বিয়ে, ডিভোর্স, অত:পর বেঁচে থাকা

শিল্পী জলি: আমাদের দেশে বিয়েকে মানুষ একটি সারা জীবনের প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করে। অতঃপর ঐ একটি বিয়েকেই ঘিরে থাকে তার সব ইমোশন, কল্পনা, ভালোলাগা, স্বপ্ন, আশা-আকাঙ্ক্ষা, চিন্তাভাবনা, সেক্স, সন্তান, এবং ভবিষ্যত জীবন রচনা ।

বিয়েতে কোন ইমোশনের সংযুক্তি না থাকলে সবার পক্ষেই বিয়েকে ম্যানেজ করা সহজ হতো। কিন্তু বিয়েতে ইমোশন জড়িয়ে থাকায় অনেক কিছুতেই শুধু যুক্তি দিয়ে বিচার করে পদক্ষেপ নেয়া যায় না, যদিও পৃথিবীতে বিয়ে সম্পর্কটিতেই সবচেয়ে বেশী দ্বন্দ্ব, সংঘাত, দ্বিমত, ঝগড়াঝাঁটি, মারামারি, আশাভঙ্গ, এবং প্রাণনাশের আশঙ্কা থাকে।
মনিকার সাথে ক্লিনটনের যখন শারীরিক সম্পর্কের কথা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়লো হিলারি ক্লিনটনের মতো ক্ষমতাবান মেয়েও তখন সয়ে নিয়েছিলেন। কেন?

Shilpi Jolley 2
শিল্পী জলি

হয়তো মানসিক দৈন্য অথবা নিজের ভালোবাসার কাছে নিজের বন্দীদশা তাঁকে অবশ করে দিয়েছিল। ওদিকে সব বাঁধা অতিক্রম করে লেডি ডায়না যখন সামনে পা বাড়ান, তখন তাঁকে পৃথিবী ছেড়েই চলে যেতে হয়।
বিয়ের বন্ধনে হয়তো নানা অদৃশ্য শক্তি এবং প্রচলিত কুসংস্কার মানুষকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখে, যা থেকে বেঁচে মুক্ত হতে পারা সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার।

সেখানে আমাদের দেশে প্রতিটি বিয়েই কঠিন– চেনা নেই, জানা নেই, কবুল হতেই এক বিছানায়। হয়তো কোন কথাবার্তা ছাড়াই প্রথম রাতে সঙ্গম বা রেপ। অতঃপর ঐ এক রাতের অ্যাকশনেই অনেকের গর্ভবতী হয়ে যাওয়া– এক কথায়, বোঝাবুঝি বা মনের খোঁজের আগেই জটিলতা।
আমাদের দেশে অচেনা দু’টো পরিবার থেকে আসা বরবঁধূর জীবনযাপন পদ্ধতি, চাওয়া-পাওয়া, এবং চিন্তা-ভাবনায় বিস্তর পার্থক্য থাকে। তাই পরিবার যৌথ হলে বিয়ের শুরুটি সবারই কঠিন হয়। তদুপরি অনেক পরিবারই ভাবে না যে, সম্পর্কে বর-বঁধূ হলেও তাদের বিয়ে হতেই মিল-মহব্বত এবং সবকিছু বোঝাপড়া হয়ে যায় না।

বিয়ে করা আর এক ছাদের নিচে মিলেমিশে সুখে বসবাস করা দুটো ভিন্ন জিনিস– তাদের বোঝাপড়ার জন্যে সময় দেয়া জরুরি। তাই বিয়ে হলেও পারিপার্শ্বিকতার চাপে অনেক বিয়েতেই বরবঁধূর মাঝে হৃদয়ের বন্ধন গড়ে ওঠে না। অধিকন্তু, যৌথ পরিবারে অনেক মেয়েই শারীরিক আঘাতসহ নানাধরনের অত্যাচারের মুখোমুখি হয়, যেটা বিয়ের ভিতকে আরও নড়বড়ে করে দেয়।

সংসারের শুরুটিই যখন নড়বড়ে, তখন অনেকেই ভাবে, এইতো সবে শুরু– সময়ের সাথে ধীরে ধীরে সম্পর্কটি মজবুত হবে। ততোদিনে হয়ত একটি-দু’টি সন্তানও চলে আসে পরিবারে। মিল-মহব্বত বা বোঝাপড়া তেমন মজবুত না হলেও বিয়ের বাঁধনে তারা আরও জড়িয়ে যায়। দু’জনার মাঝে বোঝাবুঝিহীন এই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা বিয়েটি জীবনের ভারে হয়তো মাঝে মাঝেই হেলে পড়তে পারে। তার মানে এই নয় যে সবসময়ই ভাঙনের পূর্বাভাস। কেননা অনেক সময়ই সমস্যার মূল কারণ স্বামী-স্ত্রী নয়, বরের বা কনের পরিবার। তবে আউট সাইডারের ঈশারায় নিজেদের বিয়ে ভাঙা কাজের কথা নয়। বরং যতো দ্রুত সম্ভব তাদেরকে ত্যাগ করাই উত্তম।

বিয়ে ভাঙনের পূর্বাভাস হলো, যে বিয়েতে স্বামী-স্ত্রী সবসময়ই একজন আরেকজনকে এড়িয়ে চলে, অথবা কথা মানেই ঝগড়া বা শারীরিক হাতাহাতি, দীর্ঘ সহবাসের অনুপস্হিতি, বাইরের লোকের সামনে একজন আরেকজনকে হেয় করা, পরকীয়ায় জড়িয়ে যাওয়া, একজনের সঙ্গ আরেকজনের কাছে অসহ্য মনে হওয়া, পারস্পরিক শ্রদ্ধা চলে যাওয়া, অথবা নিরাপত্তাহীন মনে হওয়া। এমন বিয়ে টিকে যাবার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তারপরও কারও কারও মনে হতে পারে যে, এখনও যদি টিকিয়ে রাখা যায়–বাচ্চার খাতিরে বা নিজের জন্যেই আরেকটু চেষ্টা করলে ক্ষতি কি?
তার মানে সে তখনও তৈরি নয় চলে যেতে।

আমাদের দেশে ডিভোর্সের পরের জীবনটি যেহেতু তেমন আকর্ষণীয় নয়, জীবনটা অনেকটাই নো-সেক্স, নো-পার্টনার ধরনের। অধিকন্তু অন্যের আশ্রয়ে যাওয়া এবং নানা গঞ্জনা। তাই এমন জীবনের জন্যে প্রস্তুত হতে মেয়েদের সময় লাগতেই পারে। ডিভোর্স যেহেতু ‘নো রিটার্ন পলিসি’ তাই জীবনের ঝুঁকি না থাকলে ( শারীরিক হামলা বা প্রাণনাশের আশঙ্কা) যতোটা সময় দরকার, ঠিক ততোটা সময়ই নেয়া উচিত– যেন ভিকটিম হিসেবে ঐ বিয়ে থেকে বের হয়ে না এসে খুশি মনে বের হয়ে আসা যায়।

যেন মনে হয়, জীবনে যাই ঘটুক এর চেয়ে অন্তত ভালো থাকবো। কোনো ভুল হয়নি– রাগের উপর বা দেখিয়ে দিতে ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নেইনি, বরং কোন ভবিষ্যতই ছিল না এই বিয়েতে।

যে কারোরই কাগজের ডিভোর্সের আগে মনের ডিভোর্স হওয়া জরুরি। যেন পরবর্তীতে এক্স চোখের সামনে পঁচিশটি হুর নিয়ে শুয়ে থাকলেও কোনো কষ্ট অনুভূত না হয়, বরং মনে হয় আই ডোন্ট নো হিম। মনের এমন অনুভূতি নিয়ে বিয়ে থেকে বেরুলে পরবর্তী জীবন সহজ এবং সুন্দরভাবে শুরু করা যায়। নইলে হয়তো দেখা যাবে, ডিভোর্সের পরও বর্তমান স্পাউজকে ফাঁকে রেখে এক এক্স আরেক এক্সকে রাত তিনটায় ফোন করছে, আর জন্মদিনে লাভ ইউ’য়ের ফুল পাঠাচ্ছে।
কারও কারও যায় যায় বিয়েকে একপক্ষ তখনও টিকিয়ে রাখতে চাইলে, অন্য পক্ষকে পুশ করা, হেয় করা, বা রাগারাগি করা, অথবা আকুতি-মিনতি করা ইত্যাদি পদ্ধতি কার্যকর নয়। বরং তাকে নিজ থেকে উপলব্ধির সুযোগ দেয়া ফলপ্রসু।

পাশাপাশি দু’একজন ভালো জ্ঞানী বন্ধুর পরামর্শ নেয়া যেতে পারে, যারা এই পরিস্হিতির আপস এন্ড ডাউনস বুঝবে এবং পাত্র-পাত্রীর সিদ্ধান্তকে সম্মান  করবে। এমনকি বার বার প্লান বদল হলে এবং তাদের মতামতের সাথে না মিললেও তারা খুশি মনে পাশে থাকবে। কেননা ডিভোর্সে পাত্র/পাত্রীর মানসিক চাপ ভয়াবহ পর্যায়ের হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই তাদের সময় এবং প্লানের ঘন ঘন পরিবর্তন অতি সাধারণ বিষয়। কেননা ডিভোর্স হলো ‘নো গেইন’ পলিসি।

ডিভোর্সের আগে এবং পরে দু’জীবনেই লক্ষ ব্যথা আছে, জীবনের পথ চলার হাজার চাপ আছে, নিজের ভার বইবার দায় আছে। তাই ডিভোর্সকে একটি শব্দে এবং সাক্ষরে সেকেন্ডেই শেষ করার উপায় নেই। বরং নিজেকে নিজের জীবনের জন্যে তৈরি করাই ডিভোর্সের লক্ষ্য।
পরিবার বা অন্যের উপর নির্ভর করে ডিভোর্স করা চলে না। কেননা তারাও এক সময় মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে। তাই মনকে পুরোপুরি তৈরি করাই ডিভোর্সের প্রথম শর্ত।

ডিভোর্স মানে আরেকজনকে শিক্ষা দেয়া নয়, বরং নিজে মুক্তি পাওয়া এবং নিজের দায় নিজের কাঁধে তুলে নেয়া। অন্য কথায়, আত্মবিশ্বাসী এবং স্বনির্ভর হওয়া। আত্মনির্ভরশীল হতে শিক্ষার ভিত মজবুত থাকলে ভালো, না থাকলেও জীবন কখনও থেমে থাকে না। কেননা অকালে স্বামী মারা গেলেও লক্ষ লক্ষ নারী ভালোভাবেই বেঁচে থাকে।

মানুষের জীবনে ডিভোর্স যেহেতু প্রত্যাশিত নয়, তাই এক পক্ষের অবিরত কম্প্রোমাইজ কোনো বিয়ের জন্যেই শুভ লক্ষণ নয়। বরং বিয়ের শুরু থেকেই যে কোনো অন্যায়-আবদারকে হালকাভাবে নাকচ করা জরুরি। কেননা বিয়ে বা
ভালোবাসা মানে অন্যায়কে মেনে নেয়া নয়, দাসত্ব নয়, পারস্পরিক প্রতিযোগিতা নয়, একের বিরুদ্ধে অন্যের অভিযোগ নয়। বরং আলোচনার মাধ্যমে উভয়ের জন্যে গ্রহণযোগ্য পন্হাটি অবলম্বন করা।

বিয়ের শুরুতেই হরমোনজনিত কারণে মেয়েরা একেবারে গলে না গিয়ে নিজের কন্ঠটি হালকায় চালু রাখলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভবিষ্যতে অত্যাচারিত হয়ে ডিভোর্সের মুখ দেখার দরকার হয় না। বিয়েতে যে যতো মেনে নেয়, তার অত্যাচারিত হবার ঝুঁকি তত বেশি। কেননা মানুষ যতো পায় ততোই চায় এবং হাজার করেও মানুষকে সহজে সন্তুষ্ট করা যায় না।
সমাজের সবাই জানে বিবাহিত জীবনের জ্বালাযন্ত্রণা। মানুষের যার যার জীবন তাকে তাকেই বয়ে নিতে হয়। তাই ডিভোর্স হলে মানুষ কী বলবে, সেটা কোনো ইস্যুই নয়– ওরা আউট-সাইডার।

শেয়ার করুন:
  • 144
  •  
  •  
  •  
  •  
    144
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.