অসামান্য হুমায়ুন আজাদ, অসামান্য গ্রন্থ ‘নারী’

লীনা দিলরুবা: হুমায়ুন আজাদ তাঁর লেখা ‘নারী’ গ্রন্থটিতে লিখেছিলেন, নারীবাদের মূল বক্তব্য এবং প্রস্তাবগুলো। বাংলাদেশে ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারির বইমেলায় এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। এরপর এটি নিষিদ্ধ হয়, এবং আবার মুক্তও হয়। বইটির বয়স এখন ২৪ বছর।

এই ২৪ বছরে বিশ্বনারীবাদ যেখানে পৌঁছেছে সেখানে বাঙালি নারীর অবস্থান কোথায়? ‘নারী’ এমনই গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থ, যার মাধ্যমে নানা পরম্পরায় বিশ্বরাজনীতি আর সমাজনীতিকে পর্যবেক্ষণ করে, সমাজবিজ্ঞানীরা স্থানীয় রাজনীতি আর সমাজনীতির আলোকে বাঙালি নারীর অবস্থান আর গতিধারা নির্ণয় করতে পারবেন। নারী নিয়ে বাংলা ভাষায় সবচেয়ে আলোচিত আর মূল্যবান এই গ্রন্থটিকে কালের আলোকে দেখার তাগিদে এই লেখা লিখতে বসা।

নারীবাদ নিয়ে যারা কাজ করেন তারা বলতে চান, ‘নারীবাদ’ হলো -নারীদের অধিকার আদায়, সমতা অর্জন এবং সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংগঠিত বিভিন্ন মতবাদ ও আন্দোলন।

leena-diruba-2
লীনা দিলরুবা

আর হুমায়ুন আজাদ ‘নারীবাদ’ বলতে যেটি বুঝিয়েছেন সেটি হলো, “যিনি নারী-পুরুষের সাম্যে ও সমান অধিকারে বিশ্বাস করেন, তিনিই নারীবাদী।” নারীবাদের আলোচনায় অন্যদের সঙ্গে হুমায়ুন আজাদের পার্থক্য এখানেই। ‘নারী’ গ্রন্থটিও নারীকে নিয়ে অসংখ্য অালোচনায় ব্যতিক্রমী গ্রন্থ একারণেই। নারীবাদের আলোচনায় পুরুষ ভিন্ন প্রকরণ নয়। কারণ হুমাযুন আজাদই বলেছেন, “তাকে (নারীকে) মনে রাখতে হবে সে মানুষ, নারী নয়; নারী তার লৈঙ্গিক পরিচয় মাত্র; মনে রাখতে হবে পুরুষের সাথে তার পার্থক্য মাত্র একটি ক্রোমোসোমের, এবং একটি ক্রোমোসোমের জন্যে একজন প্রভু এবং আরেকজন পরিচারিকা হয়ে উঠতে পারে না।”

নারীর জীবনেতিহাস এই বইতে পূর্ণাঙ্গভাবে ধরা আছে। ধর্মে, সমাজে, পরিবারে, সাহিত্যে নারী কোথায় ছিলো, কোথায়ই বা দাঁড়িয়ে আছে, এই বইতে তার সমস্ত কিছুই রয়েছে। তিনি বলেছেন, পিতৃতান্ত্রিক সমাজ নারীর সমস্ত কিছুকেই শৃঙ্খলে বেঁধেছে। পুরুষ মানে তেজ, নারী মানে অস্তমিত সূর্য। পুরুষ মানে বুদ্ধি, নারী মানে আবেগ, এই স্থুল ধারণা একদিনে নয়, দিনে দিনে পড়িয়ে, চিনিয়ে, বুঝিয়ে নারীর ওপর চাপিয়ে দিয়েছে পুরুষতন্ত্র।

‘লৈঙ্গিক রাজনীতি’ অধ্যায়ে হুমায়ুন আজাদ কেইট মিলেট এর বই এর উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, পিতৃতন্ত্র নারীর ওপর আধিপত্য আরোপ করতে গিয়ে অনেক পরিকল্পনা করেই এগিয়েছে।

সেগুলোকে মিলেট বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে দেখিয়েছেন, ১) ভাবাদর্শগত, ২) জৈবিক, ৩) সমাজতাত্ত্বিক, ৪) শ্রেণী, ৫) অার্থ ও শিক্ষাগত, ৬) বলপ্রয়োগ, ৭) নৃতাত্ত্বিক: পুরাণ ও ধর্ম, ৮) মনস্তাত্ত্বিক ভাগে। এই পয়েন্টগুলোর বিস্তারিত আলোচনা পড়লে দেখা যাবে পিতৃতন্ত্রের পুরুষাধিপত্যের পরিকল্পনা কতোটা ব্যাপক। মিলেট আমেরিকান।  তিনি তার সমাজের বাহ্যিক আর অন্তজ চরিত্র জানতেন, হুমায়ুন আজাদ বাঙালি। তিনি জানেন তার সমাজের। এই দুজনের পার্থক্য হচ্ছে, তারা একজন নারী, আরেকজন পুরুষ। মিলেট যে আঙ্গিকে পিতৃতন্ত্রের আধিপত্যের কথা তীব্র, তীক্ষ্ণ ভাষায় বর্ণনা করে তার স্বরূপ চিনিয়েছেন, হুমায়ুন আজাদও সেই তীব্র সুরে মিলেটের আবিষ্কারের  বিষয়গুলোকে আমাদের সমাজের নানান উদাহরণের সঙ্গে সংযুক্ত করেছেন। এখানেই আসলে আজাদের অনন্যতা।

পিতৃতন্ত্রের এই স্বরূপ হিন্দু নারীদের জন্য আরো কঠিন। এজন্য হুমায়ুন আজাদ ভিন্ন একটি অধ্যায়ই লিখেছেন। যেখানে তিনি রামমোহন আর বিদ্যাসাগরকে নিয়ে বলেছেন, “রামমোহন হিন্দু বিধবার প্রাণদাতা আর বিদ্যাসাগর জীবনদাতা।”       
হুমায়ুন আজাদ সবধর্মে নারীর অবস্থান নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। এ বিষয়ে কোনোটিই নারীর অনুকূলে নেই।

এরপর যে অধ্যায়টি বিশেষ, সেটি হলো বেগম রোকেয়ার নারীবাদ নিয়ে আলোচনা। বেগম রোকেয়ার জীবন, তার লেখা গ্রন্থের আর তাঁর ভাবাদর্শের বিস্তারিত আলোচনায় হুমায়ুন আজাদ দেখিয়েছেনে কীভাবে রোকেয়া নারীর আত্মমর্যাদা রক্ষায়, অধিকার রক্ষায় কাজ করেছেন। তিনি লিখেছেন “চেতনায় রোকেয়া ছিলেন তাঁর সময়ের মুসলমান ও হিন্দু, সমস্ত নারী পুরুষ ও মহাপুরুষের থেকে সবচেয়ে এগিয়ে।” হুমাযুন আজাদ আরো বলেন, পুরুষতন্ত্রের সঙ্গে বাধ্য হয়ে রোকেয়া সামান্য সন্ধি করলেও, তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নারীবাদী।

বঙ্গীয় ভদ্রমহিলা : উন্নত জাতের নারী উৎপাদন, অধ্যায়ে হুমায়ুন আজাদ দেখিয়েছেন উনিশ শতকে এক নারী গোষ্ঠীর উদ্ভবের কথা। এটিকে তিনি অভিনব নারী জাতির আবির্ভাব বলেছেন। সেটি কেমন? এই শতকে এসে নারীরা পড়তে শেখে। নারীদের সঙ্গে তখন বিশেষ একটি শব্দযোগ করা হয়। সেটি হচ্ছে-ভদ্রমহিলা। এদেরকে তিনি বলেছেন পুরুষতন্ত্রের স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্ন। পুরুষ নিজের স্বার্থে নারীদের শিক্ষা দিয়ে একটি হাইব্রিড জাতি হিসেবে দেখতে চেয়েছে এবং দেখেছে। সেখানে অবশ্য মুসলমান নারী ছিলো না। কারণ তারা শিক্ষা গ্রহণ করার সুযোগ পায়নি। অর্থাৎ তারা ছিলো অবলা। আর হিন্দু নারীরা ভদ্রমহিলা। দু’দলের অবশ্য পার্থক্য বিশেষ নেই। সেসময় নারীদের জন্য এবং তাদের দ্বারা প্রকাশিত পত্রিকার নাম দেখলেই এ কথা পরিষ্কার হবে। বামবোধিনী পত্রিকা (১৮৬৩) অবলা বান্ধব (১৮৬৯), বঙ্গমহিলা (১৮৭৫), ভারতী (১৮৭৭), পরিচারিকা (১৮৭৮), পাক-প্রণালী (১৮৮৩), গার্হস্থ্য (১৮৮৪), মহিলা-বান্ধব (১৮৮৭), দাসী (১৮৯৭), মহিলা (১৮৯৭), অন্তপুর (১৮৯৮)। হুমায়ুন আজাদ বলেন, পরিচারিকা আর দাসী নাম দিয়েই তারা বুঝিয়ে দিয়েছে তাদের কাছে নারী আসলে কী?    

নানান তাত্ত্বিক বিষয় দিয়ে – নারীবাদী সাহিত্যতত্ত্ব ও সমালোচনা নামের অধ্যায়টি সাজানো হয়েছে। সেখানে যেমন নারীবাদীদের সাহিত্য সমালোচনা রয়েছে তেমনি ফরাসী দেশে নানান ভাগে গড়ে ওঠা নারীবাদী সাহিত্য আন্দোলনও আলোচনার বিষয় হয়েছে। লেখকরা অাসলে সাহিত্যে নারীকে যেভাবে দেখেন এবং দেখিয়েছেন, সেসব নিয়ে অজস্র উদাহরণ দিয়েছেন তিনি। এই আলোচনার সূত্রে তিনি ফরাসী নারীবাদের প্রসঙ্গ টানেন এবং ফরাসী ও বিশ্ব নারীবাদীদের মহত্তম তাত্ত্বিক সিমোন দ্য বোভোয়ারের ওপর আলোচনা করেন।

বলেছিলাম, কালের আলোকে বইটিকে দেখার তাগিদেই এটি নিয়ে লিখতে বসা। হুমায়ুন আজাদ যে সময়ে এটি লিখেছেন, তারপর আরো প্রায় আড়াই দশক পেরিয়ে আমরা নারীকে যেখানে দেখছি সেটি হুমায়ুনের গ্রন্থের বাড়তি অধ্যায় দাবী করবে নারী নিগৃহের তথ্য তুলে ধরতেই। পরিবারে, সমাজে নারীর অবস্থান খুব কিছু উন্নত বলে দাবী করা যাবে না।

কত শতাংশ নারী লেখাপড়া করছে বা কর্মক্ষেত্রে অবদান রাখছে সেই পরিসংখ্যান নিয়ে খুব আশাবাদী হবার উপায় নেই এজন্য যে, নারী নির্যাতনকে যদি আলোচনায় আনি, নারীর ক্ষমতায়নকে যদি আলোচনায় আনি, তবে দেখবো কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ লেজের দিকে লেজ বাড়িয়েছে, কর্মক্ষেত্রে এখনও সর্বোচ্চ অবস্থানে নারীকে দেখতে আমাদের পিতৃতন্ত্র চায় না। তাই যেকোনোভাবে নারীকে টেনে ধরাই পিতৃতন্ত্রের বাসনা। অনেক ক্ষেত্রে তারা সফলও। তাই সমাজে বলি, পরিবারে বলি, কর্মক্ষেত্রে বলি তার অবস্থান সামান্যই পরিবর্তিত হয়েছে।      

বই এর একদম শেষের অধ্যায়টি নারীর ভবিষ্যৎ নিয়ে লেখা। এটি যেন নারীকে বলা, তোমার উৎপত্তি, তোমার অবস্থান সমস্তই তো দেখলে, এবার শোনো তুমি কী করবে? বা তোমার কী করা উচিত, এমনই আকর্ষক এই অধ্যায়ের কথাগুলো। এই অধ্যায় এবং যুগপৎভাবে বই এর শেষ কথা হলো, “নারীকে ঘৃণা করতে শিখতে হবে সম্ভোগের সামগ্রী হ’তে, এবং হ’তে হবে সক্রিয়, আক্রমণাত্মক। নিজের ভবিষ্যৎ সৃষ্টি ক’রে নিতে হবে নিজেকেই, পুরুষ তার ভবিষ্যৎ সৃষ্টি করবে না। নারীর ভবিষ্যৎ মানুষ হওয়া, নারী হওয়া নারী থাকা নয়।”

হুমায়ুন আজাদ নেই। তার চিন্তানির্দেশিত কথাগুলো আছে। এগুলোকে নিজের জীবনে প্রতিফলিত করতে পারলে অনেক কিছুই সহজ হয়ে যায়। বইটি পড়ে এগুলোকে ধারণ করতে পারলে সেটিই হবে সার্থকতা, আর প্রয়াত লেখকের সফলতা।

শেয়ার করুন:
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
    4
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.