কালো, তা সে যতোই কালো হোক….

নাজনীন নূপুর: কমপ্লেকসানটা না খুব খেলো আর হালকা একটি বিষয়। এই যে আমি দেখতে কালো, তাতে করে কী আমি চোখে কম দেখতে পাই, নাকি বেঁচে থাকার জন্য পর্যাপ্ত অক্সিজেন পাই না!

জন্ম থেকে ফর্সা ছিলাম না, এখনো না, কখনোই না। এমনকি কখনো আফসোসও লাগেনি যে আমার চামড়ার রং কালো! উপটান মাখি না, বাইরে বেরুনোর সময় একগাদা ফাউন্ডেসানও মুখে ঘষি না। তাই ফর্সা, ধবল আর চামড়ায় মেলানিন কম থাকার কারণে যারা নিজেদের সুন্দর বলে দাবি করে, তাদের বলতে শুনেছি, আমি কালী, আমি দেখতে পেত্নীর মত!
আড়ালে না সামনেই। তাও আবার একেবারে নিজের বাবার দিকের লোকের মুখ থেকে।

nazneen-nupur
নাজনীন নূপুর

আবার এক খালাতো বোনতো ম্যাসেঞ্জারে লিখেই পাঠিয়েছিল, আমি নাকি কালো সুন্দরী। বিশ্বাস করেন প্রচণ্ড কষ্ট পেয়েছিলাম। আমাকে থম মেরে বসে থাকতে দেখে উনি বললেন, “আমার কাছে তো বার্নিকাটকেই সবচে সুন্দর লাগে।” আমি উনার সত্য ভাষণ শুনলাম, আর খুশিতে তিনটা লাফ দিলাম।

রিবন্ডিং করাই না, কখনো রঙও করাই না,  চুলগুলো রঙিন ধান পাতা, ধান পাতা না। কোঁকড়ানো। কেন, কোন সমস্যা..??
ভাই আমারে নিয়া আপনার এতো না ভাবলেও চলবে। আপনি বরং দেশের ক্লাইমেট চেইঞ্জ নিয়া ভাবেন, কেন ঢাকা শহরের তাপমাত্রা দিনকে দিন অসহনীয় পর্যায়ের ঠেকছে, কেন শহরের যানজট একটুও কমছে না, বৃষ্টি পরা শুরু করলেই কেন কোমর অব্দি ডুবিয়ে জুতা উঁচিয়ে রাজপথে চলতে হয়, ইত্যাদি ইত্যাদি। আর তাও যদি না পারেন কী আর করবেন, বসে বসে নিজের চড়কায় তেল দেন।

আমাদের কমপ্লেকসান নিয়ে আপনাদের এতো মাথা ব্যাথা কেন! আমরা তো হীনমন্যতায় ভুগি না। কালো আছি, ভাল আছি। চামড়া সাদা হওয়ার কারণে আপনি কোন জিনিসটা জয় করলেন? যা আমরা কালো চামড়া নিয়ে করতে পারি নাই! আপনি সেভেন সামিট জয় করে আসলেন? জাস্টিস হইলেন? পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সেক্রেটারি হইলেন, নাকি কোন দেশের এম্বাসেডার হওয়ার ডাক পাইলেন? আমি কালো মেয়েদের সাফল্যের এত্তো এত্তো উদাহরণ দিতে পারি যে আপনি জাস্ট টাসকি খেয়ে বসে থাকবেন। এজন্য আপনাকে দেশের সীমানা অতিক্রম করতে হবে না।  

এমন মানুষের অভাব নাই যারা কনে দেখার নাম করে ফর্সা মেয়ে শিকারে নামেন। ভদ্রলোক কালো তাতে কোন সমস্যা নাই, কিন্তু বউকে অবশ্যই সাদা হতে হবে। মায়ের আদেশ। সেই আদেশদাত্রী মাও আবার  কালো!  বুঝেন ঠ্যালা। আরে বাবা দুধে আলতা বউকে কি আপনি  সারাক্ষণ পালংকে বসিয়ে রেখে তার পা ধোয়া পানি খাবেন?  খাবেন না তো? তাকে দিয়ে তো সেই হাড়িই ঠেলাবেন!! কারণ প্রথম থেকেই আপনি একটি মেয়েকে সম্মান করতে শেখেননি। ব্যক্তি হিসেবে তার যোগ্যতা, বুদ্ধিদীপ্ত কথাবার্তা, পড়াশোনা এসবের চেয়ে আপনার এবং আপনার বংশের বাত্তিদের জন্য অপেক্ষারত আম্মাজানের কাছে আপনার হবু স্ত্রীর চামড়ার রঙটাই মুখ্য। তাহলে কী আর আশা করবো আপনার কাছ থেকে বলেন!

গায়ের রঙ সাদা হওয়ার চেয়ে একটি মেয়ের বুদ্ধিমান এবং সাহসী হওয়াটা বেশি গুরুত্বপুর্ণ। কীভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে, কী করলে নিজের মতো করে চলার সক্ষমতা অর্জন করা যাবে, কী করে নোংরা মনের অমানুষ গুলোকে ইগনোর করা যায় সেসব বিষয়ে জানতে হবে। গায়ের রঙ কখনোই একটা মানুষের যোগ্যতার মাপকাঠি হতে পারে না। চামড়া সাদা হওয়ার কারণে কোন মেয়ে শ্বশুর বাড়িতে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন থেকে রেহাই পেয়েছে এমনটা কে বলতে পারবে?

এইতো সেদিনও সবাই দেখলো প্রেম করে বিয়ে করে যৌতুকের টাকার জন্য মেয়েটাকে কেমন করে পিটিয়ে হাত আর বুকের পাঁজর ভেঙে দিয়েছে একটা পশু। হলফ করে বলতে পারি, যারা নিউজটা পড়েছে প্রত্যেকেরই মেয়েটার জন্য বুকের ভেতর কেমন কেমন করেছে। এতো সুন্দর মেয়েটা! আহারে।
নিজের চিন্তা চেতনা পাল্টান, তাহলে মানুষকে কেবল গায়ের রং ধরে মাপতে হবে না।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.