সেলফি রেনেসাঁসের যুগে

শাশ্বতী বিপ্লব: একবিংশ শতাব্দিতে আসিয়া পৃথিবী পুনরায় এক নব জাগরণ বা রেনেসাঁর সম্মুখীন হইলো। যে জাগরণ জ্ঞান, বিজ্ঞান, সাহিত্য , দর্শন , চিত্রশিল্প , ভাস্কর্য , রাষ্ট্র ও সমাজ চেতনা সকল কিছুকে ছাপাইয়া গেল। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নারী-পুরুষ, ধনী-গরীব নির্বশেষে সকলে সেই জাগরণে শামিল হইলো। পৃথিবী এইরূপ জাগরণ আগে প্রত্যক্ষ করে নাই। সে এক পরম বিস্ময় বটে!!

প্রযুক্তির উৎকর্ষের সাথে সাথে মহামারীর ন্যায় দিকে দিকে সেই জাগরণ ছড়াইয়া পড়িলো। ফেসবুক নামক একখানা মহাজাগতিক কর্মক্ষেত্র এই নব জাগরণ ফলাইবার সুযোগ সৃষ্ট করিয়া দিলো। মানব প্রজাতি “প্রচারেই প্রসার” – এই মূলমন্ত্র গ্রহণ করিলো।

selfieনারসিসাস মানব সমাজ আত্মপ্রেমে মগ্ন হইয়া যত্র-তত্র সেলফি নামক একখানি কর্ম সাধনে ব্যস্ত হইয়া পড়িলো। জীবন পণ করিয়া, মরণের ভয়কে তুচ্ছ করিয়া সেলফি তুলিতে লাগিলো। সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্খ হইতে শুরু করিয়া সুগভীর সমুদ্রতল; জল, স্থল এবং অন্তরীক্ষ কিছুই বাদ গেলো না। তাহারা সোজা হইয়া, উল্টা হইয়া, শুইয়া, বসিয়া, দাঁড়াইয়া, জাগিয়া, ঘুমাইয়া কত প্রকারেই না নিজেদের সেলফি বন্দি করিতে লাগিলো।

উৎসব, পার্বণ তো রহিয়াছেই, এমনকি তাহারা মৃত স্বজনের লাশের সহিতও দাঁত বাহির করিয়া সেলফি তুলিলো। কেহ নামাজে সিজদারত অবস্থায়, তো কেহ ভালোবাসা বানাইবার একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তের সেলফি প্রকাশ করিলো। এইভাবে, বিচিত্র মানব প্রজাতি জীবনযাপনের সকল কর্মকাণ্ডই সেলফি বন্দি করিয়া ফেলিলো। কেবল প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দেয়াকালীন সেলফিরই কিঞ্চিৎ অভাব রহিয়া গেলো। তবে, একবিংশ শতাব্দির মানব সভ্যতা তাহারও একখানি নমুনা দেখিবার আশায় পথ চাহিয়া থাকিলো। একবার সাহস করিয়া সেই মহৎ কর্মটি কেহ সম্পাদন করিয়া ফেলিলেই ষোলকলা পূর্ণ হইবে।

তো, এই নব জাগরণের ঢেউ বঙ্গদেশেও আসিয়া পড়িলো। রাজা- প্রজা কেহই এই জাগরণ হইতে বাদ গেলো না। রাজসভায় ব্যাপক হাঁকডাক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হইলো। তাহাদেরও তো কিছু করিতে হইবে, নইলে যে আর মান বাঁচে না। মহা উৎসাহ ও উদ্দীপনায় পরীক্ষা নীরিক্ষা শুরু হইয়া গেলো।

রাণীমাতা তাহার উজির, নাজির, মন্ত্রী, সৈন্য, সামন্ত সকলকে তলব করিয়া পাঠাইলেন। হুকুম জারি করিলেন, “তোমরা কি কেবল বসিয়া বসিয়া ভেরেন্ডা ভাজিবে? চারিদিকে বিপ্লব ঘটিয়া গেলো, আর তোমরা তাহার কিছুই রপ্ত করিতে পারিলে না! এই প্রকার অকর্মণ্য লোকবল লইয়া আমি কি করিবো?”

সকলে চিন্তায় পড়িয়া গেলো। রাণীমাতা নিজে ব্যক্তিগতভাবে কর্মঠ মানুষ। তাঁহার কারণে একদণ্ডও বসিবার জো নাই। এই লইয়া সভাসদগণ সকল সময়ই এক প্রকার মানসিক চাপে ভুগিতে থাকে। কেবল কাজের কথা কাঁহাতক আর ভালো লাগে! জীবনে আমোদ ফূর্তিরও প্রয়োজন রহিয়াছে, নাকি?

যাইহোক, সভাসদগণ উঠিয়া পড়িয়া লাগিলো স্বীয় যোগ্যতার প্রমাণ দাখিল করিবার আশায়। ইতোমধ্যে জনৈক কুলাঙ্গার প্রেমে প্রত্যাখাত হইয়া একজন নারীকে মনের আনন্দে কোপাইয়া ফেলিলো। আহত নারীকে উদ্ধার করিয়া মুমূর্ষু অবস্থায় চিকিৎসালয়ে লইয়া নিবিড় পরিচর্যায় রাখা হইলো, সে বাঁচিবে কিনা তাহা লইয়া সকলে উদ্বিগ্ন থাকিলো।

চারিদিক হইতে ঘৃণা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠিলো। আর যায় কোথায়! মোক্ষম সুযোগ আসিয়া আপনি ধরা দিলো কতিপয় সভাসদের হাতে।

Shaswati 5তাহারা ছুটিয়া গেলেন সেই নারীর কাছে। উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব- পশ্চিম তাকাইলেন না। ঈশান-অগ্নি-নৈঋত-বায়ু তাকাইলেন না। কেবল উর্ধ্বমুখী হইয়া নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ঢুকিয়া পড়িলেন এবং ব্যস্ত সমস্ত হইয়া সেলফি তুলিয়া ফেলিলেন। একই ফ্রেমে বন্দী হইলেন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ঝুলিতে থাকা অচেতন আহত নারীটিও। চেতন থাকিলে তিনি নিশ্চই “সে চিইজ” বলিয়া তাহাদের উৎসাহ যোগাইতে পারিতেন।

অতঃপর, সভাসদগণ স্বীয় কৃতিত্বের প্রমাণ রাখিবার সংকল্পে এবং প্রজাদিগকে উৎসাহিত করিবার অভিপ্রায়ে জীবন, মরণ, মান-সম্মান, মূল্যবোধ, নৈতিকতা সকল কিছুকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শণ পূর্বক  সেলফিখানি ফেইসবুকে পোস্টাইয়া দিলেন।

অমনি দিকে দিকে সাধু সাধু রব উঠিলো। এই না হইলে আমাদের সভাসদ! ধন্য ধন্য পড়িয়া গেলো। সেলফি নামক মহৎ কর্মটি সম্পাদন করিয়া তাহারা মরণাপন্ন নারীকে এবং প্রজাদিগকে যারপরনাই কৃতার্থ করিলেন। সকলে তাহাদের উত্তরোত্তর উন্নতি ও মঙ্গল কামনা করিলো।

(বিশেষ দ্রষ্টব্য: গল্পের প্রতিটি চরিত্র কাল্পনিক। বাস্তবের কাহারো সাথে মিলিয়া গেলে লেখক দায়ী নহে।)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

স্কয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে রোগী ছিল আমাদের তায় সেখানে আমি প্রায় একমাস ছিলাম। এবং প্রতিদিন আইসিইউতে ঢুকে রোগীকে দেখতাম কিন্তু কোন দিনও মাথা, হাত, পা, শরীর তাদের দেয়া পোশাক দিয়ে না ঢেকে ঢুকতে পারতাম না। আর উনারা রীতিমত চুল বের করে পোজ দিয়ে সেল্ফি তুললেন । বাহ্ কি সেলুকাস!!!

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.