পুরুষের অযোগ্যতার দায় কেন নেবে নারী?

ফারজানা নীলা: টাইগার সিমেন্ট এর একটা বিজ্ঞাপন চোখে পড়লো টিভিতে, যেখানে একদল নারী ফুটবল খেলোয়াড়দের দেখানো হয় যারা সবাই মাথায় হিজাব পরে ফুটবল খেলছে। আমাদের দেশের মেয়েরা কি মাথায় হিজাব পরে ফুটবল খেলে? বাংলাদেশি সংস্কৃতিতে মাথায় হিজাব পরে খেলাধুলা করে না। কিন্তু মিডিয়াতে সম্পূর্ণ বিপরীত, যা ঘটেই না এমন বিজ্ঞাপন দেওয়ার মর্মার্থ কী বুঝতে পারলাম না। নাকি তারা আকারে-ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিতে চাচ্ছে, বাঙালি মেয়েদের এমন পোশাক পরিধান করা উচিত।

Nila
ফারজানা নীলা

আমাদের সংস্কৃতির সাথে কি হিজাব যায়? বাঙালি পোশাক মানে কিন্তু শাড়ি, সেখানে হিজাবের কোন অস্তিত্ব নেই। অনেকে বাঁকা প্রশ্নও করে, তাহলে জিন্স কীভাবে বাঙালি পোশাক হয়? জিন্সও বাঙালি পোশাক না। তবে জিন্স আর হিজাবের সাথে মূল পার্থক্য হলো, জিন্স কোনো ধর্মীয় পোশাক না, কিন্তু হিজাব একটি ধর্মীয় পোশাক।

তাও যদি কেউ বলতে চায় জিন্স বা হিজাব পরা কারও ব্যক্তিগত ইচ্ছে, অনেকে শখ করেও পরতে পারে। তবে পরুক। কিন্তু যখন কোনো মিডিয়ার সামনে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে উপস্থাপন করা হ,য় যে গোষ্ঠী বাস্তবে হিজাব পরে খেলে না, সেখানে খেলার পোশাকের সাথে হিজাব যুক্ত করে দেওয়া শুধুমাত্র ইচ্ছে-অনিচ্ছার ব্যাপারের বহিঃপ্রকাশ হয় না।

কতভাবেই না বুঝানো হচ্ছে আজকাল, মেয়েদের ঢেকেঢুকে চলতে হবে। নইলে ছেলেরা যে  হামলে পড়বে। ছেলেদের  হাত থেকে মেয়েদের বাঁচতে হবে মানে হচ্ছে ছেলেরা খারাপ। চরম হাস্যকর হলো, সমাজ বলছে ছেলেরা খারাপ, কিন্তু নিয়ম বানায় মেয়েদের জন্য। যদি ছেলেরা খারাপ কাজ করেই থাকে এবং সমাজ এটা স্বীকার করে মেয়েদের জন্য নিয়ম বানায়, তবে চোখ বন্ধ করে এটা প্রমাণ হয়ে যায়, ছেলেদের এমন নোংরা কর্মকাণ্ড গ্রহণযোগ্য না।

ছেলেরা মেয়েদের উত্যক্ত করবে তাই সাবধানে চলতে হবে মেয়েদের! কেন? মেয়েদের দেখলে যদি ছেলেদের মাথা ঠিক না থাকে, তবে সেই দায় মেয়েদের কেন হবে? মেয়ে শরীর মেয়ে নিজ হাতে বানায়নি, সে জন্মগতভাবে এমন। এই স্বাভাবিক শরীর দেখে কারও যদি মাথা খারাপ হয়ে বিবেক হারায়, তবে তার মানসিক সমস্যা আছে, চিকিৎসা তার দরকার। অথচ সমাজ পাগলের চিকিৎসা না করে পাগল যাকে কামড়াতে চায় তাকে বলে ঘরে থাকো!
বিরক্তিকর আরও একটি বাক্য শুনতে হয়, “ আপনি তো জনে জনে গিয়ে বোঝাতে পারবেন না, তার চেয়ে ভাল নিজেই নিরাপদ থাকেন”।
তা বিজ্ঞ বিশারদগণ, হিজাব পরে চললেই যে ছেলেদের থাবার নিচ থেকে বাঁচা যায় তার প্রমাণ তো রাস্তাঘাটে পড়ে আছে, আপনাদের পছন্দের পোশাকই পরতো তনু, খাদিজারা। রক্ষা তারা পায়নি। আর কত প্রমাণ লাগবে বোঝার জন্য যে চিকিৎসা প্রয়োজন মানসিক বিকারগ্রস্ত ছেলেদের।

নারী সে যতই নিজেকে ঢেকে রাখুক না কেন, তার নিস্তার নেই। সমাজ নারীকে বাঁচাতে যতবেশি ঘরকুনো আর পোশাককুনো হতে বলবে, ততই তারা পুরুষদের উসকে দিচ্ছে নির্যাতন করার জন্য। ভাবখানা এমন, যেহেতু জনে জনে গিয়ে সবাইকে বোঝানো যাবে না, সেহেতু তারা আরও অবুঝ থাক, অপকর্ম-টিজিং-ধর্ষণ- হত্যা করতে থাক; নারী, তুমি শরীরে লেপ-কম্বল আরও যা পারো জড়াতে থাকো। তাতে যদি রক্ষা পাও তো ভাল, রক্ষা না পেলে কী আর করা, কপাল মন্দ!

শুধু কপাল খারাপ হয়ে মরে যায় তাও না, সাথে যুক্ত হয় হত্যাকে বৈধ করার চেষ্টা , “হিজাব পরলে কী হয়েছে ,সে তো ছেলেদের সাথে মিশতো, সে তো নাটক করতো, সে তো প্রেম করতো ছেলেটার সাথে, ধোঁকা দিছে তাই শাস্তি পেয়েছে”।
বাহরে পুরুষ সমাজ! নিজেদের দোষগুলো কোনদিন বুঝার মতো যোগ্যতা অর্জন করতে পারলে না। আর সেই অযোগ্যতার দায় চাপাও নারীদের উপর। তোমাদের মগজ উলঙ্গ, তাই নারী দেখলেই তাকে উলঙ্গ কল্পনা করে ঝাঁপিয়ে পরো।
তবে এতো এতো কদর্য জিনিসের ফাঁকে মাঝে-সাঝে ভাল জিনিসও উঁকি দেয়। রাঁধুনি মশলার একটি বিজ্ঞাপন, যেখানে দেখি স্ত্রী বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দিচ্ছে, আর স্বামী রান্না করছে।

বাহ! ঘরে ঘরে যদি এই চিত্র বাস্তবতার রূপ পেত, তবে “রান্না করা শুধুই নারীর কাজ” বোধটি লোপ পেত। অথবা স্যানিটারি ন্যাপকিনের কিছু বিজ্ঞাপন। যুগে যুগে যেসব স্বাভাবিক বিষয় মানুষ লুকিয়ে রেখেছিল সেসব বিষয় সামনে আসছে। ভাবতে ভাল লাগে, হোক না কিঞ্চিৎ পরিমাণে তবুও তো হচ্ছে। হয়তো কোনোদিন আমাদের দেখা স্বপ্ন সত্য হতেও পারে।

শেয়ার করুন:
  • 556
  •  
  •  
  •  
  •  
    556
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.