নারীবাদী নই, পুরুষবাদীও নই, আমি মানবতাবাদী

আফরিন শরীফ বিথী: প্রশ্ন দিয়েই শুরু করি। নারী অধিকার কী? যদি নারী অধিকার বলতে কোন প্রত্যয় থাকে, তাহলে পুরুষ অধিকার বলতে কিছু নেই কেন?

মানসিক, শারীরিক, সামাজিকভাবে শুধু কি নারীরাই নির্যাতিত হয়, পুরুষরা হয় না? শারীরিক গঠনের ভিন্নতার কারণেই পুরুষেরা নারীদের তুলনায় বেশী শক্তিশালী হয়, নাকি সমাজ আর ধর্ম পুরুষদের মানসিক শক্তির যোগান দেয় বলেই পুরুষরা দৈহিকভাবেও শক্তিশালী হয়ে ওঠে?

……এমন প্রশ্ন করলে শুধু প্রশ্ন করেই পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা শেষ করা যাবে। বরং উপরোক্ত প্রশ্নগুলোর প্রেক্ষিতে এবার আমার সহজ সরল চিন্তাগুলোর বিশ্লেষণ করি।

Afrin
আফরিন শরীফ বিথী

আচ্ছা নারী অধিকার বলতে কি নারী হয়ে জন্মানোর কারণে যেসব অধিকার পাওয়া উচিৎ, সেসব অধিকার? তাহলে তো নারীত্বের বৈশিষ্ট্যের কারণে মা হওয়ার অধিকার, বউ হওয়ার অধিকার, এমনকি সমাজের প্রচলিত ধারা অনুযায়ী নারী হয়ে জন্মানোর অপরাধে নির্যাতিত, অবহেলিত, বঞ্চিত হওয়ার অধিকারও বুঝায়! এসব অধিকার পেতে নিশ্চয়ই আপনার লড়াই করতে হচ্ছে না, এমনিতেই সে অধিকার সমাজে প্রতিষ্ঠিত আছে।

তাই “নারী অধিকার” না বলে নারীর ন্যায্য অধিকারকে মানবাধিকার বলাটাই আমার কাছে বেশি যুক্তিযুক্ত মনে হয়। নারীরাও যে মানুষ, শুধু এই যুক্তিতেই একজন পুরুষের যা করার অধিকার আছে, একজন নারীরও তা করার অধিকার আছে। যদি নারী-পুরুষের সমান অধিকার আপনি মানতে না চান তাহলে আপনাকে প্রমাণ করতে হবে নারীরা মানুষ নয়।

অথবা একজন পুরুষ যা নির্দ্বিধায় করতে পারে একজন নারীর তা করার ইচ্ছে সৃষ্টি হওয়া অনুচিৎ কেন, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তার যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা আপনাকে দিতে হবে। অথবা নারীর মনে সেই ইচ্ছে সৃষ্টি হওয়া আপনাকে বন্ধ করতে হবে। কী করে পারবেন তা! সম্ভব না। কারণ জন্মলগ্ন থেকে বায়োলজিক্যালিই সেই ইচ্ছে পোষণের সফটওয়্যার নারীর মস্তিষ্কে সেটিং করা আছে।

আর হ্যাঁ অধিকার মানে অবশ্যই স্বেচ্ছাচারিতা নয় সেটা মনে রাখতে হবে। যা খুশি তাই করতে চাওয়াটাই অধিকার নয়। নারীর যে কর্ম সমাজের জন্য ক্ষতিকর সেই একই কর্ম পুরুষ করলেও ক্ষতিকর। একটা মেয়ে সিগারেট খাওয়া যদি বেলাল্লাপনা হয়, তবে একটা ছেলের ক্ষেত্রে নয় কেন! সিগারেট তো প্রত্যেকটা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যই ক্ষতিকর!

আর হ্যাঁ, নারী অধিকার ও মানবাধিকার সম্পর্কে যা বলছিলাম। আচ্ছা আপনি কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারেন কোন পুরুষ নারীর দ্বারা নির্যাতিত হয় না? কতই তো হচ্ছে! নারীদের আমি এতো অক্ষম হিসেবে ভাবতে চাই না যে নারীরা পুরুষদের নির্যাতনের সক্ষমতা রাখে না। অবশ্যই রাখে। কত পুরুষকেই তো দেখি তার বৌয়ের কাছে মিউ মিউ করতে। তাহলে পুরুষ অধিকার বলতে কিছু নেই কেন? সংখ্যায় কম বলে? একজন পুরুষ নির্যাতিত হলেও তো তার প্রতিবাদ হওয়া উচিৎ তাই না!

যেহেতু আমরা মানবতাবাদের পক্ষে। একজন পুরুষও তো মানুষ।

যেহেতু নারীরা পিছিয়ে তাই নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নারীবাদিতার প্রয়োজন আছে। তবে আমি মনে করি বর্তমানে নারীবাদের প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। যখন নারীদের ভোটাধিকার পর্যন্ত ছিল না তখন নারীবাদিতা অত্যাবশ্যক ছিল। কিন্তু আজ নারীরা প্রায় সকল ক্ষেত্রেই পুরুষের সাথে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। নারীর অগ্রযাত্রায় রাষ্ট্রের সংবিধানে লিখিত তেমন কোনো বাধা আর নেই, আছে শুধু সমাজের অলিখিত প্রতিবন্ধকতা, দীর্ঘদিনের অভ্যস্ততা, গোঁড়ামি আর মুর্খতা। সেসব কাটিয়ে উঠতে আমরা মানবতাবাদের যুক্তিতেই লড়াই করতে পারি।

আমি মনে করি মানবতাবাদের মধ্যেই নারীদের অধিকার নিহিত। আর যারা নিজেকে মানবতাবাদী বলে দাবি করে, মানবতার পক্ষে লড়াই করে, তারা যদি নারীদের সমান অধিকারের বেলায় চুপ থাকে, তাহলে তারা ভণ্ড ছাড়া আর কিছু নয়। আর যারা মানবতাবাদীই নয়, তাদের তো আমি মানুষ বলেই মনে করি না। তারা নারীর অধিকারে শামিল হবে কী করে!

যাহোক একবার এক ব্রিলিয়ান্ট ছেলে আমার কথাবার্তার ধরন শুনে বলেছিল, আপনি আবার নারিবাদী নাকি, আমি নারীবাদীদের ভয় পাই। হেসেছিলাম! এই হচ্ছে অবস্থা! আর এটা শুধু ঐ ছেলের কথা নয়, অধিকাংশরাই এই দলে, এরা নারিবাদিতা মানেই নেতিবাচক বলে মনে করে। তাই আমি এই ভীতু পুরুষদের সাথে নিয়ে নারীদের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠায় নারীবাদ নয়, মানবতাবাদের যুক্তিতেই সমানাধিকারের কথা বলতে চাই। যাতে আমার চাওয়াকে কেউ অগ্রাহ্য করার সুযোগ না পায়। কারণ মানবতাবাদের যুক্তিতেই নারীর দ্বারা কোন পুরুষের নির্যাতনের বিপক্ষেও আমি প্রতিবাদ জানাই।

তাহলে, হে পুরুষ, তুমি কেন নারীর ন্যায্য অধিকারের পক্ষে থাকবে না! এজন্য আমি আমার ফেসবুক বায়োতে লিখে রেখেছি  – “নারীবাদী নই, পুরুষবাদীও নই, মানবতাবাদী”।

আমার কথা হলো, পুরুষও মানুষ, নারীও মানুষ। প্রকৃতির নিয়মেই মানব সমাজের বিস্তারের প্রয়োজনে নারী-পুরুষের দৈহিক গঠন ভিন্ন। দৈহিক গঠনের ভিন্নতার কারণে পুরুষ নারীর তুলনায় শারীরিকভাবে বেশী শক্তিশালী। কিন্তু শুধু শক্তি দিয়েই কি সব হয়!

কালা পাহাড়ের মতো বলবান কোন পুরুষ কি পারবে গর্ভধারণ করতে? মাতৃস্নেহের মতো স্নেহে সন্তান পালন করতে? প্রাকৃতিক নিয়মে সীমিত কিছুক্ষেত্রে নারী যা পারে, পুরুষ তা পারে না, আবার পুরুষ যা পারে নারী তা পারে না। একজন পুরুষ যেমন কোনদিন মা হতে পারে না, তেমনি একজন নারী কোনদিন বাবা হতে পারে না। এই সহজ বিষয়গুলো যাদের মাথায় ঢোকে না, এসব নিয়ে যারা তর্ক করে তারা মূর্খ ছাড়া আর কী!

আসলে ওরা নারী-পুরুষের সমানাধিকার মানতে পারে না বলেই তর্ক করে, যৌক্তিক কোনো কারণে নয়। আর যারা বলবেন সৃষ্টিকর্তাই নারীদের কম অধিকার দিয়ে, কম শক্তি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, তাদের কাছে একটা প্রশ্ন রাখি।

সৃষ্টিকর্তা কি তার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির সাথে বৈষম্য করতে পারে, যে বৈষম্যের কারণে তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির এক পক্ষ (নারী) আরেক পক্ষের (পুরুষ) কাছে হেয় হয়ে থাকবে? আর যদি সৃষ্টিকর্তা তাই চান, তাহলে আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন নারীরা তো একদিন পুরুষবিদ্বেষী না হয়ে সৃষ্টিকর্তাবিদ্বেষী হয়ে উঠবে? তখন কেমন হবে? সৃষ্টিকর্তার চিন্তায় নিশ্চয়ই এটা ছিল।

আমি বিশ্বাস করি, সৃষ্টিকর্তা তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির সাথে কোন বৈষম্য করেননি। এ পুরুষশাসিত সমাজ নারীদের দুর্বল করে রেখেছে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা ও তথাকথিত ধর্মীয় অনুশাসন দ্বারা। নারীরা শারীরিকভাবে যতটা না দুর্বল, তার চেয়ে শতগুণ বেশি দুর্বল মানসিকভাবে। আর নারীর এ মানসিক দুর্বলতা তৈরি করে দিয়েছে এ সমাজই। মানসিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারলেই একজন নারী শারীরিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারে।

তা নাহলে অলিম্পিকে আমরা নারীদের এতো শক্তির মহড়া দেখতে পেতাম না। কারাতে শেখা কোন নারীর কাছে অনেক পুরুষই ধরাশায়ী হয়। বুদ্ধির খেলায় যদি নারী পুরুষের সাথে জিততে পারে, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে নারী-পুরুষের সম্মিলিত শারিরীক শক্তির প্রতিযোগিতাও একদিন অলিম্পিকে যুক্ত হবে। কোনকিছুই অসম্ভব নয়। সবক্ষেত্রেই নারী আজ দক্ষতার প্রমাণ দিচ্ছে।

সমস্যা হচ্ছে সংখ্যায় ব্যাপকতা না থাকা। সেটা কী করে হবে নারী যদি নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগই না পায়! পুরুষতান্ত্রিক এ সমাজে পুরুষের সহযোগিতা ছাড়া সে সুযোগ পাওয়া কঠিন। আপনার মেয়ে, আপনার বোন, আপনার মা যখন সুনাম অর্জন করে তখন কি আপনার মন্দ লাগে! নিজের আপনজনকে সফল,সুখী দেখতেই নারীর স্বাধীনতা ও ন্যায্য অধিকার মেনে নিন না!

নারীর স্বাধীনতায় সহযোগিতা করুন না! বোকার মতো নারী মানেই পর ভাবেন কেন?

শেয়ার করুন:

মানবতাবাদী তো সকলেই। ‘নারীবাদ’ আলাদাভাবে বলার কারণটাও খুব স্বাভাবিক। আমরা আলাদাভাবে শিশু অধিকার কেন বলি বা প্রতিবন্ধীদের অধিকার কেন বলি? সে কারণেই নারীর অধিকারও আলাদাভাবে বলি। পোস্টমডার্ন ফেমিনিসম এই ধারণাকে আরও সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করেছে। মানবতাবাদী তো সকলকেই হতে হবে কিন্তু নারীবাদকে বাদ দিয়ে ঢালাওভাবে শুধু মানবতাবাদ বললে অনেক কিছু না বলা রয়ে যাবে, ধামা চাপা পড়ে যাবে।

ঠিক নারীবাদ নারীবাদ বলে পুরুষ বিদ্বেষে আসলে কোন কাজ হবে না,জানোয়ার প্রতিরোধ করতে হলে পুরুষ দের সাথে নিয়েই করতে হবে সব পুরুষ তো আর ধর্ষক নয় ভাল খারাপ সবকিছুর মধ্যেই আছে।বিদ্যাসাগর রামমোহন রায়,জালালুদ্দিন রূমী রাও পুরুষ ই ছিল

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.