ডাকাতের বউ বনাম আকতার জাহান: একই বৃত্তের গল্প

সুচিত্রা সরকার: আশরাফ স্যার আমার ইংরেজির মাস্টারমশাই। তাঁর কাছে শোনা গল্পগুলোয় জীবনকে দেখেছি অনেক কাছ থেকে। একদিন তাঁর কাছে শোনা এক ডাকাতের বউয়ের গল্পে আমার নারীবাদ নড়ে উঠেছিল উত্তাল তরঙ্গে!

গল্প নয়, এ সত্যি ঘটনা। স্যারের বাড়ির পাশেই এক ডাকাতের বউয়ের বাস। স্যার ডাকেন ডাকাত চাচী। যখনকার ঘটনা, ডাকাতটা ততদিনে পাপ-পূণ্য নিয়ে ঈশ্বরের সঙ্গে হিসেব কষায় ব্যস্ত। আর ডাকাত চাচী, ভিক্ষে করে দিনযাপন করে। স্বামী বেঁচে থাকতেই তিনি কাঁধে নিয়েছেন ভিক্ষার ঝুলি। না, স্বামীর পেশাকে ঘেন্না করে নয়! স্বামীর দেয়া অপমানের জবাব দিতে।

Suchitra Sarker
সুচিত্রা সরকার

স্বামীটি, ডাকাতটি, একদিন দ্বিতীয় বিয়ে সেড়ে বাড়ি ফিরলেন। ডাকাত চাচী নতুন বউকে বরণ করলেন। বাসর সাজালেন। স্বামীসহ যে ঘরে ঘুমাতেন, সে ঘরটা নতুন বউটার জন্য ছেড়ে দিলেন। তারপর স্বামীকে শুধু একটি কথাই বললেন,‘আপনেরে আমি জীবনে মাফ করুম না।’

পরদিন থেকে ভিক্ষুকের জীবন শুরু। সেই উপার্জনেই জীবন ধারণ। শতেক ছিন্ন দুটি কাপড়ে বছর পার! স্বামীর কাছ থেকে কোন সাহায্য নেন না। একা রান্না করে খান। কিন্তু স্বামীর বাড়ি ছেড়ে যাননি। ডাকাত স্বামী, প্রায়ই আস্ফালন করে। অনুযোগ করে! আসলে অনুযোগটা প্রতীকী। মনে মনে অভিলাষ, ডাকাত চাচীর মাথাটা হেঁট হোক তাঁর পুরুষটার কাছে!
যেদিন ডাকাতের মৃত্যু হলো, গ্রামবাসী, আত্মীয়-স্বজন, সকলের কাছে মাফ চাইলেন। মৌলানা ডেকে তওবা পড়লেন। ডাকাত চাচীকে ডেকে হাত ধরে বললেন, ‘আমারে মাফ কইরো!’ চাচীর নির্লিপ্ত উত্তর, ‘আপনের মাফ নাই!’ ডাকাতের মৃত্যুর পর চাচী গায়ে তুলে নিয়েছিল সাদা থান!

কী তেজ! কী প্রতিবাদ! প্রতিবাদটা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে করতেই পারতেন! কিন্তু পুরো লড়াইটা চালালেন, ডাকাতের সঙ্গে থেকে। কেন?

শৈশবে আমার বাড়ির পাশে এক কাকী ছিলেন। লাল শাড়ি ছাড়া কিছুই গায়ে তুলতেন না। ডাকতাম লাল কাকী। একদিন শুনি কাকীর বর আবারও বিয়ে করেছে। কাকী আর কী করে, এ বাড়ি, ও বাড়ি কাঁথা সেলাই করে ছেলেটার মুখে ভাত তুলে দেয়। একদিন খুব ভোরে, কাকীকে ওঁর বর বাপের বাড়ি রেখে এলো। লাল কাকীর সতীনের কোল আলো করতে আসছে যে একজন! কাকী আমার শৈশব থেকে লাল শাড়ি নিয়ে চলে গেলেন। লাল কাকী কেন থাকতে পারলো না জোর করে? দশ বছরে অধিকার জন্মায় না?

রহিমা খেলার সাথী। ওর মা প্রতিদিন মার খেত। উঠতে, বসতে। চলতে, ফিরতে। কারণ তিনি তিন মেয়ের পরে, একটি ছেলের জন্ম দিতে পারছেন না। অসুরের সঙ্গে কিভাবে থাকছেন তিনি? কেন থাকছেন?
পাশের বাড়ির বিলকিস আন্টি। স্বামী সমকামী। বিয়ের পরই প্রমাণ পেয়েছিলেন। স্বামী পরোয়া করতো না। ‘মাইয়্যা মানুষরে কিসের ডর! হেগো কাছে কিসের সম্মান!’ এখন তাঁর তিন সন্তান। বড়টির বয়স আঠারো। তবুও স্বামী পরোয়া করে না। এখনও বিলকিস আন্টির চোখের জলে আগুন জ্বলে। তবু পড়ে রইলেন। কেন?

প্রশ্নগুলোর উত্তর একটিই। নারীদের ঘর নেই। নারীরা বেরিয়ে কোথায় যাবেন? কে তাদের জন্য পায়েসান্ন রেঁধে রেখেছে? বাপের বাড়ি থেকে একবার বেরোলে, সেখানে আর ফেরা হয় না। আবার সমাজের ঋষিরা (পড়ুন পতি) বলেন, ‘স্বামীর ঘর থেকে বের হতে হয় একবার। কাফনের কাপড় পরে।

ফেলে আসা বাবার সংসারে, ঘর পোড়ানো মেয়েটির ঠাঁই হয় না। সোনার সংসারে পিতল কন্যার জায়গা নেই! অথবা আছে! সকালের বাসি ছাই ফেলতে, ভাঙা কুলা মেয়েটির খুব কদর! সঙ্গে থাকে কথার ঝুড়ি। ‘কেন এলো? কেন থাকতে পারলো না? বেটারা একটু এমনই। মেয়েদের সহ্য করতে হয়! ’- নিত্যি নিত্যি।
আর যারা একা থাকেন, ডিভোর্সি, তাদের যাপনের রুটিনে ‘দুশ্চরিত্র, অপয়া, স্বামীখাকী’- শব্দগুলো নেওটা হয়ে যায়! ঘুরপাক খায়! বৃত্তের মতো। তাই নারীরা পড়ে থাকে পতিদেবতালয়ে! ভয়ে!

akter-jahan-photo
আকতার জাহান জলি

একটা অংশ আছে, যারা সয়ে সয়ে ক্লান্ত হন না। একদিন খুব ভোরে বেরিয়ে পড়েন। জীবনের উদ্দেশ্যে। জীবনকে ভালবেসে। প্রতিবাদ করে। সাহসের সঙ্গে। যেমন রাজশাহীর শিক্ষক আকতার জাহান। একা থাকার সংগ্রামটা চালিয়েছেন সংগোপনে। তাঁর ‘একা থাকা’ উপন্যাসের পৃষ্ঠাগুলো কারো পড়া হয় না। না তাঁর পরিবার, না বন্ধু, না স্বজন। পড়লে, নিশ্চয়ই তারা দুঃসময়ে পাশে দাঁড়াতেন।

লড়াইয়ের গল্পটা জানতো কয়টি জড় পদার্থ। একটা মেলামাইনের প্লেট (যেটিতে তিনবেলা তিনি ভাত খেতেন), প্লাস্টিকের পানির বোতল, ৩০৩ নম্বর রুম আর একটি সুইসাইড নোট।
যে অসীম সাহসিকতায় স্বামীর বাড়ি ছেড়েছিলেন, সেই সাহসটা (আত্মহত্যাটা আসলেই সাহসের ব্যাপার। এবং বোকামিরও) এসে ভর করলো তাঁর জীবনে। হয়তো জীবনের সবচে আলোড়িত ঘটনায়। তাই দাড়ি টানলেন জীবনের! মাঝ নদীতে এসে বৈঠা দিলেন ভাসিয়ে! কিছুরই তোয়াক্কা না করে! কিন্তু তাতেও মুক্তি মিললো কই!

কথা আজো শুনতেই হচ্ছে। যেমন, ‘ওর জন্য ছেলেদের মহলে গুঞ্জনের কারণেই, ওকে বিশেষভাবে চেনা। আকতার তো ধর্মপ্রাণ। তাও লাশটা কেন হাসপাতালে দিল? তাঁর স্বামী তো অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়ান! প্রগতিশীলও। সেই স্বামী অত্যাচার করতো? আরে, এটা তো জলির মুখেরই শোনা কথা। ওর বন্ধুরা তাই বলছে। প্রমাণ তো নেই।’
‘সন্তানকে কেন মা নিজের কাছে রাখতে পারলো না? বা, কেন তিনি, এত এত সহ্য করেও গলায় ছুড়ি ঠেকানো অবধি থেকে গেলেন? বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের এ মেনে নেয়া জাস্ট মানা যায় না। কেন স্বামীর বিরুদ্ধে পুলিশ কেস (অতো কি সহজ ব্যাপার!) করলেন না? বিচ্ছেদ হয়েছে, চার বছর আগে, এখন, সুসময়ের দোরগোড়ায়, মরতে গেলেন কেন? তিনি তো সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে মহীয়সী হবার চেষ্টা করছেন। এই মিথ্যা তকমায় নারীর মুক্তি মেলে না।’ ইত্যাদি ইত্যাদি।

ডাকাত চাচীরা সব সহ্য করে স্বামীর ঘরে রয়ে যান। বাপের বাড়ি যান না বা আত্মহত্যাও করেন না। ‘আকথা কুকথা’র ডরে। আবার একা একা বাঁচতে শেখা মেয়েটিও গঞ্জনা সইতে না পেরে, ‘আকথা কুকথা’ শুনে ঝুলে পড়েন সিলিং এ। তারপর পোস্টমোর্টম করা শরীরটা ‘আকথা কুকথা’ শুনে শিউরে ওঠে (ভাগ্যিস মৃতরা শুনতে পায় না)।

সেই হয়! নারীর মুক্তি মেলে না। না স্বামীর ঘরে প্রতিবাদ করা ডাকাত চাচীর, না সমকামী স্বামীর স্ত্রী বিলকিস আন্টির, না ‘ঘরের তোয়াক্কা না করা’ মেয়েটির। না আকতার জাহানের। সমাজের গঞ্জনার লাভা ‘সব শ্রেনির সব পর্যায়ের নারীদের’ একই বৃত্তে দাঁড় করায়। মুক্তি মেলে না|

২৬.৯.২০১৬
লালবাগ, ঢাকা
রাত ৩.০৮ মিনিট

 

শেয়ার করুন:

সমাজের গঞ্জনার লাভা ‘সব শ্রেনির সব পর্যায়ের নারীদের’ একই বৃত্তে দাঁড় করায়। মুক্তি মেলে না| ! ভাল মেয়ে হয়ে থাকতে থাকতে একদিন মরে যায় , কেউ কেউ সুইসাইড করে , এদের জন্মই যেন ভাল মেয়ে হয়ে জীবন উৎসর্গ করা !… আবার কেউ কেউ ভাল মেয়ের থেকে বেরিয়ে এসে হয়ে পড়ে নষ্টা স্বাধীন ! 🙂 পুরুষেরা এই সব কিছুর উরদ্ধে ! তাঁদের নষ্ট কি আর সতীত্ব কি ? তাঁদের সব অন্যায় ,পাপ সবই স্বভাবগত তাই প্রাপ্ত অধিকার , তাই এঁরা চিরদিন স্বাধীন দাম্ভিক পুরুষ !

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.