লাথি না খাওয়া পর্যন্ত পড়ে থাকবে কেন মেয়ে তুমি?

তামান্না ইসলাম: সম্প্রতি কয়েকজন ডিভোর্সি মেয়ের সাথে কথা হয়েছে। ঠিক কোন পর্যায়ে গেলে মেয়েরা ডিভোর্স পর্যন্ত যায়? কেন বাংলাদেশে আজকাল ডিভোর্সের হার বাড়ছে? এই প্রশ্নগুলো আমাদের সবার চিন্তায়, আলোচনায় ঘুরে ফিরে আসে। ডিভোর্স ব্যাপারটি কারো জন্যই সুখকর বা আকাঙ্ক্ষিত পরিণতি নয়। সমাজের জন্যও এটি সহায়ক নয়। বিশেষ করে যাদের ডিভোর্স হচ্ছে তাদের সাথে তাদের সন্তানদেরকেও মানসিক এবং ক্ষেত্র বিশেষে আর্থিক, সামাজিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।

একজন মানুষের পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য, বেড়ে ওঠার জন্য একটি সুস্থ পরিবারের কোন বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে সুস্থ শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেই সুস্থ পরিবার একটি শিশুকে, বালককে সঠিকভাবে লালন করে তাকে তৈরি করে সামনের জীবনের জন্য, সেই একই পরিবার অসুস্থতার শিকার হয়ে বিভীষিকা হয়ে নেমে আসে শিশুটির জীবনে, তার সমস্ত স্বপ্নকে দুঃস্বপ্নেও পরিণত করে।

Child 1বাবা, মায়ের মধ্যে শ্রদ্ধাহীন সম্পর্ক, বৈরি ভাব, নিরন্তর ঝগড়াঝাঁটি, শারীরিক, মানসিক আক্রমণ, সন্দেহ, কটু কথা দেখে দেখে বড় হওয়া সন্তানরা আত্মবিশ্বাসহীন, স্বপ্নহীন মানসিক রোগীতে পরিণত হয়, মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে তারা। কথা হচ্ছে ডিভোর্সকে যদি বলি সমাজের জন্য ক্ষতিকর, সেটা কি এই অসুস্থ পরিবার, অসুস্থ সম্পর্কের বোঝা টেনে নেওয়ার চেয়েও বেশি ক্ষতিকর?  

সম্ভবত না, আর সেকারণেই একাকিত্বের কষ্ট, সামাজিক গঞ্জনা, পারিবারিক বাধা উপেক্ষা করে, অর্থনৈতিক সুখকে পায়ে ঠেলেও মানুষ ডিভোর্সের পথ বেছে নেয়।

তাই ডিভোর্সের হার বাড়ছে মানেই সমাজ রসাতলে যাচ্ছে এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। তবে ডিভোর্স যেসব কারণে হচ্ছে, সে কারণগুলো একটু গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার। যদি এমনটা হয় যে, কারণগুলো আগে যা ছিল, এখনো তাই আছে, শুধু পার্থক্য হলো, মেয়েরা আত্মনির্ভরশীল হচ্ছে, অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হচ্ছে, তাদের আত্মসম্মান বোধ বাড়ছে তাই তারা সাহস করে মুখ বুঁজে পড়ে পড়ে মার না খেয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, উঠে দাঁড়াচ্ছে নিজের পায়ে, তাহলে সেটা বরং সামাজিক উন্নতির লক্ষণ।

কিন্তু কারণগুলো যদি হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন, অর্থাৎ ছেলেরা এবং মেয়েরা কেউই আর কাউকে বিশ্বাস করছে না, সম্মান করছে না, কেউ কারো সাথে কিছু ভাগাভাগি করে নিতে রাজি না, সেটা সাফল্যই হোক আর কষ্টই হোক, সবাই শুধু স্বার্থ হাসিলে ব্যস্ত, একজন আরেকজনের উপর সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে এবং সম্পর্কটাকে সিরিয়াসলি নিচ্ছে না তাহলে সেটা ভিন্ন কথা।

আমি যাদের সাথে কথা বলে দেখেছি, অথবা বিভিন্ন লেখা পড়ে যতোটুকু বুঝেছি, পরের কারণগুলোতে যে ডিভোর্স হচ্ছে না তা নয়। আমরা একটা প্রজন্মকে দেখছি যারা বড় হচ্ছে সোশাল মিডিয়ার যুগে, ওরা সম্পর্ক গড়ছে, ভাঙছে, সিরিয়াসলি নিচ্ছে না, এটা দু তরফাই হচ্ছে। কিন্তু এদের বাইরে দেশের যে বিরাট এক অংশ, সেখানে শিক্ষিত মেয়েরা, তাদের পরিবারের চিন্তা ভাবনাও সেই নিম্ন মধ্যবিত্তদের মতোই রয়ে গেছে এখনো এই একটি ক্ষেত্রে। এখানে মেয়েরা এক তরফা, আপ্রাণ চেষ্টা করে যায় বিয়েটাকে  টিকিয়ে রাখার জন্য। শিক্ষিত পরিবারের উচ্চ শিক্ষিত, উপার্জনশীল মেয়েরাও এই কাজ করে। স্বামী গায়ে হাত না তোলা পর্যন্ত, বা চূড়ান্ত পরকীয়ায় জড়িয়ে না পড়া পর্যন্ত দাঁতে দাঁত চেপে এরা সংসার কামড়ে পড়ে থাকে। সম্পর্কে ঝামেলা শুরু হলে মেয়েরা কাছের মানুষ, নিজের পরিবারের কাছেও মুখ খুলতে লজ্জা পায়, স্বস্তি পায় না।

যেন, সংসার ঠিকঠাক মতো চলছে না, স্বামী তাকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয় না, বনিবনা হচ্ছে না এইসব কিছুর দায়ভাগ মেয়েটির একা, এটা মেয়ে হিসাবে তার বিরাট ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতার গ্লানি ঘাড়ে নিয়ে কারো কাছে মুখ খুলতে নিজের কাছেই বড় বেশি ছোট লাগে। আমাদেরকে কেউ শেখায়নি যে বিয়ে টিকিয়ে রাখা বা সফল করার দায়িত্ব দুজনের, যেকোনো একজনের অপারগতায় সেটা ভেঙ্গে যেতে পারে, ব্যর্থ হতে পারে, তার মানে এই না অন্য মানুষটি সাড়া জীবনের জন্য হেরে গেলো, বা সে কারো করুণার পাত্র হয়ে গেলো।

আরেকটি বড় কারণ, পরিবারের কাছ থেকে সাপোর্ট না পাওয়া। অনেক সময় পরিবার মেয়েটির কথায় কানই দেয় না, বা হালকা করে দেখে। “সবাই পারছে, তুমিও পারবে।” মা, খালারা বলবে “আমাদের জীবনও এরকমই ছিল, এ আর নতুন কী? মেয়েদের জীবন মানেই তো এরকম।”

উল্টো পারিবারিক সম্মান আঘাতপ্রাপ্ত হতে পারে বলে মেয়েটাকেই হয়তো বকে দেয়, “এসব কথা মুখেও আনবে না, ছেলেরা একটু এরকমই হয়। প্রার্থনা করো, সব ঠিক হয়ে যাবে সময়ে।” এইসব দম্পতির যদি বাচ্চা থাকে তাহলে তো আর কথাই নাই। সব মায়ের কাছেই তার সন্তান সবচেয়ে মূল্যবান। মায়েরা  প্রকৃতির নিয়মেই সন্তানকে নিজের চেয়ে বেশি ভালবাসে। সেজন্যই হয়তো সন্তানের মঙ্গলকে নিজের ভালো থাকার চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয়।

এজন্য বিবাহিত জীবনের হাজার ঝড় ঝাপটার মাঝেও নিজেই নিজেকে অবিরাম বোঝাতে থাকে “আমি এইসব কিছু সহ্য করছি আমার সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে।” অভিভাবকরা এই বুঝ দিতে থাকে “বাচ্চাটার কথা একবার ভাবো মা, ওর কী হবে? ও কী দোষ করেছে? ওর দিকে তাকিয়ে সব মেনে নাও।”  কিন্তু বাচ্চার কী হবে সেই চিন্তা কী একা মায়ের? বাবার কোনো দায়িত্ব নেই? আমার ধারণা মায়েদের এই দুর্বলটার কথা বাবারাও জানে। আর তাই তো কোনো কোনো বাবা, সন্তানের বাবা হয়ে যাওয়ার পরেও সেই পরমপ্রিয় সন্তানের মায়ের গায়ে হাত তুলতেও দ্বিধা করে না।

সম্পর্কের দূষণটাকে যদি সেই পর্যন্ত টেনে নেওয়া অবধি অপেক্ষা করা হয়, তাহলে কার ভালো হয়?  সন্তানের? না স্বামীর, না স্ত্রীর? কেন আকতার জাহানের মতো মেয়েরাও ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নিতে যতক্ষণ না শারীরিক নির্যাতন হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত অপেক্ষা করে? অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিত, বাইরে থাকা মেয়েরাও সামাজিক এবং পারিবারিক চাপে ফসিল হয়ে এমনকি বাচ্চা না থাকলেও এধরনের ভুল করে। বন্যা আহমেদের মতো শক্ত মহিলা তার লেখাতেও সেদিন পড়লাম তার প্রথম স্বামী শারীরিক নির্যাতন করার পর তিনি ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নেন।

আমাদের দেশের নিম্নবিত্ত এবং নিম্নমধ্যবিত্ত মেয়েদের দেখেছি নিজেরা মানুষের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাচ্ছে, মাতাল স্বামীর তিন নম্বর বউ হয়ে “আমার একজন স্বামী আছে” এই নেমপ্লেট কিনছে।  অনেকেই বলে অর্থনৈতিক পরাধীনতার জন্যই এইসব বিয়ের দরকার তাদের। কিন্তু আমি তো দেখেছি, তারাই বরং সংসারের রুটি-রুজি করছে। মাথার ঘাম, পায়ে ফেলে কয়েক বছরের উপার্জন করা টাকা ওই সো-কলড বিবাহিত স্বামীর হাতে তুলে দিলেও, সমাজের খুব বেশী পরোয়া তারা করে বলে আমার মনে হয় না, কিন্তু এই সমাজই তাদের মাথায় গেঁথে দিয়েছে স্বামী না থাকা মানে তুমি ব্যর্থ, তোমার জীবনে কিছু নেই, তুমি অরক্ষিত, ভোগের সামগ্রী। দশ জনে লুটে পুটে খাবে তোমাকে। বিবাহিত হওয়াই নারী জন্মের একমাত্র সার্থকতা।

শিক্ষিত, স্বনির্ভর মেয়েরা, “লাথি না খাওয়া পর্যন্ত মাটি কামড়ে পড়ে থাকবো” এই মহান ব্রত ভেঙ্গে ভেবে দেখুন বিয়েটা টিকিয়ে রাখতে হলে সম্পর্কটা গড়ে তুলতে হবে দুজনকেই। পারস্পরিক ভালোবাসার পাশাপাশি দরকার আছে শ্রদ্ধার, বিশ্বাসের, দরকার আছে একজন আরেকজনের সাংসারিক কাজে এবং দায়িত্বে হাত বাড়িয়ে দেওয়ার। সংসার চালানোটা সমানভাবে ভাগ করে নেওয়ার। দরকার আছে একজনের বিপদে আরেকজনের পাশে দাঁড়ানোর।

আপনি যদি মনে করেন আপনার স্বামী আপনাকে একজন মানুষ হিসাবে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করে না, আপনার ঘাড়ে চাপিয়ে দেয় সংসারের সমস্ত দায়িত্ব, এক তরফা সেবা আশা করে, আপনার স্বাধীনতা নেই আপনার উপার্জিত অর্থ খরচ করার, সামান্য প্রশংসা বা স্বীকৃতিও আপনি পান না তার কাছ থেকে, অনর্থক সন্দেহ করে, গালাগালি করে, মানসিক কষ্ট দেয়  এগুলো কোনটাই কিন্তু সুস্থ সম্পর্কের লক্ষণ না। একমাত্র “আমার গায়ে হাত তুলে না বা মেয়ে মানুষের দোষ তো নেই”, এই দুটো স্কেলে স্বামিত্বের পাস মার্ক হয় না।  

শেয়ার করুন:
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
    2
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.