বক্ষে ক্ষত মম, পৃষ্ঠে নাহি অস্ত্রলেখা

জিনাত রেহেনা ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আকতার জাহান জলির মৃত্যু নিয়ে উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সবগুলো লেখা একটানা পড়ে ফেললাম। একটা অস্ফুট কান্নার চোখ জ্বালা করা বাষ্প যেন গলায় দলা পাকিয়ে থাকলো। ডুকরে কাঁদতে পারলে হয়তো মুক্তি মিলতো সব অবহেলা, অপমান, আত্মহনন আর পাহাড়প্রমাণ অভিযোগের, যা বহন করতে করতে শেষ হচ্ছি আমরা মেয়েরা তিলে তিলে। চলন্ত শবদেহের ভিড় ঠেলতে ঠেলতে নিজের বেঁচে থাকাটাই ভুলতে বসেছি। এক একেকটি মুখ একেকটি সমস্যা, একেকটি মৃত্যুর সাথে আলিঙ্গন যেন!

akter-jahanজলি দেবী মৃত্যুকে বেছে নিয়েছেন, আমরা পারিনি মানেই কি আমরা বেশী সাহসী? তার কাছে বেঁচে থাকার মতো বা পালন করার মতো কিছু ছিল না- এই নিঃস্ব বিশ্বাস থেকেই জীবন থেকে তিনি বিদায় নিয়েছেন? তার মানে কি তিনি দুর্বল? এত্তোবড় পৃথিবীতে তিনি আঁকড়ে ধরার মতো কিচ্ছু পাননি মৃত্যু ছাড়া? তিনি নিশ্চিতভাবে সাধারণের মতো বিলাসী ছিলেন না। তাকে আমি একক ব্যতিক্রমী মানি। তার কালো গায়ের রঙ উঠে আশায় মন খুব ভারাক্রান্ত হয়েছে

ভারত কী বাংলাদেশ বা অন্যদেশ সবখানেই বুঝি দ্বিচারিতার স্কেল এক। কোনো নারীর মুখে ‘কালো’ এই সালুটেসন তো আমার অভিশাপের মতো লাগে। জলি দেবী স্বামীর ছাত্রী প্রেমগুঞ্জনের ও দ্বিতীয় বিয়ের সাথে সাথে এই অভিশাপও বহন করেছিলেন ভাবলে এই সমাজ ও পুরুষের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের, বিপ্লবের সাধ জাগে। আমার চোখে তিনি সুন্দরী ও সাহসী। তিনি মেয়েদের সঙ্গে চলমান কবর খুঁড়ে নিজেদের হাড়গোড়গুলোর সেটিং দেখে নিতে বলেছেন এই আর কি! সেগুলি তো আমাদের নিজেস্ব!

বিবাহ বিচ্ছেদ নিশ্চিত একটি আলোড়নকারী ঘটনা মেয়েদের জীবনে। এখনো আমাদের সমাজ ও পরিবার মেয়েদের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাকেই নোবেল পুরষ্কার দিয়ে থাকেন। ভালো মেয়ের শিরোপা আজও বিরাট চাকরি, বিদেশ যাওয়া বা পরীক্ষায় টপার হবার চেয়ে বেশী গুরুত্ব রাখে। স্বামীর ঘরে সন্তান নিয়ে টিকে থাকাটাই তার জীবনের বড় ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট, তাই দাম্পত্য ভেঙ্গে গেলেও বিবাহ কাগজে কলমে বুক ফোলায়। কখনো পরিবার,কখনো সন্তানকে শিখণ্ডী খাড়া করে মেয়েদের রুখে দেওয়া হয়, কিন্তু জন্মদাতার ছাড়পত্র থেকে যায়। এই অসম সমাজের বিরুদ্ধে জলি দেবী আওয়াজ তোলেননি, নীরবে ক্ষয়ে গেছেন, এর মধ্যে আমি জাতীয় মাতম নয়, অহংকার দেখি এই অনন্যা নারীর। ফুঁৎকারে উড়িয়েছেন পার্থিব সুখ!

বার্তা এই- যা! চাই না এমন পৃথিবী! জলি দেবীকে আমি হিরো মানি। চলে গিয়েছেন কিন্তু বাঁচিয়ে রেখে গেলেন সেই ইস্যু যা তাকে বাঁচতে দেয়নি, যা বেঁচে থাকা বিপুলসংখ্যক নারীদেরও ‘জিনা হারাম’ করে রেখেছে।

ডিভোর্সি টার্ম টাই আমার কাছে অবমাননাকরএই শব্দটা এতোটাই কালো যে শোনার সাথে সাথে মানুষের চোখ ঘুরতে থাকে নারী রুপী সেই এলিয়নের জন্য। যেন – কোন সে নারী যে পুরুষের বশ্যতা স্বীকার করে না – তাকে চিনহিত কর! যে পুরুষ স্ত্রী ছাড়েন তার কী পরিচয় এই সমাজে? নারীরা আজও সে শব্দবন্ধনী বার করে তাকে জনপ্রিয় করতে পারেনি। ডিভোর্সি শব্দের তলায় সে চাপা পড়ে খোরাকি ও শিশু বাঁচাতেই প্রাণপাত  করেছে, আইনের দরজায় গিয়ে মাথা খুঁড়েছে বা স্বামীর কাছে ভিক্ষা চেয়ে এসেছে।

jolleyমহামান্য আদালত যা রায় দেবেন তাই নারীদের মাথার তিলক। কোনো লড়াই নেই, প্রতিবাদ নেইসব সারি সারি ভালো মেয়ের দল তখন নিজের নিজের কাজে ব্যাস্ত। সব দোষ পুরুষ ও সমাজের ঘাড়ে আমি ফেলি না, আমাদের নিজের দাবী বুঝে নেওয়ার ব্যাপারে আমরা মেয়েরাও বড় কিছু করে উঠতে পারিনি। সত্যি করে আমরা ইউনাইটেড হতেই পারিনি। জলি দেবী কাউকে পাশে পাননি এর চেয়ে বড় হতাশার আর কীইবা থাকতে পারে!

আমার মা খুব কষ্ট পান যে আমি আমার পয়সাওয়ালা ডাক্তার স্বামীকে নিয়ে সংসার না করে আজীবন পিতার ভবনে একমাত্র সন্তানসহ পারমানেন্টলি থেকে গেলাম বলে। বাবাকে এই নিয়ে কখনো উচ্চবাচ্য করতে শুনিনি। তবে বিয়ের পরে নিজের ক্যারিয়ারের কথা ভেবে নবাগত ভ্রুনের বিদায় চেয়েছিলামবলেছিলাম, ‘সন্তান পরে তো নেওয়া যেতে পারে’। বাবা দু’চোয়াল দৃঢ় করে বলেছিলেন, ‘মেয়েদের মা হতে হবে, নয়তো মাগী!’ পুরুষের শক্তি সেদিন দেখেছিলাম। তার এককথাতেই বিছানা ছাড়তে পারিনি দুইদিন। শেষে আমায় মা হতে হয়েছিল সেবারই। আমার সব স্বপ্নের সমাধির উপরে জিতেছিলেন এক বাবা, এক স্বামী। আজ স্বামী ডাক্তার, বাবা একজন জেলার আধিকারিক,জেলা শিক্ষা পরিদর্শক হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত, আমি সামান্য শিক্ষিকা। বিবাহ ও সন্তান নিয়ে এর চেয়ে সহজ চাকরি আমার কাছে আর কিছুই ছিল না। আমি সেদিনই জলিদেবীর মৃত্যুর মতো করে কি মরিনি?

আমার মা বলতেন, ‘তুই কালো, বিয়ে হবে না’ তাই চ্যালেঞ্জ নিয়ে এক মেডিক্যাল ফাইনাল ইয়ারের স্টুডেন্টকে আমি বিয়ে করি। পরিবারকে দিখিয়ে দিই বিয়ের জন্য ফর্সা নারী চাই- এ এক কাগুজে বিজ্ঞাপন। এই বিজ্ঞাপিত ইমেজকে আমি পদাঘাতে উড়াতে পারি।

আমি এই দেহে বাচ্চা ধারণ করে তাকে বয়ে বেড়িয়ে ও জন্ম দিয়েও রাতের পর রাত জেগে চাকরি পেতে পারি, আমার সেই জেদ স্বামীকে খুব হীনমন্যতায় ভোগায়। চাকরিতে জয়েন করলে যেন তার ডেথ সার্টিফিকেট লেখা হয়। আমার মেলে মুক্তিপত্র। ডাক্তার স্বামী এবারে বাদ সাধে।

বলে ‘আমার বাচ্চাকে’ কে দেখবে? বাবা রুখে দাঁড়ান। জানিয়ে দেন ,আমি চাকরি ছাড়ছি না। এবারে তার অন্য প্রতিরোধ। কর্মস্থলে আমি কেন পিঠকাটা ব্লাউজ পরবো? কেন নেলপালিশ ও হিল জুতো পরবো? কেন সিলেবাসের পড়া পড়তে গিয়ে নিজের সন্তানকে দেখভাল করবো না?

সে তখন একটি সরকারি হাসপাতালের সুপার। বাড়ি এসে সে দেখে আমার হাতে বই, আর বাচ্চা একা একা খাটে বসে খেলছে। কাজের মেয়েকে সে চা করতে পাঠিয়ে দেয়, তারপর আমার ছোট্ট বাচ্চাকে খাট থেকে ফেলে দেয় শুধু আমায় শিক্ষা দেবার জন্য। তাজা রক্তে ভাসতে থাকে মেঝে। মেয়ের বাঁদিকের কপালের দাগ আজও মেটেনি। সেই স্বামীই আবার রাতে তার সাথে শোবার আহ্বান জানাতে কুণ্ঠিত হয় না অসুস্থ বাচ্চাকে কাজের মেয়ের পাহারায় পাশের ঘরে ছেড়েসেদিন কি আমার মৃত্যু হয়নি জলিদেবীর মতো?

jinat-rehana
জিনাত রেহেনা ইসলাম

আমাকে কোনোভাবেই সংসারে ফেরাতে না পেরে স্বামী পুরুষ আমার মেয়েকে ফোনে বলে, ‘তুই আর তোর  মাতো মাগীগিরি করিস’। মেয়ে বিস্মিত হয়ে আমায় প্রশ্ন করে। আমি কোনো উত্তর দিতে পারিনি। নিজের সন্তান যাকে প্রবল চাপের সামনে এক সেকেন্ডের জন্য স্বামীর কাছে ছাড়িনি, আমার সেই সিদ্ধান্ত কত ঠিক তা ভেবে নিজের পিঠ চাপড়ে নিই একবার। বিয়ে ও সন্তানের পরেও আমি জেলার এক বিশিষ্ট সাংবাদিকের প্রেমে পড়ি। ছিঃ ছিঃ পড়ে যায় ঘরে বাইরে। সেই প্রেমিকও আমাকে স্বামী নিয়ে নানা খোঁটা দিতে থাকে। নেশার ঘোরে বলে ফেলে ‘বেশ্যা’।

স্কুল বন্ধ হয় আমার সাতদিন। ফোনে ধরা হাত নেমে আসে চকিতে। নিজের হাতেই দংশন হতে থাকে বার বার, রক্তে ভেজে বালিশ। দিকে দিকে আমার নাম ‘তসলিমা নাসরিন’ এর নামের সাথে জুড়তে থাকে। প্রেমিকও পুরুষের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। একেবারে ব্র্যান্ড খারাপ মেয়ের ধাব্বা চড়ে যায় মাথায়। বিবাহিত ভালো মেয়েরা স্বামীর নির্দেশ মেনে আমায় এড়িয়ে চলতে থাকে। এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতা একসময় আমায় পরিবারে ব্রাত্য করতে থাকে।

মা কেঁদে বলেন, ‘তোর জন্য কোথাও মুখ দেখাতে পারি না, তোর আব্বা আর আমি’। জীবন,মৃত্যু একদম সমার্থক হয়ে যায়। আলাদা করে আর জলি দেবীর মত দেহের মৃত্যু হয় না।শুধু কফিনে কিছুর আলোড়ন বুঝি। হ্যাঁ! এইতো আমার নিঃশ্বাস চলছে।

তবু এই পৃথিবীর প্রতি কোনো অভিযোগ নেই আমার হাজার সহস্র বছর মেয়ে হয়েই ফিরতে চাই এই ধরায়। জলি দেবী নিজের সুখের কথা ভাবেননি, আমি বা আমরা ভাবি। উত্তরণে আস্থা রাখি। আমার শরীর, মন আমারই। সাধ্য কার এর উপর কর্তৃত্ব করে!

তানভীর আহমেদে ভরা এই পৃথিবী। ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হয়ে যাবে, তবু লড়ে নিতে চাই নিজের অধিকার। লক্ষণরেখা পেরিয়ে শত শত আহমেদ’দের বলি-‘কাম অন! কাওয়ার্ড! আই আম রেডি টু গিভ ইউ ফিটেড আনসার!’     

জিনাত রেহেনা ইসলাম, সম্পাদক, উইমেন সেকশন, অন্যদেশ ওয়েব ম্যাগাজিন                                             

শেয়ার করুন:

তবু এই পৃথিবীর প্রতি কোনো অভিযোগ নেই আমার। হাজার সহস্র বছর মেয়ে হয়েই ফিরতে চাই এই ধরায়। জলি দেবী নিজের সুখের কথা ভাবেননি, আমি বা আমরা ভাবি। উত্তরণে আস্থা রাখি। আমার শরীর, মন আমারই। সাধ্য কার এর উপর কর্তৃত্ব করে!

My sister who became a MBBS Dr from Dhaka Medical College in 1972 divorced her husband who was Ph.D. holder in 1975 and married her classmate and now live in USA . She had two daughter with each oh her husband and her eldest daughter who also become a OBG Dr married a Jewish boy and now mother of Zarra and Sasha. Never give up your fight to live your life fully. Faruk Hyder Choudhury

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.