নারীবাদী মুখোশের আড়ালে

শাশ্বতী বিপ্লব: সমাজটা যেহেতু নারী-পুরুষ দুইয়ের মিলনে তৈরি, তাই নারী একা নারীমুক্তির জন্য যতই চিৎকার করুক না কেন, যতদিন পর্যন্ত পুরুষও এই দাবীর পক্ষে এক কাতারে এসে না দাঁড়াবে ততদিন একটি সমতাভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে। তাই যখন কোন পুরুষ স্বতোঃপ্রণোদিত হয়ে আন্তরিকভাবে নারী আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন, তখন আমার মনের কোণে আশার আলো জ্বলে ওঠে। ভাবি, এবার তবে ঘুচবে সকল আঁধার।

feminist-man-1কিন্তু আমার মনের ধন্ধ কাটে না তাতে। নানা শংকা ও প্রশ্নেরা উঁকিঝুঁকি মারে। খুব মুশকিল। এই প্রশ্ন করার বাতিকের কারণে এই জীবনে আমার কখনো কোথাও জনপ্রিয় হওয়া হলো না। সবাই যখন কোন কিছু স্বতঃসিদ্ধ বলে মেনেই নিয়েছে, তখনই আমার মনে শুধু প্রশ্নরা ঘুরে বেড়ায়।

কোন কোন নারীবাদী পুরুষকে দেখেও আমার মনে বোকা প্রশ্নেরা ঘোরাঘুরি করে। নারীবাদকে একজন পুরুষ কতটা ধারণ করতে সক্ষম? আজন্ম পুরুষ হিসেবে বড় হয়েছে যে মানুষ সে কি চাইলেই তার সেই পুরুষ স্বত্ত্বাটাকে, তার মাসকুলিনিটিকে ঝেড়ে ফেলতে পারে? কতটা পারে? পুরুষ হিসেবে এযাবৎকাল সে যে সুবিধাগুলো ভোগ করেছে তার কতটা সে জলাঞ্জলি দিতে প্রস্তুত? যদি কখনো তার পুরুষ স্বার্থে বা পৌরুষে আঘাত লাগে, তখনও কি সে নারীবাদের পক্ষে থাকে?

অনেকেই হয়তো থাকে, আবার অনেকে থাকে না। নারীবাদিতা অনেকের কাছে একধরনের ফ্যান্টাসি, ভারি ভারি বুলির স্মার্টনেস বা নিছক ক্যারিয়ার তৈরির সোপান। নারীবাদী পুরুষের ঘরে উঁকি দিলে অনেকসময় সত্যটা টের পাওয়া যায়। জানি, অনেকেরই পছন্দ হবে না কথাগুলো। কিন্তু কী করবো বলুন। কথায় আছে, স্বভাব যায় না ম’লে। আমারও সেই অবস্থা। হয়তো কম বুঝি বলেই।

নারীর প্রতি বৈষম্য নিয়ে টুকটাক লিখলেও আমি ঠিক সেই অর্থে নারীবাদ নই। সত্যিকার অর্থে একজন নারীবাদী হতে হলে যে পরিমাণ প্রজ্ঞা ও সাহসের প্রয়োজন হয়, আমার তার যথেষ্ট ঘাটতি আছে। যা লিখি তার অনেকটাই প্রকৃতিগতভাবে আমি নারী বলেই হয়তো। কিন্তু চারদিকের নারীবাদ চর্চা নিয়ে মনে অনেক প্রশ্ন তৈরি হয় প্রতিনিয়ত। আমি সেগুলোর উত্তর খোঁজার বা বোঝার চেষ্টা করি।

feminist-man-2নারীবাদী নারীদের সম্পর্কে একটা সাধারণ ধারণা হলো এরা শারীরিক সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে বেশ উদার। আর এই ভুল ব্যাখ্যা বা ধারণার সুযোগ নিতে টুক করে হাজির হয়ে যায় কিছু কামুক ও নিপীড়ক পুরুষ। হ্যা, নারীবাদীর খোলসেই। যাদের প্রধান টার্গেট উঠতি বয়সী কিশোরী বা সদ্য তরুণী, যে সমাজের পঁচা গলা নিয়মগুলোকে ভাঙতে ছটফট করছে। খুলতে চাইছে হাত পায়ের বাঁধনগুলো। আর টার্গেট বিষাদগ্রস্ত নারী, যার একটু সহমর্মিতা দরকার।
আপাতদৃষ্টিতে এইসব নারীবাদী পুরুষদের সচেতন ও সংবেদনশীল মনে হলেও আদতে তারা নারীবাদের মুখোশ পড়ে থাকে। নারীর কাছে ঘেঁষার এটা একটা দারুণ কৌশল। এদের শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ এবং তার সুচতুর ব্যবহারে দক্ষ। “women’s lib”, “body positive” বা “sexual agency” র মতো মনভোলানো শব্দগুলো এরা মুখস্ত করে নারীকে ভোলাতে।

তারা জানে, আপনি এমন একজন পুরুষকে খুঁজছেন যিনি নারীর সমতায় বিশ্বাস করে। আপনার সামনে সে পুরুষের সমালোচনা করে। চাই কী একটা দুইটা পুরুষকে একহাত দেখিয়েও দেয়। এসবই সে করে আপনাকে জয় করার জন্য।
তারপর, একবার সম্পর্কটা তৈরি করতে পারলেই ধীরে ধীরে মুখোশটা খসে পড়তে থাকে। সে আপনার নিয়ন্ত্রক হিসেবে আবির্ভুত হয়।

এমনকি, কখনো কখনো জেন্ডার সমতাকেই সে তার নিপীড়নের কুটকৌশল হিসেবে ব্যবহার করে। তা সে প্রেমিকই হোক বা বিয়ে করা বর। পরকীয়াই করুক বা লিভ টুগেদার – স্বার্থে আঘাত লাগলে নিপীড়কের চেহারাটা বেরিয়ে আসতে সময় লাগে না। শেষপর্যন্ত আপনি যদি তার বশ্যতা স্বীকার করে না নেন, তবে আপনার নামে কুৎসা রটাতে, আপনাকে নিয়ে মুখরোচক সমালোচনা করতে তার এতোটুকু বাঁধে না। কাজেই, সাধু সাবধান!

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় দেখেছি একাডেমিকভাবে ‘ফেমিনিজম’ পড়া কিছু মানুষের ভণ্ডামী। যারা নারী পুরুষের সম্পর্ক নিয়ে বেশ উদার কথা বার্তা বলেন, কিন্তু কাজকারবার চরম বিরক্তিকর। আমার প্রায়ই মনে হতো, এই চর্চাটা আসলেই কতটা নারীমুক্তিকে সাহায্য করে, আর কতটা উদারতার মুখোশে পক্ষান্তরে পুরুষের হীন স্বার্থ হাসিলকে সাহায্য করে।
খুঁজতে খঁজতে পেয়ে গেলাম আমার প্রশ্নের কিছু উত্তর।

Shaswati 4
শাশ্বতী বিপ্লব

এভরিডে ফেমিনিজমের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক মেলিসা এ. ফাবেলো এবং কুইয়ার লেখক আমিনা খান নারীবাদি পুরুষের সাথে যৌন বা প্রেমের সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে  কিছু সাবধান বাণী উল্লেখ করেছেন। উনারা দুজনই এক্টিভিস্ট। দুজনে মিলে দশ ধরনের নারীবাদি পুরুষকে চিহ্নিত করেছেন।লিংক দিয়ে দিলাম নীচে, আগ্রহীরা পড়ে দেখতে পারেন। যদিও তারা ডেটিং করার ক্ষেত্রে এদের সনাক্ত করেছেন, তবুও সাধারণভাবে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রেও এর বেশিরভাগই প্রাসঙ্গিক।
আনন্দের বিষয় হলো, মেয়েরা আজ আর অতো বোকা নয়। তারা বেশিরভাগ চালাকি বুঝতে সক্ষম।

এসময়ের মেয়েরা আমাদের চাইতে অনেক বেশি বুদ্ধিমতি, সাহসী। আমি ওদের মুগ্ধ হয়ে দেখি। সাহসকে সাধুবাদ জানাই। তবুও কথা থাকে। আমি যদি একজনকেও গতানুগতিক গণ্ডি ছেড়ে বেরিয়ে আসতে আহ্বান জানাই, তাকে সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সাবধান করাও আমার দায়িত্ব। তারপর যার যার সিদ্ধান্ত তার তার।
(বিশেষ দ্রষ্টব্য: সত্যিকারের নারীবাদী পুরুষ, যারা সৎভাবে এই আন্দোলনের পাশে আছেন, তাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা রইলো।)
http://everydayfeminism.com/2016/08/reasons-to-beware-feminist-men

শেয়ার করুন:

এ কথাটি খুবই সত্যি যে অধিকাংশ পুরুষই নারীবাদকে উপলব্ধি করতে এবং ধারণ করতে সক্ষম নয়। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে বেশ কিছু নারীবাদী পুরুষকে চিনি, যারা নারী আন্দোলন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারী-পুরুষ সমান অধিকারের জন্য পরিশ্রম করেন। মূল ব্যাপারটি হচ্ছে নারীবাদ সম্বন্ধে পুরুষের ভেতরে খুব ভুল কিছু ধারণা বাস করে। একদিকে যেমন দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্ণতা, অন্যদিকে আছে নারীবাদ সম্বন্ধে সঠিক জ্ঞানের অভাব। অধিকাংশই বিশ্বাস করে- ‘নারীবাদ মানেই পুরুষ বিরোধীতা, নারীবাদ মানেই পুরুষকে হটিয়ে দিয়ে সবকিছু দখল করে নেয়া।’ ব্যাপারটা যে মোটেও তেমন কিছু নয়, তা বোঝার ক্ষমতা অনেকেরই নেই। ‘নারী যে পুরুষের আজ্ঞাবহ হয়ে পুরুষের মনমতো, ইচ্ছেমতো জীবন যাপন করবে না’ এই ব্যাপারটির সঙ্গেও অনেকে পুরুষ বিরোধীতার মিল খুঁজে পান। তবে আমি বিশ্বাস করি, পরিবর্তন আসবেই। পরিবর্তন আসতে সময় লাগবে। আজ হয়তো হুট-হাট করে আমরা চারপাশটা পালটে যেতে দেখবো না। কিন্তু আজ থেকে শত বছর পর হয়তো বা নারী ও পুরুষের মাঝে সত্যিকার অর্থেই কোনো পার্থক্য থাকবে না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.