‘পিরিয়ড হলে রোজা রাখতে হয় না ম্যাডাম’?    

কামরুন নাহার রুমা: সপ্তম রোজার দিন হবে সম্ভবত। আমি বিভাগের সামনের গোল টেবিলটাতে বসে ছাত্রছাত্রীদের সাথে আড্ডা দিচ্ছি। আমি আড্ডাবাজ, সময় পেলেই ওদের সাথে আড্ডা দিতে বসে যাই। ওরাও সানন্দে তাতে যোগ দেয় (আমার অবজারভেশন বলে)। কী নয় সেই আড্ডার বিষয়! লেখাপড়া , প্রেম, মাথাব্যথা, রুপচর্চা, কানের দুল, জিন্সের প্যান্ট, মাংস ভুনা, পাস্তা, রান্নার খালা, ভ্রমণ, ছুঁয়ে দিলে মন, জঙ্গিবাদ, সব – সব বিষয়ে আড্ডা হয়।     

10658570_10204726730786618_4753997966757513674_o
কামরুন নাহার রুমা

আড্ডা চলছে। হঠাৎ এক ছাত্র জিজ্ঞেস করলো ‘ম্যাম, রোজা আছেন’? আমি বললাম ‘না বাবা, আমি তো রোজা নেই’। ও তো অবাক, আমি রোজা রাখিনি! ও খানিকটা বিস্ময়ের সাথেই জানতে চাইলো ‘কেন ম্যাম’? আমি উত্তর দিলাম ‘বাবা আমার পিরিয়ড চলছে, তাই রোজা রাখিনি’।

ও এবারও খানিকটা বিস্মিত এবং বিস্ময়ের সাথেই জানতে চাইলো ‘পিরিয়ড হলে রোজা রাখতে হয় না ম্যাডাম’?

আমি বললাম ‘না বাবা, ধর্মে নিষেধ আছে’। ধর্মে কেন নিষেধ আছে সেই ব্যাখ্যায় না গিয়ে আমি ওকে একটা সরল বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিলাম। ও সেই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হয়ে বললো ‘ ম্যাডাম, এতোদিন পিরিয়ডের ব্যাপারটা জানতাম, কিন্তু কিছু কনফিউশন ছিলো – আজ পুরোপুরি ক্লিয়ার হলো’। একটা ব্যাপার বলে রাখা ভালো, যে ছাত্রটি প্রশ্নটি করেছিলো সে হিন্দু, আর আমার মুখে পিরিয়ড চলছে কথাটা শোনার সাথে সাথে ও লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছিলো। ও যেহেতু হিন্দু, তাই পিরিয়ড হলে রোজা রাখতে হয় না, এটা ওর পক্ষে না জানাই স্বাভাবিক (যেহেতু ওর ঘরে কেউ রোজা রাখে না, যদিও ওদেরও উপাস করার রীতি আছে)।

সম্মান শেষ বর্ষের একজন ছাত্র পিরিয়ডের কথা শুনে  আজও এই দেশে লজ্জায় লাল হয়ে যায় এটা এদেশের স্বাভাবিক চিত্র – আমি মোটেও অবাক হইনি; আর মেয়েরা তো ভুলেও তা আলোচনায় আনে না।

আমি মাস্টার্সের ক্লাস নেয়ার ‘সময় হেলথ এন্ড পপুলেশন কমিউনিকেশন’ কোর্সটা পড়াই। সেখানে সবাই তুলনামূলক ম্যাচিউরড; অনেক বিবাহিতরাও সেখানে পড়েন। কোর্সের খাতিরে আমাকে সেখানে প্রজনন স্বাস্থ্যের উপরও লেকচার দিতে হয় এবং ফ্লোর ওপেন করে দিয়ে অনেক আলোচনা করতে হয়। আমি নির্দ্বিধায় লেকচার দেই এবং আলোচনা করি।

সেখানেও আমি দেখেছি এই বিষয়গুলোতে সবাই আলোচনায় অংশগ্রহণ করছেন এক ধরনের অস্বস্তি নিয়ে! ওনাদের মধ্যে অস্বস্তি কারণ এই ব্যাপারগুলো তারা এতো ওপেনলি বলে, শুনে বা আলোচনা করে অভ্যস্ত নন। কারণ ওনাদের পূর্বসূরিরা এগুলো নিয়ে ওপেনলি আলোচনা করেননি এবং বলাবাহুল্য ওনারাও ওনাদের সন্তানদের সাথে আলাপ করবেন না এবং বাস্তবতা হলো, করেন না। আর তাই আজও সম্মান শেষ বর্ষের একজন ছাত্র পিরিয়ডের কথা শুনে এই দেশে লজ্জায় লাল হয়ে যায় এবং অনেক বিষয়ে এখনও তার কনফিউশন থাকে। এর জন্য দায়ী এই ছেলেটি নয় – দায়ী আমাদের সমাজ এবং শিক্ষা ব্যবস্থা।  

মনে আছে অষ্টম শ্রেণীর গার্হস্থ্য অর্থনীতি বইতে পিরিয়ড (মাসিক বা রক্তস্রাব) নিয়ে একটি চ্যাপ্টার ছিল -ছিল জীববিজ্ঞান বইয়েও; কিন্তু সেগুলো  আমাদের পড়ানো হয়নি। বলা হয়েছিলো, নিজেরা যাতে পড়ে নেই। এমনকি ঘর থেকেও ব্যক্তিগতভাবে আমাকে আমার মা বা বোন বিষয়টি আগে থেকে বলেননি; (যেটা অধিকাংশ পরিবারেই আজও মেয়েদের বলা হয় না) যার দরুণ আমার স্কুল জীবন থেকে একটা দিন হারিয়ে গেছে খেলাধূলাহীন। ওই একদিন আমি থম মেরে বেঞ্চের এক কোনায় বসে ছিলাম ভয়াবহরকম ব্যথা আর ব্লিডিং নিয়ে। দ্বিতীয় দিন আর না পেরে যখন চিৎকার জুড়ে দিলাম তখন আমার মা বোনের টনক নড়েছিল। আমার মতো এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি এখনও অগণিত মেয়ে  হয়।   

এই দেশে মা-বাবারা প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে সন্তানদের সাথে কথা তো বলেনই না ,উল্টো তা সামনে আসলে প্রসঙ্গ পাল্টে তাদের চুপ করিয়ে দেন – ভাবখানা এমন এসব আলোচনা করলে তারা উচ্ছন্নে যাবে অথবা এগুলো নিয়ে আলোচনা করা পাপ। আর এভাবে চুপ করিয়ে দেবার মধ্য দিয়ে আমরা  ছেলেমেয়েদের অনিশ্চিত এক বয়ঃসন্ধির দিকে ঠেলে দেই। গলার স্বর ভাঙতে শুরু করলে, গোঁফ উঠতে শুরু করলে, স্বপ্নদোষ হলে, হঠাৎ খেলার সময় পিরিয়ড হয়ে গেলে, শরীরের গঠনে পরিবর্তন আসতে শুরু করলে ছেলেমেয়েগুলো দিশেহারা অবস্থায় পড়ে যায়; তারা না পারে কাউকে বলতে, না পারে নিজেরা কিছু করতে। এই ‘ট্রানজিশন পিরিয়ডের অজ্ঞতা’ যে কী কঠিন, তা যে পার হয়েছে সেই জানে।

এই দেশে টিভি চ্যানেলে চিপস আর জুসের বিজ্ঞাপন দেদারসে দিয়ে যেভাবে বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস  করা হচ্ছে, তার অর্ধেকও যদি সঠিক এবং পরিষ্কার বার্তা সম্বলিত স্যানিটারি ন্যাপকিন আর কনডমের বিজ্ঞাপন দিতো অথবা বয়ঃসন্ধি সংক্রান্ত নাটিকা প্রচার হতো, তাহলে ছেলেমেয়েগুলোর উপকার হতো।  যা বিজ্ঞাপন দেয়, বা নাটিকার নামে যা প্রচারিত হয়, তাও যথেষ্ট নয় আর প্যাড বা কনডমের বিজ্ঞাপনের সময় চ্যানেল বদলে দেয়া এই দেশের পুরনো কালচার।

কদিন আগে যখন বাড়িতে গেলাম, দেখি আমার বড় আপার বড় ছেলেটা কাকে যেন ফোনে বলছে ‘আরে আমি এখন বয়ঃসন্ধিতে পড়েছি, আমার গলার স্বরতো এখন পরিবর্তন হবেই, তুমি বোঝো না’? আমি খুশি হয়েছিলাম, আশাবাদী হয়েছিলাম কারণ কদিন আগেই আমি আপাকে বলছিলাম “ও বড় হচ্ছে ওকে প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে বলার সময় এসেছে”। আপা বলছিলেন “ও তোর-আমার চেয়ে বেশি জানে”। পরে ওকে যখন জিজ্ঞেস করলাম ‘কাকে বললি কথাগুলো’ ও উত্তর দিয়েছিলো ‘বাবাকে’।  

এইতো এক সপ্তাহ আগে  ঈদ উপলক্ষে বাড়ি যাবো বলে আমি আগের দিনই বড় ভাইয়ের বাসায় চলে গিয়েছিলাম। বাসায় ঢোকার কিছুক্ষণ পর আমার ভাইয়ের ছেলে আমি আদর করে যাকে বাণ্টি ডাকি ও এলো । আমাকে ধরে ও ওর রুমে নিয়ে গেলো । দরজা বন্ধ করে একটা বই বের করে একটা চ্যাপ্টার বের করে আমাকে খুব দ্রুততার সাথে দেখালো এবং বন্ধ করে দিলো । চ্যাপ্টার নাম ছিলো “Puberty”। বইটা ছিল ইংলিশ বই। ওর স্কুলিং এর প্রাথমিক সময়টা অর্থাৎ ছয় বছর ও অস্ট্রেলিয়াতে কাটিয়েছে। ওর সাথে গল্পচ্ছলে জেনেছি যে, অস্ট্রেলিয়াতে স্কুলে ওদেরকে প্রজনন স্বাস্থ্য বিশেষ করে বয়ঃসন্ধি সম্পর্কে পড়ানো হয়েছে। ওর বয়স ১১ চলছে – তাই আমি জানতে চেয়েছিলাম ওর মধ্যে কোনো শারীরিক পরিবর্তন এসেছে কিনা। ও জানিয়েছিল যে এসেছে কিন্তু ও ওর মা বা বাবাকে বলতে পারছে না কিন্তু আমার সাথে ওই রাতে ও অনেক কিছু শেয়ার করেছে। আমিও ভাবীকে বলেছিলাম ওর ব্যাপারে। আমার ভাল লেগেছে এই ভেবে যে আমার বাণ্টিটা সচেতন। আমি ওকে বলেছি যদি কোনো সমস্যা হয় তাহলে মাকে বা বাবাকে বলতে না পারলে আমায় জানিও। ও মাথা নাড়িয়ে সায় দিয়েছে।    

প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে আসুন আমরা সন্তানদের সাথে খোলাখুলি কথা বলি – ওদেরকে একটা নিশ্চিন্ত কৈশোর আর নিরাপদ আগামী উপহার দেই। আজকের একজন ছেলে বা মেয়ে আগামীর বাবা এবং মা। তাদের সুস্বাস্থ্য সুস্থ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিশ্চিত করবে।

(এই লেখাটা পড়ার পর যার যতো খুশি আমাকে গালি দেন, বেহায়া বলেন – আমি কিচ্ছু মনে করবো না। কিন্তু দয়া করে কথা বলুন আপনার সন্তানের সাথে)।

 

শেয়ার করুন:

সামাজিকভাবে এগুলো আমাদের দেশে ট্যাবু কিন্তু আশার কথা আমরা এখন আপনাদের মত সচেতন শিক্ষক এবং সচেতন বাবা মা পাচ্ছি (উচ্চশিক্ষিত) যার ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানছে এবং জানবে কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলে এবিষয়ে সচেতনতার জন্য সরকারকে দায়িত্ব নিতে হবে।

ধন্যবাদ
আহসান হাবীব

আপনি পিরিয়ডের কি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন জানতে ইচ্ছে হচ্ছে।আমি আমার ১০ বছরের ছেলের সাথে নানা বিষয়ে কথা বলি। ও যখন জানতে চায় কেন ওই কয়টা দিন তুমি নামাজ পড়ো না, সেটার ধর্মীয় কারণ ছাড়া আমি আর কিছু জানাতে পারিনি।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.