রেশমাকে নিয়ে বিতর্ক কতদিন চলবে?

Reshma survives Savarউইমেন চ্যাপ্টার: সাভারের রানা প্লাজার ধ্বংসস্তুপ থেকে ১৭দিন পর উদ্ধার পাওয়া পোশাক কর্মী রেশমাকে নিয়ে বিতর্ক এখনও চলছে। দেশে ও বিদেশে তিনটি পত্রিকায় এই ঘটনাকে সরকারের ‘বানোয়াট কাহিনী’ বলে রিপোর্ট প্রকাশ হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে নানা মহলে নানাভাবে আলোচিত হচ্ছে। তার ওপর রেশমার সাথে কথা বলা নিয়ে গণমাধ্যমের ওপর সরকারের নজরদারি ও কড়াকড়ি আরোপের পর এটি আরও ধোঁয়াশার সৃষ্টি করেছে। তবে সেনাবাহিনী এই ঘটনাকে তাদের বিরুদ্ধে ‘অপপ্রচার’ বলে অভিহিত করে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

বিবিসি বাংলার ‘সাভারে রেশমা উদ্ধার : স্থানীয়রা কী জানতেন?’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘সানডে মিরর দাবি করছে রেশমাকে উদ্ধারের আগের দিন আশপাশের বাসিন্দাদের সরিয়ে দেয়া হয়েছিল এবং গণমাধ্যমের জন্য ভিডিও চিত্রধারণের উপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছিল’।
বিবিসি’র আকবর হোসেন সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে প্রতিবেদনে বলেন, “আসলে কি ঘটেছিল, সেটি জানতে গিয়েছিলাম রানা প্লাজার কারখানা যেখানে ছিল তার কয়েকশ গজ দূরে একটি বাড়িতে। সেই বাড়িটিতে থাকেন হামিদা বেগম। রানা প্লাজা বিধ্বস্তের পর দিন-রাত নিজের বাসা থেকেই উদ্ধার তৎপরতা দেখেছেন তিনি।

হামিদা বেগম বলেন ,“প্রথম থেইকা শেষ পর্যন্ত সব আমরা দেখছি। ২৪ ঘন্টাই আমরা বিল্ডিংয়ে ছিলাম। আমরা সময় জানালা দিয়া সবকিছু দেখছি।” তিনি বলেন, রেশমাকে উদ্ধারের আগের দিনও তারা বাড়িতেই ছিলেন। বাড়ি ছেড়ে দিতে কেউ কোন চাপ কিংবা অনুরোধ করেনি বলেও হামিদা বেগম উল্লেখ করেন।
একই বাড়িতে থাকেন রোজিনা আক্তার। তাকেও জিজ্ঞেস করেছিলাম রেশমাকে উদ্ধারের আগের দিন কোন ধরনের অস্বাভাবিক তৎপরতা তার নজরে এসেছিল কিনা?

রোজিনা আক্তার বলেন, “বাসা থেকে জানালা দিয়ে দেখতাম কীভাবে লাশ নিয়ে যাচ্ছে, কীভাবে সবকিছু সরানো হচ্ছে। সবকিছু দেখতাম।” রোজিনা বলেন, রেশমাকে উদ্ধারের আগের দিন তিনি বাসায় ছিলেন। বাসা ছেড়ে দেবার জন্য কোন অনুরোধ কিংবা চাপ আসেনি বলেও উল্লেখ করেন রোজিনা।
বিবিসি জানায়, রানা প্লাজা বিধ্বস্ত হবার পর থেকেই সেখানে ২৪ ঘন্টা অবস্থান করেন দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের অনেক সাংবাদিক। সরাসরি সম্প্রচার করেছে বাংলাদেশের টেলিভিশন স্টেশনগুলো। কিন্তু সানডে মিরর বলছে, রেশমাকে উদ্ধারের ২৪ ঘন্টা আগে গণমাধ্যমের জন্য ভিডিও চিত্র ধারনের উপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছিল।

কিন্তু এধরনের কোন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়নি বলে জানালেন আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এসোসিয়েটেট প্রেসের বাংলাদেশ প্রতিনিধি জুলহাস আলম। সানডে মিরর যে দিন-ক্ষণের কথা বলছে তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের ২৪ঘন্টার সংবাদ-ভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল সময় টেলিভিশনের সংবাদদাতা সারোয়ার রেজা জিমি। তিনিও বিবিসিকে বলেন,
“আমরা স্বাধীনভাবে কাজ করেছি এবং অঘোষিতভাবেও কোন তৎপরতা চোখে পড়েনি।”
তিনি বলেন, ‘রেশমাকে উদ্ধারের আগে রাত পৌনে একটা পর্যন্ত আমি সেখানে ছিলাম। আমরা স্বাধীনভাবে কাজ করেছি এবং অঘোষিতভাবেও কোন তৎপরতা চোখে পড়েনি।” মি: জিমি বলেন, ঘটনাস্থলের কাছাকাছি গিয়ে চিত্র ধারণ করতেও তারা কোন বাধা পাননি।

লন্ডনের সানডে মিরর এবং বাংলাদেশের আমার দেশ পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী রানা প্লাজা বিধ্বস্তের পর সেখান থেকে এক সহকর্মীর সাথে উদ্ধার পেয়ে রেশমা কাছের এনাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং দুইদিন সেখানে অবস্থান করে।
কিন্তু এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক(জনসংযোগ) জাহিদুর রহমান বলেন, রেশমা তাদের হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, এরকম কোন তথ্য তাদের কাছে নেই।

কয়েকদিন আগে এক সংবাদ সম্মেলনেও তিনি একই কথা বলেন। রেশমাকে উদ্ধারের বিষয়টি নিয়ে দুই একটি খবরের কাগজে সন্দেহ কিংবা প্রশ্ন উত্থাপন করা হলেও সাধারণ মানুষের কারও কারও মধ্যেও এনিয়ে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। এসব সন্দেহ আর প্রশ্নের তৈরি হচ্ছে মূলত লোকমুখে কথার উপর ভিত্তি করেই।
এদিকে, ঘটনার দুমাস পর ব্রিটেনের ডেইলি মেইল, সানডে মিরর এবং বাংলাদেশের দৈনিক আমার দেশ এটিকে ‘সাজানো ঘটনা’ বলে খবর প্রকাশের পর এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী।

বুধবার ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা কয়েকটি দেশি-বিদেশি সংবাদপত্রে এ নিয়ে প্রকাশিত খবরগুলোকে ‘সর্বৈব মিথ্যে’ বলে উল্লেখ করেন।
এই উদ্ধার তৎপরতার সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।
রেশমার উদ্ধার হওয়ার ঘটনা নিয়ে তৈরি এই বিতর্ক ছড়িয়ে গেছে দেশটির সাধারণ মানুষের মধ্যেও।
কেউ কেউ বলছেন, একজন মানুষ ১৭ দিন পর এরকম পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার পাওয়ার পর তার যে মানসিক ও শারীরিক অবস্থা থাকার কথা তা রেশমার মধ্যে আমি দেখিনি। রেশমা যে দীর্ঘদিন ঠিকমতো খাবার বা পানি পাননি, তা রেশমা উদ্ধারের পর তার মুখের ভাব দেখে মনে হয়নি। এতদিন পর আলোতে বের হলে তার চোখে সেটাও সহ্য হবে না।
তবে জনগোষ্ঠির বড় একটি অংশ ঘটনাটি সাজানো তা মানতে রাজি নন।

ঢাকার একজন গৃহিণীর বরাত দিয়ে বিবিসি জানায়, সৃষ্টিকর্তা চাইলে সব পারেন। তিনি চাইলে একজন মানুষকে দীর্ঘদিন জীবন দিতে পারেন।”
তিনি মনে করছেন ঘটনাটিকে হয়ত বা কেউ রাজনীতির ইস্যু বানাতে চাইছেন।

অনেকেই আবার ব্রিটেনের ডেইলি মেইল, সানডে মিরর এবং বাংলাদেশের দৈনিক ‘আমার দেশ’ এর প্রতিবেদনকে সন্দেহের চোখে দেখছেন। তাদের মতে, এই বিতর্ক আর অভিযোগকে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে একটি ষড়যন্ত্র।

অনেকেই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের প্রতিযোগী দেশগুলোকে দুষছেন। তারা বলছেন, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের আরও ক্ষতি করতেই এ ধরনের রিপোর্ট ছাপা হচ্ছে।

এরই মধ্যে দৈনিক আমারদেশ কার্যালয়ে ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন রাইটের মিটিংয়ের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ হলে তা নিয়েও ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সাইমন রাইটের অতীতের কুকীর্তিও সবার সামনে উঠে আসে। ফলে সাধারণ মানুষ এসব প্রতিবেদনকেই ‘সাজানো’ এবং পোশাক শিল্পকে ধ্বংসের ‘পাঁয়তারা’ বলে উল্লেখ করছেন।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.