নারী নির্যাতন বনাম পুরুষ নির্যাতন

জেসমিন চৌধুরী: একটু আগে এক বন্ধু একটা লেখার লিংক পাঠিয়ে মেজাজটাই খিঁচড়ে দিয়েছে। আজ যখন সারাদেশ খাদিজা নামের মেয়েটার ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত চেহারা ভোলার অক্ষম চেষ্টায় ব্যস্ত, সামান্যতম মানবতা বোধসম্পন্ন প্রতিটা মানুষ যখন একটা নিষ্পাপ নির্যাতিত মেয়ের জন্য হাহাকার করছে, তখন একটি অনলাইন পত্রিকায় একজন পুরুষ সিংহ লিখেছেন নারীর হাতে পুরুষ নির্যাতন নিয়ে।

torture-2নারী নির্যাতন নিয়ে অনেক কথা হয়, কিন্তু পুরুষ নির্যাতন চোখের আড়ালেই থেকে যায় বলে কেঁদে কেটে অস্থির লেখক। আরে ভাই, সূঁই এতো ছোট বলেই তাকে দেখা যায় না, তাও বোঝেন না? এখন ‘হাতী কেন দেখা যায়, আর সূঁই কেন যায় না’ বলে কান্নাকাটি শুরু করলে বিষয়টা কেমন লাগে বলুন তো? পুরুষ নির্যাতন নিয়ে কথা বলার প্রয়োজন আছে, বলুন।  কিন্তু কেন এই হাতীর সাথে সূঁইয়ের তুলনা?  নারী নির্যাতন আর পুরুষ নির্যাতন কে পাশাপাশি দাঁড় করানোর চেষ্টা এই পর্যায়েরই মুর্খতা।

ইনি আবার যেমন তেমন লেখক না, অনেক তথ্য নিয়ে হাজির হয়েছেন। ২০১৫ সালে আইনগত সাহায্য প্রত্যাশী নির্যাতিত পুরুষের সংখ্যা উল্লেখ করেছেন তিনি, কিন্তু আলোচ্য বছরে কতজন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, কতজন সাহায্য চেয়ে পেয়েছেন বা পাননি, আর কতজন নারী সাহায্য চাওয়ার সাহসই অর্জন করতে পারেননি, তার খবর হয়তো তিনি রাখেন না।

গত কয়েকদিনে প্রেমে ব্যর্থ পুরুষের হাতে দু’জন তরুণীর মৃত্যুর খবর এসেছে পত্রিকায়, আর এই সময়ে একজন পুরুষ লিখছেন, পুরুষ নির্যাতনের কথা। কী অদ্ভুত!

মানুষের উপর নির্যাতনের প্রকারভেদে বিশ্বাস করি না আমি। শিশু, নারী, পুরুষ, (এমনকি পশু) যার উপরই হোক না কেন,  সব ধরনের নির্যাতন বন্ধ করার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু এই আর্টিকেলের লেখক নারী আর পুরুষের উপর নির্যাতনের কথা পাশাপাশি টেনে এনে এবং শুধুমাত্র পুরুষ নির্যাতনের উপর আলোকপাত করে নিজের চিন্তা এবং অনুভূতির অগভীরতারই পরিচয় দিয়েছেন।

Jesminআচ্ছা, একজন পুরুষ যখন একজন নারীর হাতে নির্যাতিত হন (অবশ্যই এরকম দু’চারটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা পৃথিবীতে কালে ভদ্রে ঘটে থাকে) তখন নির্যাতনের প্রকৃতি ঠিক কেমন হয়? কী ঘটে সেক্ষেত্রে? বাস্তব কোন ঘটনার কথা জানা না থাকলে আপনাকে কল্পনার আশ্রয় নিতে হবে, এবং আপনার মস্তিষ্ক অতি উর্বর হলেও সারাদিন কল্পনা করে আপনি বড়জোর কী পাবেন?

নির্যাতনকারী নারীটি তার জীবন সংগীর প্রতিটি ইচ্ছার বিরুদ্ধাচারণ করেন, তাকে নিজের ইচ্ছামত চালানোর চেষ্টা করেন , তার টাকা পয়সা নিজের কাছে নিয়ে নেন, তাকে বন্ধুদের সাথে সময় কাটাতে দেন না, বাচ্চাদের উপর অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করেন। এরকম দুঃখজনক কিছু ঘটনা নিজের চোখে দেখেছি বলেই আমি মেনে নিতে বাধ্য যে এসব ঘটনা ঘটে থাকে।

কিন্তু এর উলটো পিঠটা দেখতে গেলে আপনাকে কল্পনার আশ্রয় নিতে হবে না। নিজের পাড়ায় একটা চক্কর দিয়ে আসুন অথবা পত্রিকা খুলুন। কী দেখতে পাচ্ছেন?

এসিড নিক্ষেপ, ধর্ষণ, খুন, ছুরি দিয়ে কোপানো, শরীরের নানান স্থানে ছ্যাঁকা দেয়া, নারী পাচার, বলপূর্বক নারীকে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা (স্বাধীনচেতা নারীকে ‘পতিতা’ বলে গালি দেবার নির্যাতনের কথা ভুললে চলবে না কিন্তু), শিশু এবং বাল্যবিবাহ। কি, ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন? এখনো তো অপেক্ষাকৃত হালকাগুলো (অনেকের দৃষ্টিতে) বাকি থেকে গেল: ইভ টিজিং, স্টকিং, বৈবাহিক সম্পর্কের ভেতরে ধর্ষণ, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানী এবং নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ। হাঁপিয়ে উঠেছেন?

দাঁড়ান, আরো আছে:  নারীর শিক্ষা এবং  চাকরির অধিকার খর্ব করা, তাকে স্বপ্ন দেখতে না দেওয়া, তার উচ্চাকাংখাকে ভেংগে গুড়িয়ে মাটিতে মিশিয়ে দেয়া, তার গায়ের রঙের জন্য তাকে অপদস্থ করা, তাকে পুরুষকেন্দ্রিক পারিবারিক ব্যবস্থা মেনে নিতে বাধ্য করা।

এটুকু পড়তে পড়তে নিশ্চয়ই আপনার মাথায় আরো অনেকগুলো নারী নির্যাতনের উদাহরণ এসে গেছে, কিন্তু সেগুলোকে মাথার পেছন দিকে গুঁজে দিয়ে আপনি মরীয়া হয়ে একটা অস্ত্র খুঁজছেন, কিভাবে কমেন্ট বক্সে গিয়ে আমাকে ঘায়েল করবেন। যুক্তিপূর্ণ কিছু না পেলে ক্ষতি নেই, অনায়াসে আপনি আমার চরিত্র তুলে কিছু বলতে পারেন অথবা অন্য কোনো ব্যক্তিগত আক্রমণের আশ্রয় নিতে পারেন। আমি একজন নারী এবং আমাকে এইটুকু ভার্চুয়াল নির্যাতন করার অধিকার আপনার অবশ্যই আছে।

গত কয়েক বছরে দু’জন নির্যাতিত পুরুষের জন্য দোভাষীর কাজ করেছি আমি, কিন্তু আমাকে যদি প্রশ্ন করা হয় এ যাবত আমার নির্যাতিত নারী ক্লায়েন্টের সংখ্যা কত, আমি তার সঠিক হিসেবই দিতে পারব না। আর সেইসব নির্যাতনের প্রকৃতি? এই দু’চোখে নারীর উপর নির্যাতনের যেসব নমুনা দেখেছি সেগুলো মনের মধ্যে এমন ভাবে গেড়ে গেছে বলেই হয়ত নাকে তেল দিয়ে ঘুমাতে পারি না, আর পুরুষ নির্যাতন নিয়ে লোকজনের আহাজারি দেখলে চুপ করে থাকাও কঠিন হয়ে পড়ে।

অবশ্য আমরা নারীরাও কম যাই না। আমাদের সাহস পুরুষের সহ্যের সীমা অতিক্রম করে দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। আমরা নিজের সৌন্দর্য ঢেকে রাখি না, আবার পুরুষ সেই সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে আমাদের দেহ কামনা করলে তাকে প্রত্যখ্যান করার ধৃষ্টতাও আমরা দেখাই। কাজেই সেই পুরুষ যখন আমাকে কুপিয়ে মারে, তখন সেদিকে না তাকিয়ে কেউ কেউ পুরুষ নির্যাতন নিয়ে লিখতে বসবেন, সেটাই বোধ হয় স্বাভাবিক।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.