মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, অবলম্বন যখন আপনিই

প্রীতি ওয়ারেছা: আজ থেকে ছয় মাস আগে আমার পুত্র ওয়াসিফ চোখ ভর্তি পানি নিয়ে আমার কাছে এসে বসলো।

ওয়াসিফ: মা, প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করার উপায় কী?

মা: চোখভরা পানিকে উপেক্ষা করে বললাম- প্রথমে অনুমতি নিতে হবে।

ওয়াসিফ: অনুমতি নাও, আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চাই।

মা: খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না হলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেখা করার অনুমতি দেবেন না। বলো, তুমি কেন দেখা করতে চাও?

priti-waresa
প্রীতি ওয়ারেছা

ওয়াসিফ: আমার বিষয়টিও খুব গুরুত্বপূর্ণ। দেখো, আমাদের স্কুলে ১৫-২০টি খেলার মাঠ আছে অথচ প্রিন্সিপ্যাল স্যার আমাদের খেলতে নিষেধ করে দিয়েছেন। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ করতে চাই।

মা: এটা খুব ছোট্ট একটি বিষয়। তুমি বরং এক কাজ করো কয়েকজন বন্ধু মিলে প্রিন্সিপ্যাল স্যারের কাছে যাও। সরাসরি তাকেই বলো যে তোমরা খেলতে চাও। দেখবে তিনি রাজি হয়ে যাবেন। ডে’ শিফটে পড়ো, তোমাদের বাসায় ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে একারণেই হয়তো তিনি ছুটির পরে খেলতে নিষেধ করেছেন।

ওয়াসিফ: তুমি জানো না, টিফিনের সময়েও খেলা নিষেধ। এতোগুলো মাঠ অথচ খেলা যাবেনা। তাহলে কেন এই স্কুলে ভর্তি হলাম!

মা: আচ্ছা বুঝলাম। তাহলে প্রধানমন্ত্রীর সাথে তোমার দেখা করতেই হবে?

ওয়াসিফ: হ্যাঁ। মা, দেখা হলে প্রধানমন্ত্রীকে আমি কী ব’লে ডাকবো?

মা: প্রটোকল মোতাবেক একটা সম্মোধন নির্ধারণ করা আছে। সবার জন্য সেটা প্রযোজ্য। আমাকে বলো, তুমি কোন সম্মোধনে তাঁকে ডাকতে পারলে খুব খুশি হতে?

ওয়াসিফ: দাদী।

মা: ঠিক আছে। আমি জানি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তোমার এই ডাকে খুশি হবেন। তাঁর বাবা বঙ্গবন্ধুও পাড়ার নাপিত, সবজিওয়ালা কিংবা ঘাটের মাঝি সবার কাছেই ভাই ছিলেন। ভাই সম্মোধন দেশের প্রেসিডেন্টকে একটুও বিব্রত করেনি, উল্টো তিনি সেই সম্মোধনকে প্রশ্রয় দিতেন। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও কারো কাছে বুবু, কারো কাছে আপা, কারো কাছে দাদী, কারো কাছে নানী।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের বাইরে অবস্থান করছেন এই তথ্যটি জানিয়ে ওয়াসিফের অভিযোগপর্ব স্থগিত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে সে আর বিষয়টি উত্থাপন করেনি। সন্তানের মনে বিষয়টি যাতে আর না আসে এই ভয়ে ভয়ে আমিও ভান ধরে ভুলে আছি।

তবে আজ খুব সুন্দর একটি দিন। বলেই দেয়া যায়। শুভ জন্মদিন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আমাদের ছোট ছোট অভিযোগ জানানোর জন্যেও আমরা আপনাকেই স্মরণ করি। করতেই থাকবো। দীর্ঘজীবী হোন। আমাদের সন্তানদের পথ প্রদর্শক হিসেবে আপনাকে অনেকদিন বাঁচতেই হবে। ঢাকা শহরে বাস করে প্রায় এক কোটি স্কুলগামী ছাত্রছাত্রী। তারা পড়ালেখা করা মাংসপিণ্ডর একেকটি যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই না। মা হিসেবে এটা কী যে অবর্ণনীয় কষ্ট! চোখের সামনে সন্তানকে বড় হতে দেখছি, কিন্তু মানুষ হতে দেখছি না। কার কাছে কষ্টের কথা বলবো! আপনাকেই তো জানাবো, আপনাকেই তো জ্বালাবো!

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী-

আমার সন্তানটিকে তখনও ভালো কোন স্কুলে দিতে পারিনি। বাড়ির পাশে একটি টিউটোরিয়ালে পড়ে। ভালো স্কুল বলতে খুব ভালো রেজাল্ট করে সেরকম স্কুলকেই বোঝে সবাই। তবে আমি খানিকটা বেশি বুঝেছিলাম। কোন ভবনের শুধু গ্রাউন্ড ফ্লোরের কয়েকটি রুমওয়ালা স্কুলকে আমার কখনোই স্কুল মনে হয়নি। খোয়াড় মনে হতো। তাইতো, ঢাকার প্রসিদ্ধ একটি স্কুলের পাশ দিয়ে আমি যখনই যেতাম রীতিমত মুগ্ধ হতাম। তৃতীয় শ্রেণীতে সেই স্কুলে ভর্তির সুযোগ পাওয়া যায়। সন্তানের কাছে আমি একটি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম- ‘বাপ, তুই যদি এই স্কুলে ভর্তি হতে পারিস তাহলে সারাজীবন আমি আর তোকে পড়ালেখার কথা বলবো না’। আমি জানতাম, চারপাশের পরিবেশ মানুষকে পরিবর্তন করে। স্কুলের বিশাল গণ্ডি আমার সন্তানকেও সাহায্য করবে বিভিন্নভাবে।  

ডে’ শিফটে ক্লাস শুরু হয় বেলা ১টা থেকে,  কারণেই তারা খেলাধুলার সুযোগ পায় না। টিফিনের সময় যেটুকু পায় টিফিন খাওয়া বাদ দিয়ে শুধুই খেলে। মাঝে মাঝে ব্যাট বল নিয়ে যায়, আবার মাঝে মাঝে ফুটবল। একদিন স্কুল থেকে এসে ওয়াসিফ আমাকে জানালো, টিফিন পিরিয়ডে খেলার সময় স্যার ব্যাট সিজ করে নিয়ে চলে গেছে। শুধু তারই না আরো কয়েকজনের। কান্নাকাটি করে চাওয়ার পরেও ব্যাট ফেরত দেয়নি। মাত্র সপ্তাহখানেক আগে তিন হাজার টাকা দিয়ে ব্যাটটা কিনে দিয়েছিলাম। এই ঘাটতি পূরণ করা যেকোনো মধ্যবিত্ত অভিভাবকের জন্যেই ভীষণ কষ্টকর।

হাজার হাজার ছাত্র পরিচালনা করতে গেলে কিছু সমস্যা থাকবেই। সেটাকে উদারভাবে এবং অবশ্যই কৌশলগতভাবে হ্যান্ডেল করাটা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। তারপরেও আমি বলবো এটা একটি সাধারণ সমস্যা। প্রকট সমস্যা হলো কয়েকটা স্কুল বাদে আমাদের সন্তানদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের কোন সুবিধা ঢাকার প্রায় পঁচানব্বই ভাগ স্কুলেই নেই। একটা ফ্লোর-একটা স্কুল। এটাই এসময়ের ব্যবসায়ীদের চিন্তাধারা।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমাদের মতো আমাদের সন্তানরাও আপনাকেই অবলম্বন ভাবে। যেমনটি ভেবেছে ওয়াসিফ। যেন সব সমস্যার সমাধান কেন্দ্র আপনি। তবে জনে জনে কতজনকে দেখা করার সুযোগ দেয়া আপনার পক্ষে সম্ভব! আমরা চাই স্থায়ী একটি সমাধান। চাই সুস্থ শিশু, সুযোগের অভাবে বিকাশ প্রতিবন্ধী শিশু নয়। আবারো শুভ জন্মদিন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী!

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.