমালোচিত হয় তার নোংরা মানসিকতার জন্য। যে মানসিকতায় থাকে কেবলই নারীর ‘শরীর’। ব্যক্তি হিসেবে নারী তাদের কাছে গুরুত্ব পায় না, কিন্তু ‘সেক্সুয়াল অবজেক্ট’ হিসেবে অপরিসীম গুরুত্ব পায়। এই অপরিসীম গুরুত্ব দেয়া পুরুষ হতে পারেন বিসিএস পাশ কর্মকর্তা, অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, অথবা রাস্তার একজন দোকানদার।

মন্তব্য, রাগ প্রকাশ যাই বলেন, সব কিছুর লক্ষ্য নারীর ‘শরীর’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক কথা বলেন বুকের দিক তাকিয়ে (প্রত্যেক ডিপার্টমেন্টে এমন এক বা একাধিক পিস থাকে), বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি নতুন কিছু না।

চাকরির ক্ষেত্রে যৌন হয়রানির কথা কাইন্ডলি একটু নারী কলিগদের জিজ্ঞেস করে নেবেন। এসব লিখতে গা গুলিয়ে ওঠে ঘেন্নায়…
গালি দিতে হবে? মা/বোনের সাথে শারিরিক সম্পর্ক স্থাপন করা সংক্রান্ত গালি দিবে।
রাগ হয়েছে? নারীর শরীরে আঘাত কর। চড় দাও, বেল্ট খুলে মারতে মারতে অজ্ঞান করে ফেল। প্রেমের প্রস্তাবে রাজি হবা না? কোপ খাও। এসিড ছুঁড়ে মারো মুখে…। রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছো? বুকের মাপ- নিয়ে গা শিউরে ওঠা মন্তব্য আসবে।
গত বইমেলায় বের হবার সময় আমার এক শিক্ষিকা ছেলের বয়সী একদলের দ্বারা বুকে, শরীরে থাবার শিকার হয়েছেন। উনি বাসায় ফিরে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন।

কী অসামান্য গুরুত্বই না পুরুষ দেয় নারীর শরীরকে! অথচ এই শরীরেই নয় মাস ঠাঁই না পেলে দুনিয়াই এসব ‘পুরুষ’দের দেখা হতো না!!!  

একটু কল্পনা করবেন? সময় হবে?
উপরে যা কিছু লিখলাম তা যদি না হতো, সমালোচিত হতো পুরুষ?
পুরুষকে নিয়ে ‘সাহসী’ লেখা লিখতো নারীরা?

নারীদের লেখার আরেক বিষয় সংসারে পুরুষের অসহযোগিতা।

সংসারের প্রতি মিলিমিটারে পুরুষের ডোমিনেশন।  
পুরুষের নিজস্ব সময় থাকবে, নারীর থাকবে না।
যেন স্ত্রীদের এসব ‘আহ্লাদ’ হতে নেই।
স্ত্রীদের আবার নিজস্ব সময় কী?

কত মা বছরের পর বছর বাবার বাড়ি যেতে পারেন না।
গৃহকর্তার নাকি ভাল লাগে না।
কী অকাট্য যুক্তি!
অথচ নিজে কিন্তু প্রতি শুক্রবার মাকে দেখে আসছে…।

একটা প্লেট পর্যন্ত ধুবে না, এক কাপ চা বানিয়ে খাবে না,
ওয়াশিং মেশিন কাপড় ধুয়ে দিয়েছে, এবার বারান্দায় একটু মেলে দাও!! বলতেই- ওমা, এসব কি পুরুষদের কাজ নাকি?

শরীর খারাপ লাগছে। আজ না করলে হয় না??- ওমনি তার রাগ।
তার শরীর চাইছে, এখন নারীর শরীরকেও চাওয়াইতে হবে!!
বিপরীত দৃশ্য?  
গুনাহ হবে! গুনাহ!!
ভাবাও পাপ!!

এখন আমাকে একটু বলবেন?
এফরমেনশন্ড ‘পুরুষ’রা সমাজে সংখ্যাধিক্য নাকি ‘মুষ্টিমেয়’?
‘জেনারালাইজেশান’ ব্লেম দেয়া মুষ্টিমেয়রা, আপনারা এখানে কোথায়?
পুরুষ চরিত্রের যে চিত্র আঁকলাম এগুলা একসময় ছিল আমাদের মা-খালাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ, আর এখন খুঁটি গেড়েছে আমাদের জীবনে।    
সমাজের সকল অংশে, উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে বস্তি চিত্র একই, শুধু পাত্রী আর পাত্র আলাদা।

আমরা ভিক্টিমরা এসব নিয়েই লিখি।
আর এসব পড়েই আপনারা বলেন ‘জেনারালাইজেশান’ করছি।
‘জেনারালাইজেশান’ কে করে যখন সমাজের ৯০ ভাগ পুরুষ এসব ভূমিকা দিনের পর দিন দক্ষতার সাথে পালন করে আসছে।

১০ ভাগ নিয়ে কে কথা বলবে?  
১০ ভাগের গুরুত্বই বা কী সমাজ পরিবর্তনে? নারীর নিরাপত্তায়?
১০ ভাগ আছে -এই একটা লাইন শুধু আমি লিখতে পারবো, তর্ক থেকে বাঁচতে। এর গুরুত্ব ঠিক এতটুকুই, না থাকার মতই।
এই ১০ ভাগের যারা সহধর্মিণী, সহকর্মী, তারা এই ১০ ভাগকে নিয়ে আনন্দিত, আহ্লাদিত।
বাকি ৯০ ভাগের সহধর্মিণী, সহকর্মিরা যে দিনের পর দিন অপমানিত হচ্ছে তার হিসাব কে রাখে?
উইমেন চ্যাপ্টারে অল্প কয়েকজন নির্যাতিত নারী নিজের বা আশেপাশের নারীদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন, তাতেই ‘জেনারালাইজেশান’ হয়ে যায়!
৯০ ভাগের দ্বারা নির্যাতিত সবাই যদি লিখতো, তাহলে যে কী শব্দ ব্যবহার করতেন, কে জানে!  

বিশ্বাস করুন, নারীরা আপনাদের মতে এসব ”সাহসী’ লেখা লিখতে ইচ্ছুক না। তারা যখন এসব লেখে, লেখার সময় কতগুলো দীর্ঘশ্বাস ফেলে তা আপনারা জানেন না। কতবার চোখ জানালায় নিয়ে যায়, আকাশ দেখে কান্না থামানোর চেষ্টা করে তাও আপনারা বুঝবেন না। আপনাদের অস্তিত্ব সমাজে, পরিবারে, রাস্তায় আপনাদের চারপাশে অবস্থিত নারীর জন্য নিরাপদ।
সমাজের বাকি নারীদের যে দিনের পর দিন অসম্মানিত, অপমানিত হতে হচ্ছে ঐ ৯০ ভাগের হাতে, সে ক্ষেত্রে আপনাদের উত্তর কি?   

প্রিয় মুষ্টিমেয় পুরুষরা, অথবা এভাবে বলি জেনারালাইজেশান শব্দবিরোধী পুরুষরা,   
নিজের কন্যা সন্তান বা বোনটিকে সন্ধ্যার পর একটু ঘরের বাইরে যেতে দিয়েন।
অথবা বোনের মেয়ে যে রাত করে অফিস থেকে ফেরে তার প্রতি রাস্তার পুরুষের মন্তব্য কী জানতে চান। অথবা মধ্যবয়সী কোনো বড় বোনকে জিজ্ঞেস করুন, সংসারে তার স্বামী তাকে কতখানি মূল্যায়ন করে…আশে-পাশে তাকিয়ে দেখেন কত মা নিজেকে বলী দিয়ে দিচ্ছে সংসারে…  
তাদের উত্তরে খুঁজুন যে তারা যৌক্তিক সমালোচনা করছে নাকি ঢিল ছুঁড়ছে..
বোঝার চেষ্টা করুন পুরুষ সমাজের এই সমালোচিত হবার মূল কারণ হিসেবে তারা ‘প্রেমের আকুতি’ নাকি ‘নোংরা মানসিকতাকে’ দায়ী করছে ….  
 
যদি দেখেন তারাও আমাদের মতো ‘জেনারালাইজেশান’ করছে (আপনাদের ভাষায়) তাহলে নিজেকে জিজ্ঞেস করবেন, ‘আমি একা ভাল হয়ে কী লাভ হলো? আমার মেয়ে, বোন, ভাগ্নিকে তো নিরাপত্তা দিতে পারছি না বাইরের সংখ্যাধিক্য নোংরা মানসিকতার পুরুষের থেকে। ওরা ভিক্টিম হয়েই তো ‘সাহসী’ (!!) লেখা লিখবে দুইদিন পর!!
তাহলে এখন করণীয় কী!  
মুষ্টিমেয় হয়েই থাকবেন, নাকি নোংরা সংখ্যাধিক্যদের বিদায় করে তাদের বদলে নিজেদের অনুসারীর সংখ্যা বাড়াতে ভূমিকা রেখে ‘সাহসী’ লেখকদের লেখা বন্ধ করার পদক্ষেপ নেবেন ?-উত্তরটা আশা করি আপনাদের বিবেক দিয়ে দেবে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.