“You are a Woman of questionable character”

আনন্দ কুটুম: সেক্স বা যৌন সম্পর্ক স্থাপনের সময় ‘না’ শব্দটির গভীরতা কত বেশি সেটার প্রমাণ দিতে যুগ যুগ ধরে অনেক যুক্তি তর্ক মহাগ্রন্থ লেখা হয়েছে। তারপরও সবক্ষেত্রেই নারীর ইচ্ছাকে ছাপিয়ে পুরুষের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। কখনো কখনো অতিশুদ্ধ কিছু ধর্মগ্রন্থ পুরুষের কাম-বাসনা পূরণ নারীর জন্য অবশ্যই করণীয় বলেও নির্দেশ দিয়ে থাকে। তাই যৌনতা আজো পুরুষেরই ইচ্ছার অধীন। নারী কেবলমাত্র আমাদের সমাজে সাপোর্টিভ অনুষঙ্গ মাত্র।

pinkযুগ যুগ ধরে চলে আসা হাজারো রিচুয়াল বা সামাজিক বিশ্বাসকে ভেঙ্গে দিয়ে মাথা ফুঁড়ে দাঁড়িয়েছে একটি সিনেমা, যার নাম পিংক বা গোলাপি। সিনেমাটিকে স্রেফ আর দশটি বাজারি হিন্দি ছবি ভেবে বসলে শুধু ভুলই হবে না, ভারতীয় নারীদের প্রতি সমাজের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির যে গভীর চিড় ধরতে শুরু করেছে সেই যুগান্তকারী সামাজিক পরিবর্তনের আলোকচ্ছটা উপলব্ধি করতেও আপনি ব্যর্থ হবেন। তাই খুব অনায়াসেই বলতে পারি পিংক শুধুমাত্র ভারতীয় নারীই নয়, সমগ্র সমাজ জাগরণের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা আখ্যান।

সিনেমাটা যতোটা না মুভিজ, তার থেকে অধিক পরিমাণে টকিজ। সুতরাং হিন্দি ভাষায় অজ্ঞ যেকোনো দর্শকের জন্যই সিনেমাটা কানেক্ট করা খুব কঠিন হয়ে যাবে। কেননা, সিনেমার ৯০ শতাংশ ম্যাসেজ বহন করে এই সিনেমার ডায়লগ বা বক্তব্য।

সিনেমার শুরু হয় মধ্যরাতের দুইটি দৃশ্যের ক্রসম্যাচিং এর মধ্য দিয়ে। যেখানে একদল (৩ জন) মেয়ে খুব ব্যতিব্যস্ত হয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বাড়ি ফিরছে। অন্যদিকে একদল ছেলে (৪ জন) হাসপাতালের দিকে ছুটছে। তাদের মাঝে আবার একজনের শরীর রক্তাক্ত। ক্যামেরার অতিমাত্রায় জার্ক মুভমেন্ট এবং ব্যাকগ্রাউন্ড সাউন্ডের কারিশমা দিয়ে এক ধরনের টেনশন ক্রিয়েট করার চেষ্টা করা হয় এখানে। প্রথম ১০ থেকে ১৫ মিনিট তাই গল্পের সাথে কানেক্ট হতে যেকোনো লেভেলের সমঝদার দর্শকের জন্যও একটু সমস্যা বোধ হবে।

গল্প খুলতে শুরু করে ঠিক ১৫ মিনিট পর থেকে। গল্পটা ঠিক এরকম, মিনাল আরোরা, ফালাক আলী, আনরিয়া নামের তিনজন কর্মজীবী মেয়ে দক্ষিণ দিল্লীর একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকে। তারা তিনজনই এসেছে ভিন্ন তিনটি অঙ্গরাজ্য থেকে। এদের মধ্যে যদিওবা মিনালের পরিবার দিল্লীতেই থাকে, তবুও রাত বিরাতে কাজের সার্থে (মডেলিং) সে নিজ পরিবারের সাথে না থেকে এই ব্যাচেলর ফ্ল্যাটে থাকে। বাকি দুইজনের একজন কাজ করে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ফার্মে, অন্যজন কাজ করে একটি স্বনামধন্য বহুজাতিক কোম্পানিতে। তিনজনই কর্মজীবী এবং স্বাধীনচেতা।

এক রাতে তারা রাজভির নামের এক স্বল্প পরিচিত বন্ধুর আমন্ত্রণে ডিনার পার্টিতে যায়। মধ্যরাতে মদ্যপ রাজভির এবং তার বন্ধুরা নানাভাবে মেয়ে তিনটিকে যৌন হয়রানি করে। এক পর্যায় রাজভির মিনালকে ধর্ষণ করতে গেলে প্রথমে মিনাল রাজভিরকে বাধা দেয়। একপর্যায়ে আত্মরক্ষার সার্থে কাঁচের গ্লাস দিয়ে রাজভিরের মাথায় আঘাত করে পালিয়ে আসে। রাজভির গুরুতর জখম হয়।

pink-2এমন ঘটনায় স্বভাবতই রাজভিরের বন্ধুরা ক্ষেপে যায়। আহত রাজভিরকে হাসপাতালে নিয়ে যায় তারা। ডাক্তার তাদের পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে পরামর্শ দেয়। তবুও রাজভিরের বন্ধুরা পুলিশের কাছে অভিযোগ করা থেকে বিরত থাকে এবং ঘটনাটা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। এরপর থেকে শুরু হয় মেয়েগুলির উপর নানা অত্যাচার। রাজভিরের বন্ধুরা নানাভাবে তাদের উতক্ত করতে থাকে। মেয়েগুলো রাজভিরের কাছে ক্ষমা চেয়ে সবকিছু মীমাংসা করে নিতে সচেষ্ট হয়। কিন্তু রাজভিরের উদ্ধত আচরণ ঘটনাকে মীমাংসার পথে আনতে ব্যর্থ হয়। মেয়েদের ছবিতে যৌন কর্মীর ট্যাগ লাগিয়ে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়। ফলে ফালাক তার একমাত্র সম্বল চাকরিটা হারায়।

এর মধ্যে মিনাল তার এক সহকর্মির মাধ্যমে পুলিশ সুপারকে জানায় এবং স্থানীয় থানায় মৌখিক অভিযোগ করে। থানার পুলিশ উপরন্তু তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে লিখিত অভিযোগ করা থেকে বিরত রাখে এবং স্বল্প পরিচিত ছেলেদের সাথে পার্টিতে যাওয়ার জন্য খারাপ ইঙ্গিত করে। রাজভিরের বন্ধুরা  মিনালের বাড়িওয়ালাকে নানাভাবে চাপ দেয় যেন সোসাইটি থেকে ব্যাচেলর মেয়েদের বের করে দেওয়া হয়। কখনো কখনো বাড়িওয়ালাকে মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়। একবার পরিকল্পিত সড়ক দুর্ঘটনাও ঘটানো হয়। কিন্তু দিল্লীর আর দশজন চিরাচরিত বাড়িওয়ালার মত আচরণ না করে তিনি মেয়ে তিনটির পাশে এসে দাঁড়ান।

ঘটনার দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয় ঠিক সেই সময় যখন রাজভিরের রাজনৈতিক ক্ষমতাধর চাচা বিষয়টা জানতে পারেন। একদিন সকালে মিনালের ফ্ল্যাটে পুলিশ এসে মিনালকে তুলে নিয়ে যায়। ততোক্ষণে সোসাইটির সবাই ঘটনাটা জেনে যায়। সবাই নানা অপমানজনক কথা বলতে থাকে। মেয়ে তিনটি অনেক অসহায় হয়ে পড়ে। ফালাক তার প্রফেসর প্রেমিকের (বিপত্নীক) কাছে সাহায্য চাইলে, সে সাহায্য করবে না বলে জানিয়ে দেয়। ফালাক এবং আনরিয়া বারবার চেষ্টা করেও মিনালকে ছাড়িয়ে আনতে ব্যর্থ হয়। এমন সময় মেয়েগুলির পাশে এসে দাঁড়ায় এডভোকেট দীপক সেহগাল (অমিতাভ বচ্চন)।

pink-3বাইপোলার ডিসঅর্ডার রোগে আক্রান্ত দীপক একই সোসাইটির অন্য একটি ফ্ল্যাটে তার অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করেন। অসুস্থতার কারণে খুব দ্রুত তার মেজাজ পরিবর্তন হয়। সিনেমার শুরু থেকেই তিনি ক্যাটালিস্ট হিসেবে ঘটনার সব কিছুই পর্যবেক্ষণ করেন। অনেকটা ঠিক নীরব বিবেকের মত। এডভোকেট দীপক এই কেসের দায়িত্ব নেয়ার পর বেড়িয়ে আসতে থাকে থলের বিড়াল।  

এই সিনেমায় বেশকিছু চমৎকার ডায়লগ আছে যা সমঝদার দর্শককে গভীরভাবেই ভাবতে শেখাবে। এর অন্যতম একটি ডায়লগ হলো “You are a Woman of questionable character”. নারী, তুমি সবসময়ই প্রশ্নবিদ্ধ। তাই সতীত্বের প্রশ্নবাণে যুগ যুগ ধরে তাকে হতে হয়েছে জর্জরিত। আর এই সতীত্বের অগ্নিপরীক্ষা তাকে দিতে হয়েছে শতাব্দীর পর শতাব্দী। আমাদের সমাজে ঘড়ির কাটার উপর নির্ভর করে নারীর সতীত্ব বিচার করা হয়। যে নারী যত রাত করে ঘরে ফেরে তার চরিত্রে দোষ তত বেশি। এখানে একটি মেয়ের ছোটখাটো পোশাক পরাটা ছেলেদের যৌন উত্তেজক প্রভাবক হিসেবে বিচার করা হয়। কোন মেয়ে ছোট কাপড় পরলে, হেসে হেসে ছেলেদের সাথে কথা বললে, রাতে পার্টিতে গেলে, ছেলেদের সাথে হ্যান্ডসেক করলে বা ছেলেদের শরীর স্পর্শ করলে, দু গ্লাস মদ খেলে মেয়েদের সতীত্ব খোয়া যায়। এই ধরনের মেয়েদের ভাবা হয় সেক্স ডল।

ধরেই নেওয়া হয়, এই সকল মেয়েরা হল পাবলিক প্রোপার্টি। যখন ইচ্ছা, যেভাবে ইচ্ছা এই সকল মেয়েদের ব্যবহার করা যায়। এ সমাজে সুটেট বুটেট হয়ে ঘুরে বেড়ানো কেতাদুরস্ত উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত কত ছেলের মন যে সেই মধ্যযুগীয় গোরস্থানে পড়ে আছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। বাইরে সুন্দর পরিপাটী আধুনিক সভ্য দেখতে এই সকল ছেলেরা যে কতোটা বেশি অসুস্থ ধ্যান ধারণা পোষণ করে তার যুগান্তকারী উদাহরণ হতে পারে এই সিনেমাটি।

আজকের এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে যখন নারী ছুটে চলেছে পাতাল থেকে মহাকাশে, তখনো আমাদের সমাজে নারীর সমানাধিকার বা নারী অধিকার নিয়েই যুদ্ধ করতে হচ্ছে তাকে। এটা যে কতোটা লজ্জার সেটা বুঝতে আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যাবস্থা সত্যিই অপারগ।

এই সিনেমাটির মধ্য দিয়ে প্রশ্ন উঠেছে যে, তবে কি একা একা একটি মেয়ে কোথাও নিরাপদ নয়? সে কি একা একা নিজের শৌচালয়েও যেতে পারবে না? সে কি মধ্যরাতে তবে কর্মস্থল থেকে ঘরে ফিরতে পারবে না? স্বামীবিহীন, ভাইবিহীন, প্রেমিকবিহীন, বাবাবিহীন কোন মেয়েরই কি এই দুনিয়ায় বসবাসের অধিকার নেই? একটি ব্যাচেলর মেয়ের ঘরে ভেতরে কি হচ্ছে বা না হচ্ছে বাইরে থেকে সেটা কি চাইলেই যে কেউ তার নিজের মতো করে ভেবে নিতে পারে? তার সেই অতি কল্পনীয় ভাবনাগুলো কি সে চাইলেই পাড়াময় বলে বেড়াতে পারে? রাতের বেলায় রাস্তায় মেয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে যে পুরুষের গাড়ির গতি মন্থর হয়ে যায়, দিনের আলোতেই সেই পুরুষটি কি সতী নারীর সংজ্ঞা আওড়াতে পারে? বা পারা উচিৎ?  

anando-kutum
লেখক, আনন্দ কুটুম

সিনেমার বুননে আরো উঠে এসেছে ভারতের অন্যান্য অঙ্গরাজ্যের মেয়েদের থেকে উত্তর-পূর্ব (সেভেন সিস্টার) অঙ্গরাজ্যের মেয়েরা ভারতে কত বেশি নিগৃহীত। উঠে এসেছে গার্লস ম্যাটার বলে যা কিছু গোপনীয় তা চাইলেই সবার সামনে আদালতে দাঁড়িয়ে বলা যায় না। বন্ধু মহলে বলা কৌতুক সবার জন্য না। আদালত চাইলেই ছোট ছোট এই ব্যক্তিগত বিষয়কে নিয়ে জনসম্মুখে আলাপ করতে পারে না। একটি মেয়ের একাউন্টে কোন ছেলের একাউন্ট থেকে অর্থ ট্রানজেকশন হলেই সেই অর্থকে প্রমাণ ছাড়াই অবৈধ অর্থ বলা যেতে পারে না।

মিনাল আরোরা ১৯ বছর বয়সেই তার কুমারীত্ব বিসর্জন দেয়। এর পরেও কখনো কখনো দুই একজনের সাথে তার শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে। প্রতিবারই সেটা হয়েছে নিতান্তই নিজের ইচ্ছায়। যেখানে ছিল না কোন অর্থের লেন দেন, জোর জবরদস্তি বা ক্ষমতার প্রভাব। একজন সাধারণ মেয়ে তার নিজের শারীরিক মানসিক প্রশান্তির জন্য এটা করেছে।

কিন্তু যখন তার ইচ্ছা নেই, এমন সময় তাকে শারীরিক সম্পর্কে বাধ্য করা কতোটা ন্যায়সঙ্গত? ঠিক সেই প্রশ্নই ছুঁড়ে দিয়েছে পরিচালক আদালতের কাছে। নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও কাউকে স্পর্শ করলে সেটা যে কতোটা যন্ত্রণাদায়ক সেটা নারী ছাড়া কে ভালো বুঝবে?

বাদী পক্ষের প্রসিকিউটর যখন মেয়ে তিনটিকে চরিত্রহীন, নষ্ট, দেহ ব্যবসায়ী হিসেবে আদালতে প্রমাণ করতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই ফালাক আলী যুক্তির সার্থে স্বীকার করে নেয়- “হ্যাঁ, আমরা টাকা চেয়েছি এবং নিয়েছিও। কিন্তু টাকা নেওয়ার পরে আমাদের ইচ্ছা বদলে যায়। আমরা তাদেরকে আমাদের উপরে জোর করতে ‘না’ করি। তবুও তারা ধর্ষণ করতে চেষ্টা করে। ভারতীয় আইন তবে কি বলে? আইন কি একজন সেক্স ওয়ার্কারকে ধর্ষণ করাটা সমর্থন করে?”
রাজভির যখন মিনালের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তখন মিনাল ঠিক কী ইন্ডিকেশন দিয়েছিল? ঠিক কীভাবে সে বলেছিল যে, সে তখন যৌন সম্পর্কে আগ্রহী নয়? এই একটি প্রশ্নই সিনেমাটাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। যার উত্তর ছিল স্রেফ “না”। এই ‘না’ শব্দটির মূল্য যে কত সেটার প্রমাণ নানা ভাবেই উঠে এসেছে এই সিনেমায়। ‘না’ শুধু একটি শব্দ না। ‘না’ একটি পূর্ণাঙ্গ বাক্যও বটে। কখনো কখনো একটি দীর্ঘ বয়ানের সমান। শত শত প্রশ্ন, শত শত প্রস্তাবের জন্য ‘না’ একাই একটি দৃঢ়তম পূর্ণাঙ্গ উত্তর। এটা বোঝার মতো ক্ষমতা সাধারণত সবার থাকে না।

‘No’ means No. So no need to explanation or strong causes or more speech for it. হোক সে পরিচিতা, হোক সে ফ্রেন্ড, গার্লফ্রেন্ড বা সেক্স ওয়ার্কার, যখন সে সেক্সের প্রস্তাবে ‘না’ বলে, তখন তার শরীরে স্পর্শ করা বা তাকে জোর করাটা আইনগত এবং নীতিগত উভয়ভাবেই অন্যায়। এমন কি সেই মেয়েটি যদি বিবাহিতা স্ত্রী ও হয় তবুও তার অনুমতি ব্যতিত, তার ইচ্ছার বাইরে তার উপর জোর করাটা অন্যায়। সুতরাং যখন কোন মেয়ে মুখে ‘না’ শব্দটি উচ্চারণ করে তখন তার যে কোন ধরনের ইঙ্গিতকে ছাপিয়ে এটাই একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বলে গ্রহণীয় হয়। সুতরাং তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার শরীর স্পর্শ করা ধর্ষণ করার শামিল।

সিনেমাটা খুব স্পষ্ট করেই বুঝিয়ে দিয়েছে যে, নিজের ইচ্ছায় শারীরিক সম্পর্ক করা আর শারীরিক সম্পর্ক করতে বাধ্য করা এই দুটি বিষয় এক নয়। এমতা অবস্থায় নিজের সেল্ফ ডিফেন্সের জন্য নেওয়া চেষ্টাকে এটেম্পট টু মার্ডার বলে না, বলা উচিৎ এটেম্পট টু সেল্ফ ডিফেন্স।
অতি মননশীল এই সিনেমাটা পুরোটাই তৈরি হয়েছে ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর বাঙালী সন্তান সুজিত সরকারের মাথার ভেতরে। যদিও সিনেমাটা ডিরেকশন দিয়েছে আরেক বাঙ্গালি সন্তান অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী। কিন্তু এই সিনেমাটির গল্প তৈরি হয়েছে কলকাতা, মুম্বাই আর দিল্লি হাইকোর্টের অনেক মামলার মিশেলে। এবং বলাই বাহুল্য যে সিনেমাটি সার্থক।

একই সাথে তা যেমন দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে, তেমনি মানুষের ভাবনায় গিয়ে নাড়া দিতেও সমর্থ হয়েছে। আমার এই কথার সত্যতা জানতে হলে আপনাকে অবশ্যই ভারতের মাটিতে আসতে হবে। এখানে আসলেই আপনি বুঝতে পারবেন সিনেমাটা কতোটা নারীর গোপন কান্নার স্পষ্ট প্রতিফলন। যারা বেঙ্গল রেনেসাঁ সম্পর্কে জানেন, তারা নিশ্চই অবাক হবেন না এটা জেনে যে, সতীদাহ প্রথা বিলোপ, বিধবা বিবাহ প্রচলনের পরে কোন বাঙ্গালী সন্তানের হাতে এমন সিনেমা রচিত হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। নারীর প্রতি অমানবিক আচরণের প্রতিবাদ বার বার এই বাংলাতেই হয়েছে।

রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের পথ অনুসরন করে সুজিত এবং অনুরুদ্ধ যা সৃষ্টি করল, অদূরভবিষ্যতে সেটা আদালতের রেফারেন্স ওয়ার্ক হয়ে যাবে, নতুন আইন তৈরি করতে সাহায্য করবে বলেই আমার বিশ্বাস।    
এমনিতেই লেখাটা অনেক বড় হয়ে গেছে। তাই টেকনিক্যাল দিক নিয়ে আর বিশেষ কোন আলাপে জড়ালাম না। তবে বলতেই হয়, অমিতাভ বচ্চনের সেরা কাজটি তিনি করে ফেলেছেন। সিনেমার শেষ কয়েকটি দৃশ্য এখনো মাথার মাঝে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

ধর্ষণ একটি সামাজিক ব্যাধি। ধর্ষিতা নয়, ধর্ষকেরই লজ্জায় মাথায় ঘোমটা দিয়ে হাটা উচিৎ। অমিতাভ বচ্চন যখন তাপসী পানুর মাথা থেকে ঘোমটা টেনে খুলে ফেলে তখন একটি নির্বাক দৃশ্যই হয়ে ওঠে হাজার লাইন কাব্যের সমান। আর শেষ দৃশ্যে বিজয়ী তিনটি মেয়ের সূর্যের দিকে মুখ করে তাকিয়ে থাকাটা যেন সূর্যের শক্তি শুষে নিয়ে আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠার একটি প্রতীকী দৃশ্য।

আপনি ছেলে হোন বা মেয়ে, আজ আপনি বলতেই পারেন পিংক কোন দুর্বলতার প্রতীক না। পিংক মানে শক্তির প্রতীক। হিমালয়ের মত দৃঢ়টার প্রতীক। সেটা প্রমণন করে দিয়েছেন সুজিত সরকার, বেঙ্গল রেনেসাঁর আরেক নতুন সৈনিক।

চলচ্চিত্র নির্মাতা ও গবেষক

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.