বিষয়: নগ্নতা

সাগুফতা শারমীন তানিয়া: পর্দা নহি জব্‌ কোয়ি খুদাসেঁ…নগ্নতা নিয়ে নেরুদার একটি অমর লাইন আছে-  You  have moonlines, applepathways. শুনলেই কেমন চাঁদের কিংবা আপেলের গোলালো ভাবটা চোখে ভেসে ওঠে। খোসা ছাড়ানো একখানা নিটোল বাদামের মতো বা শস্যদানার মতো নগ্নতা, কিউবার রাত্রির মতো নীল মখমলি।

এই অ্যাপল-পাথওয়েজ শুনলে আমার আরেকটা দৃশ্যের কথা মনে পড়ে, রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস  ‘যোগাযোগ’এ কুমু কাপড় বদলে জামা ছেড়ে ডুরে শাড়ি পরে শুতে আসছে। সে অপেক্ষমান কিংবা স্তব্ধ। কিন্তু তার দেহ ঘিরে ডুরে শাড়ির সেই ডোরাগুলি যেন চোখের দৃষ্টির মতো ঘুর্ণায়মান, অশেষ ক্ষুধার দৃষ্টির মতো সেই দৃষ্টিপথ যেন তার দেহ ঘিরে আপূর্যমান।

Shegufta
সাগুফতা শারমীন তানিয়া

কুমু আর মধুসূদন- একদিকে প্রেমের আজন্ম চাহিদা, আরেকদিকে প্রেমহীনতা। যে প্রেম শ্রেষ্ঠ পিচ্ছিলকের মতো দু’জনকে গড়িয়ে দেয় যৌনতার পথে- প্রেমহীন মানুষকে যখন সেই পথ অতিক্রম করতে হয় তখন তার অবস্থা হয় কুমুর মতো শোচনীয়।

আমার দেখা প্রথম নগ্নতা- অঁরি রুশোর ছবিতে, অলিয়ঁস ফ্রঁসেস থেকে শিশুশিল্পীর পুরস্কার হিসেবে দেয়া হয়েছিল অঁরি রুশোর বই।  কালচে সবুজ বনে আজানুলম্বিত চুল বিছিয়ে নগ্না নারী বসে আছে অপেক্ষায় বা দাঁড়িয়ে- মৃত্যুপথযাত্রী হাতির মতো তার গম্ভীর অপেক্ষা একরকমের চূড়ান্ত বস্তুর জন্য। তার নগ্নতা মনে কোনো চপলতার ঢেউ তোলে না। এ সেই ‘স্তনের মতো যোনীর মতো অন্ধকার’। সে বয়সে বনফুলের রূপকথায় বিমল দাসের আঁকা ছবিতে কাঁচুলিবদ্ধ মঞ্জরীকে বা রত্নাবলীকে দেখে আমার মনে যে পুলক জাগতো, যে সৌন্দর্য সচেতনতা ধীরে ধীরে স্থান করে দিচ্ছিল শরীর বিষয়ক চিন্তার, সে চিন্তার খোরাক যোগাতে তৎকালে রুশো ব্যর্থ হয়েছিলেন।

আর ক’দিন পরেই তো আমি ভেবে জেরবার হবো, কপালকুন্ডলার পরনে কি ছিল, যখন সে গোড়ালিছোঁয়া কেশজালে নিজেকে ঢেকে প্রশ্ন করেছিল, “পথিক, তুমি কি পথ হারাইয়াছ?” কিংবা গেইনসবরোর নগ্না নারী কেন আশিরপদনখ নগ্ন হয়ে শিশুকে স্তন্য দেন, সেই প্রশ্ন আমার মাথায় উদয় হবে। সুবোধ ঘোষের ‘ভারত প্রেমকথা’য় কুন্তীর আহ্বানে সূর্যদেব এসে পড়েছেন, ভীত বিহ্বলা কুন্তী কেবল দেখতে চেয়েছিল ঋষির বর ফলে কি না- সে মিনমিনিয়ে বলেছিল, “আপনি ফিরে যান সূর্যদেব।”

সূর্যদেব অসম্মত হলেন, দেবতা একবার মর্ত্যের নারীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে বর সম্পূর্ণ না করে ফিরে যেতে পারেন না- তাতে তাঁর পৌরুষ নিয়ে হাসবে লোকে। সে সময় আমি ভাবতে চেষ্টা করেছিলাম সূর্য মিলিত হলেন কুন্তীর সাথে, করেজ্জোর তুলিতে Danae যেমন করে মিলিত হয়েছিলেন আলোর রেনুর সাথে, কেমন দেখতে ছিলেন উজ্জ্বল নগ্ন সূর্যকণার মতো দেবতা?

আর আমি স্তব্ধ হয়ে যাব বার্ণিনির ‘অ্যাপোলো অ্যান্ড ড্যাফনি’ দেখে- মার্বলের চাঙড় থেকে কেমন করে শরীরের আলো ফুটে বেরোয় সেটা দেখে। ক্ল্যাসিক্যাল শিল্পীরা তো বটেই নিওক্লাসিসিস্ট- প্রির‍্যাফায়ালাইট- বারোক সব মনুমেন্টে- স্মৃতিস্মারকে- তোরণে- পেডিমেন্টে- স্তম্ভে এত এত নগ্ন নারীপুরুষ কেন? কেন তাদের নগ্নতা এমনি করে আবাহন করে সুন্দরকে এবং যুগপৎভাবে ‘বিপুলকায়’কে- ‘লার্জার দ্যান লাইফ’কে। কেন নগ্ন পরিপুষ্ট ‘চেরাব’ গীর্জাকে এমনি সুষমা দান করে?

আমাদের বাৎসায়নে নগ্নতা। খাজুরাহোতে নগ্নতা। কূম্ভমেলাতে নগ্নতা। অবতারদের বাম উরুতে বসে আছেন পীনস্তনী দেবী, তাঁর খোলা কোমরে দেবতার হাত; কখনো উভয়ে দন্ডায়মান, দেবীর স্তন দেবদূর্লভ ফলের মতো আঁজলায় ধরে আছেন দেবতা। ডিমিটারের ডালা থেকে পাকা ফসল লুটে আনতে আদিতে গ্রীক চাষাদের বলা হয়েছিল বীজবপন-হালকর্ষণ এবং ফসল আহরণের সময় নগ্ন থাকতে।

zinat-1নগ্নতার প্রশ্নে জুদাইজম, ক্রিশ্চিয়ানিটি এবং ইসলাম প্রায় ঐকবাক্য বলে। ক্যালেন্ডারে নারী পক্ষীরাজ বোরাক এর যে ছবি মেলে তা যদিও যথেষ্ট যৌনাবেদনময়। অ্যাডাম এবং ইভ স্বর্গোদ্যানে নিষ্পাপভাবে নগ্নই ছিলেন, জ্ঞানবৃক্ষের ফল খাওয়ার পর তাঁদের নগ্নতায় জড়িয়ে গেল লজ্জা- আত্মসচেতনতার লজ্জা, বাইবেলে নগ্নতা লজ্জা এবং অনুতাপের (অরিজিনাল সিন) সমার্থক হয়ে গেল।  নগ্ন যীশু কিংবা বুদ্ধ শুধু নিবিড়ভাবে পবিত্র নন- বিষাদসুন্দরও তো। কালীতে এসে নগ্নতা নিষ্ঠুর কিংবা শক্তিমতী।

আদিযুগের প্যালিওলিথিক ভেনাসের থলথলে পেট আর অন্তরীপ সদৃশ স্তন, বতিচেল্লির ভেনাসে এসে সেই নগ্নতা প্রসন্ন, মুক্তা সুগোল লাবণ্য তার। আবার সেই একই পৃথিবীর আরেক প্রান্তে নগ্ন সরস্বতী আঁকবার জন্য দেশান্তরী হতে হয়েছে ফিদা মকবুল হুসেনের মতো শিল্পীকে। হুসেনকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে মুসলিমের মন কিংবা পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ভারতীয় স্পিরিচুয়ালিটিকে বুঝতে চেষ্টা না করতে ইত্যাদি।

আদি ইহুদিদের কাছে নগ্নতা ছিল (আছেও) চূড়ান্ত লজ্জাস্কর শাস্তি। ইহুদি পর্ণো ম্যাগাজিনেও যে কাপড় পরতে হয় কিন্তু বিলোল চাহনি দিতে হয়- এধরনের বহু রসিকতা পশ্চিমে চালু আছে। নগ্নতা বহু জনপদে সামাজিক শাস্তি, নারীর তো বটেই, পুরুষেরও। দুর্দমনীয়া ফুলনকে মনে আছে তো আপনাদের? ধর্ষণ শুধু নয়, গ্রামের সকলের সম্মুখে নগ্নতা ছিল যার শাস্তি?

আমাদের সাহিত্যে নগ্নতার অপূর্ব নির্মাণ বলতে তেমন কিছু মনে পড়লো না কেন? রবীন্দ্রনাথ না হয় ভিক্টোরিয়ান, নজরুল ‘দেহের দেউড়ি’ অব্দি লিখে মূলতঃ অ্যালিগরিতেই মগ্ন, আবুল হাসানে যখন লাবণ্যসম্ভবা নারীর স্বচ্ছ জামরুলের মতো গোড়ালির কথা পড়ি-  মনে হয় সেই নগ্নতার স্বাদ লাগছে আমাদের জিভে, লুকিয়ে পড়া বুদ্ধদেব বসুর ‘রাত ভর বৃষ্টি’তে মালতীর খোলা বুকে এরিওলার বিবরণে তালের কালোর নীচ থেকে উঁকি দেয়া গোলাপী- একটি উন্মুক্ত স্তন যেন চাহনির  মতো শুধু বলতে পারে, এই আমি। আর কিছু জানি না।… একেবারে অনবদ্য!  কেন  গাঁওদিয়ার কুসুমের সৌন্দর্য কেবল ‘গায়ে তাহার বেলাউজ নাই’ অব্দি এসেই থেমে যায়? আমরা খুব শ্লীল বলে? নগ্নতা আমাদের কাছে অশ্লীল বলে? নগ্নতা আমাদের কাছে পদস্খলন- চরিত্রহানিকর- তামসিক জীবনের অনুসঙ্গ বলে? আল মাহমুদের ‘জলবেশ্যা’র সদ্য চেরাই করা জামকাঠের গন্ধমাখা শরীর আর ছইয়ের টিমটিমে আলোয় উদ্ভাসিত গাঙশুশুকির মতো বুক কি অশ্লীল? শারীরিক নগ্নতা কি ‘চোখের বালি’র বিনোদিনীর পায়ে মহেন্দ্রর শেষ প্রণাম এবং “বোঠান মাপ করিও”এর চেয়ে বেশি অশ্লীল?

zinat-2নগ্নতা এবং যৌনতাকে জাদুতুলিতে মাখিয়ে হারুকি মুরাকামি রচনা করেছিলেন তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় উপন্যাস ‘নরওয়েজিয়ান উড’; মনে আছে আন্তরিক সমারোহে ‘নরওয়েজিয়ান উড’ অনুবাদ করতে বসেছিলাম- তখন দেখি বেশির ভাগ শারীরিক অনুসঙ্গের কোনো বাংলা হয় না, ইয়ে  স্বাভাবিক সুন্দর বাংলা হয় না। যে এই অনুবাদ করবে, তাকে বাংলায় নির্মাণ করতে হবে সেই শব্দমালা যাতে নগ্নতার মতো অগ্নি আছে। নগ্নতার একটি ভারী অদ্ভূত প্রতিশব্দ আছে আমাদের বাংলায়, ‘দিগম্বর’- আকাশ যার আচ্ছাদন! অতএব কোনোদিন এই শারীর অনূসঙ্গবাহী উপন্যাসগুলি অপূর্বভাবে অনূদিত হবে বাংলায়, সেই আশা আছে।

নগ্নতা এবং যৌনতাকে অসামান্য নিপুণ তুলির রঙ হিসেবে ব্যবহার করে অরহান পামুক নির্মাণ করেছেন ‘দ্য মিউজিয়াম অভ ইনোসেন্স’ উপন্যাসটি- শরীর থেকে শুরু একটি আকর্ষণ শারীরিক জাদুতন্তুতে ভর দিয়ে একটি মায়াজাল রচনা করে সেখানে, যা শুরু হয়েছিল একটি নিছক খেলার মতো করে; যার কোনো গন্তব্য হবার কথা ছিল না তা একসময় বিচিত্র লীলায় সমস্ত জীবনকে অধিকার করে বসে।

নারী হারিয়ে যায়- তার সোহাগ- তার নির্মল যৌনতা- তার প্রেম হারায় না, পুরুষ সেই হারিয়ে যাওয়া নারীর সমস্ত উঞ্ছ স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ করতে করতে একসময় আবিষ্কার করে এটি একটি জাদুঘরে পরিণত হয়েছে। সে উপলব্ধি করে- সময়ের চিহ্নই সবচেয়ে মূল্যবান, এই নশ্বর জীবনে।

এই খেলাচ্ছলে যৌনতা এবং নগ্নতাকে প্রখর উপাদান করে নির্মিত হয়েছে বার্তোলুচির ‘লাস্ট ট্যাংগো ইন প্যারিস’, দু’জন বাস্তবতাপীড়িত মানুষ একটি খালি বাড়ি দেখতে এসে টের পায় তাদের একমাত্র মূল ভূখণ্ড তাদের শরীর, একটিমাত্র সুখের দ্বীপ হিসেবে বিক্ষুব্ধ সংসারসমুদ্রে জেগে আছে সেই শরীর।

মুম্বাইয়ের রাজ কাপুর ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’এ জয়গান গাইলেন দেহোত্তীর্ণ সুন্দর হৃদয়ের, অথচ পর্দায় সর্বক্ষণ জ্বালিয়ে রাখলেন জিনাত আমানের সুন্দর শরীর এবং তদলগ্ন কামনার বহ্নি। হৃদয়ের কথা বলতে চাইলেন, অথচ বারংবার হৃদয়ের ক্রুসিবল দেহকেই দেখিয়ে গেলেন মোটাদাগে। ক্যামেরার চোখ সেই কুমুর শাড়ির ডোরার মতোই জিনাতের শরীরকে ঘিরে তার অরবিট রচনা করে গেল, করেই গেল। এই কপটতা রীতিমতো অশ্লীল।

সিনেমায় নগ্নতা নিয়ে একটি আলাদা লেখাই হতে পারে, সেখানে আসতে পারে একইসাথে হিচককের ‘সাইকো’ এবং ‘ফ্রেনজি’, একটিতে নগ্নতার বিরুদ্ধে তখন রক্তচক্ষু সেন্সরবোর্ড, আরেকটিতে ফ্রন্টাল ন্যুডিটিও দেখিয়েছেন তিনি, অথচ সেটা সাইকোর মতো মোক্ষম হয়নি।

আগেই লিখেছি, দেবাদিদেবরা কমবেশি সবাই নগ্ন- গ্রীক ও রোমান- ইজিপশিয় ও এসিরিয়- ভারতীয়। ভেবে দেখুন ‘দেবদূর্লভ কান্তি’ বলতে আমরা যা বুঝি, তা কিন্তু আসলে নিঁখুত মনুষ্য শরীরের। তার কাঁধ পাখির দাঁড়ের মতন সমতল হয়ে শেষটুকু পুরু ডানার মতো নোয়ানো। পিঠের শিরদাঁড়া নিষ্কম্প রেড়ির তেলের শিখার মতো সটান, চামড়া ফুঁড়ে বের হয়ে পড়ে তার বিভা। পিঠের দু’পাশে তেকোনো হাড় কী জীবন্ত! পিঠ থেকে কোমর অব্দি যেতে যেতে দুই তীরে দু’খানা বন্ধনীর মতো টোল। নিপুণ কূম্ভকারের চাকায় গড়ানো তার নিতম্ব-‘smooth hemispheres of an apple। তার স্তনের ভীরুতা কিংবা বাহূল্য দুইই বাঙ্ময়। সুন্দর তার পাটাতনের মতো পেশল বুক। তার উদ্যত শিশ্ন সুন্দর, চামড়া ভেদ করে আভাস দেয়া বস্তিদেশের হাড় সুন্দর, সুন্দর তার উরুর পেশী, উটপাখির ডিমের আদল পাওয়া কাফমাসল সুন্দর। নেরুদা কি আর এমনি লিখে গেছেন- “তোমার ত্বকের তলায় জেগে আছে চাঁদ- জোছনা জেগে আছে।”

এতক্ষণ নগ্নতা নিয়ে মিষ্টি মিষ্টি কথা লেখা গেল, এবার আসি তিক্ত প্রসঙ্গে। নগ্নতা এতো অশ্লীল আমাদের কাছে, অথচ পথে-ঘাটে-অনলাইনে নগ্ন শারীরিক সম্বোধন এবং কটুক্তি, কই এতো অশ্লীল নয় তো?

zinat-3কাউকে শব্দ দিয়ে নগ্ন করে দিতে পারে সংঘবদ্ধ লোকে- কেউ তো তখন হৈ-হৈ করে ওঠে না দেশ গেল, সমাজ গেল! প্রেমিক-প্রেমিকার একান্ত নগ্নতার ভিডিওর কিন্তু আমরা আবার একাগ্র গ্রাহক; যা হার্দিক-যা ব্যক্তিগত সেই নগ্নতার বেলায় আমাদের উচ্ছাস কুরুসভার দুঃশাসনের মতো। অর্ধনগ্ন পুরুষের প্রকাশ্যে প্রস্রাবত্যাগ নিয়ে আমরা চিন্তিত নই, আমরা চিন্তিত মেয়ে স্কুল ছুটি হবার পর পিলপিলিয়ে যে মেয়েরা স্কুল গেট দিয়ে বেরুচ্ছে তাদের হা-ক্লান্ত শরীরের ওড়না কত সেন্টিমিটার সরে গেল তাই নিয়ে, ব্লাউজের হাতা কাঁধে থামলো না বগলে নাকি কনুইয়ে এর প্রতিটি আমাদের আদর্শিক অবস্থানের মাপমান।

আমরা আমাদের দীর্ঘতম সৈকত সাজিয়ে রেখেছি (ঠিক সাজিয়ে নয় অবশ্য), কিন্তু সেখানে দেশবিদেশের মানুষ তার নিজস্ব নগ্নতাকে সামান্যতম মুক্তিও দিতে পারে না। দিলে আমরা আচ্ছা মতোন পিটিয়ে দিই। নগ্নতা এতো অনতিক্রম্য বলেই স্কুল-কলেজে যৌনতার শিক্ষা নিয়ে আমাদের এত বাধা। নগ্নতা বিষয়ক শব্দাবলীও আমাদের কাছে নগ্ন।

প্রকাশ্য নগ্নতার যেসব উদাহরণ আমাদের সামনে আছে- বিজ্ঞাপন- চলচ্চিত্র- গ্ল্যামার ম্যাগাজিনের কল্যাণে, সেখানে নগ্নতার যে সৌন্দর্য উদ্ভাসিত, সেটা কতোটা জীবনঘনিষ্ঠ? মেক-আপ এবং সংশোধনমূলক প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে দাঁড় করিয়ে দেয়া ‘দেবদূর্লভ’ নগ্ন শরীর কি সাধারণ মানুষদেরকে তাদের স্বরূপ নিয়ে উদ্ভ্রান্ত এবং বিমর্ষ করে তুলছে না?

এইসব নিয়ে প্রচুর বিতর্ক রয়েছে। বিতর্কের কারণও রয়েছে। নারীর নগ্নতার সাথে পণ্যায়ন বিষয়ক বিতর্ক আছে, পণ্যের দরে তার নগ্নতা এবং যৌনতাকে বিক্রি করবার দায়ে আধুনিক সমাজ দোষী। আধুনিক সমাজে নারীপুরুষের হাসিকান্না অব্দি স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় পণ্যায়িত, কারো মাথায় পিলফারপ্রুফ ক্যাপ নেই। তাহলে পুরুষকে সেইমতো পণ্য হতে বাধা দিচ্ছে কে? কে বলেছে পুরুষের নগ্নতার পণ্যমূল্য নেই? পুরুষ নিজে বলেছে?

শরীরের নগ্নতা একটি প্রকাশ। শারীরিক নগ্নতার বাইরে আর যতরকম নগ্নতা- যার পোষাকী নাম ‘প্রকাশ’, সেইসব প্রকাশ আমাদের প্রিয় নয়? ভালবাসার প্রকাশ? সাহসের প্রকাশ? আকুতির প্রকাশ? বেদনার প্রকাশ? সম্মিলিত আনন্দের প্রকাশ? প্রকাশ হয়ে পড়া মগ্নচৈতন্য?

এই শরীর এই নগ্নতা জীবের যৌনতার প্রধানতম বাদ্যযন্ত্র- ঈশ্বরের হাহাকার। প্রিয়জনের নগ্ন শরীর জড়িয়ে ধরে যে সময়টুকু নশ্বর মানুষ কাটায়- সে’সময় নৈঃশব্দ্যের মতোই হীরন্ময়। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের একটি অসামান্য উক্তি আছে শরীর নিয়ে, হুবহু মনে নেই বলে দুঃখিত- দাঁত ব্যথা হলে নাকি বোঝা যায় শরীর ছাড়া মানুষকে আর কিছুই দেয়া হয়নি, নেহাত নিজেকে গরু গরু লাগবে বলে মন-টন ইত্যাদি ভেবে নেয়া।  নগ্নতাকে সেলাম। নগ্নতা যিনি তিল তিল করে সৃষ্টি করেছেন তাঁকে সেলাম।  

শুরু করেছিলাম খঞ্জর-হাতে আনারকলিরূপী মধুবালার লিপে সুপারহিট গানের লাইন দিয়ে-

“পর্দা নহি জব্‌ কোয়ি খুদাসেঁ/ বান্দোসে পর্দা করনা কেয়া…”

এইখানে থামি। প্রবল আক্রোশে পৃথ্বীরাজ কাপুরের চোখের মতো জ্বলছে সমাজচক্ষু, দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছি।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.