কেন আমি একা?

ফেরদৌস কান্তা: ইদানিং মনে হয় অনন্তকাল ধরেইকেন আমি একাপ্রশ্নটা শুনতে হবে! অপরাধ আমি মেয়ে। তাই কোন সিদ্ধান্ত নিজে নিয়ে ফেলাটা কখনো বেয়াদবি, কখনো বা অন্যায়। সমাজ ভাবি যাকে, তার সঙ্গে পরিচয়ের শুরু পরিবার থেকেই। দিন বদলাতে আমরা বদ্ধপরিকর। কিন্তু প্রথম খামচিটা বেশির ভাগ সময় আসে নিজের পরিবার থেকেই। অন্যের বেলায় আমার মা সহজে যেভাবে একটা মতামতে পৌঁছে যান, ঠিক ততোটাই রাগ বা বিরক্তি আমার বেলায়, একইরকম সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে। একই কথা ভাইবোনদের ব্যাপারেও।

পছন্দের বিয়েতে মিলেমিশে থাকার দায়ভার প্রায়শই শুধু মেয়েটির। এই দায়ভারে ক্লান্ত মেয়েটি নিঃশেষ হয়ে শেষবারের মতো বাঁচতে চাইলে, জাত গেল গেল বলে রব ওঠে।

maজীবন নিয়ে হিসাব ছিল না, আর চাওয়াপাওয়াও ছিল সীমিত। আশেপাশের, কাছেরদূরের কেউ বলতে পারবে না কখনো কারো খারাপ চেয়েছি। তাই জীবনের সাথে প্রতিটি পদক্ষেপেই সমঝোতা করতে চেয়েছি একসময়। পছন্দের জীবনসাথীকে সংসার জীবনে এসে যতই অপছন্দ হোক, সহ্য করাটাই নিয়ম। নিয়ম ভাঙার চেষ্টায় শুনেছি, “চয়েজ ওয়াজ ইউরস, এডজাস্ট জাস্ট।সুতরাং বার বার ফিরে গেছি জাস্ট এডজাস্ট এর পথে।

বিবাহপূর্ব পরিচয়ের সময়টায় ছিলাম সহপাঠী। তার মাদকাসক্তির ব্যাপারটা ছিল অজ্ঞাত। রাজনীতি আর বিশাল পরিসরের বন্ধুবান্ধব নিয়ে তার রাজকীয় চলাফেরা এখনও গল্পের খোরাক হয়ে আছে। কিন্তু ২৪ ঘণ্টা একসাথে থাকতে গেলে অনেক কিছুই জানা হয়ে যায়। তার মাঝে কিছু হজম হয়, কিছু এডজাস্ট, আর কিছুদিন পর বদহজম হতে থাকে। সেটা নিয়মে পরিণত হলে, চারপাশের মানুষগুলি টের পাওয়া শুরু করে ঠিকই। মুখ খোলার আগেই পরামর্শ আসে আপনজনদের কাছ থেকে, পুরুষদের একটুআধটু দোষ থাকেই, মানিয়ে নিতে হয়। তার পরিবারও বেশ গর্বিত ছিল তার উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনে। হায় মানিয়ে নেয়া! ততদিনে না চাইতেই সল্প সময়ের সংসারে একসন্তান  চলে এসেছে।

বাবা মা আত্মীয়পরিজন, পাড়াপ্রতিবেশীরা আজো ভাবেন, সন্তানই সম্পর্কের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। একটা বাচ্চা মানে, পুরুষটি এই বাচ্চার টানেই সংসারি হবে এবং সুখেশান্তিতে বসবাস করবে। তাই যতবার নিজের দম বন্ধ হয়ে আসার কথা ফ্যামিলিতে বলতে বা বোঝাতে চেয়েছি যে, সত্যি আর পারছিনা, ততবারই শুরু হয়েছে সম্পর্ক জোড়া লাগানোর তোড়জোড়

কিন্তু কিভাবে? যেখানে সম্পর্কের নানামুখী সুতাগুলি ক্রমাগত খারাপ ব্যবহার, অবহেলা, অত্যাচার আর অসংযমী আচরণে সবগুলি ছিঁড়ে যাচ্ছে! এত গিঁট নিয়ে কী সামনে আগানো যায়? কাছের সবার ভ্রূকুঞ্চিত ছিল, যখন একাই সিদ্ধান্ত নিলাম ডিভোর্স চাই, ব্যাস, আমার দোষ খোঁজা শুরু হয়ে গেল। প্রথম দোষ, মেয়েদের এত রাগজিদ থাকতে নাই। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার শেষ অস্ত্র ছিল আমার ভুক্তভুগি ছেলেটা। কিন্তু কেউ বুঝতে চাইল না প্রতিদিনের কুৎসিত ঝগড়াঝাটির প্রথম বলি হতে চলেছে আমার বাচ্চাটা। ফলে আমি প্রতিবাদী হচ্ছিলাম। গালাগালি আর মারামারি নিত্যদিনকার রুটিন হয়ে দাঁড়াল। ঝগড়া হলেই প্রথম দিকে বাচ্চাটা ভয়ে কেঁদে উঠত। আস্তে আস্তে ঝগড়ার হিংস্রতায় সে ভয়ে খাটের এক কোণে ঢুকে বসে থাকত। কতই বয়স তখন ওর, দেড় থেকে দুই!

kanta
ফেরদৌস কান্তা

সংসারহীন সংসারটা ছিল আমার একার ঠেকা। সংসার, বাচ্চা পালা, বাজার, রান্না, আর হঠাৎ হঠাৎ সোয়ামির মনোরঞ্জন একসময় এতই অসহ্য ঠেকল যে শুধু আত্মহত্যার কথা ভাবতাম। চারপাশের চাপ আমাকে পাগল করে দিচ্ছিল। একসময় মুক্তি হিসাবে ভাবতাম, কোন খাবারে বিষ মিশিয়ে মাছেলে একসাথে খেয়ে ফেলি। মানসিক, আর্থিক, শারীরিক প্রতিটা ব্যাপারে আমি শুরু থেকে ভুগেছি। আমার মা চাকুরিজীবী ছিলেন বলে ছেলেটার তেমন অযত্ন হয়নি। সন্তানের প্রতি তার টান হঠাৎ হঠাৎ উথলে উঠত। আবার হারিয়েও যেত। আমি আর্থিক কষ্টে ভুগলেও তার বিলাসবহুল জীবনযাত্রায় বাধা পড়েনি কখনোই।

মরার আগে একবার সাহস করে বাঁচতে চাইলাম। লইয়ার বান্ধবীর সাহায্যে ডিভোর্স ফাইল করলাম। কেউ কেউ পাশে দাঁড়ালো, কিন্তু নিজের বাসা থেকে সেই সাপোর্টটা পাইনি। এখন বুঝি কথাটার অর্থ, মেয়েদের নিজের বাসা বলে আসলেই কিছু নাই। বাচ্চার ভবিষ্যতের ভয়াবহ দিক দেখিয়ে আমাকে ফেরানো হল সংসারহীন সংসারে। সেও সবার সামনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হল ভালো হবার। ফিরলাম আমি একবুক তীব্র ঘৃণা নিয়ে। বেঁচে থাকার চেষ্টায় আরও বেশি মরলাম। মাঝে মাঝে কেবল ছেলেরমা’-ডাকে মনে হত আমি কেন মরব? কিন্তু পারছিলাম না কিছুতেই। ভালো মানুষ হবার প্রতিশ্রুতি তাকে আরও হিংস্র করে তুলল দিনের পর দিন।

শেষ দেখতে চাইলাম শেষবারের মতো। আবার ডিভোর্স ফাইল করলাম। সংসার ছাড়লাম কারো পরামর্শের ধার না ধরেই। এবার সবাই পাশে। যদিও কুৎসিত বাস্তবতার মুখোমুখি হতে গিয়ে হারিয়েছি জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলি। সম্পর্ক থেকে বের হতে চাইলাম বলে এর মাঝেই চলল মানসিক অত্যাচার। নানান ভয়াবহ নোংরা মেসেজ,  হুমকিধামকিতে আমার দিনরাত অস্থির হয়ে গেল। তবুও অটল রইলাম। আর সে অতিরিক্ত মাদকাসক্তির ফলে গেল মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে। তার পরিবার হঠাৎ করেই  ছেলের সুখি জীবনের প্রত্যাশায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠল। যদিও আমার বাচ্চাটা তাঁদের পরিবারের একমাত্র উত্তরাধিকারী হওয়া সত্ত্বেও কোনোদিন ভালো করে খোঁজখবর করেননি তাঁরা। আমি তাঁদের ছেলেকে ছেড়ে দিলাম এটা খুব সম্মানে লাগল বুঝি! আমাকে যেভাবেই হোক ফেরত নেবার প্রত্যাশা জানালেন তাঁরা

কিন্তু বিধি বাম! এক মধ্যরাতে স্ট্রোক করে তাঁদের সুপুত্র মাদকাসক্তি কেন্দ্র থেকে হাসপাতারে, আর রাত না পেরুতেই জীবনের মায়া ত্যাগ করল। খবরটা শুনে খুশি হয়েছিলাম না দুঃখ পেয়েছিলাম মনে নাই। তবে তার কথা মনে হলে মুখ শক্ত হয়ে যায়, ভাবি, এত সহজ মৃত্যু পাওনা ছিল না তার কিছুতেই।

আমি কী মুক্ত হলাম! এবার অন্য ধরনের যন্ত্রণা, কেন আবার বিয়ে করিনা? একা কেন? একা থাকা ঠিক না। তাছাড়া বাচ্চা বড় হয়ে যাচ্ছে, নানান লজিক। একা থাকার সুবিধাঅসুবিধা নিয়ে নানান তর্ক। আমার কাছে সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে হাতপা ছড়িয়ে নিজের মতো আরাম করে ঘুমানোই একা থাকা। মাছেলের ছোট্ট সংসারে অনেক কিছুর ঘাটতি আছে, কিন্তু শান্তি আর ভালোবাসার কোনো অভাব নাই।

অসুবিধা? পরিচিত অনেক পুরুষমুখ সান্ত্বনা দেবার ছলে দেখা করার, কফি খাবার, কিংবা গল্প করার অজুহাত খোঁজে, তবে অবশ্যই সবার কথা বলছি না

মৃত আমি যে স্বকীয়তায় ফিরেছি তার কৃতিত্ব যতটা আমার একার, ততটাই আমার প্রিয় বন্ধুদেরও। এই বন্ধুদের তালিকায় ছেলেমেয়ে উভয়েই আছে। তাদের ভালবাসা, বিশ্বাস, শ্রদ্ধা আর আস্থা আমাকে আজকের আমিতে দাঁড় করিয়েছে। তারাও যখন মাঝেমাঝে বলে, ভাল দেখে বিয়ে করে ফেল, আমি মাঝেমাঝে হাসি, মাঝেমাঝে বিরক্ত হই, কখনো ভাবি। শুধাই , যদি ভাল না হয়? আমার বাচ্চাটাকে যদি ভালো না বাসে? যেমন আছি ঠিক এভাবেই আমাকে মেনে নেবে? যদি আবার বের হয়ে আসতে চাই? তখন তোরাই সবার আগে বলবি, আমারই সমস্যা। আমি অ্যাডজাস্ট করতে চাইনা।

জবাব, একটু তো মানিয়ে নিতেই হয়! দিন শেষে কাউকেই বোঝাতে পারিনা, জীবন থেকে অ্যাডজাস্ট শব্দটাই হারিয়ে গেছে। একটু একটু জীবনে ফেরা এই আমি বেশ ভাল আছি। আমার এই আমিকে মেনে নিয়ে কেউ জীবনে এলে ভেবে দেখবো। কেউ না এলেও সমস্যা নাই। খুব ভাল আছি। আর তাই আমি একা আছি

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.