আমাদের পুত্রশিশুটিও নিরাপদ থাকুক

ফারহানা আনন্দময়ী: আমি একজন কন্যাসন্তান ও একজন পুত্রসন্তানের মা। কন্যা তাঁর শৈশব-কৈশোর পাড়ি দিয়ে তারুণ্যে প্রবেশ করেছে, পুত্রটি কিশোর। নিজের সঙ্গে যখন ভাবনা আদান-প্রদান করি, তখন একদিন মনে হলো… যে যে সতর্কবার্তা আমি শিশু বা কিশোরী কন্যাকে পৌঁছে দিয়েছিলাম তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যে, কিশোর পুত্রটিকে তো ঠিক সেভাবে সতর্ক করা হয়নি। লেখাপড়া, বন্ধুসংগ এমন বেশ কিছু বিষয়ে ওকে ভাল-মন্দের নির্দেশনা তো দিই কিন্তু কন্যার নিরাপদে বেড়ে ওঠার জন্যে, কন্যার সঙ্গে যে বিষয়টি অতি গুরুত্বের সঙ্গে ভাগ করেছিলাম… পুত্রের সঙ্গে তা করা হয়নি এখনো।

anandomoyeeবিষয়টি শিশু যৌন-নিপীড়ন। পুরুষবান্ধব এই সমাজে ক্ষমতাশীল এই গোষ্ঠী অর্থাৎ পুরুষেরা তাদের তৈরী তন্ত্রের জোরেই নিরাপদ জীবনযাপন করেন। কিন্তু একজন পুত্রশিশু বা কিশোর তো এখনো পুরুষ হয়ে ওঠেনি। একজন নারীর জীবনযাপনের জন্যে এই সমাজ অনিরাপদ, একইভাবে এখনো পুরুষ না-হয়ে-ওঠা কিশোরটির জন্যে একইরকম ভয়ংকর এই মানবিক মূল্যবোধ-ক্ষয়িষ্ণু আমাদের সমাজ। এই সমাজে কিছু বিকৃতমনস্ক পুরুষ আমাদের শিশুপুত্র-কন্যার জন্যে মূর্তিমান আতংক হয়ে বাস করছে।

কন্যাশিশুকে অভিভাবকেরা বিশেষ করে মায়েরা বুঝিয়ে দিই, ওদের শারীরিক সুরক্ষার হুমকি এই সমাজে কারা। তারা বেশি দূরের মানুষ নয়। প্রথমত আত্মীয়-পরিজন, বাবা-মায়ের বন্ধুরাই সেই তালিকার মানুষ, আরো পরে গিয়ে বাইরের অপরিচিত কেউ। কন্যাদের স্বভাবজাতভাবেই একটি অতিরিক্ত ইন্দ্রিয় কাজ করে, তারা নিজেরাই বুঝে যায়, পরিচিতের মধ্যে কোন পুরুষের স্পর্শ কী ইঙ্গিত করে। তারা বোঝে কোনটা নিষ্পাপ আদর আর কোনটা সেই পুরুষের হস্তসুখ! একেবারে শিশু বালিকারা হয়তো ততটা বোঝে না। তাই ওরা এইসব অমানুষদের যৌননিপীড়ণের শিকার হয় বেশি।

অপরদিকে পুত্রশিশুদেরকে আমরা অবচেতন থেকেই পুরুষ বলে ভেবে যাই, শিশু নয়। ওদেরকে আমরা বাইরে খেলতে পাঠাই, মা-বোনের পাশে বেশি ঘুরঘুর করলে বলি, “মেয়েদের কথার মধ্যে এতো কী?” ওকে যে এলাকার বড় ভাইয়ের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতে পাঠাচ্ছি, ওকে যে কোচিং সেন্টারে পাঠাচ্ছি… আমাদের মনে একবারও কোনো আশংকা উঁকি দেয়নি তার যৌননিরাপত্তা নিয়ে। কারণ আমাদের একটা মাইন্ডসেট তৈরী করা আছে, পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজ শুধু নারী-কন্যার জন্যে অনিরাপদ। পুত্রটি শিশু হলেও পুরুষগোষ্ঠীর প্রতিনিধি তো! ওর জন্যে এসব কোনো ভয় নেই।

এটা নিয়ে ভয় আসলে ছিলোও না আমাদের প্রজন্মের অভিভাবকদের। তখন বড়জোর মাদ্রাসায় দু-একটি ঘটনা শোনা যেত এধরণের পুত্র-শিশু যৌননিপীড়নের। কিন্তু আজকের দিনে এটাই একটি বিশাল সামাজিক সমস্যা, শিশুদের শারীরীক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যে হুমকিস্বরূপ। একটি সামাজিক সমীক্ষায় জানা যায়, বিশ্বে ১৮ বছরের নীচে প্রতি ৬জন পুত্রশিশুর মধ্যে ১জন এই যৌনসন্ত্রাসের শিকার। এবং নিপীড়কেরা পরিচিত বয়স্ক আত্মীয়, সিনিয়র ভাই, ধর্মীয় শিক্ষক, কোচিং শিক্ষক… যাদের মানসিক বিকার আছে।

কেউ কেউ মনে করেন, সমকামীরাই পুত্রশিশুদের সঙ্গে এই কাজটি করে থাকেন। আসলে ঘটনা তা নয়। সমকামীরা নিজের সঙ্গী বেছে নেন সমকামীদের মধ্যে থেকেই। শিশুদের সঙ্গে এই যৌননিপীড়ন  যারা করেন তাদের বেশিরভাগই বিtorture-1ষমকামী অথবা উভকামী। যাদেরকে আমাদের সাদা চোখে সাদা মানুষ ব’লে মনে হয়।  তবে কিছু ঘটনা আবার চমকে দেয়, এমন কিছু বিকৃতমনস্ক নারীও থাকেন আশেপাশে, যারা এই শিশু-কিশোরদেরকে দিয়ে নিজের জৈবিক আনন্দ মিটিয়ে নেন।

পুত্রশিশুদের বেলায় ঘটনাগুলো ঠিক সেভাবে রিপোর্ট হয় না, খুব নিকটজনের কাছে ছাড়া প্রকাশিতও হয় না। না হওয়ার কারণ পুত্রশিশুকে আমরা এই যৌননিপীড়ণ সম্পর্কে আগে থেকেই সতর্ক করি না। তাই ঘটনা যখন ঘটে যায়, ঘটনার আকস্মিকতায় ওরা ভয় পেয়ে যায়। সাহস করে অভিভাবকদেরকে বলে না কিংবা বললেও শিশুটি পুরুষ ব’লেই হয়তো তার এই অভিযোগটিকে আমলে নেয়া হয় না।

আরো একটি বিষয় কাজ করে এখানে। একজন কিশোরী সেই বয়সে ভাবপ্রকাশে যতটা অকপট, একজন কিশোর কিংবা বালক নিজের ভাবপ্রকাশের মত যথেষ্ট স্বচ্ছন্দ নয়। তাদের শব্দভান্ডারও অনেক সীমিত একজন কিশোরীর তুলনায়। চোখের সামনে পুরুষতন্ত্রের পেশিবহুলতা দেখে দেখে কিশোরটি এমন একটি ঘটনাকে নিজের দুর্বলতাও ভেবে নেয়। যখন যৌন এই নিপীড়ন সহ্যের সীমার বাইরে চলে যায় কিংবা অসুস্থ হয়ে পড়ে তখনই কেবল অভিভাবকদেরকে জানায়।

আমাদের জানা উচিৎ, একটি শিশু যৌননিপীড়নের ঘটনা একজন কন্যাশিশুর শারীরীক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যে যে পরিমান ক্ষতিকর, ঠিক একই পরিমান ক্ষতিকর একজন পুত্রশিশুর জন্যেও। এমন একটি দুটি ঘটনা যখন একজন শিশুর সঙ্গে ঘটে, পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিই ওদের বদলে যায়। ওরা কাউকে আর বিশ্বাস করতে পারে না। এবং তার প্রভাব পড়ে শিশুটির ব্যক্তিজীবনে, যখন সে প্রাপ্তবয়স্ক হয়। সেই প্রভাবটি নেতিবাচক হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকে।

তাই আজকের অভিভাকদের উচিৎ, আমাদের কন্যাশিশুকে যেমন সমাজের অমানুষদের হিংস্র যৌনথাবা থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখার কৌশলগুলো শিখিয়ে দিই, একইসঙ্গে ঘরের পুত্রশিশুটিকেই সেই একই কৌশলগুলো জানিয়ে দেবো। আমাদের পুত্রশিশুরাও নিরাপদ জীবনের ছায়ায় বেড়ে উঠুক।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.