“অসহায় নারী মাত্রই শরীর বেচতে রাজি”

নাহিদ শামস্‌ ইমু: ঘটনাটি ঘটেছিলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আমার বন্ধু তালিকার একটি মেয়ের সঙ্গে।হঠাৎ করেই যেন মেয়েটির জীবনের প্রায় সবকিছু মোটামুটি ওলট-পালট হয়ে গিয়েছিলো।
nahid-shams-emu
নাহিদ শামস্ ইমু

বেশ জটিল একটি রোগ বাসা বাঁধে শরীরে। সদ্য বিয়ে করা স্বামীরও একটি অসুখ ধরা পড়ে। এদিকে হাতে একদম টাকা-পয়সা নেই। মেয়েটির নিজ পরিবারের আর্থিক অবস্থাও খুব করুণ। বাসায় টাকা পাঠাতে হয়। সেই টাকাটাও জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

এদিকে নিজের পড়াশোনার খরচটাও চালাতে হচ্ছে, চালাতে হচ্ছে স্বামীর সংসার, মায়ের সংসার, তার ওপর চালাতে হচ্ছে চিকিৎসা, টিকে থাকতে হচ্ছে অসুখের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। মেয়েটি জীবনে প্রথমবারের মত চোখের সামনে ভয়াবহ অন্ধকার দেখতে পায়। এক পর্যায়ে মানুষের কাছে হাত পাততে বাধ্য হয় সে। ঠিক তখনই দেখা দিলো বিপত্তি……

মেয়েটির এই অসহায়বস্থা দেখে সুযোগসন্ধানী কিছু পুরুষের চোখ চকচক করে ওঠে। খুব বিশ্বাস করে মেয়েটি নিজ ডিপার্টমেন্টের এক বড় ভাইয়ের কাছে সাহায্য চেয়েছিল। ছেলেটি তাকে হতবাক করে দিয়ে তাকে শারীরিক সম্পর্কের প্রস্তাব দিয়ে বসে। সে দাবি করে যে মেয়েটিকে নিয়মিত তার কু-প্রস্তাবে সাড়া দিতে হবে এবং এর বিনিময়ে মেয়েটিকে সে লাখ খানেক টাকা দেবে। চেনা জানা এক বড় ভাইয়ের কাছে এরকম অপ্রত্যাশিত ও আপত্তিকর প্রস্তাব ঝড়ের মতই আঘাত হেনেছিলো মেয়েটির মনঃজগতে। তার ভাষ্যমতে, এ কথা শোনার পর ছাদ থেকে লাফ দিয়ে মরে যেতে ইচ্ছে করেছিলো তার। প্রচণ্ড মানসিক কষ্টে কেটেছিল কয়েকটি দিন।
ব্যাপারটা সেখানেই থেমে থাকে নি। সমাজের খুব ভদ্রবেশী এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গেও জানাশোনা ছিল মেয়েটির। তাঁর কাছেও সাহায্যের আবেদন জানিয়েছিল সে। ভদ্রবেশী অফিসার সাহেব সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রতার মুখোশ খুলে ফেললো। মেয়েটির কাছে চেয়ে বসে তার কিছু নগ্ন ছবি। এবং বলে যে নগ্ন ছবির প্রতিদানে সে মেয়েটিকে দশ হাজার টাকা দেবে। তার সঙ্গে আমার কথোপকথনের এক পর্যায়ে আমার মনে হয়েছে সে প্রায় মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশে কোনো না কোনো কারণে অসহায় অবস্থায় পড়ে যাওয়া প্রায় প্রতিটি নারীর জীবনের গল্পটা প্রায় এরকমই। খুব চাকরি দরকার যে মেয়েটার, অনেক টাকা দরকার যে নারীর, থাকার জন্য একটি ঘর দরকার যেই কিশোরীর, পরীক্ষায় পাশ করা দরকার যে ছাত্রীটির- এরা প্রত্যেকেই লোলুপ পুরুষদের চোখে স্বেচ্ছায় বিক্রির জন্য বাজারে ওঠা একটি জ্যান্ত মাংসের টুকরো। সত্যি বলতে নারীর অসহায়ত্ব পুরুষের কাছে খুব লোভনীয়।
পুরুষ টাকা দিয়ে শরীর কিনতে চায়, কারণ তারা বিশ্বাস করে অসহায় নারী মাত্রই নিজ শরীর বিক্রি করে পেট চালাবার টাকা, থাকার ঘর, ভালো একটা চাকুরি, কিংবা পরীক্ষা পাশের সার্টিফিকেট কিনতে সানন্দে রাজী হবে। কেউ বা বাধ্য হয়ে অন্য উপায় না দেখে রাজি হয়ে যায়; কেউ লজ্জায়, অপমানে নিজেকে গুটিয়ে ফেলে; কেউ আত্মহত্যা করতে চায়, আর কেউ সত্যি সত্যিই আত্মহত্যা করে ফেলে। কিন্তু যে কাজটি কেউ করে না বা করবার সাহস করে না- সেটি হলো কু-প্রস্তাব দেয়া পুরুষটির মুখোশ খুলে ফেলা! 
অনেক ক্ষেত্রে মুখোশ খুলে দেয়ার সাহস পায় না নারী। অনেকেই মনে মনে ভাবে- ‘থাক, মেয়ে হয়ে যখন জন্মেছি, সহ্য করতেই হবে। যেটা গেছে গেছে…’ অনেকক্ষেত্রে মুখোশ খুলে দেবার ইচ্ছে থাকলেও হাতে কোনো প্রমাণ থাকে না। তবে বেশ কিছু ক্ষেত্রে প্রমাণ হাতে হাতের কাছেই। আর যদি হাতের কাছে তেমন কোন প্রমাণ থেকেই থাকে, তাহলে কেন তার মুখোশ খুলে দেয়া হবে না?
ডিজিটাল এই যুগে তথ্য প্রযুক্তি যেমন এগিয়ে গেছে, তেমনি এই মুখোশ খুলে দেওয়াটাও অনেক অনেক সহজ হয়ে গেছে! কেউ কেউ কু-প্রস্তাব দিয়ে থাকে ইনবক্সে, ম্যাসেঞ্জারে। সেক্ষেত্রে তার সেই চ্যাটালাপের স্ক্রিণশট ফাঁস করে দেয়া যেতে পারে। যদি মোবাইল ফোন কথোপকথনে এ ধরনের প্রস্তাব দেয়া হয়ে থাকে তাহলে সেটা রেকর্ড করে ফাঁস করে দেয়া যেতে পারে ফোন কনভার্সেশনের অডিও ক্লিপ। শুধু এরকম কয়েকটি দৃষ্টান্ত প্রয়োজন। শুধু কয়েকটি ভদ্রবেশী পুরুষকে অনলাইনে ‘নগ্ন’ করে ফেলতে হবে, সেটা নিয়ে খুব হৈ চৈ ফেলে দিতে হবে। 
torture-2তবে এ কথাগুলোর পরও সমাজের একটা বড় অংশ গোলযোগ উপস্থিত করবে, তা আর বলে দিতে হবে না। কেউ কেউ হয়তো বলবে ‘কু-প্রস্তাব’ই তো দিয়েছে, ধর্ষণ তো আর করেনি! যারা এ কথাগুলো বলছেন, তারা জানেন না এরকম একটি কু-প্রস্তাব একজন নারীর জন্য কতখানি মানসিক কষ্টের, হতশার, লজ্জার, অপমানের!
প্রতিদিন অসংখ্য নারী কর্মক্ষেত্রে, পারিবারিক জীবনে, সামাজিক জীবনে এ ধরনের কু-প্রস্তাব পেয়ে প্রচণ্ড অস্বস্তিতে ও মানসিক হীনম্মন্যতায় দিন কাটাচ্ছেন, তার সঠিক হিসেব কি আমাদের কাছে আছে? কেন আমরা এটাকে চলতে দেবো? কেন আমরা এটাকে বন্ধ করব না?  
যদি এরকম বেশ কয়েকজন মুখোশধারীর মুখোশটা সমাজের সামনে খুলে ফেলা যেতে পারে, তাহলে বোধহয় সুযোগসন্ধানী পুরুষদের একটা বড় অংশকে ভয় পাইয়ে দেয়া সম্ভব হবে। টনক নড়বে সমাজের। যারা এখনও বিশ্বাস করে যে নারী মাত্রই বাংলা সিনেমার প্রধান নারী চরিত্রের মতো দরজা বন্ধ করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদবে, কেঁদে-কেটে বালিশ ভেজাবে, নিজেকে গুটিয়ে রাখবে, তিলে তিলে শেষ করে দেবে অথবা অন্য উপায় না দেখে পুরুষের হাতে ধরা দেবে- তাদের সেই বিশ্বাসটাকে চিরতরে ভেঙ্গে দিতে হবে।
মনে রাখতে হবে, একজন নারীর মানসিক দুর্বলতাটুকুই বিকৃতিগ্রস্থ পুরুষের সব থেকে বড় শক্তি।
শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.