বেঁচে থাকলে প্রতিদিন নতুন দিনের শুরু

দিনা ফেরদৌস: অনেক কথাই বলতে ইচ্ছে করে। সমাজে থাকি, সংসার করি তাই সব চাইলেও বলা যায় না, বলতে হয় না। মা’র কাছ থেকে জেনেছি, চাইলেই যাওয়া যায় সাহস থাকলে। টিকে থাকাটাও এক ধরনের আর্ট। যাওয়ার জায়গা না থাকলে টিঁকে থাকার কৌশল বের করতে হয় সেই জায়গাতেই।

মেয়েদের যুদ্ধ সব জায়গাতেই। ঘরে-বাইরে। নিজের বাপ-ভাইকে বুঝতে পারলে স্বামীকে বুঝতে পারা খুব কঠিন কিছু না। যদিও মায়ের এই টিকে থাকার জ্ঞান আমার মোটেও পছন্দ নয়। এই টিকে থাকতে গেলে কতটুকু স্যাক্রিফাইস করতে হবে বা হয় তা আমার মা বলেননি।

dina-ferdous-edited
দিনা ফেরদৌস

কারণ মেয়েদের শারীরিক নির্যাতন ছাড়াও আর এক ধরনের অদেখা নির্যাতন করা হয়। মানসিক নির্যাতন। যার সব কিছুর ব্যাখ্যা দেয়া যায় না, বা দেখানোও যায় না। দুজন মানুষ এক ঘরে থাকে, একই বিছানায় শুই, মানেই ধরে নেই তারা বেশ আছে। সংসার করছে।
যারা সংসার জীবনে ভালো আছে তাঁদের জন্য শুভ কামনা। কিন্তু যাঁরা ভাল থাকার ইচ্ছায় টিকে থাকার থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাদের জন্য মায়া হয়। কারণ সংসার যদি দুজনের ভালোবাসায় টিকে না থাকে সেখানে অন্য সব বিদ্যা অচল।
একবার গ্রামের দূর সম্পর্কের বিয়ে খেতে গেছি বর পক্ষের হয়ে। পাত্র ঘর থেকে বের হওয়ায় পূর্বে এক বয়স্ক মহিলা পাত্রের বোনকে বলে দিলেন যে, পাত্রের কানের কাছে গিয়ে যেন বলেন; “আম্মা যা বলেছিলেন মনে আছে”?
প্রচলিত “হাবার” গল্পে আছে যে ছেলে শ্বশুর বাড়ি যাবার কালে মা শিখিয়ে দেন কী কী করতে হবে ওখানে গিয়ে। কারণ তার ছেলেটা ছিল হাবা।

এতো কোনো গল্পের প্লট নয়। আর ছেলেটা এখানে পেশায় হাইস্কুলের একজন শিক্ষক। তবে কী মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে কৌতুহল হলো।
পাত্রের বোনকে জিজ্ঞ্যেস করলাম, কী মনে করিয়ে দিলেন? বললেন, কিছুই না। এটা বলতে হয় শুধু। জানতে চাইলাম, কেন বলতে হয় শুধু?
বললেন, পাত্র এই কথা নিয়ে সারাক্ষণ টেনশনে থাকবে, মা যেন কী বলেছিলেন! আর নতুন বৌয়ের দিকে তেমন মনোযোগ দিতে পারবে না। মানে হচ্ছে প্রথম থেকেই বৌ যাতে কব্জা করতে না পারে নিজের স্বামীরে তার আগাম সতর্কতা হিসেবে মা নিজের জায়গা সুরক্ষা করে নিচ্ছেন।

এতো গেলো গ্রামের বাস্তব গল্প। আমি শহুরে বহু মা’য়েদের দেখেছি, বিনা কারণেই ছেলের বিয়ের দিন মুখ ভার করে থাকেন। কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে যান। ছেলেকে বাসর ঘরে যাবার আগে ধরে কান্নাকাটি করেন। ছেলের এই বিশেষ দিনে তার ছোটবেলার অনেক কিছু মনে আসতেই পারে। তাই বলে তার বিশেষ মুহূর্তে এই কান্না প্রদর্শনের মানে কী, তা কোন পুরুষ না বুঝলেও নারীরা ঠিকই বুঝি। আর সেই সব কান্না ম্যাজিকের মতো কাজও করে। যেখানে স্বামী বৌয়ের ঘুমটা তোলে বলবে,”তোমাকে পেয়ে আমি সুখী”, সেখানে বলে, আমার মা’কে মানে সারা পরিবারকে সুখী করতে হবে তোমার।

এই সারা পরিবারকে সুখী করার বোঝা এক একজন এক এক ভাবে দেন। কেউ আগে পটিয়ে পরে দেন। কেউ এই বোঝা দিয়ে পটিয়ে রাখেন। এই পটিয়ে রাখাকে অনেক মেয়েই প্রেম মনে করে ভুল করেন। স্বামীর ভালোবাসা পেতে গিয়ে সারা পরিবারের দাসত্ব বরণ করেন।
নিজের বিয়ের তিন-চার দিনের মাথায় শুনতে হলো, আমি যে স্বামীর পাশে বসি তাতে কারো কারো লজ্জা লাগে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক বলতে কী বুঝায়, তা যেকোনো পাগলও বুঝে। সেখানে লজ্জা লাগার কী ছিলো তা তখন না বুঝলেও এখন বুঝি। প্রথম থেকেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে গ্যাপ তৈরি করার একটা ধান্দা।

আজ থেকে সাত বছর আগে স্বামীর কাছ ঘেঁষে থাকতে যে ভালো লাগতো, এখন সাত বছর পর একইরকম অনুভূতি কাজ না করাই স্বাভাবিক। এরপর শুনলাম, কেনো নিজের রুমে বসে থাকি, বাইরে বেরিয়ে সবার সাথে কথা বললেও তো পারি। বিয়ে বাড়িতে কমবেশি লোকজন থাকেই। আর এক পরিবেশ থেকে অন্য পরিবেশে গিয়ে সহজ হতেও তো সময় লাগে। আমার কারো সাথে ওই সময় কথা না বলার ইচ্ছাও থাকতে পারে।
সেটা নিয়ে কেউ ভাবেনি। এরপর থেকেই শুরু হলো আমার জামাকাপড় নিয়ে কথাবার্তা। পাশের বাসায় কোন মহিলা বলে গেছেন, নতুন বৌ শর্ট জামাকাপড় পরে। ঘরের মেয়েরা ইচ্ছামতো জামাকাপড় পরতে পারবে, বৌ পরলেই সমস্যা।
নতুন অবস্থায় সারারাত কান্নাকাটি করলাম। স্বামীকে কিছুই বলিনি। মনে হলো, ভাবতে পারে এসেই তার পরিবারের নামে নালিশ শুরু করে দিয়েছি। কোনো ছেলের পক্ষে এটা বিশ্বাস করা কঠিন যে, তার নতুন বৌয়ের পিছনে তারই পরিবারের সবাই লেগে পড়েছে।

আমি জানতাম, ছেলেরা মুখে যতই বলুক পরিবারের কারো কথায় কান দিও না, কিন্তু যখনই বলবেন, তোমার অমুক বলেছে তখনই আসল চেহারা বেরিয়ে আসবে। কারণ সে তার অতি প্রিয় অমুকের যে চরিত্রের সাথে পরিচিত আর তার বৌয়ের যে চরিত্রের সাথে পরিচয় হয়েছে, তা তার সম্পূর্ণ অজানা এক চরিত্র।

দিন যায়,অনেক কিছুই বদলায়, বয়সের সঙ্গে বুদ্ধিও বাড়ে। প্রতিদিন কিছু না কিছু নতুন শিখা হয়। এখন সেইসব লজ্জা পাওয়া মানুষেরা স্বামীর সঙ্গে আমার লেপ্টানো ছবি দেখেন। শর্ট জামা পরা ছবিও দেখেন। মাঝে-মধ্যে মনে হয় ওই আচরণ করে তারা হয়তো আরাম পেয়েছেন ঠিকই। অন্যের দোষ খুঁজে বেড়ানোর মধ্যে এক ধরনের মজা আছে আর সে যদি হয় নতুন বৌ তাহলে তো কথাই নেই। বহু নতুন মানুষদের মাঝে নতুন, পরিশেষে একাকী একজন মানুষ যে কাউকেই ভালমতো চিনে না, তাই তার মুখ থেকে কথা ফোটার আগেই বন্ধের প্রস্তুতি নিতে একযোগে সব প্রস্তুত।

কিন্তু অন্য রকমও তো হতে পারতো। ভালোবাসা দিয়ে ভালবাসা শিখানো যেতো নতুন বৌ’টিকে। বেশি বেশি সুযোগ করে দেয়া হতো স্বামীর সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য। বহু কিছুই করার ছিলো যা নিজেদের মেয়ের বেলায় আমরা কামনা করি। যাই হোক এখন কিছুতেই কিছু যায় আসে না। কারো কাছ থেকেই কিছু আশা করি না যে, সে এটা বলতে পারে না বা করতে পারে না।

এক কথায় কিছুতেই তেমন আশ্চর্য হই না। মানুষ বহুরূপী। আর পুরুষ মানুষ তো বটেই। নারী নারীর শত্রু কথাটার সাথে আমি একমত না হলেও পুরুষের প্রতিনিধিত্ব করা নারীদের আমি বিশ্বাস করতে পারি না।
পরিবারে মেয়েদের আসলে কোন ক্ষমতাই নেই, যদি না পুরুষ দিয়ে থাকে। দেখা যায়, যে পরিবারে ছেলে মা’কে বেশি গুরুত্ব দেয়, সে পরিবারে ছেলে বৌ হয় নির্যাতিত। আর যে ছেলে বৌ’কে বেশি গুরুত্ব দেয়, সে পরিবারে তার মা হয় নির্যাতিত। আপাত দৃষ্টিতে সেই ক্ষমতাবান, যাকে পুরুষ ক্ষমতা দেয়। নতুবা কারো সাধ্য নেই যে, এ-তার জন্যে ক্ষতিকর হয়ে উঠবে। বহু মেয়েদের মুখেই শুনি, “আমার স্বামী মানুষটা ভাল, শাশুড়ি-ননদ ভালো না”।

কথাটা আমি মানতে পারি না।

কারণ স্বামী প্রটেক্ট করলে কারো পক্ষেই সম্ভব না তার বৌ’কে নিয়ে কেউ কটুবাক্য  বলে। মানিয়ে চলার দায়িত্ব সব বৌ’য়ের ঘাড়ে দিয়ে যে স্বামী পরিবারের অন্য কারো আচরণের দিকে না তাকিয়ে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরেন, তাদের ভাল মানুষি’তে আমি সন্দেহ পোষণ করি।

সংসার ছাড়া যাদের কোন গতি নেই, তাদেরকে দেয়ার মতো আমার কোন ম্যাসেজ নেই। তবে যারা আত্মসম্মান নিয়ে নিজের মতো বাঁচার প্রস্তুতি রাখেন, তাদেরকে বলবো, নিজেকে মিথ্যা সান্ত্বনা দেয়ার মধ্যে কোন বীরত্ব নেই। যেখানে মূলে সমস্যা, সেখানে একমাত্র সমাধান- তিক্ততা তার চেয়েও বেশি বাড়ার আগে নিজেকে শক্ত করুন। সময় থাকতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিন। বেঁচে থাকলে প্রতিদিন নতুন দিনের শুরু হয়। নিজেকে দেবার মতো অনেক কিছু আছে এখনো।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.