নিষেধের দেয়াল, শরীরের খেয়াল!

জান্নাতুন নাঈম প্রীতি: ক্লাস সিক্সের শুরুতে খেয়াল হলো আমার চতুর্দিকে একটি দেয়াল তোলা হচ্ছে। দেয়ালের ইট গাঁথছে সমাজ, পরিবার আর চুন-সুড়কির সংস্থান হচ্ছে পাড়ার বখাটেদের দল। বাইরে খেলাধুলা করা যাবে না, ধীরে ধীরে ফ্রক পরা ছাড়তে হবে, ছোটো জামা পরা যাবেনা, যথাসম্ভব কাপড় দিয়ে বুক আবৃত করতে হবে, সন্ধ্যাবেলা বাইরে যাওয়া যাবেনা, মাগরিবের আজানের আগে ফিরে আসতে হবে ইত্যাদি। নিষেধের একটি দেয়াল চারিদিকে।

eid-day
জান্নাতুন নাঈম প্রীতি

ওই বয়সেই একটা ছেলের প্রতি একটু প্রেম প্রেম ভালো লাগা ছিল। কিন্তু সে একদিন প্রাইভেট থেকে ফেরার সময় বললো- আজান হচ্ছে, মাথায় কাপড় দাওনি কেন? আমি উল্টো বললাম- তুমি টুপি পরোনি কেন? সে হো হো করে হেসে উঠে জানালো- কাপড় শুধু মেয়েদেরই দিতে হয়, ছেলেদের নয়। আমার প্রেম প্রেম ভালো লাগা দূর হয়ে গেলো। যে মানুষের জন্য মাথায় কাপড় দিয়ে ‘আমি একটি মেয়ে’ প্রমাণ করতে হয় তার প্রতি ভালোবাসা থেকে কী লাভ?

তবে বিরাট বিপ্লব করে ফেলতে পারিনি তখনই। কারণ জন্মের পর থেকেই পরিবার আমাকে শিখিয়েছে- মেয়েরা এটা করে, মেয়েরা ওটা করেনা। মেয়েরা কি করে আর কি করেনা’র ব্যাকরণ যে মেয়েকে মুখস্ত করতে হয় তার নিজের সীমাবদ্ধতা আর সেই সীমাবদ্ধতা বোঝার মানসিক বিকাশ কখন ঘটবে? এদেশের মেয়েরা যে আকাশসমান একটি সীমাবদ্ধতাজনিত ও সীমালঙ্ঘনজনিত সীমার মধ্যে আবদ্ধ তার সবচেয়ে বড় আবদ্ধ ক্ষেত্রটি যেটি, সেটি হচ্ছে- মেয়েটির শরীর।

শৈশবে একটি মেয়েকে সবচেয়ে বেশি ভাবতে হয় তার শরীর নিয়ে। শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে। যেসময় তার মাঠে দৌড়াদৌড়ি আর পুকুরে দাপাদাপি করার কথা ঠিক সেই সময়েই সে ওড়না, শরীর এবং শরীরের সাধারণ ক্রিয়া লুকোতে ব্যস্ত। আমার স্পষ্ট মনে আছে একবার পিরিয়ড হয়ে গিয়েছিল ক্লাসরুমে। মেয়েদের স্কুল বলে স্কুলের আয়া আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেবে। সাদা পায়জামা ভেদ করে টকটকে একটি লাল বৃত্ত হয়ে শরীরের রক্ত চুইয়ে পড়ছিল। সেসময়ও ফেরার পথে আমাকে শুনতে হয়েছে- আমি একটি মাল, যে ‘মাল’টির ‘মাসিক’ নামক ঘিন্নাকর কিছু একটা হয়েছে! গা ঘিনঘিনে এই মন্তব্যটি থেকে বুঝলাম, ফার্সি ভাষায় ‘মাল’ মানে বিক্রয়যোগ্য বা ক্রয়যোগ্য দ্রব্যাদি, কাজেই সমাজে মেয়েদের অবস্থানটা ওই মালের সমান!

শুধু মালের সমান নয়, খানিক সময় মালের চেয়েও কম মেয়েদের মূল্য। যৌন নিগ্রহের শিকার একটি মেয়েকে সেই শিশুকাল থেকেই মানসিকভাবে বয়ে বেড়াতে হয় একটি অপরাধবোধে ভরা হাহাকারগ্রস্ত হৃদয়। কখনো পাশের বাসার চাচা, বড়ভাই বা বৃদ্ধটিও নানা ছলে বলে কৌশলে কন্যা শিশুটির শরীরে, বুকে, যোনীতে খেলাচ্ছলে হাত দিয়ে বিকৃত যৌনসুখ পায়। বুড়োদের মাঝে অনেক সময় এই মাত্রা প্রবল হয়, কারণ বুড়ো বয়সে তাদের প্রোস্টেট গ্লান্ডের সম্প্রসারণ যে যৌনতা বৃদ্ধি করে তা পোহাতে হয় অসহায় অবুঝ কন্যাশিশুদের। বিকৃতভাবে শরীরে হাত দেওয়া লোকটি কখনো শাসিয়েও দেয়- খবরদার আম্মুকে বলবে না, বললে তোমার আম্মু তোমাকে বকা দেবে, মারবে ইত্যাদি!

হয়ও সেটাই। পাড়ার বখাটে ছেলেটি কখনোই শোনেনা সে মেয়েটিকে উত্যক্ত করে অপরাধ করেছে। বরং উত্যক্ত মেয়েটি শোনে- ঠিক কী কারণে বখাটে ছেলেটি মেয়েটিকে উত্যক্ত করলো! মেয়েটি কি যৌন উত্তেজক পোশাক পরেছিল? মেয়েটির কি ব্রা’র ফিতা দেখা যাচ্ছিল? মেয়েটির কি ওড়না সরে গিয়েছিল? নানা প্রশ্নবানে জর্জরিত এই মেয়েটি কখনো কখনো শাওয়ারের নীচে দাঁড়ায় শরীরে লেপ্টে থাকা পাপগুলিকে ধুয়ে ফেলতে, কখনো বাথরুমের দরজা বন্ধ করে কাঁদে, কখনো মেয়ে হওয়ার কারণে নিজেকে অভিশাপ দেয়, কিন্তু কখনোই বলতে পারে না- আমার সাথে, আমার শরীরের সাথে অন্যায় ঘটেছে। কারণ সমাজ, ধর্ম এবং পুরুষতন্ত্র সমৃদ্ধ সামাজিকতা তাকে শিখিয়েছে- শরীরে কিছু ঘটে গেলে কাউকে বলতে হয় না, ওতে জাত যায়। শরীর নিয়ে কটু কথা শুনলেও না শোনার ভান করতে হয়, নয়তো ওতে সম্মান যায়! কিন্তু যাদের জন্য জাত সম্মান সব যাচ্ছে, তারা দিব্যি গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরছে, লাম্পট্যের কাঁধে ভর দিয়ে পুরুষজন্মের সুখ নিচ্ছে! 

পুরুষ যখন বহুগামী হয়ে, পতিতালয়ে যেয়ে এইচআইভি বা সিফিলিসের মতন ভয়াবহ যৌন রোগ বাধায় নারী তখন ঘরে থেকে নারীত্ব প্রমাণে ব্যস্ত। দেখা গেলো বাবা-মা ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিয়েছে আর বাসর রাতে সেই তথাকথিত ভালো ছেলেটির কাছ থেকেই মেয়েটি উপহার পেয়েছে এইচআইভি। কিছুকাল পরে অন্তঃসত্ত্বা মা হয়ে ওঠা মেয়েটির কাছ থেকে সেই এইচআইভি পেয়েছে পেটের সন্তানটিও! একটি এইচআইভি পজেটিভ চমৎকার পরিবার গড়ে উঠেছে তাদের!

কাজেই এখন দরকার সচেতনতার। কন্যা শিশুটি কাদের কাছে অস্বস্তি বোধ করছে, কী লুকোচ্ছে, কীসে কষ্ট পাচ্ছে সেটা দেখুন। এটাও দেখুন যে সদ্য জামাই হতে চলা প্রবাসী বা ভালো চাকুরিওয়ালা ভালো ছেলেটি কোনো যৌন রোগের বীজ বহন করে চলেছে কিনা। রক্ত, এইচআইভি ইত্যাদি পরীক্ষার পরেই ভালো মন্দের পাল্লাটি সম্পর্কে নিশ্চিত হন।

মেয়ের দুর্নামের ভয়ে যৌন নির্যাতনকে লালন না করে নির্যাতনকারীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন, প্রতিকারের ব্যবস্থা করুন। কারণ হত্যাকারী শরীর হত্যা করে আর যৌন নির্যাতক শরীর হত্যা না করলেও মনটি হত্যা করে, আহত করে।

কাজেই গুরু, অন্ধ হলেই কিন্তু প্রলয় বন্ধ হবে না! বরং সচেতনতায় অন্ধত্ব ঘুচুক আপনার। আপনার, আপনার কন্যার, মাতা, প্রেমিকা বা ভগ্নীর পৃথিবীটি হোক স্বাধীনতার আর সমতার সূতিকাগার!     

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.