প্রথা ভাঙা কিংবা ধারা গড়ায় চলুন, শামিল হই  

ফারহানা আনন্দময়ী: আজ সকালে এক আত্মীয়ের সঙ্গে ফোনে কথা হচ্ছিল। কাজিনের মেয়ে ডাক্তার, তার বিয়ে হয়েছে ক’মাস আগে। হঠাৎ বিয়ে, তাড়াহুড়ো করে সামান্য আয়োজনে হলুদও হয়েছে। এরপর পাত্রপক্ষের জোর দাবির প্রেক্ষিতে ঢাকা শহরের অভিজাত এক হোটেলে বিয়ের অনুষ্ঠান করা হয়েছিল, কন্যাপক্ষের আপত্তি হালে পানি পায়নি। এবার বউ শ্বশুরবাড়িতে তুলে নেয়ার অনুষ্ঠান। এবার তাদের দাবি, জাঁকজমক করে হলুদের অনুষ্ঠানের।

anandomoyee
ফারহানা আনন্দময়ী

আমি বললাম, পাত্রপক্ষের সব কথা শুনতে হবে কেন? কেন তাদের সব দাবি মানতে হবে? উত্তর পেয়েছি, “শ্বশুরবাড়িতে মেয়েকে সুখি রাখতে গেলে এগুলো করতে হয়।“ আমি হেসেছি, খুব হেসেছি ফোনের এপারের হাসি ওপারে দেখতে পায়নি।

আমি সেদিনও হেসেছিলাম। অনেক বছর আগে যেদিন আমার সামনে উচ্ছ্বাসি কণ্ঠে শাশুড়ি গল্প করেছেন, তার এক পুত্রকে তার শ্বশুর গার্মেন্টস কোম্পানির মালিক বানিয়ে দিয়েছেন। আরেক বেয়াই তার আরেক পুত্রকে অ্যাপার্টমেন্ট দিয়েছেন। একটুও মন ছোট হয়নি আমার সেদিন। জানি না, আমার স্বামীর ভেতরে বিন্দুমাত্র আক্ষেপ সেদিন জমেছিল কিনা। তবে আমি সেদিনও খুব হেসেছিলাম, এইসব মা-বাবার মিথ্যে বাহাদুরী গল্পে এবং সেইসব পুত্রদের আত্মসম্মানবোধের অভাব দেখে।  

সেদিনের হাসি আর আজকের হাসির মাঝখানে দিন অনেকগুলো গড়িয়ে গেছে, কিন্তু দিনের ভাবনা বেশিরভাগ পরিবারে একই রয়ে গেছে। কোথাও এতোটুকু বদল হয়নি, আলো পড়েনি। কন্যার বাবা-মায়ের, পুত্রের বাবা-মায়ের… উভয়পক্ষেই। কেউ কন্যাকে উপঢৌকন দিয়ে, পাত্রপক্ষের মন জুগিয়ে কন্যাকে বিবাহপরবর্তী জীবনে সুখি রাখতে চাইছেন। আর অপরপক্ষ সেই উপঢৌকন পেয়ে, দাবি পূরণ হওয়ার পুলকে পুলকিত হয়ে নিজেদেরকে সুখি ভাবতে চাইছেন।

অর্থ দিয়ে কোনোদিন সুখ কেনা যায়নি। সাম্প্রতিক অতীতে কত বিয়ে দেখলাম, দুইপক্ষ মিলিয়ে অর্ধকোটি টাকা ব্যয়ে বিয়ে দু’মাস-ছ’মাস না পেরোতেই ভাঙনের সুর বেজে উঠেছে। অর্থ দিয়ে, বিত্ত দিয়ে আপনি বড়জোর স্ট্যাটাস কিনতে পারবেন। কন্যাকে বিয়ের দিন আগাগোড়া হীরে-মুক্তো-স্বর্ণের অলংকারে মুড়িয়ে, নতুন গাড়ি উপহার দিয়ে আপনি আপনার স্ট্যাটাস ঊর্ধ্বমুখি করছেন। আর পাত্রপক্ষ হাজারখানেক বরযাত্রী নিয়ে এসে, অভিজাত হোটেলে পুত্রের আহামরি বিয়ের আয়োজন দেখিয়ে তার আত্মীয়স্বজনের কাছে স্ট্যাটাসের বাহাদুরি করছেন। যেন দেখুন, ছেলে আমি কেমন পরিবারে বিয়ে করালাম! এবার শুধু প্রাপ্তিযোগ!  

আমাদের সমাজে উচ্চবিত্ত পরিবারে হয়তো কন্যার বিয়ের আয়োজন নিয়ে এতো চিন্তা-দুশ্চিন্তার কিছু নেই। কিন্তু একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে একজন পিতা বা মাতা কন্যার কিশোর বয়স থেকেই তার বিয়ের আয়োজন নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। সমাজ তাকে বাধ্য করে এই দুশ্চিন্তা করাতে। একাধিক কন্যা থাকলে তো সেই পিতামাতার আয়ু ক্ষয় শুরু হয়ে যায় শুধু এই বিয়ের আয়োজনের দুশ্চিন্তায়। বিয়ের আয়োজন, এরপর কন্যার অলংকার বানানো, ঘর সাজিয়ে দেয়া, জামাইকে উপহারের নামে যৌতুক দেয়া আরো কত আবদার! সমাজের আর দশটা বিয়ে আয়োজনের জৌলুসের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে কত পরিবারকে যে নির্মম এক প্রতিযোগিতায় নাম লেখাতে হয়!

একটি পরিবারও কি এই প্রথার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারলো না আজ পর্যন্ত? একজন পিতাও যদি সাহস করে পাত্রপক্ষকে বলতে পারে, আমার কন্যাকে আমি লেখাপড়া শিখিয়েছি, স্বনির্ভর করেছি… এই কন্যাই আমার পক্ষ থেকে সবচেয়ে দামী এবং একমাত্র উপহার। কন্যাটিও যদি সাহস করে উঠে দাঁড়িয়ে বলতে পারে, আমি স্বনির্ভর একজন নারী। আপনাদের পুত্রটিও উপার্জনক্ষম একজন পুরুষ। এই বিয়েতে দুই পরিবারের পরিচয় ছাড়া আর অন্য কিছু বিনিময় হবে না। রাজি থাকলে বিয়ে হবে, নইলে নয়।

handsহুম, আপনারা বলতেই পারেন, যত সহজে লিখছেন, বিষয়টি তত সহজ নয়। আমি জানি, সহজ নয়। কিন্তু সহজ করতে চাইলেই সহজ। আগে তো আপনাকে চাইতে হবে, আপনি এই প্রথার বদল চান। আপনার নিজের মানসিকতা বদল করুন। পুত্রকে বড় করতে যে আর্থিক বিনিয়োগ আপনি করেছেন, তা বিয়ে দিয়ে কন্যার পরিবারের কাছ থেকে উসুল করার মতলব ছাড়ুন। এরপর আপনি আপনার সন্তানকে, তা সে কন্যাই হোক আর পুত্র… লেখাপড়া শেখান। আত্মনির্ভরশীল হয়ে গড়ে ওঠার শিক্ষাটা দিন। আত্মসম্মানবোধ শিক্ষা দিন। আপনার পুত্র এটা জানতে জানতে বেড়ে উঠুক, একজন সভ্য, শিক্ষিত পুরুষের জন্যে এটাই সবচেয়ে বড় অপমানজনক তা হলো, শ্বশুরবাড়ি থেকে উপঢৌকন (পড়ুন যৌতুক) নেয়া।

কন্যাও জানুক, আমার শিক্ষার জন্যে আমার মা-বাবা যে বিনিয়োগ করছেন এটাই তাঁদের সর্বোত্তম বিনিয়োগ। বিয়ের অলংকার আর ঘর সাজানোর উপহারের জন্যে যেন তার মা-বাবাকে নতুন করে  বিনিয়োগ করতে না হয়। বিয়েতে অলংকার যদি লাগেই, কন্যা নিজের আয়ে সেই অলংকার গড়াক। বিয়ের পরে ঘর সাজানোর আসবাব পাত্র-পাত্রী নিজেদের আয়েই করবে, সেটা পুত্র-কন্যারা যেমন জানবে তেমন পুত্রকন্যার মা-বাবারাও জানবে। একুশ শতকের আধুনিক মননের তারুণ্য এমনটাই জানবে, মানবে এবং চর্চা করবে, এই চর্চাই যে স্বাভাবিক, তা মেনে নিতে শিখুক আগের প্রজন্মের মা-বাবারা।

কথা শেষ করবো, ব্যক্তিগত একটি প্রসঙ্গ টেনে। কন্যা উচ্চশিক্ষায় বিদেশে গেছে, টিউশন স্কলারশিপ নিয়েই গেছে। কিন্তু এর বাইরে তার ডর্মের খরচ, বইপত্র কেনার খরচ… সেটার পরিমাণও বেশ চাপের অংক আমাদের জন্যে। তবু আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমাদের সঞ্চয়ের বিনিয়োগটা আমরা সম্পত্তি-প্রতিষ্ঠায় ব্যয় না করে কন্যা এবং পুত্রের উচ্চশিক্ষাতেই করবো। আমাদের এই সাহসী এবং ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তে কোনো কোনো আত্মীয়স্বজন চিন্তিত এবং নাখোশ। তাদের ধারণা, এই অর্থ আমরা ওর লেখাপড়ার নিমিত্তে বিনিয়োগ না করে বিয়ের আয়োজনের জন্যে জমিয়ে রাখাটাই অধিক বুদ্ধিমানের কাজ হতো!

তাদেরকে আমার উত্তর ছিল, আমাদের কন্যা এবং পুত্রের বিয়েতে এক রতি স্বর্ণের অলংকারও যেন না দিতে হয়, সেটা নিশ্চিত করতে পারার মতো মানসিক এবং সামাজিক যোগ্যতা যেন আমাদের সন্তানেরা অর্জন করতে পারে, এই জন্যেই আমাদের এই ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ।

আমরা শুরু করেছি, ভাবনার বাতাস আলোমুখি করতে চেষ্টায় ব্রত হয়েছি। সবাই নয়, কেউ কেউ আছেন, জানি এই বাতাস গায়ে লাগানোর কথা নিশ্চয়ই ভাববেন। নিশ্চয়ই আমার মতোই বিশ্বাস করতে শুরু করবেন, কোনো এক আগামিতে কন্যা বা পুত্রের বিয়ের অনুষ্ঠানে ওদের আমন্ত্রিত বন্ধুবান্ধবদের সাথে আমরা মা-বাবাও শুধু বিশেষ অতিথি হয়ে ওদের আনন্দে শামিল হবো, বিয়ের কেক আর গরম কফি খেয়ে আসবো। আমার পরিচিতজন যারা এই লেখা পড়ছেন, মিলিয়ে নেবেন আমার বিশ্বাস।            

শেয়ার করুন:
  • 102
  •  
  •  
  •  
  •  
    102
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.