মেয়েদেরই কেন সর্বংসহা হতে হবে?

তানিয়া মোর্শেদ: পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা যে কারও থাকতে পারে, পুরুষ, নারী, বিখ্যাত মানুষ যেকোনো কারণে, অখ্যাত মানুষ, জ্ঞানী মানুষ, অশিক্ষিত মানুষ। আবার এর উল্টোটাও যে কেউ হতে পারেন। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, নারী-পুরুষ। সমাজে তথাকথিত উচ্চ শিক্ষিত, “প্রগতিশীল” মানুষ যখন পুরুষতান্ত্রিক হন, ধাক্কাটা সবচেয়ে বেশি লাগে। দুঃখজনক হলেও পুরুষতান্ত্রিক মানুষই সংখ্যাগরিষ্ঠ।

tania-morshed
তানিয়া মোর্শেদ

অনেকে নিজেও জানেন না তার মধ্যে এই মানসিকতা আছে বা কতোটা আছে! উচ্চ শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত, “প্রগতিশীল” অনেক নারীও এই চিন্তা ধারণ করেছেন, করেন। নিজের পুত্র আর কন্যা সন্তানের মধ্যে যে বিভাজন তা যতোই সামান্য মনে হোক না কেন তা দিয়ে। কন্যা সন্তানের কাছ থেকে অভিভাবকদের একটা “আশা” সব সময়ই থাকে, পড়া-লেখা করবে, সবকিছু করবে সেই সাথে সংসারেও খেয়াল দেবে। স্কুলের যে ক্লাসেই পড়ুক না কেন, যে বিত্তেরই হোক না কেন, বাড়ির কিছু দিকে তার খেয়াল রাখতে হবে। এটা যেন কন্যা হয়ে জন্মানোর সাথে “প্যাকেজের” মতো চলে আসে!

অথচ পুত্র সন্তানের কাছ থেকে খুব কম অভিভাবকই এই আচরণ “আশা” করেন! ছেলেরা জানতেও পারে না, শেখে না তার বোনটির জীবন তার থেকে আলাদা! সে যে স্কেলেই হোক না কেন। বাড়ির মেয়ে যা কিছুই করুক না কেন, তাকে দায়িত্বশীল হতে হবে। অথচ ছেলে কতোটা দায়িত্বশীল হচ্ছে, আদৌ হচ্ছে কীনা ক’জন দেখেন!

ছোটবেলা থেকেই মেয়েরা পুতুল, হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে খেলে। এই খেলা খুব কম ছেলেই খেলে। মাঝে মাঝে ভাবি, হাজার বৎসর ধরে এটা দেখতে দেখতে কি মেয়েদের জিনের মধ্যে চলে গেছে? আর ছেলেদের না দেখতে দেখতে? আমার ছেলে ছোট্টবেলা থেকে খেলনা নিজে পছন্দ করেছে। আমি দেখতে চেয়েছিলাম সে নিজে কোনটা নিতে চায়? সে শুরু থেকেই বল, বেলুন, গাড়ী, লেগো ইত্যাদি ‘ছেলেদের’ খেলনা পছন্দ করেছে। একবারও একটিও পুতুল, কিচেন সেট ইত্যাদি ধরেনি! কোনদিন স্নো হোয়াইট, সিন্ডারেলা ইত্যাদি মুভি দেখতে চায়নি! ও চাইলে ঠিকই পেতো, দেখতো। আমি বরাবরই ওর পছন্দের মূল্য দিয়েছি। তবে কোনদিন একটিও “গান” বা অস্ত্র জাতীয় কিছু কিনে দেইনি। ওয়াটার গান অনেকটা পরে, আগে ভালো মতো বুঝিয়ে তারপর দিয়েছি। আর প্লাস্টিকের একটি সোর্ড সেটাও অনেক কথা বলে তারপর। ভিডিও গেইমস, ভায়োলেন্ট ধরনের,  দেইনি কখনো। কিছুদিন আগে এক বন্ধুর বাসায় একটি গেইম খেলেছিল। শুনে আমি অসন্তুষ্ট হয়েছি, সেটাও জানিয়েছি।

যাক মূল প্রসঙ্গে আসি। মেয়েদের মা-বাবারাই এক ধরনের ছকে বড় করেন। ছেলেদের আরেক ধরনের। মেয়েদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শেখানো হয়, সর্বংসহা হও! নিজের সব ধরনের ব্যথা, যন্ত্রণা নীরবে হজম করে ফেলো! এই শিক্ষাটা এমন পর্যায়ে চলে যায় যে, কোনো নারী যদি বিবাহিত জীবনে নির্যাতনের শিকার হোন, শারীরিক বা মানসিক বা উভয়ই, অধিকাংশই “মানিয়ে” নেবার চেষ্টা করেন। খুব কম নারী আছেন যারা প্রথম নির্যাতনেই বেরিয়ে আসেন।

অনেক নারীই প্রথম বাধাটিই পান নিজের মা-বাবার কাছ থেকে! কী বিস্ময়কর, নয়?  উচ্চশিক্ষিত, স্বচ্ছল, “প্রগতিশীল” পরিবারেও এমনটা অহরহ ঘটে। ভায়েরাও পাশে দাঁড়ান না। এমন কত নারীর কথা জেনে “চুপ” থাকতে হয় আমাকে! একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের জীবন কেউ বদলে দিতে পারে না যদি তিনি নিজে তা না চান। জেনেছি অনেক “প্রগতিশীল” পরিবারের নারী যেন ডিভোর্স না নেয়, যদি নেয়ই, ডিভোর্সের পর যেন সন্তান নিয়েই থাকে, আর কোনো বিয়ে না করে, এসব নিজের পরিবার থেকে, মায়ের থেকে শুনতে হয়েছে, হয়!

জন্মের পরপরই বাবা হারানো নারী যখন বরের নির্যাতনের শিকার, ভায়েরা কেউ পাশে দাঁড়ায়নি। সেই নির্যাতনকারী বরের সাথেই আছেন! “প্রগতিশীল” পরিবারের অনেক প্রগতিবাদী ভাই ডিভোর্সি বোনকে বঞ্চিত করেছে সম্পত্তি থেকে। অর্থনৈতিকভাবে ভীষণ ভালো অবস্থানে থেকেও বিধবা বোনকে সম্পত্তি দিতে কার্পণ্য করেছেন, এমন ভাইও আছেন।

নারীকে শুধু বরই বঞ্চিত করে না। নিজের জন্মগত পরিবারও করে। করবে না কেন? ছোটবেলা থেকেই তো ছেলেরা দেখে এসেছে, মাছের বড় টুকরোটা, মুরগির রানটা তাদের প্লেটে! নিজের মা-ই তো এমন করেন, তাহলে শিক্ষাটা কোথা থেকে আসবে?

বাংলাদেশের মুসলিম আইনে ভায়ের অর্ধেক বোন পায়। অনেক সময় দেখা যায় অনেক নারীই কোন কিছুই নেন না। মনে করেন, দরকার নেই। ভায়েরা ভালো থাকুক ইত্যাদি। উল্টোটা কম দেখা যায়। ক’জন প্রগতিবাদী মানুষ এ বিষয়ে কথা বলেন, কেন নারী অর্ধেক পুরুষের থেকে সমাজে-ধর্মে-আইনে?

আজ এক বন্ধু লিখেছেন অন্য এক লেখার পরিপ্রেক্ষিতে, হিন্দু নারী কেন কিছুই পায় না তা নিয়ে কেন বলা হয় না? আমি লিখেছি সেখানে, এ নিয়ে অনেকবার বলতে যেয়েও বলিনি। কারণ, সমাজ-পৃথিবী এখন ভীষণভাবে বিভাজিত। এই বিষয়ে আমি লিখলে অনেকেই আমার নামের শেষ অংশ দিয়ে বিচার করবেন, বলবেন আমার উদ্দেশ্য কী এটা বলার?

আমি কিছু জায়গায় পড়েছি, কিছু মানুষের মতামত (“প্রগতিশীল” তারা!), হিন্দু নারীকে সম্পত্তিতে অধিকার দিলে (বাংলাদেশে) মুসলমান ছেলেরা ভুলিয়ে ভালিয়ে বা জোর করে হিন্দু নারী বিয়ে করে তার সম্পত্তি দখল করে নেবে। বাংলাদেশে হিন্দুর সম্পত্তি যে কেউ দখল করে, সে যে কোন দলের বা কোন দলের না হলেও। হিন্দুর সম্পত্তি দখল করার জন্য কি কোনো আইনের অপব্যবহার করতে হচ্ছে? আর যে জোর করে বিয়ে করবে, তা তো বিয়ে নয়। সে তো অপরাধী। অপরাধী কেন সম্পত্তি পাবে? আইনেই থাকতে হবে ব্যবস্থা যেন কেউ তার অপব্যবহার করতে না পারে।

সেদিনই লিখেছি, সন্তানদের এমন করে বড় করতে হবে বিয়ে, প্রেম না টিকলে যেন মনে না হয় জীবনটাই পুরো ব্যর্থ। মা-বাবাকে এই কথাটিও বলতে হবে, কোনভাবেই নির্যাতিত হয়ে বিয়ে টিকিয়ে রাখতে হবে না। মানুষ, সমাজ, ধর্ম, সংস্কৃতি কিছুই কাউকে খাওয়ায় না। নিজের জীবনের মূল্য নিজেকেই দিতে হবে। আর “প্রগতিশীল”-দের প্রতি অনুরোধ, প্রগতিশীলতা শুধু কথা দিয়ে নয়, কাজ দিয়ে প্রমাণ করুন। শুরু করুন নিজের বাড়ি থেকে।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.