বৈরাগীর ‘বৈরাগ্যে’ কলুষিত নারী

নাসরীন মুস্তাফা: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এরকম একটি স্ট্যাটাস দেখে থমকে যাই। “***ভাই আবার আল্লাহর নাম নেয়! শ্লার লজ্জাও নাই।” বৃত্তান্ত জানতে শেয়ার করা অনলাইন পত্রিকার উপর চোখ বোলাতেই হয়। সেলিব্রেটি নাট্যকার-অভিনেতা-নির্মাতা জনাব ফখরুল হাসান বৈরাগী খবরের মূল চরিত্র। তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করে দেওয়া হেডিংটা এরকম: ‘আমি নিখোঁজ নই, ওই নারী আমার স্ত্রী নন।’

পুরোটা পড়ে বুঝলাম নাটক-সিনেমায় নাট্যকার-অভিনেতা-নির্মাতা হিসেবে অবদান রাখা জনাব বৈরাগী বাস্তব জীবনেও নাটক-সিনেমা বানিয়ে ফেলার ‘অবদান’ রেখেছেন। চিত্রনাট্যের গভীরে সাঁতার না কেটে এই ‘অবদান’-এর মর্মার্থ বোধগম্য হলো না বলেই রুচির বোয়েমে ঢাকনা এঁটে চোখ বুলাই পুরো খবরে।

nasrin-mustafa
নাসরীন মুস্তাফা

বয়োবৃদ্ধ বৈরাগী নিজের মুখেই জানাচ্ছেন, তিনি দীর্ঘদিন এক নারীর সাথে থাকতেন। কিন্তু তিনি তাকে বিয়ে করেননি। সেই নারীর গর্ভে একটি ছেলেও পয়দা করেছেন। এতো কাল মান-অপমান সহ্য করে সেই নারীর সাথে থাকতে পারলেও আর পারেননি। ফলে আগের সংসারের ছেলেদের কাছে চলে গেছেন। ‘আল্লাহ যে কদিন বাঁচিয়ে রাখবে’, সে ক’দিন তিনি আর সেই নারীর সাথে থাকবেন না।

এই প্রায় শতভাগ মুসলমানের দেশে বৈরাগী সাহেব বিয়ে না করেই দীর্ঘদিন এক নারীর সাথে থাকতেন। সন্তান পয়দা করলেন। সেই সন্তানের বয়স আন্দাজ করছি বোঝার মতো বয়সে পৌঁছেছে। সে বেচারা নিজের ইচ্ছেয় পৃথিবীতে আসেনি। আসার পর বাপ-মা পেয়েছিল বটে, তবে দীর্ঘদিন পর জন্মদাতা বাপের মুখেই শুনলো, সে বিয়ে বহির্ভুত সন্তান। জন্মদাতার ক্ষমতা কত অসীম, চেয়ে চেয়ে দেখতে দেখতে বেচারা নির্বাক না হয়ে যায়!

ইচ্ছে হলেই জন্ম দেয়, ইচ্ছে না হলে সন্তানের পিতৃত্ব স্বীকার করে না, সমাজের দশজনের সামনে দাঁড়িয়ে বুক ফুলিয়ে নিজের সন্তানের দিকে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দেয়, ঐ যে দেখছেন ওকে, ও আমার সন্তান বটে, তবে বিয়ে বহির্ভুত সন্তান। এখন বিয়ে বহির্ভুত সন্তান জন্মদাতার সম্পদের অধিকারী হবে কিনা, এসব বাস্তব আইন-কানুন-কূটকৌশল চলবে। সামাজিক মানুষরা এক কথায় প্রকাশের মাধ্যমে বিশ্রি একটা বিশেষণ দিয়ে বেচারার অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ অর্থাৎ গোটা জীবনটাকেই কাফনের কাপড়ে মুড়িয়ে দেবে। এত বড় শাস্তি যে পাবে, তার কোন দোষ কিন্তু নেই।

দোষ তবে কার? বৈরাগী সাহেব লিভ টুগেদার করেছেন, বুক ফুলিয়ে বৃদ্ধ বয়সে এসে সবাইকে জানানও দিচ্ছেন। কেননা, এতে তার কোন ক্ষতি নেই। পত্রিকায় একটা ছবি দেখলাম। বুক ফুলিয়ে কথা বলছেন বৈরাগী সাহেব আর পুলিশ কর্মকর্তা ও সহকর্মী নাট্যজন তাকে ঘিরে ‘বাপের ব্যাটার সাথে আমরা’ মার্কা হাসি ঝুলিয়ে জনাব বৈরাগীর ‘বৈরাগ্যের’ বৃত্তান্ত শুনছেন।  

পুলিশ কর্মকর্তার বরাতে উঠে এসেছে জনাব বৈরাগীর পক্ষে সাফাই বক্তব্য, সেই নারী জনাবের ‘স্ত্রী নন’ বলে ‘সামাজিক’ সার্টিফিকেট দিয়ে দিয়েছেন।

boiragiআসলে, সবাই বাপের ব্যাটা। স্ত্রী থাকাটা কৃতিত্বের নয়, রক্ষিতা বা দাসী জোগাড় করতে পারাটা বড় কৃতিত্বের বিষয়। এই রকম কৃতিত্ব পারলে কোনো নারী নাট্যকার-অভিনেতা-নির্মাতা করে দেখান তো! মুখ ফুটে স্বীকার করুন তো, দেখি কত বড় ‘বাপের বেটি’! ধর্ম রক্ষার্থে রাস্তায় জড়ো হবেন ধার্মিকগণ, এখন যদিও তাদের মুখে কুলুপ আঁটা, এখনো। কুলুপ খুললে যেসব ব্যাখ্যা পাবো, তা জনাব বৈরাগীর ‘বাপের ব্যাটাত্ব’র বিপক্ষে যাবে না। সকল বাপের ব্যাটাই আর আর বাপের ব্যাটাগণকে রক্ষিতা বা দাসী রাখার অধিকার দিয়েছে, বাজারে তুলে দরদাম হেঁকে বেচার সুবিধাসহ আরও আরও অগনিত যেসব সুবিধা দিয়েছে, তা উহাদিগকে বাপের ব্যাটা বানাবে না তো কি মানুষ বানাইবে?

মিডিয়ার নারীদের চোখ বুঁজে ‘অসতী’ বানাতে ব্যস্ত মিডিয়া-ই। এরা কিন্তু জনাব বৈরাগীসহ এরকম বাপের ব্যাটাদিগকে চেনে-জানে, কিন্তু ‘অসৎ’ বানায় না, সমাজকে চেনায় না, জানায়ও না। তা না হলে কী জনাব বৈরাগীকে এতো কষ্ট করে এই বয়সে এসে নিজের মুখেই নিজের বাহাদুরি দশ জনকে জানাতে হয়?

সেই নারীর সাথে থাকাটা তো আর ধুম করে একদিনে হয়নি। এই মিডিয়া আরও আগে, তিনি যখন সেই নারীর সাথে থাকাথাকি করবেন করবেন বলে গলিত হচ্ছিলেন, তখন যদি জানিয়ে দিত, তবে উপকার হ’ত ধর্মের, সমাজের। সেই নারী বেঁচে যেত বুড়ো বয়সে এসে রক্ষিতা বা দাসী হিসেবে সামাজিক চিহ্নায়নের কবল থেকে। তার গর্ভের সন্তানটির আসতে হতো না পৃথিবীতে। সবচেয়ে বড় বাঁচা বেঁচে যেত সেই নিষ্পাপ প্রাণ, নয় কি?

কী দুর্দান্ত দাপটের সাথে বৈরাগী সাহেব চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেছেন, বিয়ের কোন রেকর্ড নেই। প্রশ্ন জাগে, বিয়ে কি তবে রেকর্ড থাকা না থাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ? একদা ভালবেসেই তো সেই নারীর সাথে তিনি থাকতে শুরু করেছিলেন। গর্ভে সন্তান দিয়েছিলেন। ভালবাসার সেই মন্ত্র কি বিয়ের মন্ত্র নয়? এক কালে আমাদের দাদা-নানারা বিয়ে করতেন, বিয়ে রেজিস্ট্রি করার চল তখন ছিল না বলে কাগজের রেকর্ড থাকতো না। তাই বলে কি তাদের বিয়ে অসিদ্ধ ছিল? তারা কি সারা জীবন স্ত্রী হিসেবে একজনের জীবনের সব রস সাংসারিক খাটুনির যাঁতাকলে পিষে ফেলে শুষ্ক করার পর ছেঁড়া ত্যানার মতো ছুঁড়ে ফেলে বলতেন, আমি কেবল থাকতাম। বিয়ে করিনি।

জনাব বৈরাগী সেই নারীর গর্ভে সন্তান দিয়ে দশ মাস দশ দিন কষ্ট উপহার দিলেন, মর্মান্তিক প্রসব যন্ত্রণা সহ্য করতে বাধ্য করলেন, তার দিনযাপনের আরামের জন্য কাস্টমার সার্ভিস দিতে বাধ্য করলেন, তার সন্তানকে খাওয়ানো-যত্ন করার মতো পরিশ্রম করালেন, অথচ বিয়ের রেকর্ড দিলেন না। তিনি তো আদতেই বৈরাগী, বৃদ্ধ বয়সে এসে এই রেকর্ড না থাকাটা তার বৈরাগ্য জীবনকে কতটা সার্থক করে তুলবে তা তিনি সেই আদিতেই বুঝতে পেরেছিলেন বলে বলতেই হচ্ছে, আসলেই তিনি বাপের ব্যাটা।

রেকর্ড যদি থাকতোও, তাতেই বা কি হতো? তিনি চোখ খুলেই বলে দিতে পারতেন, ইহা আসল নহে। আসল কেবল আমি।

কেননা, আমি বাপের ব্যাটা।

সমাজ ধর্ষণের শিকার নারীর সাথে ধর্ষকের বিয়ে দিয়ে সেই নারীর জীবন ‘বাঁচিয়ে’ দেয়। প্রেমিকের বাড়িতে অবস্থান ধর্মঘট করছে প্রেমিকা, গলায় দড়ি দিচ্ছে কেবলমাত্র বিয়ের দাবিতে। বিয়ে তথা বিয়ের রেকর্ড খুব জরুরি কেবল নারীর জন্যই? চরিত্রবান পুরুষ রেকর্ড করে, রেকর্ড দেয়ও। কেননা, সে বাপের ব্যাটা।  

এরকম ঘটনা অনেক, সবাই বলে না, জনাব ফখরুল হাসান বৈরাগী বলেছেন। কেননা নিজেকে তার স্ত্রী হিসেবে দাবি করা সেই নারী তাকে নিখোঁজ বানিয়ে সবাইকে জানাচ্ছিলেন যে তিনি তার স্বামীকে নিরাপদে তার সাথে থাকার জন্য ফেরত পেতে চান। ইহা যে সত্য নয়, তা জানানোর জন্যই সবাইকে সব কিছু খুলে বলতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। বুঝেই বলেছেন। পানিতে নেমেও চুল ভেজাননি, এখনো তিনি ভিজবেন না বুঝেই বলেছেন।

কেননা, তিনি থাকতেন বটে, সেই নারী কেন থাকতো এই চুলচেরা বিশ্লেষণের কালির গোলা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাবে সমাজ, এ তিনি ভালোই বোঝেন।

আবার দেখি স্ট্যাটাসটা। তিনি থাকতেন বটে, তবে তিনি আল্লাহর নাম নেন। তিনি শ্লার। তার লজ্জা নাই।

ওহে নারী, লজ্জা কেবল তোমারই। আর তাই প্রশ্ন তোমাকেই, তুমি কেন থাকো? বিয়ের রেকর্ড যে দেয় না, তার সাথে কেন থাকতে চাও? কেন থাকতে যাও? রেকর্ড ছাড়াই তোমার সাথে থাকতে পারে, নিজেকে এমন সস্তা কেন কর? তোমার গর্ভ কলুষিত করে এমন কাউকে গর্ভসঞ্চারের সুযোগ কেন দাও?

ওহে নারী, বিয়ে বহির্ভুত থাকাথাকিকে তুমি ‘না’ বল। এক্ষুণি বলো। তুমি লজ্জা কাটিয়ে শেখ কিভাবে প্রত্যাখ্যান করতে হয়, ‘না’ বলতে হয়।

ওহে নারী, তুমি প্রত্যাখান কর।

প্রত্যাখান করার পর প্রত্যাখান কেন করেছ, এই অপরাধে তোমাকে ছুরিকাঘাতে মেরে ফেলা হবে কি না, তা অবশ্য জানি না। সত্যি বলতে কি, কেউ-ই জানে না।

স্বয়ং সমাজও না।

 

শেয়ার করুন:

মিডিয়া চান্স পেতে গেলে বিছানায় শোয়তে হয় এমন কথাও অনেক নারীর মুখ থেকে শুনেছি। তিনি কি এক নারীকেই নিজের বিছানায় শোয়াছেন নাকী আরো নারীকে শোয়ায়েছেন সেটাও জানার দরকার।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.