প্যারেন্টিং কেন গুরুত্বপূর্ণ!

তানিয়া মোর্শেদ: এক কিশোর তার বাবা-মাকে অগ্নিদগ্ধ করেছে। বাবাটি মারাও গেছেন। কোনো এক ব্র্যান্ডের মটর সাইকেল কিনে না দেবার জন্য এই ঘটনা। এই খবরে অনেকেই ছেলেটিকে নিয়ে আলোচনা করছেন। ঐশীকে নিয়েও অনেক আলোচনা হয়েছে। অধিকাংশই কজ নিয়ে কথা না বলে ইফেক্ট নিয়ে অনেক কথা বলেন।

সন্তান “মানুষ” হচ্ছে কিনা, হবে কিনা, তা অনেক কিছুর উপর নির্ভর করে। তবে বাবা-মা, অভিভাবকের উপর অনেকখানি দায় বর্তায়। ছোট শিশু যা দেখে, শোনে, তার প্রভাব অনেক। মানুষের “মানুষ” হবার জন্য পরিবার, স্কুল, সমাজ, রাষ্ট্রের ভূমিকা অনেক। আবার তার নিজের নিজস্বতাও ভূমিকা রাখে।

tania-morshed
তানিয়া মোর্শেদ

অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের আচরণের দায় বাবা-মায়ের উপর চলে আসে। মানুষ প্যারেন্টিং শিখে পৃথিবীতে আসে না। সন্তান জন্মের আগে এটা নিয়ে অধিকাংশই মাথাও ঘামান না। অনেকে জন্মদানের পরও না! পৃথিবীতে কোন মানুষই পারফেক্ট নন। কোন বাবা-মাও পারফেক্ট নন। তবে সন্তান জন্ম দিলে চেষ্টা করা উচিৎ যতটা সম্ভব “মানুষ” করার। আর এই মানুষ করতে গেলে নিজেকে সবচেয়ে আগে “মানুষ” হবার চেষ্টা করতে হবে। নিজের কথা আর কাজের মিল না থাকলে সন্তান যতো অল্প বয়স্কই হোক না কেন সে ঠিকই ধরে ফেলবে!

প্রতিটা বাবা-মা চান তার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে। কিন্তু এই দুধে-ভাতে থাকা একেকজনের কাছে একেক রকম! সন্তানকে দুধে-ভাতে রাখতে যেয়ে যদি বাবা-মা অনৈতিক কোন কাজ করেন তা কখনই ভালো কিছু বয়ে আনে না। আবার বাবা-মা যদি বাস্তবতা বর্জিতভাবে সন্তানকে লালন পালন করেন, তাও সুখকর কিছু বয়ে আনে না।

বাবা-মার কাছে যে একমাত্র প্রায়োরিটি, পৃথিবীর কাছে সে সাত+ বিলিয়নের আরেকজন মাত্র! ভালবাসা, কেয়ারিং কখনো বস্তুগত বিষয় দিয়ে পূরণ হয় না। সময় একটি আপেক্ষিক বিষয়। কতটা সময় দেওয়া হচ্ছে তার থেকে বড় কথা কীভাবে দেওয়া হচ্ছে? তবে যতোটা সম্ভব সন্তানের বেড়ে ওঠার সময়, সময় দেওয়া জরুরি। এটার উপর নির্ভর করছে সন্তানের অনেক কিছু। তার “মানুষ” হওয়া, সাফল্য এবং মানসিকভাবে ভালো থাকা। সন্তানের সাথে মানসিক সম্পর্ক এমন একটি বিষয় যা সারা জীবন বাবা-মায়ের জন্য তো বটেই, সন্তানের জন্যও ভীষণ জরুরি।

জীবন একটি যাত্রা (নাটক অর্থে নয়)। এর পথে পথে কত কী ছড়িয়ে আছে কেউ জানে না! যে মানুষটি বিভিন্ন সময়ে হাসি-কান্নায়, ঝড়-ঝাপ্টায় মানসিকভাবে বাবা-মাকে অনুভব করতে পারে (বাবা-মা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও), তারা আসলেই অনেক ভাগ্যবান।

বর্তমান সময়টা বড়ই অস্থির সময়। একদিকে বিশ্ব রাজনীতি, যুদ্ধ, ধর্ম নিয়ে যুদ্ধ, মানুষের অতিরিক্ত ভোগবাদী মনোভাব, পুরো পৃথিবীর কালচারাল ভ্যাকুয়ামে পরা (সঠিক বাংলা মনে আসছে না। সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্ব কি?) এসবের মধ্যে মানুষের বেড়ে ওঠা এক সাংঘাতিক চ্যালেঞ্জ! আর আছে ইন্টারনেটের প্রভাব!

টেকনোলজি ব্যবহার কে, কীভাবে করছে তার উপর নির্ভর করছে এর প্রভাব। ক’দিন আগে আমার ছেলে (১৬+ বৎসর) এক ডাক্তারের সাথে শ্যাডোইং (ডাক্তার রুগী দেখার সময় তার সাথে থাকা, কিভাবে তারা কাজ করেন তা দেখা) করেছিল। ফিরে এসে বলেছে, এক বৎসর দুয়েকের বাচ্চা যে কিনা এখনও “হাই’ বলা শেখেনি ঠিকমতো (ডাক্তারকে দেখে যে “হাই” বলতে হয় সেটি), সে নাকি পুরোটা সময় মা বা বাবার ফোন নিয়ে ব্যস্ত ছিল! স্মার্টফোনের স্ক্রিন নিয়ে কীভাবে ব্যস্ত ছিল তা দেখালো!

shahnaz-photo
ছবিটি সদ্যপ্রয়াত আলোকচিত্রী শাহনাজ পারভিনের প্রোফাইল থেকে নেয়া

কিছুদিন আগে আমিও দেখেছি এক শিশুর ডায়পার বদলানোর সময় তার হাতে স্মার্ট ফোন দেওয়া! মনে পড়েছিল, দীপ্তকে সেই সময় বই দেওয়া হতো। না হলে স্থির থাকতো না। ওর কয়েক মাস বয়স থেকেই বই (অবশ্যই শিশুদের) দেখতো। ছোট্ট ছোট্ট শিশুদের কত ধরনের বই আছে! কিছু বই আছে বাথের সময় দেওয়া যায়। কাগজের নয় অবশ্যই।

যুগের সাথে অনেক কিছুই বদলায়। এযুগে বাচ্চারা অবশ্যই অনেক কিছু ব্যবহার করবে, যা আগে ছিল না বলে ব্যবহার হয়নি। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে কোন বয়সে কতটা কীভাবে ব্যবহার করতে হবে। এটা একটি ভীষণ বড় চ্যালেঞ্জ। ড্রাগ, গেইমস, ইন্টারনেটের ব্যবহার এযুগের বিশাল চ্যালেঞ্জ।

কিছু কিছু বাবা-মা একেবারেই টিভি, ইন্টারনেট ব্যবহারের পক্ষপাতি নন। সেটাও ঠিক নয়। সবকিছুতেই পরিমিতিবোধ হচ্ছে জরুরি। সেটা খাবার, পোশাকের বেলায়ও। ব্রান্ড নেইমের জিনিস কেনার অভ্যেস যেন এমন না হয় যে তা না পেলে জীবন ব্যর্থ মনে হয়! সন্তানের খাওয়া নিয়ে চিন্তা করা ভালো, তবে তা যেন তাকে শারীরিকভাবে সুস্থ রাখে সেভাবে ভাবা। খাইয়ে খাইয়ে অবিস বানানো তার জন্যই ক্ষতিকর।

ভালবাসা মানে প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার, বস্তুগত চাহিদা মেটানো নয়। সঙ্গ দিতে না পারার ঘাটতি বস্তুগত কিছু দিয়ে পূরণ করা নয়। শিশুকে যেমন বঞ্চিত করাও ঠিক নয়, আবার সব চাহিদাই সাথে সাথে মিটিয়ে দেওয়াও ঠিক নয়। চাইলেই সব পাওয়া যায় এই ভাবনা নিয়ে বড় হলে সেই মানুষটিই জীবনে যখন চাহিদার কিছু একটা পাবে না (চাইলেই সব পাওয়া যায় না জীবনে, চাওয়াটা শুধু কি বস্তুগত হয় জীবনে?) তখন তা মেনে নিতে প্রচণ্ড কষ্ট পাবে।

আমার ছেলে এক সময়ে দোকানে গেলেই খেলনা কিনতে চাইতো। অনেক ছোট ছিল। বাড়িতে অনেক খেলনা তবুও। দোকান ভর্তি এত খেলনা দেখে সে বয়সে সব বাচ্চারাই অমন করে মনে হয়! আমি শুরু থেকেই বলে দিতাম, শপিং কার্টে খেলনা তুলছো তোলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটা কিনতে পারবে। নিজেই বুঝে দেখো কোনটা নেবে। মাঝে মাঝেই বলতাম, এটা তোমাকে অর্জন করতে হবে।

বিশেষত ভিডিও গেইমসের বেলায়। কোন গেইম সিস্টেম কিনতে হলে আগে ভাবতে হবে এটা তোমার না হলে কি চলছেই না? বিশেষ দিনে পাবে। ইত্যাদি। সব সময় যে সে ধৈর্য্য রাখতে পেরেছে তা নয়। একটি কাণ্ড করতো। বাবা বা মায়ের জন্মদিনে সে নিজের খেলনা কিনে বলতো এটা তার গুডি ব্যাগ! বাবা-মা কেউ জন্মদিন পালন করে না। শুধু বাইরে ডিনার আর কার্ড আর ফুল (আমার বেলায়)। এখন সেকথা মনে করে নিজেই নিজেকে দোষারোপ করে সে! কিছু কেনার আগে জিজ্ঞাসা করে, কেনা যাবে কি না?

জাপান থেকে আসার আগ মুহূর্তে এয়ারপোর্টে হঠাৎ রিস্ট ওয়াচ কিনতে চাইলো। যেটা পছন্দ করছে আমরা বলছি, আরো ভালো কিছু দেখ। জাপান থেকে কিনবে ভালো দেখেই কেন। সে পোশাক, ঘড়ি এসবে উৎসাহী নয় কোনভাবেই। শেষ পর্যন্ত তার পছন্দেরটাই কিনলো। দাম শুনলে যে কেউ বিস্মিত হবে! ওর স্কুলের এক বন্ধুর বাবার বিজনেস আছে এখানে। আমরা যে কমিউনিটিতে বাস করি সেখানে সব হাইটেক জব আর কিছু ডাক্তার। ভারতীয় উপমহাদেশ ও পূর্ব এশিয়ান বেশী, চেনা জানার মধ্যে। সেই বিজনেসম্যানের ছেলে সব সময় দামী দামী জিনিস কেনে। আমার ছেলেকেও বলে। ওর একটাই কথা, এত দামী জিনিস কিনে কি হবে?

ক’দিন আগে একজনের সাথে কথা প্রসংগে বলেছিলাম, অনেক মানুষ না হলেও কিছু মানুষ আছে যারা কিনতে পারবে বলেই কিনতে হবে এভাবনায় বিশ্বাসী নয়।

বাবা-মাকে দগ্ধ করা ছেলেটি, ঐশী বা এরকম ছেলে-মেয়েরা কেন এমন করছে বোঝার চেষ্টা করা ভীষণ জরুরি। সন্তান শুধু তো বাবা-মায়ের সন্তান, কিন্তু সে তো পৃথিবীর নাগরিক। আর নিজের সন্তানকে একজন সুনাগরিক হিসাবে দেখতে কে না চান!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.